নীরবতার জন্ম (ধারাবাহিক পর্ব—৪)
চতুর্থ অধ্যায়: ধ্যান — ভাব থেকে শূন্যতায়
মানুষ ভাবে—ধ্যান মানে চিন্তা করা।
কেউ ভাবে—ধ্যান মানে কল্পনা।
কেউ ভাবে—ধ্যান মানে ঈশ্বরকে স্মরণ করা।
কিন্তু ধ্যান মানে ভাবের অনুপস্থিতি।
ধ্যান মানে শূন্য হওয়া।
ধ্যান মানে নিজের ভেতরের কোলাহল থামিয়ে দেওয়া।
আমাদের ভেতর সারাক্ষণ এক অবিরাম শব্দ বয়ে চলে—
স্মৃতি, কামনা, ভয়, পরিকল্পনা, অনুশোচনা, প্রত্যাশা।
এই শব্দই আমাদের প্রকৃত স্বরকে ঢেকে রাখে।
ধ্যান সেই নীরবতার দরজা খুলে দেয়।
আমি যখন প্রথম গভীর ধ্যানে প্রবেশ করি,
মনে হলো আমি যেন ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছি।
এক সময় ‘আমি’ নামের ধারণাটাই ফিকে হয়ে গেল।
ভয় লাগল।
কারণ আমরা নিজেদের ধারণাকেই অস্তিত্ব মনে করি।
এই ধারণা ভাঙতে গেলে মনে হয়—আমি মরে যাচ্ছি।
কিন্তু সেই ভয়ের ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
আমি দেখলাম—
আমার চিন্তারা আসে, যায়।
আমার অনুভূতিগুলো ওঠে, নামে।
কিন্তু আমি—আমি কেবল দর্শক।
এই দর্শকত্বই ধ্যানের মূল।
ধ্যানে কোনো সাধনা নেই,
ধ্যানে কোনো সংগ্রাম নেই,
ধ্যানে কোনো অর্জন নেই।
শুধু দেখা।
শুধু সচেতন থাকা।
যখন তুমি নিজের ভাবনাকে না জড়িয়ে দেখতে পারো,
তখন ভাবনা ধীরে ধীরে ক্ষয় পায়।
আর সেই ক্ষয়ের ফাঁকে জন্ম নেয় নীরবতা।
এই নীরবতা মৃত নয়।
এই নীরবতা জীবন্ত।
এই নীরবতার গভীরে এক অনন্ত প্রজ্ঞা প্রবাহিত হয়।
ধ্যান কোনো ধর্মীয় আচার নয়।
ধ্যান কোনো বিশ্বাসের ফল নয়।
ধ্যান এক বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতা।
তুমি যদি চুপচাপ বসে শ্বাসের ওঠানামা দেখো,
তুমি যদি কোনো প্রতিক্রিয়া ছাড়া নিজের চিন্তাকে যেতে দাও,
তুমি ধ্যানে প্রবেশ করছ।
ধ্যান আমাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে।
কারণ মানুষ আসলে দাস নিজের চিন্তার।
ধ্যানে চিন্তার রাজত্ব ভেঙে পড়ে।
তখন প্রথমবার তুমি নিজের প্রকৃত স্বাধীনতা উপলব্ধি করো।
চলবে….
লেখক: ফরহাদ ইবনে রেহান
বই: নিজের পথে – নীরবতার যাত্রা
চতুর্থ অধ্যায়: ধ্যান — ভাব থেকে শূন্যতায়



