পর্বত ও আধ্যাত্মিক আরোহণ (গুরু-শিষ্যের আলোচনা)
আজকে রাতের গভীর আলোচনা:- (গুরু: মোঃ বশিরুল ইসলাম, শিষ্য: আব্দুল মজিদ)
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): মজিদ, আজ আমরা এক কঠিন কিন্তু পবিত্র আলোচনা শুরু করব। তুমি কি মানবদেহকে কেবল রক্ত-মাংসের একপিণ্ড মনে করো, নাকি এর গভীরে কোনো অসীম রহস্য লুকিয়ে আছে? তোমার কি প্রশ্ন পর্বতে আরোহণের সাহস আছে?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, আমার মন প্রশ্ন-পর্বতের চূড়ায় পৌঁছাতে ব্যাকুল। আপনার শিক্ষা থেকে আমি বুঝেছি, এই দেহ নিছক বস্তু নয়, এটি আত্মার এক ঠিকানা, এক অলৌকিক মানচিত্র। কিন্তু এই মানচিত্রের গহীনে প্রবেশের পথটি এখনও আমার কাছে অস্পষ্ট। আমার প্রশ্ন হলো, এই পথে কীভাবে পা বাড়াবো?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): চমৎকার প্রশ্ন, মজিদ! এই পথটি দুর্গম হলেও এর গন্তব্য পরম শান্তি। এই দেহরূপী যান ব্যবহার করে আত্মা তার আদি উৎস, ‘আলমে আমর’ বা নূরের ঘরের দিকে এক নিরন্তর যাত্রা করে। একেই আধ্যাত্মিক পরিভাষায় ‘সায়েরে ইলাল্লাহ’ (আল্লাহর দিকে যাত্রা) এবং ‘সায়েরে ফিল্লাহ’ (আল্লাহর মধ্যে যাত্রা) বলা হয়। এই যাত্রাপথে আমাদের শরীরে নিহিত পাঁচটি মুখ্য স্তর বা ‘মনজিল’ আমাদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রতিটি মনজিলে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তি বাস করে, যা একটি ভিন্ন জগতের (আলম) দরজা খুলে দেয় এবং সত্তার গভীরতম সত্যকে উন্মোচন করে। কিন্তু এই মনজিলগুলো অতিক্রম করার আগে, মজিদ, আমাদের ভেতরের কিছু সহজাত প্রবণতাকে চিনতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কী মনে হয় তোমার, সেই প্রবণতাগুলো কী?
১. মানবদেহের তিনটি মৌলিক জাত: আগুন, পানি ও বাতাস
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): আমাদের সত্তার গভীরে তিনটি মৌলিক প্রবণতা বা ‘জাত’ লুকিয়ে আছে: আগুন, পানি ও বাতাস। এই জাতগুলোর সঠিক নিয়ন্ত্রণই আত্মশুদ্ধির মূল ভিত্তি। প্রথমেই বলো, আগুনের জাত সম্পর্কে তোমার উপলব্ধি কী?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, আগুনের জাত মানে আমার ভেতরের ক্রোধ, লালসা, প্রতিহিংসা এবং অহংকার। আপনি শিখিয়েছেন, “তোমার ভিতরেই এক আগুন বসে আছে—সে চায় ভোগ, চায় দখল, চায় জ্বলতে। তুমি তাকে না পোড়ালে, সে তোমাকে পোড়াবেই।” এই আগুন মানুষকে অন্ধ করে, সিদ্ধান্তকে বিষিয়ে তোলে এবং অন্যের ভালো সহ্য করতে পারে না। কাম, অন্যের ওপর নিজের দাবি এবং আত্মম্ভরিতা (যেমন ইবলিসের মতো নিজেকে “উত্তম” ভাবা) এই জাতের প্রধান উপসর্গ। আমার প্রশ্ন হলো, গুরুদেব, এই সর্বনাশা আগুনকে কীভাবে নিভিয়ে ফেলব?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): তোমার প্রশ্ন ঠিক জায়গায় পড়েছে, মজিদ। এই আগুন যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তোমার ইবাদতও পুড়ে যাবে; নামাজ কেবল বাহ্যিক ক্রিয়ায় পরিণত হবে, কিন্তু অন্তরে আগুন জ্বলতেই থাকবে। একে নিভানোর জন্য ধৈর্য (সবর) ধারণ করা আবশ্যক। রাগ এলেই চুপ করে যাও এবং মুখে ‘ইয়া হালিম’ পড়ো। রোজা রাখলে শারীরিক আগুন দুর্বল হয়। নিজেকে দোষারোপ করে বিনয়ী হও, যেমন ইবলিস অহংকারে ধ্বংস হয়েছিল। মৃত্যুচিন্তা আগুনকে নিয়ন্ত্রণে আনে, তাই কবরের ধারে দাঁড়াও। আর আল্লাহর নাম ‘ইয়া সালাম’ ও ‘ইয়া নূর’ যিকির করে আগুনের বিপরীতে নূরের প্রবাহ নামিয়ে আনো। এবার পানির জাত সম্পর্কে তোমার কী জিজ্ঞাসা?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, পানির জাত হলো কামনা, মোহ, দেহপ্রীতি এবং সুখলোভ। আপনি বলেছেন, “তুমি যতই শুদ্ধ হতে চাও, ততই তোমার ভেতরের পানির ঢেউ তোমাকে কামনায় ডুবিয়ে ফেলতে চায়।” এর প্রকাশ ঘটে ভোগ-আসক্তি, সম্পর্কবন্দিত্ব এবং সাময়িক শান্তির লোভে। আমার প্রশ্ন হলো, এই মোহের ঢেউ থেকে কীভাবে আত্মাকে রক্ষা করব?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): মজিদ, যদি এই পানির ঢেউ না থামে, আত্মা দেহসুখে নিমজ্জিত হবে এবং ইবাদত কেবল রূপ হয়ে থাকবে। একে দমনের জন্য তাকওয়া (আল্লাহভীতি) তৈরি করো—একাকী সময়েই আসল পরীক্ষা। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করো, কারণ চোখই প্রথম পানির দরজা। কবর কল্পনা করে মৃত্যুর দৃশ্যকল্পে পানির ঢেউকে স্তিমিত করো। রাত জেগে ইবাদত করো, কারণ পানি আরাম চায়, কিন্তু রাতের সাধনা এই জাত ভেঙে ফেলে। আর আল্লাহর নাম ‘ইয়া কুদ্দুস’, ‘ইয়া কাহ্হার’, ‘ইয়া নূর’ যিকির করে কামনার স্রোতকে আলোর তীব্রতায় দূর করো। সর্বশেষ, বাতাসের জাত সম্পর্কে তোমার কী প্রশ্ন?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, বাতাসের জাত আমার কাছে সবচেয়ে ধূর্ত মনে হয়েছে। এটি অহংকার, আত্মপ্রতিষ্ঠা, রিয়া (প্রদর্শন) এবং বিভ্রম তৈরি করে। আপনি বলেছিলেন, “বাতাসেই ইবলিস উড়েছিল, এবং পতনও সেই বাতাসে।” এটি মানুষকে নিজেই তার ঈশ্বর বানিয়ে তোলে। আমার প্রশ্ন হলো, এই অদৃশ্য অহংকারকে কীভাবে দমন করা যায়?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): তোমার প্রশ্ন অত্যন্ত জরুরি, মজিদ। যদি এই বাতাসকে দমন না করা যায়, আত্মা ঈমানের বদলে “নিজের বিশ্বাসে” আবদ্ধ হয় এবং ইবাদতের আসল উদ্দেশ্য—আল্লাহর নিকটতা—হারিয়ে যায় আত্মপ্রতিষ্ঠার পেছনে। আল্লাহ কোরআনে অহংকারীদের পতনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। একে দমনের জন্য নিজের সাধনার প্রচার বন্ধ করো, নীরবতা পালন করো, নিজেকে সর্বদা ‘অজানা’র শিক্ষার্থী ভাবো—অহংকার ভাঙে বিনয়েই। আল্লাহর নাম ‘ইয়া খাফি’, ‘ইয়া হালিম’, ‘ইয়া হক্ক’ যিকির করো। আর নিজের ভুল সর্বদা নিজেই স্বীকার করো, কারণ তা কেবল অহংকার কমায় না, রূহের পথও খুলে দেয়। মনে রেখো, বাতাস গর্ব বয়ে আনে, কিন্তু আত্মা বিনয়ে বিকশিত হয়। এই তিন জাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই তুমি প্রশ্ন-পর্বতের প্রথম ধাপ অতিক্রম করবে।
২. চার কালেমার চার ধাপে আত্মার জাগরণ: শরিয়ত থেকে মারেফত
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): এই আধ্যাত্মিক যাত্রায় চারটি কালেমা চারটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বার হিসেবে কাজ করে। এদের মাধ্যমেই আত্মার গভীর জাগরণ ঘটে। প্রথম কালেমা, যা শরিয়তের কালেমা, তা কী এবং এর ভূমিকা কী?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, প্রথম কালেমা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ – “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল।” এই কালেমা দিয়ে পথচলা শুরু হয়। আমরা আল্লাহর বিধান মেনে চলি, নামাজ পড়ি, রোজা রাখি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এই স্তরে আত্মা কেন ঘুমন্ত থাকে?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): চমৎকার প্রশ্ন, মজিদ! এই স্তরে আত্মা বাহ্যিক আমল দ্বারা পরিচালিত হলেও, অন্তরে দ্বিধা এবং জাগতিক আসক্তি রয়ে যায়, তাই আত্মা পুরোপুরি জাগরিত হয় না। এরপর আসে তরিকতের কালেমা। এটি কী শেখায়?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): তরিকতের কালেমা হলো লা মাকসুদা ইল্লাল্লাহ – “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।” এখানে সাধক বুঝতে পারে, আমল নয়—উদ্দেশ্যই আসল। দুনিয়া, মোহ, লোভ – সবই পর্দা। আমার প্রশ্ন হলো, এই উপলব্ধি কীভাবে আসে?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): এই উপলব্ধি আসে যখন তুমি জাগতিক সব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে একমুখী হও। এই পর্যায়েই চোখে পানি আসে, অন্তর কাঁপে—”তুমি ছাড়া কিছুই চাই না, হে মালিক!” এরপর আসে হাকিকতের কালেমা।
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): লা মাওজুদা ইল্লাল্লাহ – “আল্লাহ ছাড়া কিছুই বিদ্যমান নয়।” এখানে ‘আমি’ বিলীন হয়ে যায়। আমার প্রশ্ন হলো, ‘আমি আছি’—এই গর্ব না থাকলে কী হয়?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): যখন এই অহংকার মুছে যায়, তখন তুমি সব জিনিস, সব মানুষ, এমনকি নিজেকেও তাঁর অস্তিত্বের ছায়া হিসেবে দেখতে পাও। এই ‘ফানা’র অবস্থায় “আমার” আর “তোমার” ভেদ মুছে যায়। আর চূড়ান্ত কালেমা, মারেফতের কালেমা?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): লা মাবুদ ইল্লাল্লাহ – “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো আরাধ্য নেই।” এখানে উপাসনা আর কেবল নিয়ম থাকে না, তা গভীর প্রেমে রূপান্তরিত হয়। আমার প্রশ্ন হলো, প্রেম দিয়ে কীভাবে নামাজ হয়?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): মজিদ, তখন নামাজ শুধু রুকু-সেজদা নয়, শিরা-উপশিরায় তাঁর নাম ধ্বনিত হয়। আরশ ও হৃদয় মিলেমিশে এক বিন্দুতে এসে দাঁড়ায়, যেখানে প্রেমিক ও প্রিয়—একই আয়নায় ঝলমল করে। এই চার কালেমা কেবল কিছু শব্দ নয়; এগুলো আত্মার ধাপে ধাপে জেগে ওঠার মানচিত্র। যে হৃদয়ে এই চারটি কালেমা খোদাই হয়, সে হৃদয় নিজেই কোরআন হয়ে ওঠে। তুমি কোন স্তরে আছো, মজিদ? শব্দে, অন্তরে, না অস্তিত্বে?
৩. মানবদেহের অলৌকিক মানচিত্র: আত্মিক সফরের পাঁচ মনজিল
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): এবার আমরা দেহের ভেতরের সেই পাঁচটি মনজিল নিয়ে আলোচনা করব, যা আত্মার আধ্যাত্মিক সফরের পথ খুলে দেয়। প্রথমটি নাফস।
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, নাফস (نفس) হলো নিম্নতল মনজিল, নাভির নিচে। এখানে পশুত্ব, কাম, লোভ, হিংসা ও অহংকার থাকে। यहीं से জিহাদুন নাফস শুরু হয়। আত্মা তখন নাফসে আম্মারা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমার প্রশ্ন হলো, এটি কেন আলমে নাসুত (বস্তুজগত) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): কারণ, মজিদ, এই স্তরে দেহ ও বস্তুগত জগৎই আধিপত্য বিস্তার করে, আত্মা এই জাগতিকতার জালে বন্দি থাকে। এরপর আসে কালব।
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): কালব (قلب) হৃদয়তলে, বাম বুকে। এটি আলোর প্রথম স্পর্শ পায়। এখানে ইলহাম, তাওবা, খুশু, ভয় এবং ভালোবাসা থাকে। আমার প্রশ্ন হলো, কালব জাগলে আলমে মালাকুত (ফেরেশতাদের জগৎ) কীভাবে খুলে যায়?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): কালব যখন জাগরিত হয়, তখন মানুষ ফেরেশতাদের জগতের পবিত্রতার সাথে একাত্মতা অনুভব করে এবং আত্মা আত্মবিশ্বাসের আলোয় দীপ্ত হয়। তারপর রূহ।
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): রূহ (روح) ডান বুকে বা ফুসফুসের পাশে। এটি খোদার ফুঁ দেওয়া সেই অদৃশ্য হাওয়া—”وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي”। এখানে নূর, তাওহিদ, সবর, ইখলাস থাকে। আমার প্রশ্ন হলো, এই স্তরে পৌঁছালে সাধক কীভাবে তার ভিতরের কুরআন শুনতে পায়?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): যখন রূহ পূর্ণতা লাভ করে, তখন আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও ঐশী বার্তা আত্মার গভীরে প্রতিধ্বনিত হয়। এটি আলমে জবরুত (ঐশী ক্ষমতা ও পরাক্রমের জগৎ)-এর দরজা, যেখানে আত্মা নিজের স্বরূপ উপলব্ধি করে। চতুর্থ মনজিল সিরর।
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): সিরর (سرّ) হৃদয়ের গভীরে, কালব ও রূহের সন্ধিক্ষণে। সিরর মানে গোপন রহস্য—এখানে মুর্শিদের (আধ্যাত্মিক গুরু) দৃষ্টির আলো থাকে। আমার প্রশ্ন হলো, কীভাবে মুরাকাবা করে নিজের ছায়ায় আল্লাহর চেহারা দেখা যায়?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): এই স্তরে গভীর ধ্যানের মাধ্যমে (‘মুরাকাবা’ করে) সাধক সত্তার পরম একত্ব অনুভব করে, যেখানে সবকিছুতেই তাঁর প্রকাশ দেখা যায়। এটি আলমে লাহুত (ঐশ্বরিক সত্তার জগৎ) খুলে দেয়, যেখানে “আনাল হক্ক” (আমিই সত্য) এর অর্থ অনুধাবন করা যায় এবং ইশ্কে হাকিকী (প্রকৃত প্রেম) দৃশ্যমান হয়। এবং সর্বোচ্চ মনজিল, খফি ও আখফা।
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): খফি ও আখফা (خفي و أخفى) কপালের মাঝখানে এবং মস্তিষ্কের মুকুটে। এগুলি সর্বোচ্চ মনজিল, যেখানে আত্মা তার আসল উৎসের সাথে মিলিত হয়। এখানে নামহীন নীরবতা—শুধু ‘হু’ (هو) বিদ্যমান। আমার প্রশ্ন হলো, এই স্তরে কারা পৌঁছাতে পারে?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): এই স্তরে কেবল ফনা ফিল্লাহ (আল্লাহতে বিলীন হওয়া) ও বাকা বিল্লাহ (আল্লাহর সাথে স্থায়িত্ব লাভ করা) তরিকার গভীর আরিফগণ (জ্ঞানী) পৌঁছাতে পারেন। এটি আলমে হাহুত (পরম সত্তার জগৎ)। এই পাঁচটি মনজিল দেহে জাগিয়ে তুলতেই জিকির, মুরাকাবা, মুশাহেদা, খলওয়াত ইত্যাদি সাধনার প্রয়োজন হয়। আর মুর্শিদের তাওয়াজ্জুহ (আধ্যাত্মিক মনোযোগ) হলো সেই চাবিকাঠি, যা দিয়ে আত্মা এই শরীর-রূপী মানচিত্রে একে একে দরজা খুলে, এক জগৎ থেকে অন্য জগতে পাড়ি জমায়।
৪. ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব নারী-পুরুষ: আল্লাহর সিফাতের প্রকাশ
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): মজিদ, আল্লাহ তাঁর সত্তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটিয়েছেন নারী ও পুরুষের মধ্যে। তুমি কি ব্যাখ্যা করতে পারবে, কীভাবে তারা আল্লাহর সিফাতের সর্বোচ্চ মাত্রার প্রকাশ ক্ষেত্র?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, আপনি শিখিয়েছেন, আল্লাহর সিফাত যখন মানবদেহে প্রকাশিত হয়, তখন সেই দেহ এক পরিপূর্ণ প্রতিবিম্ব হয়—এক আকারে নিরাকার রূপ। নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এই প্রকাশ ঘটে, তবে ভিন্ন মাত্রায়। আমার প্রশ্ন হলো, নারীর দেহ কীভাবে সৃষ্টি ও আত্মজাগরণের সুরঙ্গ হয়?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): চমৎকার প্রশ্ন! নারীদেহ হলো সৃষ্টি ও আত্মজাগরণের এক পবিত্র সুরঙ্গ। তার দেহে লুকিয়ে আছে জন্ম, পরিবর্তন, রূপান্তর। সৃষ্টির প্রথম প্রেরণা এসেছে ‘রহম’ (জঠর)-এর মধ্য দিয়ে, যা ‘রহমত’ (দয়ালুতা) থেকে এসেছে। আল্লাহ নিজেই ‘রহম’ সৃষ্টি করেছেন এবং এর নাম তাঁর নাম থেকেই নিয়েছেন। এটি নারীর গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। আর পুরুষদেহ কী বহন করে?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): পুরুষদেহ বহন করে বীজ, সম্ভাবনা, বোধ ও কর্মশক্তি। তিনি ইচ্ছার তরঙ্গ ও জ্ঞানের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেন। পুরুষতত্ত্ব স্রষ্টার ইচ্ছা, চেতনা ও কুদরতের প্রতিনিধিত্ব করে। আমার প্রশ্ন হলো, নারী ও পুরুষ কীভাবে ‘ইনসানুল কামিল’ বা পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি করে?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): যেখানে নারী ধারণার মাধ্যমে সৃষ্টি করেন, পুরুষ বীজ প্রক্ষেপণে সৃষ্টি করেন। এই দুইয়ের মিলনই ‘ইনসানুল কামিল’ বা পরিপূর্ণ মানুষের আত্মপ্রকাশ ঘটায়—কেবল যৌনতার নয়, বরং চেতনাগত মিলনের মাধ্যমে। পুরুষের দেহ হলো কোরআনের প্রকাশ্য পাঠ, আর নারীর দেহ হলো কোরআনের গোপন পাঠ। তারা আল্লাহর ‘জাহের’ (প্রকাশ্য) ও ‘বাতেন’ (গোপন) দুই রূপের মতো—পরস্পর অপরিহার্য। এই উপলব্ধিই আমাদের দেহের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে, শরীরকে ঈশ্বর উপলব্ধির মাধ্যম করে তোলে।
৫. ফকির: একটি আরবি শব্দের বহুমুখী তাৎপর্য
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): মজিদ, এবার ‘ফকির’ শব্দটি নিয়ে আলোচনা করি। এর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ কী, এবং সুফিবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব কতটুকু?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, ফকির (فَقِير) শব্দটি আরবি ‘فقر’ থেকে এসেছে, যার অর্থ “অভাব” বা “নির্ভরশীলতা”। জাগতিক অর্থে ফকির মানে দরিদ্র ব্যক্তি। কিন্তু এর আধ্যাত্মিক অর্থ কী?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): এর আধ্যাত্মিক অর্থ অনেক গভীর, মজিদ। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণে ফকির সেই ব্যক্তি যিনি নিজেকে আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ভাবেন, যার মধ্যে নিজের নিজস্ব কিছুই নেই এমন উপলব্ধি গেঁথে যায়, এবং যিনি দুনিয়ার মোহ ও স্বার্থ ত্যাগ করে পরম সত্তার দিকে ধাবিত হন। সুফিবাদে বলা হয়: “ফকির সেই, যার কিছু নেই—এমনকি নিজের অস্তিত্বও নয়। সে কেবল আল্লাহর জন্য বেঁচে থাকে, আল্লাহর জন্য মরে।” হযরত আলী (রা.)ও বলেছেন, তিনি সেই ফকির, যে সব দরজা বন্ধ হবার পর শুধু আল্লাহর দরজায় মাথা রাখে। কোরআনও বলে, “হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর প্রতি ফকির।” অর্থাৎ, ফকির কেবল একজন নিঃস্ব ব্যক্তি নন, বরং আধ্যাত্মিক উন্নতির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর জন্য আত্মাকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে বিলীন করার প্রতীক। তোমার কি এই গভীর অর্থ উপলব্ধি হয়েছে?
৬. মহাপুরুষের কাছে আত্মসমর্পণে বাধা
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): মজিদ, এত গভীর জ্ঞান লাভের পরও অনেকে কেন একজন মহাপুরুষ বা কামেল মোর্শেদের কাছে আত্মসমর্পণ করে সায়েরে ইলাল্লাহ পথে চলতে পারে না? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তোমার কী মনে হয়, কী কী বাধা তাদের পিছিয়ে রাখে?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, আমার উপলব্ধি অনুসারে তিনটি প্রধান বাধা আছে। প্রথমত, ভোগের মোহ। মানুষের মন জাগতিক ভোগবিলাসের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত থাকে এবং ভোগের পরিবর্তে আধ্যাত্মিক উপভোগের শিক্ষা গ্রহণে রাজি হয় না। দ্বিতীয়ত, গুরুর ভাবের প্রতি অনীহা। মহাপুরুষের গভীর আধ্যাত্মিক ভাবের অভিব্যক্তি অনেকের কাছে কঠিন বা অপ্রীতিকর মনে হয়, কারণ তাদের মন জাগতিক চাঞ্চল্যে অভ্যস্ত। তৃতীয়ত, নফস ও মোহ ত্যাগের ভয়। মানুষ বুঝতে পারে যে মহাপুরুষ হতে হলে নিজের নফসের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সংসারের মোহ-মায়া ত্যাগ করতে হবে, যা তাদের জন্য কষ্টকর মনে হয়। আমার প্রশ্ন হলো, এই বাধাগুলো অতিক্রম করার সহজ পথ কী?
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): তোমার বিশ্লেষণ অত্যন্ত স্পষ্ট, মজিদ। এই বাধাবিপত্তিগুলোই মানুষকে সত্যের পথে অগ্রসর হতে দেয় না। সহজ পথ হলো দৃঢ় সংকল্প, নিরন্তর চেষ্টা এবং বিনয়। এই জ্ঞানকে তোমার জীবনে ধারণ করতে পারলেই তুমি প্রশ্ন-পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করতে পারবে। মনে রাখবে, এই পথ কঠিন, তবে এর ফল অত্যন্ত মধুর। নিরন্তর চেষ্টা এবং বিনয়ই তোমাকে এই অলৌকিক মানচিত্রের প্রতিটি স্তর উন্মোচন করতে সাহায্য করবে। তুমি কি এই পথে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ?
শিষ্য (আব্দুল মজিদ): গুরুদেব, আপনার কৃপায় আমি প্রস্তুত। আপনার দেখানো পথে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে চাই এবং এই প্রশ্ন-পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করতে চাই।
গুরু (মোঃ বশিরুল ইসলাম): আলহামদুলিল্লাহ! তোমার এই সংকল্পই তোমার যাত্রার প্রথম সফল পদক্ষেপ। তোমার পথ আলোকিত হোক!






