গাউছে জামান খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর কেবলা সম্পর্কে।

গাউছে জামান খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর কেবলা সম্পর্কে।

“কুতুবে আলম গাউসে দাওরাঁ আব্দুর রহমান চৌহরভী, উনকা সদকা হাত উঠাতা হো দো’আকে ওয়াস্তে।”

অর্থ: কুতুবে আলম, গাউছে দাওরা( বিশ্ব বরেণ্য কুতুব ও যুগশ্রেষ্ঠ গাউস) হযরত আব্দুর রহমান চৌহরভী (আ.)। তাঁর মাধ্যম নিয়ে দোয়ার জন্য হাত উঠাচ্ছি।

“মান চেহ্ গোয়ম শরহে ওয়াফে আঁ আলী জনাব
নীস্ত পয়গাম্বর ওয়ালে দারদ কিতাব।
মান চেহ্ গোয়ম শরহে ওয়াফে আঁ জনাব
আফতাব আস্ত আফতাব আস্ত আফতাব।”

অর্থাৎ: “ওই মহান ব্যক্তিত্বের গুণ-কীর্তন আমি কী করবো! তিনি কোন পয়গম্বর নন, কিন্তু তাঁর একটি কিতাব
রয়েছে। ওই উঁচু মানের ব্যক্তিত্বের আমি কী গুণব্যাখ্যা দেব, তিনি সূর্য, তিনি সূর্য, তিনি সূর্য।”

ঐশী জ্ঞানতত্ত্বের নির্ঝরণী, খোদায়ী জ্ঞানতত্ত্বের খনি, শর’ঈ জ্ঞানের আধার, মুর্শিদে তরীক্বত, হাক্বীক্বতের
রহস্যাবলী উন্মোচনকারী, রূহানী শক্তির ধারক, আলেমে রব্বানী, ‘আরিফে লা-সানী, হিকমতে লুকমানের অধিকারী, যুগের আসেফ, খলীফায়ে শাহে জীলান, গাউসে যামান, অনন্য মার্কার্যে আলম, খাজায়ে খাজেগান খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী কুদ্দিসা সিররুহুল ‘আযীয বংশগতভাবে আলভী, মাযহাবগতভাবে হানাফী ও মাশরাবগতভাবে কাদেরী। তাঁর বরকতময় জন্মভূমি পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জিলার অন্তর্গত
হরিপুর শহরের নিকটে ‘চৌহর’ শরীফ।

আবির্ভাব ও বিসাল হক: ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে।  তিনি হায়াতে জিন্দেগীতে ৮০ বছর ছিলেন।

اے مرغِ سحر عشق ز پروانہ بیا موز
کآن سوختہ را جَان شُد و آواز نیامد

این مدّعیان در طلبش بی‌خبر اند
کآن را که خبرش باز نیامد

উচ্চারণ:

এ মরগে সহর ইশ্‌ক্‌ জে পরওয়ানা বিয়া মুজ,
কাঁন সুখ্‌তা রা জান শুদ ও আওয়াজ নিয়ামদ।

ইন মাদ্দিয়ান দর তোলাবাশ বেখবর অন্দ,
কাঁন রা কে খবরাশ বায নিয়ামদ।

বাংলা অনুবাদ:

ওহে সাহরীর ( প্রভাতের) সময়ে জেগে উঠা মোরগ!
তুমি ইশক শিখবে আলোপ্রেমী প্রতঙ্গের কাছে।
সে জ্বলন্ত অনলে লাফিয়ে পড়ে
আপন প্রাণ বিসর্জন দেয়
আর চিরদিনের জন্য নিজেকে বিলীন করে দেয়।

এ ভালবাসার দাবীদাররা আপন আপন প্রেমাস্পদের তালাশে এমনভাবে নিজেকে হারিয়ে বসে, যেন তাদের নিকট প্রেমাস্পদের কোন খবরই আসে নি।

খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভীর আধ্যাত্মিক সাধনা

আট বছর বয়সেই চল্লিশ দিন চিল্লাহ করেন।

পীর ও মুর্শিদের আগমন ও বায়াত: কাশ্মিরের হযরত ইয়াকুব রহমাতুল্লাহি আলাইহি হাজরাশরীফে খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভীকে তাঁর চিল্লাহগাহে এসে বায়াত করেন।

“শাহ্ মুহাম্মদ আনওয়ার শাইখে আকাবের নূরও নূর, আঁ শাহ ইয়াকুব মুহাম্মদ যুল আতাকে ওয়াস্তে”

অর্থ : শীর্ষস্থানীয় শায়খ বা মুর্শিদদের মুর্শিদ , খোদায়ী নূররাশিতে আলোকিত বুজুর্গ হযরত শাহ মুহাম্মদ আনওয়ার ও মহান দানশীল ওই শাহ এয়াকুব মুহাম্মদ আলাইহি রাহমাহর ওসীলাহ;

শিক্ষা ও স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যাবলী: হযরত খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর কেবলা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে মুক্ত ছিলেন। তিনি শুধু ওস্তাদের কাছ থেকে কোরান শরীফ পড়ে ছিলেন। বাকী প্রচলিত শিক্ষা তথা ইলমে হাদিস, তাফসীর, ফিকহ, উসুল, মানতিক ইত্যাদি কোন কিছুই ওস্তাদের কাছে পড়েন নি।

খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর কেবলা তিনি তাঁর সময়ে “গাউছে জামান” ছিলেন।

খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর কেবলা একাদা বলেছিলেন, “কাদেরিয়া খান্দানের সাথেই” গাউসিয়তে কুবরা’র সম্পর্ক। যদি এ সিলসিলায় উপযুক্ত কেউ না থাকে, তখন অন্য খান্দান থেকে “গাউছে যামান” নির্বাচিত হন। হুজুর এও বলেছেন যে, “লজ্জার কথা হবে যদি আমাদের অনুপযুক্ততার কারণে আমাদের নিজেদের সম্পদ অন্য ঘরে চলে যায়।” এক বৈঠকে খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর কেবলা বলেন “আমি আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা করেছি, আমি যতদিন দুনিয়ায় থাকি, ততদিন যেন আমার পরিচিতি প্রকাশ না পায়।”

“আমার কাছে যেন ফকীর- মিসকীন, আলিম- দরবেশরা আসেন। আমীর- ওমারা ও বিত্তবানদের জন্য আমার দরজা যেন উন্মুক্ত না হয়।” তিনি এও বলেছেন “আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করে নিয়েছেন”

একবার তরীকতের এক পীর সাহেব তাঁকে পরামর্শ দিলেন, “আপনার কাছে তো মেহমান বেশী, অথচ আমদানী কম, আপনি অমুক ওযীফা পড়তে পারেন, আমি অনুমতি দিচ্ছি। এতে আমদানি বাড়বে। হুজুর কেবলা চুপ রইলেন। ওই পীর সাহেব বারবার বিষয়টি উত্থাপন করলে তিনি বললেন, দেখুন বাইরে থেকে পীর ভেবে মানুষ আসবে, অথচ ভেতরে, ভেতরে আমদানির উদ্দেশ্যে ওযীফা পড়া হবে- বিষয়টি বড়ই লজ্জার।”

কথা তিনি কমই বলতেন। বাজে কথা কিংবা নিজেকে পীর হিসেবে প্রকাশ করা তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ ছিল। বেশি কথা বলা তিনি অপছন্দ করতেন। যখন দরকারী কোন কথা বলতেন, তখন শ্রোতার দিকে লক্ষ রেখেই মধুর বচনে বক্তব্য উপস্থাপন করতেন। কথার পাণ্ডিত্য প্রদর্শন, লৌকিকতা ও অতিলঞ্জন ছিল না।

খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর এলমে লদুনীর মাধ্যমে রচিত একটি বিস্ময়কর কিতাব “মাজমূ’ আহ- এ সালাওয়াতে রসুল।”

খাঁজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর ইন্তেকালের পর তাঁর প্রধান খলিফা শাহেন শাহে সিরিকোট হজরত সৈয়দ আহমেদ শাহ কিতাব আকারে প্রকাশ করেন।

  1. ওলীগণের সাথে একটিমাত্র মূহুর্ত বসা শত বছর নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত করা অপেক্ষাও উত্তম।
  2. তুমি যদি আল্লাহর সান্নিধ্যে বসতে চাও, তবে ওলীগণের দরবারে বস।
  3. ওলীগণের ধূলি দ্বারা আপন চোখ আলোকিত কর। তাহলে শুরু হতে শেষ পর্যন্ত দেখবে।

হে সাকী! বহুদূর থেকে তোমার শরাবখানার কথা শুনে এসেছিলাম। প্রত্যেক প্রেমিক প্রেমসূরা পান করলেও আফসোস! আমরা কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছি।

পীর পারাস্তি হক পারাস্তি:

পীর পূজাই আল্লাহ পূজা।
(তু- মবাশ আছলান্ কামাল ইঁ আস্ত ও বছ্,
তু- দরো গোম শো বেছাঁল ইঁ আস্ত ও বছ।)

অর্থ: তুমি নিজেকে বিলীন করে দাও। এটাই তোমার পরিপূর্ণতা, এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। তুমি পীরে কামেলের মধ্যে বিলীন হও, এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট।

গেয়ারভী শরীফের মধ্যে গাউসুল আজম আব্দুল কাদির জিলানী (আ.)- এর মুরিদগণ জিকির করতেন
“ইয়া শায়খ্ সুলতান সৈয়্যদ আব্দুল কাদির জীলানী শাইআল্লিল্লাহ্।”

অন্তর্নিহিত ভাবার্থ: “হে গাউসুল আজম, আল্লাহ তোমার নাম ও মর্যাদা চিরন্তনভাবে উচ্চ করেছেন, তোমার রহমতের ছায়া আমাদের উপর বর্ষিত হোক।”

খতমে গাউসিয়া শরীফে মধ্যে গাউছে পাকের মুরীদগণ পাঠ করেন “ইলাহী বিহুরমাতি হযরত খাজা সুলতান সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’ য়ালা আনহু।”

আল্লামা ইকবাল বলেন- “তেরা তরিকা আমিরি নেই ফকিরী হ্যায়, খুদী না বেচে গরীবী মে নাম প্যায়দা কর। দায়ারে ইশক মে আপনা মাকাম প্যায়দা কর।” অর্থাৎ; তোমার পথ তো আমিরি নহে, বরং ফকিরিই তোমার জন্য প্রযোজ্য। তোমার স্বকীয়তাটিকে বিক্রি না করে বরং গরিবির খাতায় নাম লিখে নাও।

আল্লামা আব্দুর রহমান জামী তাঁর কালামে ফরমান “বা সারকারে সেদো গাহে গোলামী।” অর্থ: পীরের দরবারে ফকিরীই একমাত্র গোলামি।

“বা হুসনে এহতামামাদ ইয়ারে জামী।” অর্থ: হে জামি! তুমি তো পীরের সৌন্দর্যের মাঝেই অভিভূত হয়ে আছ।

“তোফায়েলে দীদ জারা ইয়াবদ তামামী।” অর্থ: আমার শেষ পরিণতিতে আমার প্রতি একটু দয়ার দৃষ্টিতে দেখিও।

“আমরা মুর্শিদের দরবারের গোলামির একটি নজির দেখতে পাই, খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী হুজুর কেবলার প্রধান খলিফা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটির জীবন দর্শনে “পীরের লঙ্গরখানার জন্য লাকড়ির সমস্যা দেখা দেওয়ায় হজরত সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি তা’ আলা আলায়হি সিরিকোটের পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে প্রায় ১১ মাইল দূরের চৌহর শরীফে নিজ কাঁধে করে দিয়ে আসতেন। এভাবে কোন বিরতি ছাড়া বহু বছর এ কঠিন দায়িত্বটি পালন করেন। একজন খ্যাতনামা ব্যবসায়ী, আলেম, হাফেজ, ক্বারী, অধিকন্তু নবী বংশের মর্যাদা সবকিছু ভুলে তিনি নিজের আমিত্ব বিনাশে এ কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজ মুর্শিদের মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসুল (সা.) এর সন্তুষ্টি অর্জন করেন এবং তরীকতের আসল পুরুষ্কার বেলায়াত ও খেলাফত লাভে ধন্য হন।”

(সূত্র : মাজমূ’ আহ- এ সালাওয়াতে রসুল (সা.) এর প্রথম খন্ড ও শাজরা শরীফ দরবারে আলীয়া কাদরিয়া)

শানে গাউসুল আজম আব্দুল কাদির জিলানী

السلام عليكم، يا غوث خدا، مشكل كُشا، غوثُ الأعظم، رئيسُ العارفين، پيرانه پير، دستگير، محبوب سبحاني، قطب رباني، غوث صمداني، يا شيخ، سيد، مولانا، محيي الدين عبد القادر الجيلاني الحسني والحسيني (ع)، مدد فرما، مدد فرما، مدد فرما۔

উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম, ইয়া গাউছে খোদা, মুশকিল কুশা, গাউসুল আজম, রইসুল আরেফিন, পীরানে পীর, দস্তগীর, মাহবুবে সোবহানি, কুতুবে রব্বানী, গাউছে সামদানি, ইয়া শেখ, সৈয়দ, মাওলানা, মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী আল হাসানী ওয়াল হুসায়েনী (আ.)- মাদাদ ফারমা, মাদাদ ফারমা, মাদাদ ফারমা।

অনুবাদ:

  • আসসালামু আলাইকুম — আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।
  • ইয়া গাউসে খোদা — হে আল্লাহর গাউস (সাহায্যকারী)।
  • মুশকিল কুশা — হে কঠিন সমস্যা দূরকারী।
  • গাউসুল আজম — হে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।
  • রইসুল আরেফিন — হে আরেফ (আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত) দরবেশদের নেতা।
  • পীরানে পীর — হে পীরদের পীর।
  • দস্তগীর — হে সাহায্যকারী, সহায়তাদাতা।
  • মাহবুবে সোবহানি — হে সুবহান আল্লাহর প্রিয়তম।
  • কুতুবে রব্বানী — হে আল্লাহর প্রেরিত আধ্যাত্মিক মেরু।
  • গাউসে সামদানি — হে আল্লাহ্‌র (আস্-সামাদ) সাহায্যপ্রাপ্ত গাউস।
  • ইয়া শেখ — হে শাইখ।
  • সৈয়্যদ — হে নবীজীর বংশধর।
  • মাওলানা — হে আমাদের প্রভু, পথপ্রদর্শক।
  • মহিউদ্দিন — দ্বীনের পুনর্জীবন দানকারী।
  • আবদুল কাদের জিলানী আল-হাসানি ওয়াল-হুসায়নী (আ.) — হযরত আবদুল কাদের জিলানী, যিনি হাসানি ও হুসায়নি বংশের ছিলেন (আলায়হেস সালাতু আসসালম)
  • মাদাদ ফারমা, মাদাদ ফারমা, মাদাদ ফারমা — সাহায্য করুন, সাহায্য করুন, সাহায্য করুন।

সম্প্রসারিত ভাব:

১. يا غوث خدا – ইয়া গাউসে খোদা – (হে আল্লাহর সাহায্যকারী)

গাউস মানে পরিত্রাণদাতা, উদ্ধারকর্তা। আল্লাহর বিশেষ বন্ধু বা ولي (ওলি) যখন তাঁর অনন্ত করুণা ও শক্তির প্রতিফলন হন, তখন তাঁকে “গাউস” বলা হয়। গাউসুল আজম হলেন সেই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু যার মাধ্যমে যুগে যুগে আল্লাহর রহমত উম্মতে প্রবাহিত হয়।

২. مشكل كُشا – মুশকিল কুশা – (কঠিনতা দূরকারী)

মানব জীবনের মুশকিল বা সংকট কেবল বাহ্যিক নয়, বরং অন্তরের গোপন অন্ধকার। মুর্শিদে কামিল মুরিদের অন্তরের গিঁট খুলে দেন, তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করেন। তাই গাউসুল আজমকে মুশকিল কুশা বলা হয়।

কাসিদায়ে গাউসিয়া শরীফে গাউছে পাক ইরশাদ করেন:-

“মুরীদী হিম্ ওয়াত্বিব্ ওয়াশতাহ্ ওয়া গান্নিন,
ওয়া ইফ্‌আল্ মা তাশা-উ, ফাল্ ইসমু আলী।”

অর্থ: হে আমার মুরীদ! আল্লাহর প্রেমে বিভোর হয়ে যাও, খুশী হও আর নির্ভয়ে গাও এবং তোমার মন যা চায় করো। কেননা, আমার নাম মহান। অর্থাৎ হায়মান, ত্বীব, শাত্বহ ও গেনা, যথাক্রমে প্রেমে বিভোর হওয়া, খুশী হওয়া, নির্ভয় হওয়া ও গাওয়া মা’রিফাতের কতগুলো সোপান। সুতরাং হে আমার মুরীদরা! তোমরাও এগুলো অতিক্রম করো। তা করতে পারলে তোমাদের ইচ্ছা খোদার ইচ্ছা হয়ে যাবে। তখন আর উন্নতির যাত্রাপথে কখনো পদস্খলন ঘটবে না, বরং উন্নীতই হতে থাকবে।

“মুরীদী লা তাখাফ আল্লাহু রব্বী,
আত্বানী রিফ্‌আতান্ নিতুল্ মানালী।”

অর্থ: হে আমার মুরীদ! তুমি কাউকে ভয় করো না। আল্লাহ্-ই আমার মালিক, যিনি আমাকে ওই উঁচু মর্যাদা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে উচুঁতর মর্যাদাগুলোতে (আমার আরজুগুলো) পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছি ।

৩. غوثُ الأعظم – গাউসুল আজম – (সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী) : সকল গাউসের মধ্যে তিনি আধ্যাত্মিকভাবে শ্রেষ্ঠ। সুফি ঐতিহ্যে, গাউসুল আজম হলেন এমন এক “আধ্যাত্মিক মেরু” (قطب) যিনি আল্লাহর ইচ্ছায় সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত ও সাহায্যের উৎস।

৪. رئيسُ العارفين – রইসুল আরেফিন – (আরেফদের নেতা) : ‘আরেফ’ হলেন তিনি, যিনি আল্লাহকে অন্তর দিয়ে চিনেছেন। আরেফদেরও নেতা আছেন—তিনি গাউসুল আজম। এর মানে, তিনি আল্লাহ-মারিফতের সমুদ্রে সর্বোচ্চ অবস্থানকারী।

৫. پيرانه پير – পীরানে পীর – (পীরদের পীর) : সকল আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক তাঁর কাছে শরণাপন্ন। পীররা আল্লাহর পথে মানুষকে চালনা করেন, আর তিনি পীরদের নেতা, আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ প্রতীক।

৬. دستگير – দস্তগীর – (সহায়তাকারী) : ‘দস্তগীর’ মানে যে হাতে ধরে সাহায্য করেন। মুর্শিদ রূহানীভাবে বা আধ্যাত্মিকভাবে পতিত মুরিদকে হাতে ধরে উঠিয়ে নেন এবং তাকে সঠিক পথে চালিত করেন।

৭. محبوب سبحاني – মাহবুবে সোবহানি – (সুবহান আল্লাহর প্রিয়তম) : আল্লাহর প্রিয়জন হওয়া মানে তিনি আল্লাহর নূরের প্রতিফলন। এই লকব বলে দেয়, গাউসুল আজমকে আল্লাহ বিশেষভাবে ভালোবাসেন এবং তাঁর মাধ্যমে বান্দাদের কাছে ভালোবাসা পৌঁছায়।

৮. قطب رباني – কুতুবে রব্বানী – (আল্লাহপ্রেরিত আধ্যাত্মিক মেরু) : কুতুব মানে আধ্যাত্মিক বা রূহানী জাগতের অক্ষ, যার চারদিকে সমগ্র সৃষ্টির আধ্যাত্মিক কার্যাবলী আবর্তিত হয়। ‘রব্বানী’ মানে আল্লাহর দ্বারা লালিত। অর্থাৎ তিনি সেই অক্ষ যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ যিনি আল্লাহর গুণাবলি রিজিকরূপে প্রাপ্ত, আল কিতাবের মূলতত্ত্ব অবগত এবং তাঁর পরিচয় দানকারী।

কাসিদায়ে গাউসিয়া শরীফে গাউছে পাক লিখেন;-

“দারাসতুল্ ইলমা হাত্তা সিরতু কুতুবান্,
ওয়া নিলতুছ সা’দা মিম্ মাওলাল্ মাওয়ালী।”

অর্থ: আমি (যাহেরী ও বাতেনী) ইলম পড়তে পড়তে ‘কুতুব’ হয়ে গেছি । আর আমি রাজাধিরাজ (মাওলার ) ‘র সাহায্য ক্রমে সৌভাগ্য (-এর সোপান) পর্যন্ত পৌঁছে গেছি। (কারণ, ইশক ও মুহাব্বত যেমন ‘মিলন’ পাবার মাধ্যম, তেমনি ইল্‌ম হচ্ছে কুতুব ও সৌভাগ্যের মর্যাদা লাভ করার উপায় । কবির ভাষায় “কেহ্ বে ইল্‌ম নাতাওয়াঁ খোদারা শেনাত।” (অর্থাৎ ইল্‌ম ব্যতীত আল্লাহকে চেনা সম্ভব নয় । উল্লেখ্য ‘কুতুব’ সা’আদত ও মা’রিফাতের অতি উঁচু মাযিল বা সোপান । “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে চান দান করেন।”

হুজর কাসিদায়ে গাউসিয়া শরীফে আরো বলেন:

“ওয়া ওয়াল্লনী আলাল্ আকতাবি জ্বাম্‌আ
ফা হুক্‌মী নাফিযুন্ ফী কুল্লি হালী।”

অর্থ: আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে সমস্ত কুত্ববের উপর হাকিম করেছেন। আর আমার হুকুম সব সময় জারী রয়েছে। (কেননা, আমাকে “সিরে ক্বাদীম’ (অনাদি -রহস্য) সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। যার অনিবার্য সুফল হচ্ছে – সমস্ত কুত্ববের উপর সরদার হওয়া এবং সব সময় তাঁর হুকুম জারী হওয়া।)

৯. غوث صمداني – গাউসে সামদানি – (আস-সামাদের সাহায্যপ্রাপ্ত গাউস) : আল্লাহর একটি নাম ‘আস-সামাদ’ — যিনি অমুখাপেক্ষী, চিরস্থায়ী আশ্রয়দাতা। গাউসুল আজমকে বলা হয় “গাউসে সামদানি”, অর্থাৎ তিনি আল্লাহ আস-সামাদের সাহায্যে সাহায্যকারী। অর্থাৎ যিনি মহানিরপেক্ষ।

১০. يا شيخ – ইয়া শেখ – (হে আধ্যাত্মিক গুরু) : শাইখ মানে শিক্ষাগুরু। এখানে শাইখ মানে আধ্যাত্মিক জ্ঞান শিক্ষক, যিনি মুরিদকে অন্তরের পথ শেখান।

১১. سيد – সৈয়্যদ – (নবীজীর বংশধর) : তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সরাসরি বংশধর (হাসানি ও হুসায়নি উভয় দিক থেকে)। এজন্য তাঁকে সৈয়্যদ বলা হয়, যা আধ্যাত্মিকতার সাথে বংশীয় মর্যাদাও নির্দেশ করে।

১২. مولانا – মাওলানা – (আমাদের প্রভু, পথপ্রদর্শক) : ‘মাওলা’ মানে আশ্রয়দাতা। মুরিদরা মুর্শিদকে বলে “আমাদের মাওলানা”—কারণ তিনি আল্লাহর পথে তাদের মাওলানা, পথপ্রদর্শক।

১৩. محیي الدين – মহিউদ্দিন – (দ্বীনের পুনর্জীবনদাতা) : গাউসুল আজম দ্বীনের ভুলে যাওয়া সত্যগুলো আবার জাগ্রত করেছিলেন, তাই তাঁকে বলা হয় মহিউদ্দিন।

১৪. عبد القادر الجيلاني الحسني والحسيني (ع) – পূর্ণ নাম—আবদুল কাদের জিলানী (رحمة الله عليه), যিনি নবীজীর বংশধর হাসানি ও হুসায়নি উভয় দিক থেকে।

১৫. مدد فرما – মাদাদ ফারমা – (সাহায্য করুন) : এখানে মুরিদ মুর্শিদের আধ্যাত্মিক সাহায্য প্রার্থনা করছে। তাসাউফের দৃষ্টিতে, ওলি আল্লাহর রহমতের মাধ্যম, তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ সাহায্য পৌঁছে দেন।

এই সমস্ত লকব বা উপাধি শুধু সম্মানের জন্য নয়, বরং এক একটি আধ্যাত্মিক সত্যের প্রতীক। তিনি কেবলার মতো কেন্দ্র, কাবার মতো আশ্রয়, কোরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যা, দ্বীনের পুনর্জীবনদাতা, ঈমানের শক্তি দানকারী।

এজন্যই তাঁকে “গাউসে খোদা” থেকে শুরু করে “মাহবুবে সোবহানি” পর্যন্ত অসংখ্য উপাধিতে ডাকা হয়, আর ভক্তরা বলে ওঠে: মাদাদ ফারমা, মাদাদ ফারমা, মাদাদ ফারমা।

নিবেদক:
আর এফ রাসেল আহমেদ ওয়ার্সী

আরো পড়ুনঃ