কারবালা: আত্মবিসর্জনের রহস্য ও আত্মার মহাবিপ্লব

কারবালা: আত্মবিসর্জনের রহস্য ও আত্মার মহাবিপ্লব

কারবালা কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়—এ এক দার্শনিক বিভাজন রেখা, যা আলাদা করে দেয় আত্মা আর দেহের দ্বন্দ্বকে, সিংহাসনের মোহ আর আত্মসমর্পণের তপস্যাকে, বাহ্যিক ধর্ম ও অন্তর্নিহিত ধার্মিকতাকে।

ইমাম হোসেন (আ.) কারবালার প্রান্তরে যে রক্ত ঝরিয়েছেন, তা শরীরের নয়—তা অহংকার, প্রলোভন, মিথ্যা আত্মপরিচয়ের। তাঁর মৃত্যু কোনো প্রথাগত “বীরত্ব” নয়, বরং আত্মার ঐশী মুক্তি।

কারবালার আসল শিক্ষা হলো — “নিজেকে হত্যা করো, অন্য কাউকে নয়।”
হত্যা করো সেই মিথ্যা ‘আমি’কে, যে বলছে—”আমি মুসলমান”, “আমি শিয়া”, “আমি সুন্নি”, “আমি হিন্দু”, “আমি খ্রিস্টান”, অথচ হৃদয় রয়ে গেছে যেভাবে ছিল — ক্ষমতা-পিপাসু, প্রতিপত্তি-লোভী, স্বার্থে অন্ধ।

“কারবালা তোমাকে বলে”
ইসলাম শুধুই প্রার্থনার রেওয়াজ নয়, তা এক আত্মিক জাগরণ।
হোসেন নামাজের মাঝে ছিলেন না, ছিলেন নামাজ হয়ে।
তিনি মসজিদে ছিলেন না, ছিলেন রক্তে-লিখিত আয়াত।
তিনি হিজরতে ছিলেন না, ছিলেন আত্মার আহ্বানে।
তাঁর কাঁধে ছিল না কেবল নবীর রক্ত, ছিল নবীর চেতনার উত্তরাধিকার।

কারবালা এক পরীক্ষাগার, যেখানে হোসেনের পক্ষ নেওয়া মানে নিজের ভেতরে থাকা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।
তুমি যদি সত্যকে ভালোবাসো, তাহলে হোসেন তোমারও আত্মা।
যদি মিথ্যার কাছে মাথা নোয়াও, তাহলে তুমি ইয়াজিদই—নাম যাই হোক না কেন।

“কারবালা এক আয়না।”
তুমি সেখানে গিয়ে দেখতে পারো তুমি আসলে কে।
তুমি ইমানের নামধারী, নাকি ইমানের বেহাল কর্তা?
তুমি নামাজী শরীর, না আত্মায় স্থির?
তুমি খালি চোখের মুসলমান, না অশ্রু-স্নাত আত্মার মানুষ?

ইয়াজিদ চেয়েছিল ইসলামকে কাগজে লিখে রাখতে, হোসেন চেয়েছিলেন একে হৃদয়ে জ্বালাতে।
একজন চেয়েছিল ক্ষমতা, আরেকজন চেয়েছিলেন মহাকাল।
তাই তো ইতিহাস তাকে মুছে ফেলেছে, আর হোসেন আজো বেঁচে আছেন।

“কারবালা প্রতিদিন ঘটে—তোমার একেকটি সিদ্ধান্তে।”
তুমি হালাল রুটি খাবে, না হারাম রাজনীতি?
তুমি সত্য বলবে, না সুবিধাবাদী চুপ?
তুমি প্রেমকে গ্রহণ করবে, নাকি ভয়কে পূজো করবে?

কারবালা এইসব প্রশ্নের নাম।
কারবালা বলছে—”জীবন হোসেনের মতো হও। মৃত্যু হোক চেতনাপূর্ণ, নিঃস্বার্থ।”
কারণ, সত্যের মৃত্যু নেই। এবং যার হৃদয় সত্যে স্থিত, তার নামই হোসেন।

“হোসেন তুমি, যদি তুমি আত্মা জাগাও।
ইসলাম তুমি, যদি তুমি সত্যে দাঁড়াও।
কারবালা তুমি, যদি তুমি প্রতিরোধ হয়ে ওঠো।”

এবার নিজের হৃদয় থেকে একবার বলে দাও—
“লা ইলাহা ইল্লা হক।
হোসেন মিনি, হক্ক মিন হোসেন।”

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ