শবে মেরাজ ও মুসলিম উম্মাহর পরিবর্তিত কিবলা।

শবে মেরাজ ও মুসলিম উম্মাহর পরিবর্তিত কিবলা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে যে অসংখ্য মহান নিয়ামত দান করেছেন, শবে মেরাজ তার মধ্যে এক অনন্য ও অতুলনীয় মর্যাদার অধিকারী। এই পবিত্র রাত কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর এক মহিমান্বিত মুজিযার স্মৃতি নয়; বরং এটি পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মসমালোচনা, দায়িত্ববোধ ও দিকনির্দেশনার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। শবে মেরাজ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ইসলাম শুধু মৌখিক দাবি বা আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের নাম নয়; বরং আনুগত্য, ইবাদত এবং বাস্তব জীবনে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণের নাম। এই রাতেই উম্মতে মুহাম্মদী ﷺ–কে নামাজের মতো শ্রেষ্ঠ ফরজ ইবাদত দান করা হয়—যা ঈমানের পরিচয়, দ্বীনের ভিত্তি এবং বান্দা ও রবের মধ্যকার সরাসরি সংযোগস্থল।

নামাজ এমন এক ইবাদত, যার জন্য নবী করিম ﷺ–কে বিশেষভাবে আসমানে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে নামাজ ইসলামের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ এবং মুমিনের জীবনের মূল চালিকাশক্তি। অথচ আজ অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনাবোধের সঙ্গে বলতে হয়, মুসলিম উম্মাহ—বিশেষ করে যুবসমাজ—এই মহান আমানত থেকে ক্রমশ উদাসীন হয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে আমাদের কিবলা বদলে যাচ্ছে; মসজিদের জায়গা দখল করছে দুনিয়াবি ব্যস্ততা, আর সিজদার স্থান দখল করছে নফসের খায়েশ ও কামনা। শবে মেরাজ যেন আমাদের কাছে এই প্রশ্ন রাখে—যে নামাজের জন্য আসমানে ডাকা হয়েছিল, আমরা কি তাকে আমাদের জীবনের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে সরিয়ে ফেলেছি?

নামাজ শুধু কয়েকটি আনুষ্ঠানিক কাজের সমষ্টি নয়; বরং এটি মানুষের চরিত্র গঠন, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নতির এক শক্তিশালী মাধ্যম। নামাজ মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে, তার চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করে এবং তার জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে। কুরআনুল কারিমে বারবার নামাজ কায়েম করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ নামাজ ছাড়া ঈমানের সুরক্ষা সম্ভব নয়। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম প্রশ্নই হবে নামাজ সম্পর্কে—এই সত্য নামাজের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। নামাজ ঠিক থাকলে অন্যান্য আমল সহজ হয়, আর নামাজ নষ্ট হলে সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ কারণেই আলেমগণ বলেছেন—নামাজ দ্বীনের স্তম্ভ; স্তম্ভ ভেঙে গেলে গোটা কাঠামো ধসে পড়ে।

নামাজ ও ঈমানের সম্পর্ক আত্মা ও দেহের মতো অবিচ্ছেদ্য। আত্মা ছাড়া দেহ যেমন মৃত, তেমনি নামাজ ছাড়া ঈমান নিস্তেজ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। কেউ নিজেকে মুসলমান দাবি করলেও যদি নামাজ ত্যাগ করে, তবে তার এই দাবি গভীর প্রশ্নের মুখে পড়ে। শবে মেরাজ আমাদের এই কঠিন সত্যের দিকেই জোরালোভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাই যদি মুসলিম উম্মাহ সত্যিকার অর্থে মেরাজের শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়, তবে প্রথম ও প্রধান করণীয় হলো—নিজের জীবনে নামাজকে প্রতিষ্ঠা করা। নামাজই সেই চাবিকাঠি, যার মাধ্যমে আমাদের কিবলা সংশোধিত হতে পারে এবং আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত সুন্দর হতে পারে।

আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, মুসলিম উম্মাহ বিশেষত যুবসমাজ এক গভীর গাফিলতির সময় অতিক্রম করছে। এই গাফিলতি হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; বরং ধীরে ধীরে আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমরা নামাজ ছেড়ে দিচ্ছি, অথচ বিবেক নাড়া দিচ্ছে না; ইবাদত থেকে দূরে থাকছি, অথচ অপরাধবোধ কাজ করছে না। গুনাহ আর গুনাহ হিসেবে অনুভূত হচ্ছে না—তা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দুনিয়াবি সাফল্য, সম্পদ, পদমর্যাদা ও ভোগ-বিলাস আমাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে, আর আখিরাত হয়ে পড়েছে গৌণ চিন্তা। পবিত্র রাতগুলো, যা ছিল তওবা ও আল্লাহমুখী হওয়ার সময়, আজ তা খেল-তামাশা ও অর্থহীন ব্যস্ততায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শবে মেরাজের মতো মহিমান্বিত রাতও অনেকের কাছে কেবল একটি তারিখ বা ছুটির দিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই গাফিলতির সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে মসজিদগুলোতে। কাতার ফাঁকা, ফজর ও এশার সময় নামাজির সংখ্যা অপ্রতুল। ঘরে নামাজের পরিবেশ নেই; বাবা-মা নিজেরাই উদাসীন, ফলে সন্তানরাও সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না। আধুনিক প্রযুক্তি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও অশ্লীল বিনোদন আমাদের সময়, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি কেড়ে নিয়েছে। মানুষ রাত জাগে, কিন্তু আল্লাহর জন্য নয়; চোখ খোলা থাকে, কিন্তু সিজদার জন্য নয়। এর পরিণতিতে হৃদয় কঠিন হয়ে যাচ্ছে এবং আত্মিক অনুভূতি নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।

আরও দুঃখজনক বিষয় হলো—আমরা দ্বীনকেও নিজের সুবিধামতো গ্রহণ করছি। যে ইবাদত সহজ মনে হয়, তা পালন করি; আর যা নফসের ওপর ভারী লাগে, তা পরিত্যাগ করি। নামাজ যেহেতু নিয়ম, শৃঙ্খলা ও আত্মসংযম দাবি করে, তাই সেটিই প্রথমে বাদ পড়ে। এখানেই আমাদের কিবলা বদলে যায়—মসজিদ থেকে বাজারের দিকে, আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে নফসের সন্তুষ্টির দিকে। এই অবস্থা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং সামষ্টিক পতনের সূচনা। নামাজ হারালে চরিত্র দুর্বল হয়, চরিত্র দুর্বল হলে সমাজ ভেঙে পড়ে, আর সমাজ ভেঙে পড়লে জাতি অপমানিত হয়।

তবে ইসলাম হতাশার দ্বীন নয়। যত গভীর গাফিলতিই হোক না কেন, ফিরে আসার পথ সবসময় খোলা। আন্তরিক তওবা, দৃঢ় সংকল্প এবং জীবনের কিবলা সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব। শবে মেরাজ এই আশার বার্তাই বহন করে—বান্দা যত দূরে চলে যাক না কেন, একটি সত্যিকার সিজদা তাকে আবার আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিতে পারে। এই সংশোধনের প্রথম ধাপ হলো নামাজের নিয়মিততা। নামাজ কায়েম হলে চিন্তা, চরিত্র ও কর্ম—সবকিছু ধীরে ধীরে সঠিক পথে ফিরে আসে।

এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিবেশের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা যদি নিজেরাই নামাজের প্রতি যত্নবান হন, তবে সন্তানদের হৃদয়েও তার প্রভাব পড়ে। ঘরে ইবাদতের পরিবেশ, দ্বীনি আলোচনা ও নৈতিক চর্চা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি মসজিদ, মাদরাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুবসমাজের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করতে হবে। কারণ প্রকৃত মুক্তির পথ কোনো জটিল দর্শন নয়; বরং সহজ ও পরীক্ষিত—আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, রাসূল ﷺ–এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং নামাজকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানানো।

পরিশেষে বলা যায়, শবে মেরাজ আমাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে নামাজই দ্বীনের ভিত্তি এবং মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। অলসতা, গাফিলতি ও দুনিয়ার মোহে পড়ে ইবাদত ত্যাগ করলে চলবে না। পবিত্র রাতগুলো তওবা, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে কাটাতে হবে। আমাদের চিন্তার কিবলা সংশোধন করতে হবে—মসজিদ, কুরআন ও সুন্নাহকে জীবনের অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদি মুসলিম উম্মাহ, বিশেষ করে তার যুবসমাজ, এই পরিবর্তিত কিবলাকে আবার সঠিক দিকে ফিরিয়ে আনে, তবে শুধু ব্যক্তিগত জীবনই নয়—সমগ্র উম্মাহ তার হারানো মর্যাদা ও সম্মান পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে। শবে মেরাজ আমাদের সেই পথের দিকেই আহ্বান জানায়—সিজদার পথে ফিরে আসার পথ।

নাম: রবিউল আলম
কপিলশহর, ডুরিয়া, মুরারাই, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত,

আরো পড়ুনঃ