আধ্যাত্মিক আলোকধারা: সুফি মাওলানা সৈয়দ আবুল মুনসুর বাকি বিল্লাহ (রহ.)
সূচনা: মানবজীবনের ইতিহাসে কিছু আলোকিত আত্মা এমনভাবে উপস্থিত হয়, যেন তারা পৃথিবীতে আল্লাহর রহমতের এক দীপ্ত প্রতীক হয়ে উদ্ভাসিত হয়। হযরত শাহ সুফি মাওলানা সৈয়দ আবুল মুনসুর বাকি বিল্লাহ (রহ.) ছিলেন তাঁদেরই একজন। তিনি ছিলেন জ্ঞান, বিনয়, ত্যাগ ও মহব্বতের অপার আলোছায়ায় আলোকিত এক দীনদার দরবেশ, ওলীআল্লাহ এবং রাসূলপ্রেমে আত্মবিসর্জিত এক আলোকসাধক।
নূরানী পদচিহ্ন: শাহে ক্বদমী—পাউসার শরীফ:
দরবারের নামই যেন আধ্যাত্মিক দীপ—শাহে ক্বদমী—পাউসার শরীফ। এই নামের মাধ্যমে গ্রামের পরিচয় পাউসার যেন এক নির্মল আলোয় আলোকিত হয়েছে। প্রতিটি পদচারণা, প্রতিটি জিয়ারতের মুহূর্তে এই পবিত্র স্থান হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি ঢেলে দেয়। সকল ওলীর নামের শেষে সংযোজিত পাউসারী শব্দটি তাঁদের আধ্যাত্মিক এবং পিতৃস্থানীয় পরিচয়কে স্বচ্ছভাবে ফুটিয়ে তোলে। একইভাবে, ক্বদমী শব্দটি নামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তরিকা—ই—ক্বদমীর ধারাবাহিকতা ও নবজাগরণ স্পষ্ট হয়। দরবার ও ওলীদের আধ্যাত্মিক পবিত্রতা বোঝাতে নামের পূর্বে সংযোজিত ‘শাহে’ শব্দটি যেন নির্দেশ করে—এরা শুধুই আলোর পথিক, নবীর মহব্বতে আত্মবিসর্জিত, এবং মানব হৃদয়ের নীরব প্রশান্তির উৎস। এই নামকরণ দর্শক ও মুরিদদের মনে গভীর ভক্তি ও রূহানি প্রেরণা জাগায়, আর দরবারের ঐতিহ্যকে করে অম্লান।

জন্ম, বংশ ও শিক্ষা:
সৈয়দ আবুল মনছুর বাকী বিল্লাহ পাউসারী (রহ.) পৃথিবীর আলোয় আবির্ভূত হন ২৫ জমাদিউল আউয়াল, ১৩৪৬ হিজরী অর্থাৎ ৫ অগ্রহায়ণ ১৩৩৪ বাংলা, এবং ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ—এ। হযরত বাকি বিল্লাহ (রহ.) নবী করিম (দ.)—এর পবিত্র বংশধারার এক উজ্জ্বল শাখা—“আল হাসানী আল কাদমি” উপাধি দ্বারা তা সুস্পষ্ট। এই বংশের বরকত তাঁর রূহে নববী নূরের দীপ্ত ধারা প্রবাহিত করেছিল। শৈশব থেকেই জ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ও আধ্যাত্মিক চেতনা প্রকাশ পেয়েছিল। মাতৃভাষা বাংলা হলেও তিনি আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি একজন প্রাজ্ঞ আলেম, ফকীহ ও তাসাউফজ্ঞ। বাংলাদেশ ও কলকাতায় শিক্ষা লাভের মাধ্যমে তিনি এক অনন্য আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আধ্যাত্মিক পাঠ ও মুরিদদের সঙ্গে সংযোগ:
সৈয়দ আবুল মনছুর বাকী বিল্লাহ (রহ.) কেবল পীর—মুরিদীর প্রথাগত সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন সতর্ক নাগরিক এবং নীরব মুজাহিদ, যিনি সমাজ ও সময়ের খবর গভীর মনোযোগে গ্রহণ করতেন। সেকালের ইংরেজি পত্রিকা নিয়মিত পাঠের মাধ্যমে তিনি দেশ—বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতেন। তার পাশাপাশি, তিনি দূরবর্তী মুরিদানদের সঙ্গে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় চিঠি প্রেরণ করতেন, যা তাঁদের আধ্যাত্মিক সংযোগ ও দিকনির্দেশনার উৎস হয়ে দাঁড়াত। প্রায় সময় তিনি ‘দিওয়ানে হাফিজ’ পড়তেন এবং অবসর সময়ে উর্দু ও ফারসি ভাষায় কারবালার স্মরণে মর্সিয়া পাঠ করাতেন, যেখানে ভক্ত মুরিদদের অন্তর নরম হত এবং নবীর মহব্বতের আলো ছড়িয়ে পড়ত। এই সব আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন কেবল একটি পীর—মুরিদীর সীমাবদ্ধ তরিকায় আবদ্ধ না—বরং জ্ঞানোদয়ী, সতর্ক নাগরিক এবং অন্তরের নীরব মুজাহিদ, যিনি আধ্যাত্মিক আলো ও জ্ঞানের আলো একসাথে প্রবাহিত করে মুরিদদের জীবন আলোকিত করতেন।
বংশধারা ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার:
ক্বদমিয়া তরিকার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের ধারায় প্রথম ব্যক্তি ছিলেন মাওলানা সৈয়দ আমজাদ আলী পাউসারী (রহ.)। তাঁর সন্তান মাওলানা সৈয়দ আবুল হাসান আহসান আলী (রহ.), যিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন “ঢাকার সাহেব কেবলা” নামে, ছিলেন মেজো ছেলে। তার বড় ভাই মাওলানা সৈয়দ আবু মুহাম্মদ আজমল আলী (রহ.)—ও ছিলেন খলিফা। তবে আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার মাওলানা সৈয়দ আবুল মুনসুর বাকি বিল্লাহ (রহ.)—এর বংশধারায় মূলত চলেছে মাওলানা সৈয়দ আবুল হাসান আহসান আলী (রহ.)। এরপর তৃতীয় সাজ্জাদানশীনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মাওলানা সৈয়দ আবুল মুনসুর বাকি বিল্লাহ (রহ.), যিনি উজ্জ্বল ওলী ও দীনদার দরবেশ হিসেবে ক্বদমিয়া তরিকার আধ্যাত্মিক নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন। তারপরে উত্তরাধিকার চলে আসে মাওলানা সৈয়দ আবুল ফজল মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ মাহফুজ (রহ.)—এর হাতে। বর্তমান সময়ে ক্বদমিয়া তরিকার রক্ষণাবেক্ষণ ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব পালন করছেন মাওলানা সৈয়দ আ.হ.ম মাহবুব উল্লাহ (মা.জি. আ.), যিনি ধারাবাহিক সাজ্জাদানশীন হিসেবে তরিকার নূরানী ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখছেন।

তাসাউফ ও রুহানি দীক্ষা:
হযরত বাকি বিল্লাহ (রহ.) দুনিয়ার আরাম—আয়েশ থেকে দূরে থেকে সর্বদা জিকির, তাসবিহ ও মুরাকাবায় নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর দরবার ছিল আত্মার প্রশান্তি ও নাফস পরিশুদ্ধির কেন্দ্র। অসংখ্য আশেক, মুরিদ ও সৎপ্রত্যাশী তাঁর তালীমে জীবন বদলে ফেলেছে। তাঁর রুহানি নির্দেশে বহু পথভ্রষ্ট মানুষ আল্লাহর পথে ফিরে এসেছে। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টিই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছিলেন।
আধ্যাত্মিক চরিত্র ও সাধনার জীবন:
হযরত বাকি বিল্লাহ (রহ.) ছিলেন সাদাসিধে কিন্তু হৃদয়জাগানিয়া। তিনি নিরহঙ্কারী, নম্র এবং সর্বদা অন্যের কল্যাণে নিবেদিত। আল্লাহর প্রেমে তাঁর জীবন সমর্পিত ছিল। মুখমণ্ডল নরম, দৃষ্টি প্রশান্ত, বাক্য মধুর, হৃদয় রাসূল (দ.)—এর মহব্বতে গলিত। তাঁর জীবনদর্শন ছিল— আল্লাহর দরবারে অহংকারের কোনো স্থান নেই, এবং আল্লাহর প্রেমিকের পরিচয় হলো বিনয়। তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর স্মরণ, যিকির, তিলাওয়াত ও ইবাদতে কাটত। নবী করিম (দ.)—এর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর চোখ ভিজে উঠত। তাঁর দরবারে বসলে মনে হতো—আল্লাহর রহমতের মৃদু সুবাস আত্মাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
ক্বদমিয়া তরিকার প্রবর্তক ও ধারাবাহিকতা:
ক্বদমিয়া তরিকার প্রবর্তক ছিলেন হযরত মাওলানা সৈয়দ আমজাদ আলী পাউসারী। তিনি কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন এবং তাঁর পীর ছিলেন হযরত সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি। নবী করিম (দ.)—তাঁকে তাঁর বাম কদম মুবারকের ফয়েজ ও বারাকাত দান করেন। আল্লাহ পাক সৈয়দ আমজাদ আলী (রহ.)-আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় বান্দা হযরত সৈয়দ আমজাদ আলী (রহ.)-এর অন্তরকে মনোনীত করলেন এক বিশেষ রূহানী দানের জন্য। এক পবিত্র মুহূর্তে ইলহামের দরিয়া থেকে ঝরে পড়ল এক নূর—যে নূরের নাম ক্বদমিয়া তরীক্বা। এ নূর তাঁর হৃদয়ে প্রবাহিত হয়ে গেল, যেন আল্লাহর রহমতের দীপ্ত রশ্মি তাঁর অস্তিত্বকে ভেদ করে দিল। নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উসিলায় তিনি ঐ নূরের অন্তরঙ্গ জগতে প্রবেশ করলেন, যেখানে পর্দার আড়াল থেকে নবীজিই তাঁকে শিক্ষা দিলেন তরীক্বার সব মারফতি রহস্য, আসরার ও রূহানী আদব। আল্লাহর ইলহাম ছিল সেই বীজ, আর নবীজির বাতেনী তাওয়াজ্জুহ ছিল সেই বীজের প্রাণ। তরীক্বার প্রতিটি স্তর—যিকির, ফানায়িয়্যাত, বাকারিয়্যাত, তাওয়াজ্জুহ ও ফয়েজ—সবই তিনি লাভ করলেন নবীজির সরাসরি আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে। এ শিক্ষা ছিল না কলমের রেখায় বা জ্ঞানের বইয়ে; বরং ছিল অন্তরের দীপ্তিতে, নূরের আভায়, আর রূহের গভীর নিরবতায়। এভাবেই আল্লাহ পাক সৈয়দ আমজাদ আলী (রহ.)-কে মনোনীত করেন ক্বদমিয়া তরীক্বার ইমাম হিসেবে—যাঁর অন্তরে নববী নূরের উত্তরাধিকার প্রবাহিত হয়, এবং যাঁর মাধ্যমে অসংখ্য হৃদয় আজও আল্লাহর নূরে আলোকিত হয়ে থাকে। এই আলোকিত তরিকায় হযরত শাহ সুফি আবুল মুনসুর বাকি বিল্লাহ (রহ.) তৃতীয় সাজ্জাদানশীন হিসেবে আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার গ্রহণ করেন। তিনি ক্বদমিয়া তরিকার নূরানী ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং মুরিদদের হৃদয়ের পরিশুদ্ধি, যিকির ও আল্লাহভীতি শেখাতেন।
তরিকতের দীক্ষা ও প্রভাব:
হযরত বাকি বিল্লাহ (রহ.) তরিকতের নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন, বাহ্যিক চকচিক্য নয়, অন্তরের পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহভীতি প্রাধান্য পেত। তাঁর শিক্ষা ছিল সহজ— “যিকির কর, পরিশুদ্ধ হও, আর শরিয়তের প্রতি বিনয়ী থাকো।” তরিকতের মুরিদগণ বাংলাদেশ, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত ছিলেন। তাঁর প্রতিটি দোয়া যেন আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যেত। বহু মানুষ তাঁর খেদমতে ঈমান ও জীবনের দিশা পেয়েছেন। তাঁর কথায়—‘তরিকত হলো শরিয়তেরই প্রাণ; যে শরিয়তের আলো হারায়, তার তরিকত অন্ধকারে পরিণত হয়। তাঁর কথায়—‘তরিকত হলো শরিয়তেরই প্রাণ; যে শরিয়তের আলো হারায়, তার তরিকত অন্ধকারে পরিণত হয়।’
জ্ঞান, আনুগত্য ও আল্লাহর বরকত:
সৈয়দ আবুল মনছুর বাকী বিল্লাহ (রহ.) বলতেন— “জ্ঞানার্জন ছাড়া প্রথাগত পীর—মুরিদির আনুগত্য মানুষকে গোমরাহীর পথে চালিত করে।” তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য মন, বুদ্ধি ও জ্ঞান অপরিহার্য। শুধুমাত্র আনুগত্যের পথ অবলম্বন করলে মানুষ প্রায়শই ভুল পথে প্রবৃত্ত হয়। তার আধ্যাত্মিক জীবনের বিশেষ দিক ছিল কারামত, যা আল্লাহর বরকতের প্রবাহ। কারামতে সত্যিকার ওলী ও মুমিনের অন্তরে ঈমান ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি প্রবাহিত হয়, মনকে দীপ্তিময় করে, হৃদয়কে আলোকিত করে এবং আধ্যাত্মিক পথচলায় অনন্য প্রেরণা যোগায়। ইসতিদরাজ হলো সেই অলৌকিক ঘটনা, যা কখনো কখনো অবিশ্বাসী বা পাপী ব্যক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়—এটি আল্লাহর বরকত নয়। বরং এটি একটি সতর্কতা, যেন পাপী ব্যক্তি ধাপে ধাপে নিজের অবস্থার প্রকৃতি উপলব্ধি করে, এবং গোমরাহীর নিদর্শন হিসেবে প্রমাণিত হয়। সৈয়দ আবুল মনছুর বাকী বিল্লাহ (রহ.) শিখাতেন, যে সকল অলৌকিক কর্মই কারামত নয়, এবং কোনো অলৌকিক ক্ষমতা কোনো মানুষের ওলীত্বের প্রমাণ নয়। সত্যিকারের ওলী হল সেই ব্যক্তি, যার ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আনুগত্য, এবং ফরজ ও নফল ইবাদতের ধারাবাহিকতা তাকে আলোকিত করে। ইসতিদরাজের ঘটনার মধ্য দিয়ে আল্লাহ ওয়ালারা শিক্ষাগ্রহণ করে, সতর্ক হয় এবং ঈমানের দৃঢ়তা অর্জন করে। ইসতিদরাজ বলতে বোঝায়—যাদু, তন্ত্রমন্ত্র ও অলৌকিকতার মাধ্যমে সৃষ্ট এমন প্রভাব, যা বাহ্যত অলৌকিক মনে হলেও আসলে আল্লাহপ্রদত্ত করামত নয়, বরং এক প্রকার ভ্রান্তি ও শয়তানী প্রভাব।
শরিয়তের প্রতি বিনয় ও আনুগত্য:
হযরত বাকি বিল্লাহ (রহ.) শরিয়তের প্রতি অত্যন্ত বিনয়ী ও অনুগত ছিলেন। তাঁর জীবন সুন্নতের প্রতিফলন। কখনোই তিনি শরিয়তের সীমা অতিক্রম করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, তাসাউফ মানে শৃঙ্খলাপূর্ণ আল্লাহভীতি ও আত্মশুদ্ধির পথ।
তরিকার নূর ছড়ানো সফর:
সৈয়দ আবুল মনছুর বাকী বিল্লাহ (রহ.) ছিলেন সদা গগনে উড়ন্ত আধ্যাত্মিক নক্ষত্র, যিনি কেবল দরবারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি দেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, কুমিল্লা থেকে শুরু করে ভারতের আসাম, লখিমপুর, হাইলাকান্দি, শিবনগরপুর, শিবউত্তর, সিনচর, কলকাতা, মনিপুর ও ত্রিপুরা জুড়ে তরিকার আলো ছড়িয়েছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি মুরিদদের অন্তরে নবীর মহব্বত, হৃদয়ে তরিকতের নূর পৌঁছে দিতেন। তাঁর উপস্থিতি যেন আলো ছড়ানো হাওয়ার মতো, যেখানে যেতে দেখা যায় শুধু আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও আলোর ধারা। প্রতিটি সফর ছিল যেন দুঃসাহসিক পথচলার মাঝে আলোর এক রেখা, যা মুরিদদের মন ও রূহকে আলোকিত করত।

মার্জিত জীবন ও আধ্যাত্মিক ঔজ্জ্বল্য:
সৈয়দ আবুল মনছুর বাকী বিল্লাহ (রহ.) ছিলেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মার্জিত ও সূক্ষ্মনিষ্ঠ। ধৌলাই করা কাপড় পরিধান, সুঠাম দেহ আর অভিজাত আচরণে ফুটে উঠত তার স্নিগ্ধ স্মার্টনেস। কথাবার্তা, চলাফেরা ও জীবনযাপন সবই প্রকাশ করত অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্বের ছাপ। তিনি ছিলেন ধর্মীয় গোড়ামী ও কুসংস্কারের কঠোর বিরোধী, যেখানে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতা মিশে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি করত। তার উপস্থিতি মানুষের মনে আশ্রয় ও প্রশান্তির আলো ছড়াত, যেন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে উঠত আলোকিত পথপ্রদর্শক।
ওফাত:
৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে হযরত বাকি বিল্লাহ (রহ.) পরম প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যান। তাঁর ইন্তেকাল ছিল আধ্যাত্মিক আলোছটায় ভরা এক বিদায়। তিনি শায়িত আছেন মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার উত্তর পাউসারের “দরবারে শাহে ক্বাদমি”—তে।
রওজা শরীফ ও রুহানি অনুভব:
হযরত বাকি বিল্লাহ (রহ.)—এর রওজা শরীফ অত্যন্ত সাধারণ ও সরল—একজন প্রকৃত দরবেশের নীরব সাক্ষ্যবাহক। সেখানে নেই কোনো জাঁকজমক বা স্থাপত্যিক অলংকার, নেই ছাদ কিংবা বাহ্যিক আলোকসজ্জা। অথচ তাঁর রওজার পাশে দাঁড়ালেই রূহের মধ্যে এক অপার্থিব প্রশান্তির আভা বইতে থাকে। মনে হয় যেন আল্লাহর রহমতের জোয়ারে আত্মা দুলে উঠছে। যেন এক অদৃশ্য মধ্যাকর্ষণ শক্তি হৃদয়কে টেনে নিয়ে যায় তাঁর কবরের দিকে; রূহ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে তাওহিদের নূরের অনুভবে। তাঁর সেই সরল কবরেই লুকিয়ে আছে এক মহাসমুদ্রের প্রশান্তি—আল্লাহপ্রেম ও নবিপ্রেমের অবিরাম তরঙ্গ। যারা তাঁর রওজার পাশে দাঁড়িয়েছে, তারা সাক্ষ্য দেয়— “সেখানে দাঁড়ালে মন ও রূহ কেঁপে ওঠে; মনে হয় কোনো অদৃশ্য নূরের শক্তি আত্মাকে টেনে নিচ্ছে আল্লাহর সান্নিধ্যের দিকে।”
উক্তি ও শিক্ষাবিদের বর্ণনা:
জনৈক শিক্ষাবিদ লিখেছেন, “মঈন—এ মাযহাব ওয়া মিল্লাত, আবুল মানসুর সুলতানী, কি বাশাদ রায়াত—এ ক্বদরশ ফারাজ—এ কুব্বাতুল খাযরা। যাহী দারা—এ দীন পারওয়ার কি বার মানশুর—এ ইকবালশ কাশীদা কাতিব—এ হুসন—এ আযাল তুগর—এ ইসতি’লা। হামেশা তা বুদ দৌরান, হামেশা তা বুদ গাদু, বুদ গাঙ্গু তুরা তাবে’, বুদ দৌরান তুরা মওলা।” বাংলা উচ্চারণ: “মঈন—এ মাযহাব ওয়া মিল্লাত, আবুল মানসুর সুলতানী, কি বাশাদ রায়াত—এ ক্বদরশ ফারাজ—এ কুব্বাতুল খাযরা। যাহী দারা—এ দীন পারওয়ার কি বার মানশুর—এ ইকবালশ কাশীদা কাতিব—এ হুসন—এ আযাল তুগর—এ ইসতি’লা। হামেশা তা বুদ দৌরান, হামেশা তা বুদ গাদু, বুদ গাঙ্গু তুরা তাবে’, বুদ দৌরান তুরা মওলা।” শব্দ—শব্দ অর্থ: মঈন—এ মাযহাব ওয়া মিল্লাত — ধর্ম ও সম্প্রদায়ের আশ্রয়স্থল; ধার্মিক শিক্ষা ও নীতি রক্ষাকারী। আবুল মানসুর সুলতানী — আবুল মনছুর সুলতানী; ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের প্রতীক। কি বাশাদ রায়াত—এ ক্বদরশ ফারাজ—এ কুব্বাতুল খাযরা — যার প্রভাব ও দিকনির্দেশনা বিস্তৃত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে, কুব্বাতুল খাযরার পরিসরে পর্যন্ত। যাহী দারা—এ দীন পারওয়ার — যে ব্যক্তি ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও মানুষের কল্যাণে অবিচল। কি বার মানশুর—এ ইকবালশ কাশীদা কাতিব—এ হুসন—এ আযাল তুগর—এ ইসতি’লা — তাঁর দিকনির্দেশনা ও বরকত চিরন্তন উজ্জ্বল, আকাশের চাঁদের ন্যায় দীপ্তিময়। হামেশা তা বুদ দৌরান — সময় অতিবাহিত হলেও। হামেশা তা বুদ গাদু — যুগ পরিবর্তিত হলেও। বুদ গাঙ্গু তুরা তাবে’ — তিনি সর্বদা ছিলেন রক্ষা ও পথপ্রদর্শক। বুদ দৌরান তুরা মওলা — সর্বদা তিনি ছিলেন গাইড, মুরশিদ ও আধ্যাত্মিক রাহবার। এই উক্তি সুফি—সাহিত্যের রীতিতে রচিত প্রশংসা—বাণী” — এটি পাঠককে বুঝতে সাহায্য করবে যে এটি ঐতিহাসিক শ্রদ্ধার ভাষা, নয় কোন উপাসনা বা অলৌকিক দাবি। ভাবার্থ ও শিক্ষাবিদের উদ্দেশ্য: এই উক্তি প্রমাণ করছে যে সৈয়দ আবুল মনছুর সুলতানী (রহ.) ছিলেন কেবল আধ্যাত্মিক নেতা নয়, বরং ধর্মীয় জ্ঞান ও মানুষের কল্যাণের রক্ষাকারী। তাঁর দিকনির্দেশনা, বরকত ও প্রভাব এত বিস্তৃত যে তা কেবল স্থানীয় সীমাবদ্ধ নয়, বরং দ
ূরবর্তী অঞ্চলেও ছড়িয়ে আছে। সময় ও যুগ পরিবর্তিত হলেও তিনি সর্বদা আধ্যাত্মিক রাহবার, মুরশিদ ও পথপ্রদর্শক হিসেবে অবিচল ছিলেন। শিক্ষাবিদ এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, সত্যিকারের ওলী শুধু প্রথাগত আচার—বিধিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জ্ঞান, ধৈর্য ও নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে যুগে যুগে মানুষের জন্য আলোকস্তম্ভ হয়ে থাকেন।

উত্তরসূরি ও বর্তমান নেতৃত্ব :
আজ দরবারে শাহে ক্বাদমি’র গাদ্দিনশীন হযরত শাহ সুফি শায়েখ মাওলানা সৈয়দ আ.হ.ম. মাহবুব উল্লাহ আল হাসানি ওয়াল হুসাইনি আল কাদমি তাঁর পূর্বসূরিদের নূরানি ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণভাবে বহন করছেন। তিনি কাদমিয়া তরিকার মান, মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা রক্ষা করে চলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে এই দরবার আজও কোরআন—সুন্নাহভিত্তিক প্রকৃত সুফিবাদের আলোকধারা প্রচার করে যাচ্ছে।
রুহানি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা:
দরবারে শাহে ক্বাদমি আজ শুধু একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নয়—এটি এক রুহানি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে আত্মার পরিশুদ্ধি, মানবপ্রেম, আল্লাহপ্রেম ও নবিপ্রেমের শিক্ষা আজও প্রবাহিত। হযরত বাকি বিল্লাহ (রহ.)—এর নূরানি জীবন ও শিক্ষা আজও হাজারো হৃদয়কে তাওহিদের পথে আহ্বান জানাচ্ছে।
সমাপনী:
হযরত শাহ সুফি মাওলানা সৈয়দ আবুল মুনসুর বাকি বিল্লাহ (রহ.) চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন অম্লান শিক্ষা— “আল্লাহর প্রেমে আত্মাকে সঁপে দাও, মৃত্যুও হবে নূরের দরজা।” তাঁর জীবন, চরিত্র, রওজা ও ফয়েজ আজও মানুষের জীবন আলোকিত করছে, হৃদয়কে প্রশান্ত করছে, এবং রূহকে নবীপ্রেমে পূর্ণ করছে। তাঁর স্মৃতি চিরন্তন আলোকধারা হয়ে আমাদের পথ প্রদর্শন করে।
লেখক:
মাওলানা কায়ছার উদ্দীন আল—মালেকী
(সাহিত্যিক, গবেষক ও সুফিচিন্তক)






