ফানার ছায়ায় বাকার আলো: খাজা সুজাউদ্দৌলার আত্মশুদ্ধির আহ্বান

ফানার ছায়ায় বাকার আলো: খাজা সুজাউদ্দৌলার আত্মশুদ্ধির আহ্বান

সুফিচিন্তক: কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী

আত্মশূন্য সময়ে আধ্যাত্মিকতার অমল ধারা—
এমন এক যুগে আমরা বসবাস করছি যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতি, ভোগবিলাসের প্রতিযোগিতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতার দাপট—মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার নিঃশব্দ কণ্ঠকে প্রায় আড়াল করে ফেলেছে। এই বিভ্রান্ত সময়ে খাজা সুফি সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.) যেন আদর্শ মানুষটি এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবনাচার, আধ্যাত্মিক গভীরতা, বিনয়, মেহমানদারি ও ইবাদতে নিষ্ঠা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবজীবনের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানুষের কল্যাণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, আজকের সময়েও খাঁটি ওলির জীবনযাপন সম্ভব—যেখানে নববী আদর্শ কেবল স্মৃতিই নয়, বরং চলমান এক জীবন্ত শিক্ষা।

আলোকের গভীরে এক নীরব যাত্রা—
বাংলার মাটি চিরকালই ছিল আত্মার দিগন্তে উদীয়মান সূর্যের প্রার্থনাভূমি। গঙ্গা—পদ্মার তীর ধরে যে ইসলাম এদেশে এসেছে, তা কেবল বিধানগত আনুষ্ঠানিকতা নয়—তা ছিল এক রূহানী বিপ্লব, এক তাসাউফি আলোকে উদ্ভাসিত জীবনপথ। এখানে ইসলাম মানে ছিল কেবল সালাত—সওমের নির্দিষ্টতা নয়, বরং প্রেম, পরিশুদ্ধি আর পরার্থপরতার এক অন্তর্জাগতিক সুর। এই ভূখণ্ডে সেসব আধ্যাত্মিক সাধকরা ছিলেন আলোর কষ্টিপাথর, যাঁদের বুকের গভীর থেকে উঠেছিল ‘লা—ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ ধ্বনি—যা মাটি ছুঁয়ে আকাশকে আলোকিত করেছিল। তাঁদের সাধনা ছিল জিকিরের মালায় গাঁথা, খিদমতের স্রোতে ধুয়ে যাওয়া এক অন্তহীন আত্মশুদ্ধির পথ। এই আলোকময় পথচলার বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক জ্যোতির্ময় অধ্যায়ের নাম—হজরতুল আল্লামা শাহ সুফি খাজা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রহ.)।

তিনি ছিলেন না শুধুই এক সাধক, বরং ছিলেন আলোকের দিশারী, যাঁর রূহানী শ্বাসে জেগে উঠেছিল ধর্ম—বোধ, মানবতা ও অন্তর্জগতের আরাফাত। তাঁর সুফিবাদ কোনো গূঢ় আভিধানিক তত্ত্ব ছিল না; বরং ছিল মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা সিঞ্চনের এক অনুপম পদ্ধতি। তাঁর তরিকত ছিল ইবাদত আর ইনসাফের দ্যুতিময় সংলাপ। এই আত্মিক ধারার উত্তরাধিকার বহন করেন অপর এক অগ্নিস্নাত সাধক—খাজা মাওলানা শাহ সুফি ছাইফুদ্দীন শম্ভুগঞ্জী (রহ.)। তিনি ছিলেন সেই রূহানী বংশপরম্পরার ধারক, যাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে ছিল জিকিরের ঘন ধ্বনি, আর প্রতিটি কর্মকাণ্ডে খোদাপ্রেমের স্বাক্ষর।

এই দুই আধ্যাত্মিক দীপ্তির পরম্পরা থেকে জন্ম নেন এক নিঃশব্দ ধ্যানী, এক নীরব সাধক—খাজা সুফি সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.)। তিনি যেন সেই গোপন গোলাপ, যার সুবাস পত্রহীন, কিন্তু তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে দিক—বিদিকে। তাঁর জীবন ও দর্শন আজকের এই আত্মহারা জগতে এক পুণ্যবীজ—যা আত্মশুদ্ধি ও আত্মদর্শনের চর্চাকে করে তোলে নিরবচ্ছিন্ন। এই জীবনী কেবল একটি ব্যক্তি—চরিত নয়; এটি এক আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্ণ নকশা, যা মুরিদ—মাশায়েখের সম্পর্কের বাইরে, এক শুদ্ধতম আত্মপরিচয়ের সন্ধান। তাঁর জীবনানুশীলন, খোদাভীতি, ইবাদতের গভীরতা, নিরব জিহাদ, সত্যসন্ধান ও সমাজদায়িত্ব—সব মিলিয়ে এটি এক ‘‘আধুনিক যুগের অলীসুলভ সাহসিকতার কাহিনি’’।

ছায়ার মতো এক হাত—
শীতের শেষপ্রান্তে ঈশ্বরগঞ্জের সেই মাহফিল। দিগন্তে জমে থাকা কুয়াশার চাদর যেন সেদিন সূর্যাস্তের পর থেকেই আসমানি রহমতের প্রতীক্ষায় বসেছিল। আমি (লেখক) ঢাকা থেকে এসেছি, দীর্ঘ পথ। জ্ঞানী—আলিমদের বয়ান, ওলীদের দোয়া, আর মিলাদের সেই অপার্থিব ঘ্রাণ আমাকে ডাকছিল অনেকদিন ধরে। মাহফিলের শুরু থেকে রাত গভীর হয়ে আসছিল—তবুও কারো মাঝে ক্লান্তির ছায়া ছিল না। একে একে ভেসে আসছিল হামদ, নাত, সলাত ও সালাম। কেউ কাঁদছিল। কেউ দোয়া করছিল। কেউ নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিল কোনো আভ্যন্তরীণ জ্যোতির দিকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি পেছনে। দৃষ্টি পড়লো হুজুরের দিকে—খাজা সুফি সুজাউদ্দৌলা। শান্ত, নিশ্চুপ। চারপাশে শত শত মানুষ, কিন্তু তাঁর চোখ যেন আরেক জগতে স্থির। শেষ পর্বে মিলাদ—কিয়াম। সবাই দাঁড়ালাম। কেউ নামাজের মতো হাত বাঁধল, কেউ হাত ছড়াল। খাজা সুজাউদ্দৌলা এবং খাজা আলাউল হক অলি ছিলেন কিয়ামের সামনের সারিতে।

আমি মুগ্ধ চোখে দেখছি মিলাদের রেশে ভেসে যাওয়া মুখগুলো। হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল হুজুরের উপর। তিনি ধীরে ধীরে ডান হাতটি বৃষ্টির পানি হাতে নেয়ার মতো আসমানের দিকে প্রসারিত করলেন, যেন আকাশের রহমতের স্নিগ্ধ বৃষ্টি তাঁর হাতে পড়ছে। যেন কোনো অস্পষ্ট আলো আসছে সেখান থেকে, আর তিনি তা গ্রহণ করছেন। তাঁর চোখ যেন ধ্যানমগ্ন। তাঁর হাতের ভঙ্গিমা যেন আল্লাহর দরবারে খুলে রাখা এক জ্যোতির কাপে ধরা পড়া রহমতের ধারা। আমি স্থব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি—মনে হলো, কিয়ামতের দিন রহমতের ছায়ার নিচে এই হাত থাকবে। কয়েক মুহূর্ত। তারপর তিনি হাত নামিয়ে নিলেন। আবার নীরবে মিলাদে ফিরে গেলেন। তবু সেই মুহূর্তটা, সেই ছায়ার মতো প্রসারিত হাত—আমার চোখে গেঁথে রইল চিরদিনের জন্য। মনে হলো, কোনো পবিত্র রূহ সেই মুহূর্তে আসমানের কুদরতি জানালা খুলে ফায়েজ গ্রহণ করছিল আমাদের সকলের জন্য। আমি কাঁপতে থাকা কণ্ঠে নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম— “সত্যিই কি কিছু মানুষের হাত আসমান ছুঁতে পারে?” হয়তো পারে, যদি সেই হাতে থাকে আল্লাহর দয়া গ্রহণের কাবলি রুহ।

নববী আতিথেয়তার ছায়া—
গ্রীষ্মের এক দুপুর। ভেতরটা কেমন যেন নিস্তব্ধ আর আবেগে আচ্ছন্ন। ভ্রমণের ক্লান্তি সত্ত্বেও হৃদয়ে এক অজানা প্রত্যাশা কাজ করছিল। আমার সঙ্গে ছিলেন বন্ধু ও সহযাত্রী ডা. গিয়াস উদ্দীন মিঠু। আমরা দুজনেই ভেতরে ভেতরে ভাবছিলাম—আজ হয়তো কিছু অদৃশ্য সত্যের দেখা মিলবে। গন্তব্য লালকুঠি পাক দরবার শরীফ। অনেকবার শুনেছি হুজুর খাজা সুফি সুজাউদ্দৌলা আর তাঁর ভাই খাজা সুফি আলাউল হক অলির কথা। এবার চোখে দেখার সুযোগ মিলল। দরবারে পৌঁছেই বুঝলাম, এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়—এ যেন নববী সুন্নাতের প্রতিচ্ছবি, একটি জীবন্ত আদর্শ। দরবারের পরিবেশে যে নম্রতা, সে যেন আত্মাকে ধুয়ে পবিত্র করে তোলে। হুজুরদ্বয় একে একে এগিয়ে এলেন। পরনে সাদা কাপড়, মুখে জ্যোতি, কিন্তু চোখে এক অনবদ্য বিনয়। আমরা ভাবছিলাম কারা হয়তো আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসবে। কিন্তু বিস্ময়ে দেখলাম, এই দুই ওলিকেই—নিজ হাতে অন্দরমহল থেকে খাবার এনে আমাদের সামনে রাখছেন।

শুধু তাই নয়, একজন হাত ধুতে পানি এনে দিচ্ছেন, অন্যজন টিস্যু তুলে দিচ্ছেন। কেউ আবার কণ্ঠে মধুর সুরে জিজ্ঞেস করছেন— “ভাই, আর কিছু লাগবে? ”আমি কিছুক্ষণ বোবা হয়ে থাকলাম। এই দৃশ্য তো কেবল বইয়ে পড়েছি—হাদিসে, ইতিহাসে, নবীজীর জীবনচিত্রে। সেখানে লেখা, প্রিয় নবী (সা.) নিজ হাতে সাহাবীদের খাওয়াতেন, খাবার পরিবেশন করতেন, তাঁদের জন্য দোয়া করতেন। আজ সেই অতীতের জ্যোতি যেন বর্তমানের ছায়া হয়ে ফিরে এসেছে এই দরবারে। হঠাৎই এক ভাবনায় হৃদয়টা কেঁপে উঠল—এইতো সাদামাটা দুই দরবেশ, সংসারও আছে, প্রয়োজনও আছে। তবু তারা আমাদের জন্য যা আছে, সবই এনে দিলেন। তাদের স্ত্রী—সন্তানদের জন্য কী অবশিষ্ট থাকবে? তবু মুখে নেই বিন্দুমাত্র সংশয়, নেই কৃপণতা—শুধু এক হৃদয়ভরা আতিথেয়তা। সেই দিনে আমি যেন সময়ের দেয়াল ভেঙে হেঁটে গিয়েছিলাম মদীনায়। নবীজীর পাশে বসে খাচ্ছি, আর তিনি হাতে করে পরিবেশন করছেন। হুজুর সুজাউদ্দৌলা ও আলাউল হক অলির আচরণ ছিল সেই নববী চরিত্রের এক জীবন্ত ভাষ্য। আত্মা তখন চুপচাপ সাক্ষ্য দিচ্ছিল— “যারা নবীর সত্যিকারের উত্তরসূরী, তাঁরা বংশে নয় শুধু, আচরণেই চিনিয়ে দেয় নিজেদের।”

চোখে দেখা এক নববী ছায়া—
দরবারের ভেতরটা ছিল আশ্চর্য রকম নিঃশব্দ, অথচ শব্দহীন নয়। যেন আকাশ থেকে কোনো অদৃশ্য শান্তির কণা ঝরে পড়ছে ধীরেধীরে। খাজা সুফি সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.) ঠিক তখনই এলেন সামনে। চেহারায় কোনো আড়ম্বর নেই, নেই বাহ্যিক কৃত্রিমতা। তাঁর চলনে যেন হযরতুল ইনসান—আদর্শ মানুষের প্রতিচ্ছবি। আমরা নীরব শ্রোতা, আর তিনি যেন ধীরে ধীরে এক আধ্যাত্মিক দরজা খুলে দিচ্ছেন। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি আলাদা, খুব শান্ত, হৃদয় ছোঁয়া, নবীজীর (সা.) বর্ণিত আচরণের মতোই কোমল ও সহৃদয়। তাঁর দু’হাত কথা বলার সময় শিশুর মতো নাড়ছিল। প্রথমে মনে হল, এটি হয়তো কোনো সহজাত অভ্যাস। কিন্তু তারপর আমার মনে পড়ল তাসাউফের একটি পুরনো পাঠ—যখন আল্লাহর রহমতের ঢেউ একজন বুযুর্গের হৃদয়ে নেমে আসে, তখন সে আর স্থির থাকতে পারে না। তাঁর হাতের সেই শিশুসুলভ নড়াচড়ায় আমি দেখলাম রহমতের স্পন্দন। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক আশ্চর্য সুর—নববী আলাপের ছায়া। প্রতিটি বাক্য যেন কারো দিকে নয়, বরং সমস্ত মানবতার দিকে আহ্বান ছুঁড়ে দিচ্ছে—“চলো শান্তির পথে, চলো আল্লাহর দিকে”।

সে ডাক উপদেশ নয়, আদর—গভীর এক ভালোবাসা। হঠাৎ মাঝেমাঝে দেখি তিনি থেমে যাচ্ছেন। দৃষ্টি স্থির, কিন্তু মন যেন উড়ে গেছে বহু দূরে। কোথায় যেন হারিয়ে যান তিনি। তখন মনে হয়, এই মানুষটা ঠিক আমাদের মধ্যে নেই—আছেন কোথাও উর্ধ্বলোকের আশকে ডুবে। আমি দেখছিলাম তাঁর চোখ, সে চোখে কেবল আলো নয়, ছিল অশ্রু লুকানো এক রহস্য। মনে হচ্ছিল, এই তো সেই অলী, যে নিজে কিছুই দাবি করেন না, অথচ সমস্ত আলোর পথ তিনিই খুলে দেন। সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম—খাজা সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.) কেবল একজন আলেম নন, তিনি এক জীবন্ত নববী ছায়া। তাঁর অঙ্গভঙ্গি, চলন, চাহনি, কণ্ঠস্বর—সব কিছুতেই ছিল যেন রাহমাতুল্লিল ‘আলামীনের (সা.) সুবাতাস। এ শুধু দেখা নয়, এ যেন এক আত্মিক সাক্ষাৎ। যেখানে কথা নয়, হৃদয় বলে—এই মানুষটি আল্লাহর খুব কাছের কেউ।

আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার: রক্তে বহমান রুহানিয়তের ধারা—
বংশধারার রক্তে যাঁদের জেগে থাকে ইলম, ইখলাস ও রুহানিয়তের আলো, তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে এক অলৌকিক জ্যোতির বাহক। হজরত খাজা সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.)—এর রূহানী পূর্বসূরি ছিলেন উপমহাদেশের আলোকবর্তক খাজা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রহ.), যিনি শুধু একজন অলী ছিলেন না, বরং ছিলেন এক জাগ্রত আধ্যাত্মিক দ্যুতি। তাঁর পিতা খাজা ছাইফুদ্দীন শম্ভুগঞ্জী (রহ.) ছিলেন পরিণত মুর্শিদ ও রুহানিয়তের সঞ্জীবনী ধারক। আর মা—জীবন্নেসা বেগম ছিলেন পবিত্রতা ও চরিত্রের এক জীবন্ত প্রতিমা, যার প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়েছে পুত্রের সত্তায়। এই বংশানুক্রমিক রূহানিয়ত আজও বহমান, যা শুধুমাত্র রক্তের সূত্রে নয়, বরং আধ্যাত্মিক সাধনা ও আত্মিক উত্তরণের ধারায় অটুটভাবে বহমান এক অলৌকিক ধারা।

ভাষায় আধুনিকতা, চেতনায় রুহানিয়াত—
ইংরেজি, বাংলা, উর্দু ও ফারসি—বহুভাষিক পারদর্শিতায় তিনি যেমন আধুনিক মননের প্রতীক, তেমনি তাঁর উচ্চারণে ও চিন্তায় জেগে থাকে এক গভীর রুহানিয়াত। আর তাঁর চেহারায় খেলা করা নূরানি আভা যেন আসমান থেকে নেমে আসা এক দ্যুতিময় ইশারা।

নববী চরিত্রে রূপ, ইলাহি চেতনায় দীপ্তি:—
নীরব সৌম্যতায় জেগে থাকে তাঁর চরিত্রের নববী প্রতিফলন, আর চেতনায় বিরাজ করে আল্লাহ ও রাসূলের সান্নিধ্যের ইশারা। কথার পরিমিতি, দৃষ্টির গভীরতা, এবং উপস্থিতির নূর—সব মিলিয়ে তিনি এক অন্তঃশুদ্ধির আলোকস্তম্ভ।

দরদের দানে দীপ্ত ফকির: ইহসানের জীবন্ত আখ্যান—
টাকার রাজ্য (কানাডার সিনিয়র সিটিজেন) ছেড়ে গরিবের ঘরে বসতি গড়া, চোখের আলো ফিরিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিদিন শতজনকে আহার—খাজা সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.)—এর এই দান ও সেবার ধারায় জেগে আছে এক নববী ইহসানের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

নূরের সিঁড়ি বেয়ে ইনসানে কামিল: আত্মশুদ্ধির তরিক্বতযাত্রা—
আকিদার বিশুদ্ধতা যাচাই থেকে শুরু, এরপর ১. কালিমা, ২. তাওবা, ৩. শপথ, ৪. দামানে আবদ্ধ (অর্থ— আঁচলে বাঁধা, আশ্রয়ে আবদ্ধ, অথবা সান্নিধ্যে নিয়োজিত। এটি সাধক—পীরের প্রেমময় আশ্রয়ে অবস্থান বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়), ৫. ক্বলবে সবক (অন্তরে শিক্ষিত সবক, অর্থাৎ এমন জিকির বা আধ্যাত্মিক পাঠ যা হৃদয়ে গেঁথে দেওয়া হয়েছে) এবং পর্যায়ক্রমে ফয়েজ এবং তাওয়াজ্জুহ ও জিকিরের ধাপে ধাপে এক ফকির রচনা করেন আল্লাহর পথে আত্মার জাগরণ—নূরে মুহাম্মাদির আলোয় স্নাত এক ইনসানে কামিল।

আত্মার আলো—
কানাডার ধবধবে স্নিগ্ধ এক শহরতলিতে এক বাংলাদেশি খুব সাধারণ একজন মানুষ বলেই মনে হয় প্রথম দর্শনে। কিন্তু তাঁর চোখে অনন্ত ধ্যানের দীপ্তি, আচরণে নববী চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। তিনি খাজা সুজাউদ্দৌলা—একজন আত্মিক সাধক, এক প্রবাসী দরবেশ, যাঁর দিনরাত্রি কেটে যেত ইবাদত, যিকির, কুরআন তেলাওয়াত আর নিঃশব্দ মুরাকাবায়। তিনি এক নিঃশব্দ বিপ্লব চালিয়ে যাচ্ছিলেন—ভেতরের বিপ্লব। একদিন তাঁর চলাফেরা, আচার—আচরণ, নীরব সৌম্যতা ও স্নিগ্ধ নূরানিয়াত আকর্ষণ করল এক কানাডীয় তরুণকে। সে তরুণ পাথরের মতো জীবনে প্রথমবার অনুভব করল পানির স্পর্শ। বুঝল—মানবদেহ শুধু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমাহার নয়, তার গভীরে এক আধ্যাত্মিক প্রাণ থাকে, যা খোদার দিকে হাঁটতে চায়। তরুণটি সাহস করে কাছে এলো। সান্নিধ্যে এলো। নীরবতাকে ভাষা করলেন খাজা সাহেব। তরুণটি হৃদয়ের কণ্ঠে শুনল সেই বাণী—যা শুধু একজন ওলি আল্লাহর কাছ থেকেই পাওয়া যায়।

অবশেষে তরুণটি গ্রহণ করল ইসলাম। তার আত্মা যেন একটি অনন্ত নিশ্বাসে জেগে উঠল। তৃষ্ণার্ত পাখির মতো ছুটে এলো বাংলাদেশের লালকুঠি দরবার শরীফে—যেখানে শায়িত আছেন খাজা ছাইফুদ্দীন (রহ.)। সে তরুণ তিন মাস থেকে আত্মিক প্রশান্তির নূর নিজের হৃদয়ে আহরণ করে ফেরত গেল কানাডায়। কিন্তু তার হৃদয়ে রয়ে গেল এক অলঙ্ঘনীয় সংযোগ—এক পীর, এক পথপ্রদর্শকের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন। খাজা সুজাউদ্দৌলা তাকে নিজ হাতে শিখিয়েছেন ঈমান, আকীদা, সুন্নাহ, দোয়া, যিকির, তরীক্বত ও আল্লাহভীতির মহান শিক্ষা। আজ খাজা সাহেব বাংলাদেশে। দেশের মাটিতে ফিরে এসেছেন পিতার রেখে যাওয়া দরবার ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে। কিন্তু কানাডায় ছড়িয়ে রেখেছেন আলোর একটি কণা—একটি জাগ্রত আত্মা। এ গল্প ধর্মান্তরের নয়, বরং আত্মার দিগন্তমোচনের। এটি এক পীরের জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্রের, যা শুধু ধর্ম নয়—আত্মার আলোকের কারণ হয়। একজন সাচ্চা দরবেশের সান্নিধ্য কীভাবে বদলে দেয় হৃদয়—এ গল্প তারই আলোকরেখা।

হজরত শাহ সুফি খাজা সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.): এক অলীসত্তার চার আধ্যাত্মিক প্রকাশ—
হজরত শাহ সুফি খাজা সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.)—কুরআন—হাদীস, ফিকাহ ও আধ্যাত্মিক সাধনার গভীর আলোকে আত্মিক জীবন গড়ে উঠেছে। তাঁর জীবনে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে অলীদের চারটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য—ইলহাম, কারামাত, কাশফ ও সত্য স্বপ্ন। এই চারটি বিষয়ে কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াস এবং ইমাম ও ফকীহদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে তা আমাদের নিকট এক সুস্পষ্ট আধ্যাত্মিক কাঠামো নির্মাণ করে দেয়, যেখানে অলীদের অবস্থান কেবল অনুভব নয়—তাওহীদের গভীর অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠিত।

১। ইলহাম
ইলহাম অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্তরে নিক্ষিপ্ত কোনো সত্য উপলব্ধি। হজরত খাজা সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.)—এর রূহানী অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এই ইলহাম। কুরআনে ইলহামের ইঙ্গিত এসেছে: “তাকে (মানব আত্মাকে) তার পাপ ও পরহেযগারিতার জ্ঞান দান করলেন”—সূরা আশ—শামস (৯১:৮)।
ইমাম আল—গাযযালী (রহ.) তার “ইহ্যাউ উলুমুদ্দীন” গ্রন্থে বলেন, ইলহাম হচ্ছে এমন রূহানী উপলব্ধি, যা কেবল সেই হৃদয়ে আসে, যা তাযকিয়ার মাধ্যমে আলোকিত হয়েছে। ইমাম কাশানী ও অন্যান্য সুফি ফকীহগণ ইলহামকে ওলীদের জন্য স্বীকৃত করেছেন, যদিও নবুয়তের বিকল্প নয়।

২। কারামাত
কারামাত অর্থ অলৌকিকতা বা বিরল আধ্যাত্মিক ক্ষমতা, যা একজন ওলির মাধ্যমে আল্লাহ প্রকাশ করেন। হজরত খাজা সাহেবের জীবনে অনেকবার এমন ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার বাইরে। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কারামাতের প্রমাণ রয়েছে। কুরানের উদ্ধৃতি, “যার কাছে কিতাবের কিছু জ্ঞান ছিল, সে বলল, আমি আপনার চোখের পলক পড়ার আগেই তা এনে দিতে পারি”—সূরা নামল (২৭:৪০)। এই আয়াতে কারামাতের সুস্পষ্ট নজির পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “যে আমার কোনো ওলির শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি”— সহীহ বুখারী (হাদীস: ৬৫০২)। হাদীসটি প্রমাণ করে যে, ওলিদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ থাকে এবং তাদের মাধ্যমে অসাধারণ ঘটনা ঘটতে পারে।

৩। কাশফ
কাশফ অর্থ রূহানী অন্তর্দৃষ্টি বা অদৃশ্য কোনো বিষয় হৃদয়চক্ষে উপলব্ধি। খাজা সাহেবের জীবনে এমন বহু ঘটনা আছে, যেখানে তিনি মানুষের মনের অবস্থা, রূহানী সংকেত, এমনকি গোপন সত্য অনুভব করেন। এই বিষয়টি প্রমাণিত হাদীসে বর্ণিত: “মুমিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করো, সে আল্লাহর নূরে দেখে”— সুনান তিরমিযী (হাদীস: ৩১২৭)। ইমাম শাফি (রহ.) বলেন, এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, ইলহামের মতো কাশফও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওলিদের জন্য প্রদানকৃত একটি বিশেষ দান।

৪। সত্য স্বপ্ন (রুয়া সালিহা)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “সৎ স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের একটি অংশ”— সহীহ বুখারী ও মুসলিম।” ইমাম নববী (রহ.) তার “শরহ মুসলিম” গ্রন্থে বলেন, এই স্বপ্ন রাসূল—পরবর্তী যুগে মুমিন ও অলীদের মাঝে রূহানী ইঙ্গিত বা ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যম হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে। হজরত খাজা সাহেব (মা.আ.)—এর রূহানী জীবনে এইরূপ সত্য স্বপ্ন বহুবার বাস্তবতার সাথে মিলেছে, যা আত্মিক বোধের গভীরতাকে নির্দেশ করে।

ইজমা ও কিয়াসের দৃষ্টিতে—
চার ইমামের মধ্যে কেউই ইলহাম, কারামাত, কাশফ ও রুয়া সালিহা—র অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, “আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তরকে নূরে ভরিয়ে দেন—সেখানে কোনো শয়তান প্রবেশ করতে পারে না”—তাবাকাতুল হানাফিয়া। ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেন: “কারামাত ওলিদের জন্য প্রমাণিত, এবং তা আহলে সুন্নাহ ও জামাআতের সর্বসম্মত মত”—মাজমু’ ফাতাওয়া: ১১/৩১৩।

মোদ্দা কথা—
অতএব, হজরত খাজা সুজাউদ্দৌলা (মা.আ.)—এর জীবনে ইলহাম, কারামাত, কাশফ ও সত্য স্বপ্নের প্রকাশ একদিকে তাঁর আত্মিক উচ্চতা ও তাযকিয়ার পরিচয় বহন করে, অপরদিকে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওলিদের প্রতি বিশেষ রহমতের নিদর্শন। কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের আলোকে এ চতুষ্টয় ইসলামী আত্মিকতাবাদে বিশুদ্ধ, সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ইতিহাসসম্মত বাস্তবতা। আল্লাহর নূর, ফজল ও তজ্জলির প্রতিফলন এই চারটি বিষয়ের মাধ্যমে ওলিদের অন্তরে প্রতিফলিত হয়। নবী করিম ﷺ এর দয়ার আভা এই ওলিদের হৃদয়কে প্রজ্জ্বলিত করে; তাঁর রূহানি বেলায়াতের এক ধার এই চার বিষয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। আল্লাহ বলেন— “আল্লাহ যাকে চান, তাঁর জন্য ইমানের আলো খুলে দেন, সে কি অন্ধের সমান হতে পারে?”—(সূরা যুমার, ৩৯:২২)। ওলির হৃদয় সেই আলোর কূপ, যেখানে আল্লাহর দয়া ঝরে পড়ে। তাঁরা সাধনার পর সাধনায়, ইবাদাতের পর ইবাদাতে পৌঁছান এক অন্তর্দৃষ্টি ও নূরের স্তরে, যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই ইলহাম, কাশফ, কারামাত ও সত্য স্বপ্ন—এই চারটি একই বেলায়াতি বৃক্ষের চারটি শাখা। প্রতিটি আলাদা হলেও, তারা একে অপরের পরিপূরক। এরা সবই আল্লাহর দয়া, নবীর তফরীকী (আলোকিত) উজালা এবং ওলির সাধনার ফলশ্রুতি।

সূত্রসমূহ: ১. কুরআন মাজীদ, ২. সহীহ বুখারী, ৩. সহীহ মুসলিম, ৪. তাফসীর ইবনে কাসীর, ৫. আল—ফাওয়াইদ—ইমাম ইবনে কায়্যিম, ৬ শরহে মুসলিম—ইমাম নববী, ৭. হায়াতুল আওলিয়া—আবু নু’আইম, ৮. কাশফুল মাহজুব—আল হুজুরি

আরো পড়ুনঃ