মনি মুক্তার কদর বাদশা জানে – সৈয়দ আবুল ওলা (রহঃ)
‘মনি মুক্তার কদর বাদশাজানে, আর জানে তার জাওহারী, জানে বুলবুল ফুলের কদর, আর জানে তা শাহপরী’- শাহসূফি সৈয়দ আবুল ওলা (রহঃ) সৈয়দ সাহেব (পীর সাহেব)।
মানব আত্মা চিরকালই অন্বেষণ করেছে সেই চরম সত্য, যে সত্য দৃষ্টিগোচর নয়, কিন্তু অনুভবযোগ্য। সূফিবাদ বা তাসাউফ সেই অন্তর্দৃষ্টি-ভিত্তিক জ্ঞান যেখানে প্রেম, আত্মত্যাগ, এবং তাওহিদের অনুভবই একমাত্র পথ।সুফিবাদ মানে শুধু কিছু আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়, বরং এটি এক অন্তর্জগতমুখী পথচলা — আত্মার পরিশুদ্ধির, প্রেমের, ও উপলব্ধির যাত্রা। সুফিরা বিশ্বাস করেন, সত্যিকারের জ্ঞান কেবল বইয়ে নয়, হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়। সৈয়দ আবুল ওলা (রহঃ) — যিনি একজন ওলি, আত্মদর্শী এবং গাউসে জমানা ছিলেন — তাঁর একটি বিখ্যাত বাণীতে মানব আত্মা ও জগতের গভীর সত্য উন্মোচন করেছেন চারটি চরণে।
এটি নিছক ছন্দবদ্ধ বাক্য নয়, বরং এক আত্মিক যাত্রাপথের নির্দেশনা, যেখানে প্রতিটি পঙ্ক্তি আত্মার একেকটি অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে।পঙ্ক্তির মাধ্যমে সেই সত্যকে প্রকাশ করেছেন, যা অগণিত তরিকতের মজলিসে, জিকিরের আঙ্গিনায়, আর মুরিদের কান্নাভেজা রাতগুলোর ভিতরে বারবার আত্মপ্রকাশ করে।এটা একটা রূহানী সফরনামা — যেখানে আত্মা পথ হাঁটে জ্ঞান থেকে প্রেমের দিকে, প্রেম থেকে বিলয়ের দিকে, আর বিলয় থেকে আল্লাহর গহীনে।
প্রতিটি চরণ একটি আলাদা “মাকাম” (আত্মিক স্তর) বোঝায় — যেগুলো একজন মুরীদ ধাপে ধাপে অতিক্রম করে যখন সে সত্যিকার অর্থে নিজের সত্তা (নফস), মায়া (হাওয়া), এবং জগতের মোহ (দুনিয়া) থেকে মুক্ত হতে চায়।
“মনি মুক্তার কদর বাদশা জানে।” সাধারণ অর্থ: রাজা বা ধনী ব্যক্তি রত্নের মূল্য বোঝেন।
আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ: এখানে “বাদশা” হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যিনি জ্ঞান, ধন, বিদ্যা, খ্যাতি বা পদে উন্নীত হয়েছেন। তিনি বাহ্যিক দৃষ্টিতে জগতের মুল্যবান জিনিসগুলো চিনতে সক্ষম। তিনি জানেন কোনটি হীরা আর কোনটি পাথর। কিন্তু সূফি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই বিচারও এক সীমাবদ্ধ উপলব্ধি। কারণ, এই জ্ঞান এখনো অন্তরের গভীরে পৌঁছেনি।
বাদশা প্রতীক একজন “আধা-জাগ্রত আত্মার” — যে বাহ্যিক রূপে বুদ্ধিমান ও ক্ষমতাশালী হলেও এখনো অর্ন্তজগতের সূক্ষ্ম রহস্যগুলো উপলব্ধি করতে পারেন না।তাঁর জ্ঞান অনেকটা চক্ষুষ্মান, কিন্তু হৃদয়বোধ অচেতন।এই স্তরে মানুষ হয়তো সত্যের সন্ধান করে, কিন্তু আত্মার সূর্য এখনো পূর্ণ উদিত হয়নি।বাহ্যিক জ্ঞান, মর্যাদা, ইলম, কিতাবি শিক্ষায় সমৃদ্ধ, কিন্তু এখনো ‘রূহানি দৃষ্টি’ পায়নি। তিনি যেমন দামী বস্তু চিনেন, তেমনই ভালো বক্তা, গায়েবি ঘটনা, কিংবা কারিশমাতেও আকৃষ্ট হন। কিন্তু এখানেই সূফিবাদের সূক্ষ্ম ভেদরেখা— তিনি এখনো ‘আসল রত্ন’ বুঝতে পারেন না।
বাদশা প্রতীক: বাহ্যিক জ্ঞানের উচ্চতা, খ্যাতি, প্রতিপত্তি, ইলমে যাহির, রুহানিয়াতের খোঁজ থাকলেও গভীরে পৌঁছাতে পারেন না। আত্মার প্রথম জাগরণ সীমাবদ্ধতা,হৃদয়ের খোঁজ নেই, আত্মার তৃষ্ণা নেই বিভ্রম, সত্যকে বাহ্যিক মোড়কে খুঁজে ফেরা এই ‘বাদশাহ’ — যে সত্যের কিছুটা আলোয় এসেছে, কিন্তু নিজের ছায়া এখনো ভাঙতে পারেনি। এখানে, বাদশা মানে সেই ব্যক্তি, যার হৃদয় এখনো তালাবদ্ধ। তিনি মূল্য বোঝেন, কিন্তু জীবনের গূঢ়তম সত্য বুঝেন না।
ইমাম হাসান বসরি (রহঃ) বলেন- “প্রথম ইলম হলো নফসকে চিনা। যার শুরু তা না, তার শেষেও হিদায়াত নেই।”
সূফিবাদ বলে- “ইলম না হুয়া মহব্বত কা দরিয়ায় না ডুবা।” অর্থাৎ- “জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতা নয়, তা হতে হয় হৃদয়ে।”
“আর জানে তার জাওহারী।” বাহ্যিক অর্থ– “রত্নবিশারদ জাওহারীই জানে কোনটা আসল রত্ন, আর কোনটা নকল।”
সূফি বিশ্লেষণ: জাওহারী মানে সেই আত্মিক পীর বা আরেফ যিনি বাইরের নয়, ভিতরের দীপ্তি বুঝতে পারেন। তিনি মানুষের মুখের কথা দিয়ে নয়, হৃদয়ের আলো দিয়ে বিচার করেন।জাওহারী জানেন, কার আত্মা আল্লাহর প্রেমে সিক্ত, আর কে শুধুই ধর্মীয় বাহ্যিকতায় আবদ্ধ।
এই পর্যায়ে মানুষ কেবল জানে না, সে “চিনে” — এবং আত্মার দীপ্তি তাকে আলো দেখায়। সূফিবাদে, এই অবস্থাকে বলা হয় “মাকশাফা” — অন্তর্দৃষ্টি লাভ।
জাওহারী প্রতীক: পীর, গাউস, কুতুব,মুর্শিদে কামেল, যারা অন্তরের পর্দা খুলে দিতে পারেন,আল্লাহর ইলহামপ্রাপ্ত ব্যক্তি। এই স্তরে আত্মা বাহ্যিকতা পেরিয়ে হৃদয়ের ভাষা বোঝে। কারো আত্মায় ‘নূর’-এর অস্তিত্ব আছে কিনা তা অনুভব করে।এই জাওহারীর দৃষ্টি হয় “ইনাল বাতিন”— অন্তর্জগতে।
“জানে বুলবুল ফুলের কদর।” বাহ্যিক অর্থ: বুলবুল পাখি জানে কোন ফুল আসল, তার গন্ধ ও সৌন্দর্য বোঝে।
সূফি বিশ্লেষণ: এই স্তরে আসে ‘ইশক’। বুলবুল এখানে আত্মার প্রেমিক রূপ। সে ফুল (আল্লাহ, হাকিকত, রূহ) এর প্রতি আকৃষ্ট। ফুলের বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, সে আকৃষ্ট হয় গন্ধের প্রতি — যা প্রতীক ঈমানের আসল রসের।
বুলবুল প্রতীক: মজবুত প্রেমিক আত্মা,ইশক ইলাহী-তে বিভোর ব্যক্তি,যিনি প্রেমের ভিতর দিয়ে সত্য খোঁজেন। এই প্রেমই সুফিবাদের মূল পথ।
ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলেন: “আল্লাহর প্রতি প্রেম না হলে ইলম বোঝা যায় না, আর প্রেম ছাড়া আত্মার দোর খোলে না।”
অর্থাৎ- “এই প্রেম জন্ম নেয় পীর-মুরীদ সম্পর্কের ভিতর। মুরীদ যখন পীরের চোখে আল্লাহর জ্যোতি দেখে, তখন তাঁর হৃদয় বুলবুল হয়ে উঠে।”
“আর জানে তা শাহপরী।” অর্থ: “শাহপরী বোঝেন প্রেম ও সৌন্দর্যের রহস্য।”
সূফি বিশ্লেষণ: এটি আত্মার পরিণতি। শাহপরী হচ্ছে সেই আধ্যাত্মিক সত্তা যিনি আত্ম-অস্তিত্ব বিলীন করে আল্লাহর সত্তায় বিলীন হয়েছেন। এখানে আত্মা হয়ে ওঠে ‘ফানা ফিল্লাহ’ — নিজেকে হারিয়ে আল্লাহকে পাওয়া।
শাহপরী প্রতীক: যিনি আত্মার অন্তিম সীমা অতিক্রম করেছেন।“বাকা বিল্লাহ” অর্জনকারী,নিজেকে ভুলে আল্লাহর পরিচয়ে স্থিত।
এই স্তরে পৌঁছানো মানে: ইলমে লাদুনি (আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান), ইশারায় কাজ হওয়া, আত্মিক অন্তর্দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখা।
একজন শাহপরী এমন এক স্থানে থাকেন যেখানে “তাওহীদ” ছাড়া আর কিছু নেই। তাঁর হৃদয়ে বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক বিভাজন মুছে যায়। তিনি বুঝেন — কে আল্লাহর প্রেমে পুড়ছে, কে শুধু ধর্মের ছায়ায়।
পীরে কামেল সৈয়দ আবুল ওলা (রহঃ)-এর এই চার লাইনের বাণী আসলে এক রূহানী মানচিত্র — এটি শেখায়: বাহ্যিক খোলস দিয়ে নয়, দেখতে হয় আত্মার দীপ্তি, কথায় নয়, হৃদয়ের সুরে বোঝা যায় সত্য, গৌরব নয়, দরকার প্রেম,বাহ্যিক সাধনা নয়, চাই আত্মিক বিলয়।
এই চারটি প্রতীক (বাদশা, জাওহারী, বুলবুল, শাহপরী) আমাদের শেখায় ইলম থেকে ইশক, এবং ইশক থেকে ফানা — এটাই সূফিদের পথ। এটাই আত্মিক মুক্তির মহাসড়ক।
লেখক- সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান।






