অনন্ত প্রেমের সুরাবলি
প্রিয় আত্মন, প্রেমিকের চোখে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে। তার হাসি, তার দৃষ্টি, তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে থাকে এক অলৌকিক ঔজ্জ্বল্য। যেন সে শুধু মানুষ নয়, এক জীবন্ত কাব্য। ইউসুফের স্পর্শে জুলেখার হারানো যৌবন ফিরে এসেছিল—এ কথা শুনে তুমি হয়তো অবাক হবে। কিন্তু প্রেমের এমনই শক্তি, যা বৃদ্ধের শিরায় শিরায় যৌবনের স্ফুরণ জাগায়। প্রেম এমন এক স্রোত, যা হৃদয়ের তটে আছড়ে পড়ে, দেহের প্রতিটি কোষে প্রাণের সঞ্চার করে। তখন ধন-দৌলত, বিষয়-আশয় সবই তুচ্ছ মনে হয়।
যখন মানুষ তার স্বরূপের সন্ধান পায়, তখন যে আনন্দ জাগে, তা এই প্রেমের আনন্দের চেয়েও অপরিমেয়। তখন যেকোনো অলৌকিক রূপান্তর সম্ভব। তাই জুলেখার যৌবন ফিরে পাওয়ার কাহিনি আমি হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করি। আসো, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল ছেড়ে ইউসুফ-জুলেখার এই অমর প্রেমের গাথাটি হৃদয়ের গভীরে পাঠ করি।জুলেখা ছিলেন মিশরের আজিজের স্ত্রী, আর ইউসুফ ছিলেন এক ক্রীতদাস। জুলেখা সেই বালক ক্রীতদাসকে রাজপুত্রের মতো আদরে লালন করলেন। ইউসুফের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেন তিনি। প্রেম কি আর গোপন থাকে? আগুনের মতোই তা প্রকাশ পায়। জনরব ছড়িয়ে পড়ল, আর জুলেখা সিদ্ধান্ত নিলেন, এই মোহের স্বাভাবিকতা প্রমাণ করবেন। তিনি মিশরের অভিজাত নারীদের আমন্ত্রণ জানালেন। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো ছুরি আর কমলা।
ঠিক তখনই ইউসুফ প্রবেশ করলেন। তাঁর সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে নারীরা কমলার পরিবর্তে নিজেদের আঙুল কেটে ফেললেন। এই রূপকের মাধ্যমে বোঝানো হলো—সৌন্দর্যের প্রভাব এতটাই গভীর যে, তা মানুষকে নিজেকেও ভুলিয়ে দেয়।ইউসুফকে না পেয়ে জুলেখার হৃদয়ে জাগল তীব্র কামনা। এই কামনা তাকে ন্যায়-অন্যায়ের সীমা ভুলিয়ে দিল। প্রেমের সূর্য যখন উদিত হয়, যুক্তির চাঁদ তখন অস্তে যায়। একদিন তিনি ইউসুফকে শয়নকক্ষে ডাকলেন। পর্দা দিয়ে ঈশ্বরের চোখ ঢাকতে চাইলেন। কিন্তু ইউসুফ বললেন, “জুলেখা, তুমি তোমার ঈশ্বরের চোখ ঢাকতে পারো, কিন্তু আমার ঈশ্বর সর্বত্র। তিনি আমাকে দেখেন, আমি তাঁকে না দেখলেও। আমি তাঁর কাছে আশ্রয় চাই।”
ইউসুফের প্রত্যাখ্যানে জুলেখা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। নির্দোষ ইউসুফকে কারাগারে পাঠানো হলো। এই গল্পে বোঝানো হলো—সত্যের পথে চলতে গেলে কষ্ট সইতে হয়। সত্যের সন্ধানীদের বিরোধিতার মুখোমুখি হতেই হয়। তবু, যিনি প্রকৃত রাজা, তিনি কারাগারেও রাজা। ইউসুফ কারাগারে থেকেও সবার প্রিয় হয়ে উঠলেন, প্রেমের রাজা হয়ে উঠলেন।
জুলেখা আরো হিংস্র হলেন। ইউসুফকে প্রহারের নির্দেশ দিলেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হলো—কামনা যখন তীব্র হয়, প্রেম তখন ধ্বংসের পথে এগোয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জুলেখার কামনা কমতে থাকল, প্রেম বাড়তে থাকল। কামনা রূপান্তরিত হলো গভীর প্রেমে। তিনি অনুতপ্ত হলেন, আত্মদহনে জ্বলতে থাকলেন।
এই আত্মদহনই প্রেমের রমজান।জুলেখা শপথ নিলেন, তিনি ইউসুফের রঙে রঙিন হবেন। তিনি মুক্ত করলেন সব দাস-দাসী, বিলিয়ে দিলেন সব সম্পদ। প্রেমের জন্য কাঁদতে কাঁদতে তিনি অন্ধ হয়ে গেলেন। রূপক অর্থে বলা হলো—প্রেম মানুষকে এমন অন্ধ করে যে, সে শুধু প্রিয়তমকেই দেখে।একদিন জুলেখা ভিখারী হয়ে গেলেন, আর ক্রীতদাস ইউসুফ হলেন মিশরের আজিজ। জুলেখার কান্না পৌঁছে গেল ইউসুফের কাছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী চাও তুমি?” জুলেখা বললেন, “শুধু তোমাকে, প্রিয়তম, শুধু তোমাকে।”
ইউসুফ জুলেখার কপালে চুমু দিলেন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন। তখন জুলেখার দেহে প্রবাহিত হলো প্রেমের অমৃত। তার প্রতিটি কোষ জেগে উঠল, যৌবন ফিরে এল, চোখে দৃষ্টি ফিরল। তিনি নতুন দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখলেন। এই হলো স্বরূপ দর্শনের মাহাত্ম্য।প্রেমিকের কান্না ঈশ্বর শোনেন। তিনি প্রেমিকের ইচ্ছা পূরণ করেন। প্রেম যদি রাণীকে ভিখারী করতে পারে, ক্রীতদাসকে রাজা করতে পারে, তবে বৃদ্ধাকেও যুবতী করতে পারে।তখন তুমি বললে, “প্রেমই কুরআনের সারাংশ।”
আমি বললাম, “প্রেম কেবল কুরআনের সারাংশ নয়, প্রেমই সমগ্র কুরআন। বাকি সব তার ব্যাখ্যা মাত্র।”
– ফরহাদ ইবনে রেহান






