যে ‘না’ বলতে অক্ষম, সে নিজের অস্তিত্ব নিজের হাতেই ছিন্ন করে।
যে ‘না’ বলতে অক্ষম, সে নিজের অস্তিত্বের সূত্রটি নিজের হাতেই ছিন্ন করে ফেলে—কারণ ‘না’ নয় শুধু একটি শব্দ, এটি আত্মরক্ষার প্রথম এবং সর্বোচ্চ যুক্তি, যা অযথা ‘হ্যাঁ’-এর বন্যায় জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় না। বৃষ্টির দিনে ছাতা চাইলে আমি ‘না’ বলতে পারিনি—যুক্তি ছিল সহজ: আমার শরীরের স্বাস্থ্যের চেয়ে তোমার সুবিধা বেশি মূল্যবান মনে হয়েছে। ফলে আজ আমি ঠান্ডার কাঁপুনিতে কাতর, আর তুমি শুকনো থেকে নিরাপদ—কিন্তু এই যুক্তিহীনতা কি সত্যিই যুক্তিসঙ্গত? না, এটি একটি ভুলিল্লুশিতা, যা আত্মার স্বার্থকে উপেক্ষা করে অন্যের সাময়িক সন্তুষ্টির জন্য চিরকালীন ক্ষতি করে।
তুমি নিমন্ত্রণ করলে যাওয়ার কোনো যুক্তি ছিল না—কাজের চাপ, স্বাস্থ্যের অবস্থা, বা শুধু নিজের শান্তির অধিকার—কিন্তু ‘না’ বলার সাহস হারিয়েছি। ফলে এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণার অন্ধকারে ডুবে আছি, আর তুমি হয়তো অন্য কোনো আনন্দের মধ্যে। এখানে যুক্তি স্পষ্ট: একটি অযথা ‘হ্যাঁ’ আমার জীবনের মূল্যবান সময়কে চুরি করে নিয়েছে, যা কোনো যুক্তিসঙ্গত বিনিময়ে ফিরে আসবে না। টাকা ধার চাইলে আমার অর্থনৈতিক অবস্থা টানাটানি করছিল—যুক্তি ছিল সরল: আমার নিজের চাহিদা পূরণ না করে অন্যের জন্য ঝুঁকি নেওয়া অযৌক্তিক—কিন্তু ‘না’ বলতে পারিনি। ফলে আজ ক্ষুধার জ্বালায় রাত কাটছে, আর তুমি নতুন অর্জনের আনন্দে। এই যুক্তিহীনতা আমাকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তুলেছে, যা একটি চিরস্থায়ী চক্র তৈরি করে—যেখানে আমার স্বাধীনতা ক্রমশ হ্রাস পায়।
কাম জাগ্রত হলে ‘না’ বলার যুক্তি ছিল অকাট্য: নৈতিকতা, সম্মান, এবং দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের স্থিতিশীলতা—কিন্তু আমি হার মেনেছি। ফলে রিসোর্টের সেই রাতে ধরা পড়ে গেলাম, আত্মসম্মান ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, এবং সমাজের চোখে একটা কলঙ্কবাজ অপরাধী হয়ে উঠলাম। এখানে যুক্তি গভীর: কামের মুহূর্তের আনন্দের জন্য চিরকালীন স্বাধীনতা হারানো কি সত্যিই লাভজনক?
না, এটি একটি যুক্তিহীন বিনিময়, যা আত্মার গভীরতম স্তরকে ক্ষয় করে। ক্রোধ জেগে উঠলে ‘না’ বলার যুক্তি ছিল স্পষ্ট: আবেগ নিয়ন্ত্রণ না করলে পরিণতি ধ্বংসাত্মক—কিন্তু আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি। ফলে হাত তুলে ফেলেছি, আজ শাস্তির শিকল গলায়, আর হৃদয়ে অপরাধবোধের অন্ধকার চিরকালের জন্য বাসা বেঁধেছে। যুক্তি এখানে অস্বীকার্য: ক্রোধের সাময়িক বিস্ফোরণের জন্য জীবনের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বিসর্জন দেওয়া একটি মূর্খতা, যা আত্মাকে চিরবন্দী করে তোলে। লোভ জাগলে ‘না’ বলার যুক্তি ছিল দৃঢ়: অন্যের অধিকারের উপর নিজের লোভ প্রতিষ্ঠিত করা নৈতিকভাবে অযৌক্তিক—কিন্তু আমি পড়ে গেছি। ফলে সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছি, আজ সমাজের চোখে অপাংক্তেয়, আর নিজের চোখে একটা লোভী, অসম্পূর্ণ ছায়া। যুক্তি গভীরতর: লোভের সামান্য লাভের জন্য সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা কি যুক্তিসঙ্গত? না, এটি একটি চেইন রিয়্যাকশন, যা একাকীত্ব এবং আত্ম-ঘৃণার দিকে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে, তুমি হাত ধরে বললে “চলো বৃষ্টিতে ভিজি”—এখানে ‘হ্যাঁ’ বলার যুক্তি ছিল অসংখ্য: ভালোবাসার মুহূর্ত, স্মৃতির সৃষ্টি, এবং একসঙ্গে আনন্দ—কিন্তু আমি ‘হ্যাঁ’ বলতে পারিনি। ফলে তোমার আনন্দ দেখে আমার হৃদয় বিষাদে ভরে গেল, কারণ আমি নিজের ভয়ের কারণে একটি মূল্যবান সুযোগ হারিয়েছি। তুমি ক্ষমা চাইলে ‘হ্যাঁ’ বলার যুক্তি ছিল সুস্পষ্ট: ক্ষমা মুক্তির চাবিকাঠি, যা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে—কিন্তু আমি ‘হ্যাঁ’ বলতে পারিনি। ফলে ক্ষমা পেলাম না, না তোমার কাছ থেকে, না নিজের কাছ থেকে—অপরাধবোধের গভীর গর্তে চিরকাল পড়ে রইলাম। এখানে যুক্তি স্পষ্ট: অযথা ‘না’ বলা সম্পর্কের ধ্বংস ডেকে আনে, যা আত্মার একাকীত্বকে বাড়িয়ে তোলে। জ্ঞানী এসে ডাকলেন মুক্তির পথে—’হ্যাঁ’ বলার যুক্তি ছিল অকাট্য: জ্ঞান অন্ধকার দূর করে, মুক্তি বন্ধন ছিন্ন করে—কিন্তু আমি ‘হ্যাঁ’ বলতে পারিনি। ফলে বন্ধনের মধ্যে আটকে রইলাম, জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরতে লাগলাম। যুক্তি এখানে গভীর: মুক্তির সুযোগ অস্বীকার করা নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, যা আত্মাকে চিরকালীন অন্ধকারে রাখে।
ছোট ছোট ‘হ্যাঁ’-এর জন্য আমরা বড় বড় ‘না’-গুলো হারাই—এবং এর যুক্তি অস্বীকার্য: গুরুত্বহীন অনুরোধে ‘না’ বলতে না পারলে সময় নষ্ট হয় (যা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ), শক্তি নষ্ট হয় (যা সীমিত এবং পুনরুদ্ধারযোগ্য নয়), আত্মসম্মান নষ্ট হয় (যা একবার হারালে ফিরে আসে না)—সবচেয়ে বড় কথা, নিজের অস্তিত্ব নষ্ট হয়, কারণ এটি একটি যুক্তিহীন চক্র যা আত্মাকে দাসত্বের দিকে নিয়ে যায়। ‘না’ বললে সাময়িক কষ্ট অন্যের হতো—কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বলে আমি নিজেকে চিরকালের জন্য কষ্টের সমুদ্রে ডুবিয়ে দিলাম, যা যুক্তিগতভাবে অসম্ভব লাভজনক নয়। কামকে ‘না’ বলতে পারলে প্রেমের গভীরতা পেতাম—কারণ প্রেম যুক্তিভিত্তিক, যা আবেগের দাসত্বকে অতিক্রম করে। লোভকে ‘না’ বলতে পারলে দয়ার অসীমতা অনুভব করতাম—কারণ দয়া যুক্তির ফল, যা লোভের স্বার্থপরতাকে পরাজিত করে। ক্রোধকে ‘না’ বলতে পারলে ক্ষমার আলো জ্বলতো হৃদয়ে—কারণ ক্ষমা যুক্তির শক্তি, যা আবেগের ধ্বংসাত্মকতাকে নিরুৎসাহিত করে।
জীবনের সর্বোচ্চ জ্ঞান এবং যুক্তি হলো এই সূক্ষ্ম বিচার: কোথায় ‘হ্যাঁ’ বললে নিজের আত্মা বাঁচে (যেমন মুক্তির ডাকে), আর কোথায় ‘না’ বললে নিজের আত্মা জন্ম নেয় (যেমন কাম-ক্রোধের লোভে)। ‘হ্যাঁ’ যদি সর্বদা বলি, তবে নিজের জন্য কোনো ‘হ্যাঁ’ আর অবশিষ্ট থাকে না—এটি একটি যুক্তিহীন সমর্পণ, যা আত্মাকে শূন্য করে। ‘না’ বলতে না শিখলে নিজেকে রক্ষা করা যায় না (কারণ সীমানা না থাকলে আক্রমণ অবশ্যম্ভাবী), নিজের মূল্য জানা যায় না (কারণ অযথা সমর্পণ মূল্যহীনতা সৃষ্টি করে), নিজের মুক্তির দরজা খোলা যায় না (কারণ বন্ধন শুধুমাত্র ‘না’-এর মাধ্যমে ছিন্ন হয়)। যে ‘না’ বলতে পারে না, সে নিজেকে বারবার বিক্রি করে—সস্তায়, লাভ ছাড়াই, শুধু অভ্যাসের যুক্তিহীন দাসত্বে। আর যে ‘না’ বলতে শেখে, সে নিজেকে ফিরে পায়—আত্মসম্মানের যুক্তিগত আলোয়, শান্তির নীরব যুক্তিতে, মুক্তির অখণ্ড যৌক্তিকতায়।
তাই আজ থেকে যুক্তির ভিত্তিতে শপথ করি: সবকিছুতে ‘হ্যাঁ’ নয়—শুধু যেখানে আমার আত্মা যুক্তিসঙ্গতভাবে বেঁচে থাকে এবং বৃদ্ধি পায়, সেখানেই ‘হ্যাঁ’। বাকি সব ক্ষেত্রে—দৃঢ়, নির্ভীক, যুক্তিপূর্ণ ‘না’। কারণ ‘না’ বলা মানে নিজেকে প্রথমবারের মতো যুক্তিভিত্তিকভাবে ভালোবাসা শুরু করা—এবং যুক্তিহীন ভালোবাসা কখনো স্থায়ী হয় না। নিজেকে না ভালোবাসলে (যুক্তি দিয়ে), কোনো ভালোবাসাই সত্যিকারের যুক্তিসঙ্গত হয় না।
– ফরহাদ ইবনে রেহান






