অস্তিত্বের অন্তর্জন্ম
জীবন যে কেবল একটি যাত্রা নয়, বরং যাত্রা হয়ে ওঠার দীর্ঘ ও নীরব প্রক্রিয়া এই বোধ মানুষের আত্মাকে গভীর এক দর্শনের দিকে নিয়ে যায়। আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে উঠি, কিন্তু সত্যিকারের জেগে ওঠা ঘটে আমাদের চেতনায়, যেখানে পুরোনো ধারণাগুলো ভেঙে নতুন উপলব্ধির জন্ম হয়। এ জন্ম কোনো জীববৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়; এটি আত্মার অন্তর্জন্ম, যা অদৃশ্য অথচ সবচেয়ে বাস্তব।
মানুষের ভেতরে একটি অশেষ সম্ভাবনার নদী বহমান। এই নদী কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল; কখনো নিজস্ব স্রোতে এগিয়ে যায়, আবার কখনো পাথরে আঘাত পেয়ে দিক পরিবর্তন করে। আর আমরা? আমরা সেই নদীর স্রোতের মতোই প্রতিক্ষণে পরিবর্তিত হচ্ছি। আমাদের চিন্তা, ইচ্ছা, ভয় এবং উপলব্ধি মিলেমিশে তৈরি করছে এক নতুন সত্তা। তাই বলা যায়, মানুষ কখনো একই থাকে না; প্রতিটি মুহূর্তে আমরা পুরোনো নিজের মৃত্যু এবং নতুন নিজের জন্মের সাক্ষী হয়ে আছি।
জীবন যে যাত্রা নয় এতে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। যাত্রায় দিশা থাকে, গন্তব্য থাকে; কিন্তু বেঁচে থাকার প্রকৃত অভিজ্ঞতা কোনো গন্তব্যের দিকে এগোনো নয়, বরং নিজের মধ্যে সুপ্ত অসীমতার দিকে প্রত্যাবর্তন। প্রত্যেক উপলব্ধি যেন একেকটি দরজা, যা খুলে যায় ভেতরের আরো গভীর চেতনাস্থানে। আমরা ভুল করলে, ভেঙে পড়লে, আবার উঠে দাঁড়ালে আমাদের অন্তর্জগতে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর এক পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনই আসলে যাত্রা হয়ে ওঠার প্রকৃত রূপ।
অনেকেই মনে করেন জীবন হলো ঘটনার স্তূপ, কিন্তু জীবন তার চেয়ে অনেক সূক্ষ্ম। ঘটনা কেবল বাহ্যিক; কিন্তু সেই ঘটনার ভেতর দিয়ে আত্মায় যে আলোছায়ার খেলা হয়, সেটাই প্রকৃত জীবন। মানুষের সত্যিকারের দায় সেখানে নিজেকে বুঝে নেওয়া, নিজের মধ্যে বিবর্তন ঘটানো, নিজের জন্মকে বারবার নতুন করে ঘটানো। যে মানুষ বাঁচে, সে প্রতিমুহূর্তে জীবনের সঙ্গে সংলাপ করে; সে নিজের ভেতরের ছায়াকে অস্বীকার করে না, আবার শুধু আলোতেও আবদ্ধ থাকে না। সে জানে, আলোর জন্ম ছায়াকে ধারণ করেই।
জীবনের এই অন্তর্জন্মের পথে আমরা প্রত্যেকে একা, কিন্তু একাকী নই। আমাদের প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মহাবিশ্বের প্রাচীন স্মৃতি; প্রতিটি বোধোদয়ের সঙ্গে উপলব্ধি হয় আমরা সময়ের কোনো বিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা একক সত্তা নই, বরং এক অনন্ত বিস্তৃতির ক্রমাগত হয়ে ওঠা অংশ।
তাই জীবন কখনো সমাপ্ত হয়ে যায় না; সমাপ্ত হয় কেবল আমাদের পুরোনো উপলব্ধি। আমরা এগিয়ে চলি, রূপান্তরিত হই, ভেঙে আবার তৈরি হই এভাবেই যাত্রা নয়, যাত্রা হয়ে ওঠার অসীম প্রক্রিয়াতে অংশ নিই। আর এই প্রক্রিয়াকেই বলে অস্তিত্বের অন্তর্জন্ম, যেখানে মানুষ প্রতিমুহূর্তে নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখে, নতুন করে জন্ম নেয়, এবং প্রতিনিয়ত আরো গভীর হয়ে ওঠে নিজেরই রহস্যে।
– ফকির জুয়েল সাধু






