খাজা মাসুম ফারুকী মুজাদ্দেদী (রহ.)-এর নূরানী জীবন ও কর্ম।

খাজা মাসুম ফারুকী মুজাদ্দেদী (রহ.)-এর নূরানী জীবন ও কর্ম।

উরওয়াতুল উসকা, কুতুবুল হুদা, কাইউমে সানী,পীর- শায়েখে তরিকত,ইলাহী বাহুরমাতি হজরত খাজা মাসুম ফারুকী রাহ.।

জন্ম: ১০০৭ হিজরির ১১ শাওয়াল, ১৫৯৮ সালের সোমবার হজরত মুজাদ্দিদ- ই- আলফেসানী রাহ.-এর তৃতীয় সাহেবজাদা সিরহিন্দে জন্মগ্ৰহণ করেন।

জন্মের পূর্বাভাস: হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. হতে বর্ণিত, “আমার সন্তান মুহাম্মদ মাসুমের জন্ম আমার জন্য বহুমুখী কল্যাণ বয়ে নিয়ে এসেছে। তার জন্মের কয়েক মাস পর আমি হজরত খাজা বাকীবিল্লাহ রাহ.- এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করলাম। যাবতীয় এলেম ও মারেফাত অর্জন করতে সক্ষম হলাম”।

ভূমিষ্ঠকালীন অবস্থা: স্বীয় মাতা বলেন,” আমার এই সন্তান জন্ম হওয়ার প্রাক্কালে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি, তখন আমি দর্শন করি মাশরিক বা পূর্ব থেকে, মাগরিব বা পশ্চিম পর্যন্ত সারা জাহান নুরে পূর্ণ হয়ে গেছে”।

হজরত রাসূলুল্লাহ সা.- এর বাতেনী অভয়: হজরত রাসূলুল্লাহ সা. বাতেনী ভাবে হজরত মুজাদ্দিদ-ই- আলফেসানী রাহ.-কে বলেন, “তোমার এই সন্তানের নাম রেখো- মুহাম্মদ মাসুম, কেননা সারা জীবন সে মাসুম অর্থাৎ নিঃস্পাপ থাকবে। বাস্তবেই তাঁর জীবন ও কর্মে মাসুম নামের মূল্যায়ন হয়েছে”।

পিতা- মাতা: পিতা হজরত আহমদ ফারুকী সিরহিন্দী মুজাদ্দিদ-ই- আলফেসানী রাহ.। মাতা হজরত ফাতেমা জাহরা রাহ.। পিতামহ হজরত আবদুল আহাদ ফারুকী রাহ.।

ভ্রাতা-ভগ্নি: ভ্রাতা- খাজা মুহাম্মদ সাদিক রাহ., খাজা মুহাম্মদ সাইদ রাহ., খাজা মুহাম্মদ ফররুখ রাহ., খাজা মুহাম্মদ ঈসা রাহ., খাজা মুহাম্মদ আশরাফ রাহ., শাহ মুহাম্মদ ইয়াহিয়া রাহ.। ভগ্নি- হজরত রুকাইয়া রাহ., হজরত উম্মে কুলসুম, হজরত খাদিজা রাহ.।

শিক্ষা: শৈশব থেকেই তিনি পড়াশোনায় বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। তিন বছর বয়সে কালেমা তাওহিদ সম্পর্কে যে সকল অভিমত ব্যক্ত করতেন, তা বিস্ময়কর।প্রাচীর গাত্রে অথবা ফুলবাগিচায় ফুলের উপর এবং অপরাপর বস্তুর উপর যখন তার দৃষ্টি আপতিত হতো তখন তিনি বলতেন,’ এ- আমি এবং সে-ও আমি’।

বালক পুত্রকে স্বীয় পিতা একদিন তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন- প্রিয় বৎস! শীঘ্রই পড়াশোনা শেষ কর। কেননা, তোমার দ্বারা আমার অনেক কাজ করানোর আছে।”

অতঃপর হজরত মাসুম সাহেবের পড়াশোনার প্রতি তীব্র আগ্ৰহ সৃষ্টি হয় এবং আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে তিনি বিশেষ মদদ আয়ত্ত করতে থাকেন। মাত্র তিন মাসে তিনি কুরআনে হাফেজ হন। তিনি স্বীয় বড়ো ভাই হজরত খাজা মুহাম্মদ সাদিক রাহ.- এর সমীপে পাঠ্যসূচির কিছু পুস্তক অধ্যয়ন করেন। অধিকাংশ পুস্তক পিতা এবং শায়খ মুহাম্মদ তাহির লাহোরী রাহ.- এর নিকটে পড়াশোনা করেন। হজরত মুহাম্মদ মাসুম সাহেব বলেন,আমার দাদা আমাকে ‘বেকায়া’ পুস্তক এক অধ্যায় করে পড়তে বলতেন, আমিও সঙ্গে সঙ্গে তা মুখস্থ করে নিতাম।

তিনি খুব খুব মেধাবী এবং সায়ের-সুলুক আয়ত্তকারী ছিলেন। স্বীয় সাহেবজাদা সম্পর্কে হজরত মুজাদ্দিদে আলফেসানি রাহ. একাধিক সুখবর দিয়েছেন। উচ্চমর্যাদার অধিকারী স্বীয় পুত্র যখন পূর্ণ হাল,কারামত হাসিল, অলৌকিক, উচ্চ মাকামে উন্নীত ও কামালাত প্রাপ্ত হতেন, তখন হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. তাঁকে খিলাফত প্রদান করে বিশেষ মর্যাদায় শোভিত করলেন। উত্তম চরিত্র– আল্লাহর অশেষ কৃপায় জাহেরি ও বাতেনী পর্যায়ে অত্যন্ত মজবুত ভাবে সাবলম্বী হলেন। এবং শরীয়ত ও তাকওয়ার গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে সুন্নাতের সার্বিক অনুসরণ এবং পূর্ণতার সাথে গভীরভাবে নিশ্চিত আমলে সন্নিবেশিত হয়ে উত্তম চরিত্র, বিনয়, নম্রতা, কর্মস্পৃহা এবং সকল ক্ষেত্রে তাঁর পিতার প্রচ্ছন্ন প্রতীক রূপে সাব্যস্ত হয়ে গেলেন।

আমল: তিনি এই বিষয়ে সদা সতর্ক থাকতেন যে, সুলুক, সৎকাজ, সুন্নত, মুস্তাহাব পালনের ক্ষেত্রে পিতার অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্যে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত না ঘটে। তাঁর সমুদয় কর্মস্পৃহা হজরত মুজাদ্দিদ রাহ.-এর আমলের মতো বিদ্যমান ছিল। তাঁর তরিকা ছিল হজরত মুজাদ্দিদ রাহ.-এর তরিকা। তাঁর দিবা-রাত্রির সকল আমল রুটিনমাফিক ছিল । প্রতি নামাজের পরে দোয়াও নির্ধারিত ছিল।

ফজরের নামাজ শেষে নির্দিষ্ট অজিফা পালন করতেন। স্বীয় সাথীদের নিয়ে জিকিরের মজলিস করতেন এবং মুরাকাবায় বসতেন। জোহরের নামাজ অন্তে হাফেজ সাহেবের পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মজলিসে বসতেন। মাঝে মাঝে জোহরের নামাজ শেষে জিকিরের মজলিস বসতো। তারপর বায়যাবী, আজুদী, তালবিহ, মিশকাত, হেদায়াহ কিতাবের তালিম দিতেন। মাঝে মাঝে জোহরের নামাজের পর নির্জন এলাকায় বসে সময় ব্যয় করতেন। কতিপয় সময়ে জোহরের নামাজ সমাপ্ত করে দুই রাকাত শোকরানা নামাজ আদায় করতেন।

এই পর আসরের নামাজ আদায় করতেন। তিনি বলতেন, “নামাজের মধ্যে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত বড়ই আনন্দদায়ক। তিনি সকল সময় কুরআন মজিদ তরতিবের সঙ্গে তেলাওয়াত করতেন। তিনি তিন মাসে পবিত্র কুরআনে হাফেজ হন। বেশি সময় তিনি কুরআন তেলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন। রমজান মাসে তারাবি নামাজে তিনি নিজেই এক খতম করতেন। আর হাফেজদের থেকে দুই খতম কুরআন শ্রবণ করতেন। উল্লেখ্য, শহরের নানা এলাকা থেকে এবং গ্ৰামের সাধারণ মানুষ তাঁর কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণ করে নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করতেন। মসজিদ বিরাট হওয়া সত্ত্বেও স্থান সংকুলান হতো না। আর রোজার মাসে এফতারিতে অসংখ্য রোজাদার হাজির হতেন।

সবক: মুরিদদের হাল পর্যবেক্ষণ,তাদের সুলুকের অগ্রগতি এবং তাদেরকে উচ্চ মাকামে পৌঁছানোর জন্য হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. যে পন্থা অবলম্বন করতেন, সেই পথই তাঁর প্রিয় ছিল। প্রকাশ থাকে যে,সেই প্রক্রিয়া ছিল সুন্নতে- নব্বাবী প্রকৃত পথ। তিনি মুরিদগণের প্রতি তীক্ষ্ম তাওয়াজ্জুহ জারি রাখতেন। মুরিদগণের মধ্যে তাওয়াজ্জুহর প্রভাব প্রকাশ পেতো। তাদের হাল এবং ভবিষ্যৎ সংশোধনীর বিষয়েও তিনি তাদেরকে জ্ঞাত করতেন। উচ্চ মাকামের নিয়মাবর্লী বর্ণনা করে তাদেরকে বেলায়েতের সংবাদ প্রদান করতেন।

এমনকি ব্যক্তির নামপূর্বক বলতেন, ওমুক বেলায়েতের মাকামে অবস্থান করছে, ওমুক ব্যক্তি বেলায়েতের মাকামে পদার্পণ করেছে। তাঁর অনেক মুরিদ বাতেনী হাল এবং বাতেনী কামালাত প্রাপ্তিতে ধন্য হয়ে কুতুবিয়াতের দায়েরায়ে উপনীত হয়ে খিলাফতে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁরা নিজের দেশে বা এলাকায় যথেষ্ট প্রভাবশালী হয়েছিলেন। ভক্তগণ তাঁদের নেক সোহবতে কৃতার্থ লাভ করে মারেফাতের সূক্ষ্ম তত্ত্বের সবক গ্রহণ করতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ খিলাফত প্রাপ্ত হয়ে ছিলেন। তাঁরা অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করতেন।

আল্লাহর বিশেষ দয়া ও হজরত রাসুল সা.-এর জিম্মাদারী এবং মুর্শিদের তাওয়াজ্জুহের বরকতে সুলুক এবং তার পূর্ণতার বিষয়গুলো অধিক ফলপ্রুস হয়েছে। অধিক সময়ের কাজ একদিনে অথবা এক মাসে সুসম্পন্ন হয়েছে। এক মুরিদ তরবিয়তের (আত্মিক পরিচর্যার) সূচনাতেই সাত দিনের মধ্যে কলবের ফানার ঘটনা ব্যক্ত করেছেন। ওয়ামা জালিকা আ’লাল্লাহি বি আজিম’ (আল্লাহ্ জন্য এটা কোনো কঠিন বিষয় নয়)। এই দরবেশের বেশিভাগ এজাজতপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাদের মুরিদগণের কল্পনাতূত হালের কথা বলেন। দ্রুত আল্লাহ নৈকট্য হাসিলের অনেক কারামত ব্যক্ত করেছেন, যা আনন্দদায়ক।

এই কথা বলাবাহুল্য যে, তিনি তাঁর পীর-শায়খ পিতার সব বাতেনী উচ্চাসন এবং সূক্ষ্ম মারেফাতের বিষয়ে পূর্ণরূপে জ্ঞাত ছিলেন। সেই মারেফাত এবং গুপ্ত রহস্য মাকতুবাতে কুদসী আয়াতের মধ্যে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা বিশেষ গুপ্তরহস্য হজরত মুজাদ্দিদ রাহ.-এর বিশেষ নির্জন পরিবেশে তাঁরই পবিত্র মুখ থেকে এলহামের মাধ্যমে জ্ঞাত হতে পারে এবং বিশেষ বিশেষ মারেফাত রয়েছে, যা তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কার্যক্রমে লিখে রেখেছেন।এমন কিছু গোপন রহস্য এবং মারেফাতে লাদুন্নিয়া রয়েছে, যা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত বেলায়েতের বাগানের নতুন নতুন ফুলস্বরূপ এবং যা দ্বিতীয় ব্যক্তি অবগত নয়।

পবিত্র কুরআনের কোনো কোনো মুতাশাবিহাত এবং মুকাত্তাআতের রহস্যের বিষয়ে আলোচনা কেবল তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।অপরাপর গুপ্ত রহস্য তাঁর সাথেই সংযুক্ত ছিল। অবশ্য কিছু মারেফাত বিষয় এমন আছে, যা প্রকাশ করা যেতে পারে। সেই গুলো তিনি তার কোনো কোনো মাকতুবে ব্যক্ত করেছেন। কুরআনের মুতাশাবিহাত কেবলমাত্র নবী- আম্বিয়া সা. এবং তাঁদের উত্তরাধিকারীদের পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

সুতরাং হজরত রাসূলুল্লাহ সা.- এর তাসলিমাতের পূর্ণ অনুসরণের জন্য সাধনা করো যেনো তাঁর বরকত হাসিল করতে পারো এবং তার স্বাদ আস্বাদন করতে সক্ষম হও এবং কিয়ামতের ভয়াবহ বিপদ থেকে তাঁর সুপারিশে মুক্তি পাও। (মাকতুবাতে মাসুমিয়া,প্রথম খণ্ড, ১৩৪ নং মাকতুব)।

ওই সকল সুসংবাদ যা হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. নিজ পুত্র হজরত মুহাম্মদ মাসুম রাহ.-এর উচ্চমর্যাদা সম্পর্কে বলেছিলেন- “ইতিমধ্যে সেইগুলোর কিছু কিছু আলোচনায় এসে গিয়েছে। ওই সকল শুভ সংবাদ বা ভাবিষ্যৎ বাণী তাঁর ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়েছে, যেইগুলো কেবল তাঁর সাথে সম্পৃক্ত”।

একবার তিনি স্বীয় পীর-শায়েখ পিতাকে বললেন,”আমি আপনাকে একটি নূর হিসেবে দেখলাম, যে নূরের দ্বারা সারা জগত আলোকিত হয়েছে। ওই নূর সকল বিন্দু বা অণু-পরমাণুর মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে, যেমন সূর্যের আলো দ্বারা সব কিছু জ্যোতির্ময় হয়”।

কুতুব: হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. বললেন, “হে বৎস! তুমি এই যুগের কুতুব হয়ে গিয়েছো। আমার কথা স্মরণ কর”। তিনি কোনো কোনো মাকতুবে লিখেছেন- “যখন আমার বয়স চৌদ্দ বছরে পড়লো, তখন হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. আমাকে কুতুবিয়াতের সুসংবাদ দান করলেন। এই কুতুবিয়াতের পোশাক পরিধানের পূর্বে আলহামদুলিল্লাহ মাত্র এগারো বছর বয়সে সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে। এখন ওই ভবিষ্যদ্বাণীর নিদর্শন প্রকাশিত হল। (মাকতুবাত, প্রথম খণ্ড ৮৬)।

তিনি আরোও লিখেছেন, “একবার হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. তাঁর নিজস্ব নিয়মে ফানা ও বাকা এবং যাওয়ালে আইন ও আসার সম্পর্কে বর্ণনা দিলেন। মূল মকসুদ প্রাপ্তি এবং তার নিদর্শন সম্পর্কেও আলোচনার করলেন। একমাসের অধিক সময় ধরে মারেফাতের এই গুপ্তরহস্যের বিষয়ে আলোচনা চলছিল এবং দিনের পর দিন এলমে মারেফাতের দুর্লভ ও অসাধারণ এবং সূক্ষ্ম বিষয়গুলো উন্মোচিত হতে লাগলো।
এই অধম হজরত মুজাদ্দিদ রাহ.-এর তাওয়াজ্জুহের মাধ্যমে ওই মাকামগুলো অর্জনের জন্য অশেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. এই অধমের অবস্থার প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী ছিলেন। আমার আধ্যাত্মিক সফলতার জন্য ছিলেন অপেক্ষমান। এই মর্মে তিনি সর্বদাই তাওয়াজ্জুহের মধ্যে থাকতেন এবং সূক্ষ্ম বিষয়গুলো বর্ণনার সময় এই অধমের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন এবং অনুকম্পা প্রদর্শন করতেন। মাকামগুলোতে উপনীত হওয়ার সুসংবাদ দিতে থাকতেন।

কখনো তাঁর পবিত্র রসনা থেকে এই কবিতাটি উচ্চারিত হতো-

“পিপীলিকার বাসনা ছিল কাবাকে দর্শন
অবশেষে কবুতরের চরণ ভর করে করলো সেথায় অবতরণ
মহান আল্লাহর সীমাহীন ইহসান-
এ সকল নেয়ামত দানের জন্য।।”

(মাকতুবাতে মাসুমীয়া -২৩৮)।

হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. লিখেছেন- “একদিন ফজর নামাজের পর আমি মূরাকাবায় ছিলাম। স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, আমি যে পোশাক পরিহিত ছিলাম তা আমার থেকে আলাদা হয়ে গেল। আসলো অন্য পোশাক। আমার ধারণা হলো পৃথক হয়ে যাওয়া পোশাকটি অন্য কাউকে দিয়ে দিবো কিনা। ইচ্ছা হলো এই পোশাকটি আমার পুত্র মুহাম্মদ মাসুমকে প্রদান করি। এক মুহূর্তের মধ্যে দেখলাম, পোশাকটি আমার সন্তানকে পরিধান করানো হল।”

পৃথক হওয়া পোশাকটি ছিল কাইয়্যুমিয়াতের প্রতি ইঙ্গিত, যা তরবিয়ত (আত্মিক প্রতিপালন) এবং তকমিলের (পূর্ণতার) সাথে সংশ্লিষ্ট। এই ঘটনার মূল হেতুই ছিল আমার সন্তান মুহাম্মদ মাসুম। এই নতুন পোশাক পরিধানের ব্যবস্থাপনা যখন হবে এবং তাঁর পরিহিত পোশাক খুলে ফেলার সময় যখন আসবে, তখন মহান আল্লাহর কামেল বান্দার অনুগ্রহে আশা করি তা আমার প্রিয় সন্তান মুহাম্মদ সাঈদকে প্রদান করা হবে। এই ফকির অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এই বিষয়টি প্রার্থনা করেন এবং তা কবুল হওয়ার চিহ্নও অনুমিত হচ্ছে। আর আমার এই সন্তানকে এই মূল্যবান সম্পদের জন্য উপযুক্ত হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। ‘আল্লাহর ওলীদের জন্য কোনো কাজই দুঃসাধ্য নয়’।

বন্ধুদের জানা উচিত যে, এই সম্মানসূচক পোশাক দ্বারা উদ্দেশ্য- খোল্লাত (বন্ধুত্ব)। ওই পোশাক দানের জন্য যে অঙ্গীকার খাজা মুহাম্মদ সাঈদের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল, তা কয়েকদিনের মধ্যেই বাস্তবায়িত হল। আলহামদুলিল্লাহি ওয়াল মান্নাহ। বিষয়টি হজরত মুজাদ্দিদ রাহ.-এর সময় কালেই সাব্যস্ত হয়েছিল।

হজরত খাজা মুহাম্মদ মাসুম রাহ. স্বীয় অবস্থার বিবরণীতে নিজের কোনো কোনো মাকতুবের মধ্যে উল্লেখ করেছেন- এই যুগে যখন এক দরবেশকে (মুহাম্মদ মাসুমকে) স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পোশাক পরিধান করিয়ে ধন্য করা হল, তখন হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. তাঁকে নির্জনে ডেকে বললেন, এই সম্মেলনে আমার সম্পৃক্ততার মূল উদ্দেশ্যই ছিল, কাইয়্যুমিয়‍্যাত (স্থলাভিষিক্ত)- এর বিষয়, যা তাওয়াজ্জুহ প্রদানের পর তোমার প্রতি অর্পণ করা হয়েছে। এখন মহান আল্লাহর গুপ্ত রহস্যপূর্ণ আকর্ষণ তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে। এখন এই অস্থায়ী জগতে আমার থাকার আর কোনো প্রয়োজন নেই।

যখন হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. বললেন, আমার ইন্তেকালের সময় তো এখনই। কিন্তু আমি মধ্যবর্তী অনেক সম্পর্কই তো দেখতে পাচ্ছি। তিনি গভীর তাওয়াজ্জুহের সঙ্গে মুরাকাবায় লিপ্ত হলেন এবং কিছুক্ষণ পর বললেন, আমার প্রস্থানের পূর্ব পর্যন্ত তোমার দায়িত্ব আমার উপর এবং পৃথিবীবাসীর দায়িত্ব তোমার উপর- এই বাণী শ্রবণের পর এই অধমের অন্তর কিছুটা শান্ত হল। এই ঘোষণা দেওয়ার এক বছর তিন মাস পর হজরতের ইন্তেকালের ঘটনা ঘটে।

হজরত খাজা মুহাম্মদ মাসুম বর্ণনা করেন, কোনো ব্যক্তির যতক্ষণ পর্যন্ত উদ্দেশ্যের প্রতি অটলতা বা দৃঢ়তা না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার স্থলাভিষিক্তের নেসবত অর্জিত হবে না।

হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. এই দরবেশ (খাজা মুহাম্মদ মাসুম) -কে কাইয়্যুমিয়্যাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন এবং প্রকৃত উদ্দেশ্যের প্রতি দৃঢ়তা ও তার সমৃদ্ধি ও স্থায়িত্বেরও সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এই ভাবেও বলেছিলেন যে, তোমার মূল উদ্দেশ্যের প্রতি তোমার যে পরিমাণ দৃঢ়তা অর্জিত হয়েছে, তোমার ওই পরিমাণ মাহবুবিয়াতের (প্রেমাস্পদত্বের) মাধ্যমে করা হয়েছে। অর্থাৎ মাহবুবিয়াতে যাদি (সত্তার ভালোবাসা) যার অস্তিত্ব এই দরবেশের পূর্ণ অনুতাপ দ্বারা হয়েছে। ওয়ামা জালিকা আলাল্লাহি বি-আজিম (এবং বিষয়টি আল্লাহর নিকট বড় কিছু নয়) (মাকতুবাতে মাসুমিয়া, ১ম খণ্ড- ৮৬)।

তিনি লিখেছেন-
হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. ইন্তেকালের পূর্ব রাতে অথবা তার একদিন পূর্বের রাতে যখন আমার মখদুম ও উস্তাদ মিঞা মুহাম্মদ সাঈদ সাল্লামাহু উপস্থিত ছিলেন এবং হজরতের অসুস্থতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। তিনি বললেন, আমাকে বসিয়ে দাও। এই নগণ্য তাঁকে বাহুর উপরে ভর করে বসিয়ে দিলেন। এমনভাবে যে, তাঁর ভার আমার উপরেই ছিল। সেই ভার বা বোঝার কারণে অনুমান করেছিলাম যে, এই নগণ্যের প্রতি দায়িত্বের বোঝা কী পরিমাণ ভারী হবে। আর কী পরিমাণ গুপ্তরহস্য (যা একান্ত গোপনীয়) এই অধমের উপর অর্পিত হবে।

হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. বলেছিলেন, যখন বিদায়ের ধ্বনি আমার হৃদয়ে এইভাবে বেজে উঠলো- বাদশাহ্ (আল্লাহ্) তোমাকে আহবান করেছেন, তখন আমার সাহসের পাখি যা বস্তুহীন লা মাকানের অভিমুখী হল এবং যেখানে পৌঁছানোর কথা সেখানেই পৌঁছলাম। কিন্তু মহান দরবার থেকে আওয়াজ শুনলাম, বাদশাহ্ ঘরে নেই। পরে বুঝতে পারলাম, এটা হকিকতে কাবা তিসমানীর মাকাম। যখন আমি সম্মুখবর্তী হলাম এবং ঊর্ধ্বগমন করলাম, তখন আমি সিফাতে হাকিকী মাকামে (যা অতিরিক্ত অস্তিত্বের সাথে বিদ্যমান) পৌঁছলাম। এই সিফাতের মাকাম ওই সিফাতের এলমি সুরত থেকে সামনে, যা তাআইয়্যুনে অজুদীর (নির্ধারিত অস্তিত্বের) মধ্যে তাআইয়্যুনে হুব্বী (নির্ধারিত প্রেম)।

কেননা এই আহবান এবং ভ্রমণ তাআইয়্যুনে হুব্বী থেকে সামনে। এরপর আমি এই মাকামও অতিক্রম করলাম এবং এই সিফাতের মূলের মধ্যে (যা জাতপাকের শান এবং যা জাত আল্লাহ তায়ালার মধ্যে এতবার (বিশ্বাসের মর্যাদা রাখে) প্রবেশ করলাম। এবং তোমরা দুই ভাই (মুহাম্মদ সাইদ এবং মুহাম্মদ মাসুম) সকল মাকামে আমার সঙ্গী ছিলে। তারপর এই মাকাম থেকেও ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া হল যাতে বাহাতের মধ্যে, যা সম্পর্ক এবং ধারণা থেকে আলাদা।

হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. হজরত মুহাম্মদ সাঈদ রাহ-.কে নামাজের ইমামতির সময় উচ্চতর স্তরে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে সুসংবাদ দান করেছিলেন (হজরতের অসুস্থতার সময় তিনিই ইমামতির দায়িত্ব পালন করতেন)। আর এই দরবেশকে ভিন্ন পন্থায় ওই স্তরে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে সুসংবাদ দান করেছিলেন এবং ওই মজলিসে অথবা তাঁর অন্তিম অসুস্থতার সময় অন্য কোনো মজলিসে বলেছিলেন, এই কামালতের স্তর প্রাপ্তি এবং এই উচ্চ মর্যাদায় উপনীত হওয়া কালামে মজিদের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আমি নিজেও পবিত্র কুরআনের জিম্মাদারীর মাধ্যমে এই মাকামের সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়েছি যে, কুরআন মজিদের এক একটি হরফকে এক একটি সমুদ্রতুল্য পেয়েছি, যা মূল উদ্দেশ্যের কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত পৌছে দেয়।

এই প্রসঙ্গে তিনি একটি কবিতা উচ্চারণ করেছেন, যা শুনে ওই কবিতার কবির সঙ্গে শায়েখ আবু সাঈদ আবুল খায়ের রাহ. দূর দূরান্তের পথ অতিক্রম করে সাক্ষাৎ লাভের জন্য গমন করেছিলেন।

“নিজের গানের মাঝে আমাকে রাখবো গোপন
গাইবো যখন তুমি পাবে তার সুঘ্রাণ।”

তিনি এই কবিতা পড়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। বললেন, আমার হাল অনুযায়ী কবিতাটি এরূপ হওয়া উচিত- তারই ভাষায় আমি নিজেকে রাখবো গোপন গাহিবে যখন সে আমি পাবো সুঘ্রাণ।

আশেকের কথা মাশুকের কান পর্যন্ত কেমন করে পৌছতে পারে? তার ভাষাই তার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হতে পারে এবং তারই ভাষার মাধ্যমে তার কাছে পৌছানো যায়, নিজের ভাষার মাধ্যমে নয়। কেননা আশেকের ভাষা থাকে অব্যক্ত ও অসম্পূর্ণ।

এই ফকির বলেন, ‘মান আরাফাল্লাহা কাল্লা লিসানুহু’ (যে আল্লাহকে চিনেছে তার বাকশক্তি রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে) তার জন্য সাক্ষীস্বরূপ। (মাকতুবাতে মাসুমিয়া -১৮৩)।

হজরত খাজা মুহাম্মদ মাসুম আরো লিখেছেন- হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. অন্তিম অসুস্থতার সময় বলতেন, ইসরারে সালাত (নামাজের গুপ্তরহস্য), হাকিকাতুস সালাত (নামাজের বাস্তব স্বরূপ), বায়ানে সলাতুল আম্বিয়া আলাইহিস্ সালাম (আম্বিয়া কেরামের নামাজের স্বরূপ) এবং আকমালুল আউলিয়া (আউলিয়াগণের পূর্ণতা) এবং আম্বিয়া আ. গণের ওই সকল বিশেষত্ব অন্যদেরও অর্জিত হয়। আম্বিয়া আ.গণের চার অগ্রপথিক, যারা রাসুলের পূর্ণ অনুসারী এবং ওই সকল ওলিদের শ্রেণীবিন্যাস এবং তাঁদের মর্যাদার পার্থক্য কেবল নৈকট্যলাভের স্তরের কারণেই ছিল।

এই সকল ওলি হজরতগণের মধ্যে প্রথম শ্রেণী কোনটি? আম্বিয়া আ.গণ, যাদের কথা পাক কালামে এসেছে, সম্মিলিতভাবে তাঁরা কোন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী? সর্বশেষ রাসুল সা. যিনি দ্বীন ও দুনিয়ার সর্দার তাঁর বিশেষ মর্যাদা কী এবং তিনি ও অন্যান্য আম্বিয়া আলাইহিস্ সালামের সকল মাকামের মধ্যে কী পরিমাণ মাহাত্ম্য রয়েছে? এই সকল মর্যাদা ও মাকামের বিস্তৃতি থেকে বোঝা যায় যে, শুধু রাসুলে আনওয়ার সা- এর মধ্যস্থতা বা সঙ্গলাভ ও আনুগত্যের কারণেই এই সকল ওলি এই মাকাম পর্যন্ত পৌছতে পেরেছিলেন। তিনি নিজের মাকামের নির্ধারিত অবস্থার কথা ও তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও বলতেন।

তিনি আমার মখদুম উস্তাদের (মুহাম্মদ সাঈদ) নেয়ামতপ্রাপ্তি সম্পর্কে এবং আমার মতো কদাকারের জন্য যে সকল শুভবার্তা শুনিয়েছিলেন, সেইগুলোর সাথে সম্পর্কিত এমন হালের কথাও বর্ণনা করতেন, যা জ্ঞান ও বিবেক অনুধাবনে অক্ষম।

উপরোল্লেখিত সূক্ষ্ম বিষয়সমূহ বিশদ বিবরণের সাথেই সংশ্লিষ্ট, অথচ তা একান্তই গোপনীয়। এই জন্য এই বিষয়ে খুব সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল। (মাকতুবাতে মাসুমিয়া, প্রথম খণ্ড -১৮০)।

হজরত মুজাদ্দিদ রা. বলেছেন, সাবেকিন (অগ্রগামী) দল যাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআন পাকে বলা হয়েছে ‘সুল্লাতুম মিনাল আউয়ালিনা ওয়া কুলীলুম মিনাল আখিরিন’ (পূর্ববর্তীগণের মধ্য হতে বহুসংখ্যক এবং পরবর্তীগণের মধ্য হতে অল্পসংখ্যক। ( সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত -১৩)

আমার দৃষ্টিগোচর হল দেখলাম, আমিও ওই দলের অন্তর্ভুক্ত। আমার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্য আর এক ব্যক্তিকে (খাজা মুহাম্মদ মাসুমকে) সেখানে আমার সাথে পেয়েছি। মুতাশাবিহাতের গুপ্তরহস্য সম্পর্কে বলেছেন- মুতাশাবিহাত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুআমালাত (আচরণিক বিষয়) এবং এটা জায়েজ (বৈধ) যে, এক ব্যক্তির এক মোরতবা অর্জিত হল, অথচ সেই বিষয়ে তার কোনো জ্ঞান নেই। আমি আমার সাথে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির (মুহাম্মদ মাসুম রাহ.) মধ্যে এই বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছি। তাহলে অন্যদের অবস্থা আর কী হবে? সৌভাগ্য হল বহু পর্দার অন্তরালে পর্যবেক্ষণ করে দেখো, কে তার সন্ধান পেলো।

খাজা মুহাম্মদ মাসুম রাহ. লিখেছেন- হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. বলেছেন, দ্বীন দুনিয়ার সর্দার সা. আপাদমস্তক সৃষ্টির বরকত (খামিরের মধ্যে) থেকে যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা থেকে তাঁর উম্মতের এক ব্যক্তিকে এক মহাসম্পদ দান করা হয়েছে এবং তার খামির ওই অতিরিক্ত মাটি থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে। এই দিক দিয়ে ওই ব্যক্তিকে এসালাতের (মূল উদ্দেশ্যের প্রতি দৃঢ়তার) নেসবতের দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত করা হয়েছে। এর অবশিষ্ট অংশ থেকে এই ব্যক্তির মাটির খামিরের পর খুবই সামান্য কিছু মাটি বেঁচে গিয়েছিল। তাই দিয়ে এই ব্যক্তির সম্পর্কযুক্ত খামির করা হল এবং ওই পরিমাণ তিনিও এসালাতের অংশ পেলেন।

‘ইন্না রব্বাকা ওয়াসিয়াল মাগফিরাত’ (নিঃসন্দেহে তোমার প্রভু প্রশস্ত ক্ষমাকারী)।

হজরত মাহদি মাওউদ আলাইহির রিজওয়ানের এসালাত (রাসুল সা.-এর মাধ্যমে) নসিব হয়েছে হজরত ঈসা আ.-এর মধ্যস্থতায়। (মাকতুবাতে মাসুমিয়া -১৯২)।

হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. হজরত খাজা মুহাম্মদ সাঈদ এবং হজরত খাজা মুহাম্মদ মাসুমকে রাহ.বলেছেন, আমি তোমাদের দুই’জনকে ক্রোধবৃত্তের (দায়রায়ে জালালের) বাইরে বের করে দিয়েছি, এখন তোমরা ঊর্ধ্বগমনের আকাঙ্ক্ষী হও। (মাকতুবাতে মাসুমিয়া, প্রথম খণ্ড- ৪৫)।

ওই দুই সাহেবজাদা সম্পর্কে আরো বলেছেন, আমি মুজিবুদ্ দাওয়াতের (দোয়া কবুলকারীর) দরবারে এই ফরিয়াদটি করেছি যে, যেনো তোমাদের দুইজনের বাদশাহ-র পক্ষ থেকে সান্নিধ্য ও অনুকম্পার প্রতিবন্ধক সৃষ্টি না হয় এবং তোমাদের দুইজনকে মসিবতের মধ্যে ফেলে দেওয়া না হয়। এই দোয়া কবুল করা হয়েছে। বাস্তবে সেরূপই ঘটেছিল।

১০৪১ হিজরির শাবান মাসের তিন তারিখ আসর নামাজের মধ্যে এক বসতে আজীম (বিশাল অবিমিশ্র হাল) প্রকাশিত হল। উচ্চ মনজিল এবং বিস্ময়কর এমন হালের আবির্ভাব হল যে, ইতিপূর্বে কখনো প্রকাশিত হয়নি। এমন কি তা ধারণা ও চিন্তাজগতেরও বহির্ভূত ছিল। এমন বিষয়ের অবতারণা হল যে, বলা যেতে পারে কোনো চক্ষু তা দেখেনি এবং কোনো কান তা শ্রবণ করেনি এবং যা ভাষা ব্যক্ত করতে পারে না। কলম দ্বারা লিপিবদ্ধ করা যায় না।

“হাফেজের এহেন ফরিয়াদ নয় অহেতুক
ঘটনা অসাধারণ বিস্ময়কর ও বেদনা কাতর।”

সম্ভবত এই মাকাম রাকেমুল হরূফ (পত্র-নবিশ)- এর সাথে বিশেষায়িত ছিল। কেননা ওই দরবারে তিনি নিজেকে সঙ্গীহীন পেয়েছেন। আলম (জগত)-কে হক সুবহানাহুর প্রতিবিম্ব বা ছায়া মনে করা এবং এর দর্পণ মনে করা, তাঁকে কল্পনায় দেখা, প্রতিবিম্বের আকর্ষণকারী কামালতকে মূলের উপর ন্যস্ত করা এবং প্রতিবিম্বকে শুন্য ও আমিত্বহীন মনে করা, তারপর তাঁকে মূল কামালতের সাথে প্রতিষ্ঠিত পাওয়া-সবকিছুকে বেলায়েতের নৈকট্যের অন্তর্ভক্ত বলে মনে করি যার ছায়া বা প্রতিবিম্বকে মূলের সঙ্গে মিলিত করে। সালেক এরপর মূলকে প্রতিবিম্বের রঙে রঞ্জিত করে পথিমধ্যে ছেড়ে দেয় এবং তা পবিত্র মহান দরবারের নিকটে পৌছে যায়। তখন এই সকল বিষয়ে বা কাজে তার কোনো মধ্যস্ততা থাকে না।

হজরত খাজা মুহাম্মদ হাশিম কিশমী রাহ. ব্যক্ত করেছেন যে, আমি ব্যক্তিগত ভাবে হজরত মুজাদ্দিদ-ই- আলফেসানী রাহ.-কে বলতে শুনেছি, “হজরত মাসুম দৈনিক আমার নিসবাহকে শুষে নেন, ঠিক যে ভাবে শরহুল উইকায়ার লেখক তার পিতামহের কাছ থেকে আল- উইকায়া মুখস্থ করেছিলেন।” (জুবদাতুল মাকামাত)

হজরত মুজাদ্দিদ রাহ. খাজা মুহাম্মদ মাসুম- এর অতি বাল্যকাল থেকেই তাঁর উচ্চমর্তবা ও যোগ্যতার প্রশংসা করতেন। বলতেন, এই সন্তান বেলায়েতে মুহাম্মদীর যোগ্যতাধারী এবং মুহাম্মাদী আল মাশরাব- এর অন্তর্ভুক্ত।
তিনি আরো বলতেন, মুহাম্মদ মাসুম মাত্র তিন বছর বয়সে কালেমা তওহিদ সম্পর্কে যে সকল কথা বলতো, সেই গুলো নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।

খিলাফত প্রাপ্তি: ১৬ বছর বয়সে তিনি জাহিরী এলম হাসিলের পর্ব সমাপ্ত করে শ্রদ্ধেয় পিতার তত্ত্বাবধানে এলমে মারিফাত সাধনায় আত্মনিয়োজিত হন। আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্ৰহে এবং মহান পিতার খাস তাওয়াজ্জুহ -এর কল্যাণে তিনি স্বল্পকালের মধ্যেই কুতুবিয়াত -এর অতি উচ্চ মাকামে পৌঁছে যান। অবশেষে পীর-শায়েখে তরিকত পিতা মুজাদ্দিদ-ই- আলফেসানী রাহ.- নিকট থেকে কামালিয়াত – এর সনদ ও খিলাফতে ভূষিত হন।

দিল্লি সফরে: হজরত মুজাদ্দিদ রাহ.-এর একবারের দিল্লি সফরের সময় খাজা মাসুম- কে সাথী করলেন। একদিন এক সময় তিনি মুরাকাবা সমাপ্ত করে বিশ্রামের হেতু স্বীয় নির্দিষ্ট ঘরে প্রবেশ করলেন।দৃশ্যমান হলো যে, খাজা মুহাম্মদ মাসুম তাঁর বিছানায় শায়িত। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রামাগার থেকে বেরিয়ে এলেন। খাদেম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হজরত! ফিরে এলেন কেনো? যদি বলেন, তাহলে সাহেবজাদাকে জাগিয়ে দেই। তিনি বললেন,” আমি মহান আল্লাহ-র সম্মানের আতঙ্কে ফিরে এলাম। চিন্তিত হলাম যে,আল্লাহর এক দোস্ত বিশ্রাম করছেন। তার বিশ্রামের বিঘ্ন যেনো না হয়”।

হজরত মুজাদ্দিদ সাহেব সূর্যের প্রচন্ড দাবদাহে বসে পড়লেন।মসজিদের পাথরগুলো সূর্যের কিরণে সীমাহীন উত্তপ্ত হয়ে গেল। এহেন সময় খাজা মুহাম্মদ মাসুম সাহেব নিদ্রা হতে জাগ্ৰত হলেন। স্বীয় শায়খ পিতাকে সূর্যের প্রচন্ড তাপে বসে থাকতে দেখে বিচলিত হয়ে গেলেন।পিতার বিশ্রামের জন্য শয্যা উন্মুক্ত করে দিলেন।

কারামত-

(১) দ্বীনের শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী এবং গুপ্ত রহস্যের তথ্য প্রদানকারী খাজা মুহাম্মদ সিদ্দিক যিনি তাঁর সুযোগ্য খলিফা ছিলেন, পেশোয়ারে তরিকা প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন- আমি তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে পেশোয়ার থেকে খচ্চরে চড়ে রওনা হলাম। হঠাৎ খচ্চরটি রাস্তা থেকে ভিন্ন দিকে পালাতে লাগলো। লাগাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু আমার পদযুগল ছিল রেকাবের মধ্যে। আমি টেনে হিঁচড়ে চলতে লাগলাম। কিছু লোক তাকে ধরার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। হঠাৎ আমার অন্তরে আমার পীর হজরত মুহাম্মদ মাসুম রাহ.- এর কথা স্মরণ হল। দেখলাম, আমার পীর নিজে এসে খচ্চরের গতি রোধ করলেন। থামিয়ে দিলেন। রেকাব থেকে আমার পদযুগল পৃথক হয়ে গেল। আমি ইচ্ছা করলাম, তাঁর কদমে লুটিয়ে পড়ি। কিন্তু তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

(২) মুহাম্মদ সিদ্দিক রাহ. বর্ণনা করেন, একবার আমি হজরত মুহাম্মদ মাসুম রাহ.- এর দরবার থেকে বিদায় নিয়ে নিজ দেশে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে সুলতানপুর নামক স্থানের একটি পুলের নিচে (নদীপথে) আমার কাপড় পাক করছিলাম। হঠাৎ আমার পা পিছলে গেল। নদীতে পড়ে গেলাম। সাঁতার জানতাম না। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে আমি নিমজ্জিত হতে লাগলাম। এমন সময় দেখলাম, হজরত উপস্থিত হয়ে আমার হাত ধরে পানি থেকে ওঠালেন। অতঃপর অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

(৩) তিনি এরকমও বর্ণনা করেছেন যে, হালের আধিক্যের কারণে একবার আমি একদিনের দূরত্বে এক জঙ্গলের দিকে চলে গেলাম। জঙ্গলটি ছিল লোকালয় থেকে অনেক দূরে। আমার খুবই তৃষ্ণা পেল। জীবন নাশের উপক্রম হল। এমন সময় দেখলাম, হজরত মাসুম রাহ. দূর থেকে আসছেন। আমি অতি উৎফুল্য হয়ে তাঁর দিকে দৌড়ে গেলাম। কাছাকাছি পৌঁছে তাঁকে আর দেখতে পেলাম না। কিন্তু সেখানে একটি পানির হাউজ দেখতে পেলাম। আমি পানি পান করে পরিতৃপ্ত হলাম।

(৪) ওই একই ব্যক্তি বর্ণনা করেন, একবার আমার উপর ‘সুলতানুল আজকার’ জিকিরের হাল প্রবল হয়ে গেল। সারাদিনই আমি জঙ্গলে অবস্থান করলাম। সেখানে জনমানবের বিচরণ ছিল না। যেই দিকেই তাকালাম, সেই দিকেই দেখলাম হজরত হাজার হাজার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এই রকমই চললো। অতঃপর তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

(৫) জনৈক ব্যক্তি বর্ণনা করেন- হজরত একান্ত নির্জন পরিবেশে আমাকে নফি এসবাত জিকিরের শিক্ষা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কলেমা তাইয়্যেবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ নিজের অন্তরের মাধ্যমে পড়ো। তার পদ্ধতিও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, শব্দের অন্তর্নিহিত সত্তার প্রতি খেয়াল করো এইভাবে যে, জাত পাক ব্যতীত আমার কোনো উদ্দেশ্য নেই। আমার মনে খেয়াল হল, কালেমার অর্থ তো এটাই যে, ‘উদ্দেশ্য নেই জাত পাক ব্যতীত’। ‘কোন্’ শব্দটি অতিরিক্ত। এই কথাটি কয়েকবার আমার অন্তরে উদিত হল। কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না। তাঁর প্রতি আমার অন্তরের হাল প্রকাশিত হল। তিনি বললেন, তুমি কী জানো না যে, অনির্দিষ্ট কালের না-সূচক ক্রিয়া সামনে থাকলে তা সাধারণ অর্থ প্রকাশ করে। হজরতের কথা শুনে আমার অন্তরের ওই সন্দেহটি দূর হয়ে গেল। তাঁর প্রতি আমার আস্থা আরো বহুগুণ বেড়ে গেল।

(৬) হাজি নুরুদ্দিন ছিলেন কঠোর রেয়াজতকারী ও বিশুদ্ধ সাধক। তিনি বর্ণনা করেন, আমি জিয়ারতে বায়তুল্লাহ্ ও রওজা মোবারক জিয়ারতের সফরে ছিলাম। ছিলাম জাহাজে আরোহণকারী। হঠাৎ ভয়ানক তুফান শুরু হল। জাহাজ নিমজ্জিত হওয়ার উপক্রম হল। ভীতসন্ত্রস্ত যাত্রীরা বিপদের শঙ্কায় অস্থির হয়ে গেল। জাহাজ হালকা করার জন্য লোকজন তাদের আসবাবপত্র সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে লাগলো। এমন সময় হজরতের কথা মনে হল। দুই সাহেবজাদা খাজা মুহাম্মদ সাঈদ এবং খাজা মুহাম্মদ মাসুম রাহ. দুইজনেই উপস্থিত হলেন। বললেন, মহব্বতের বন্ধন সুদৃঢ় কর। আমরা তোমাদের সাহায্যের জন্য পৌঁছেছি। ইনশাল্লাহ এই জাহাজ ডুববে না, আমার অন্তরে যখন এই সুসংবাদটি পৌঁছলো, তখন আমি জাহাজের যাত্রীদেরকে বললাম, আপনারা মালপত্র সমুদ্রে নিক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকুন। ইনশাল্লাহ্! এই জাহাজ ডুববে না। আমার পীর-মোর্শেদ এই সুসংবাদ দিয়েছেন। কিছু লোকের ধারণা ছিল তুফান থেকে বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমার কথা তারা বিশ্বাস করলো না। একটু পরেই তুফান বন্ধ হয়ে গেল। আবহাওয়া হয়ে গেলো একদম স্বাভাবিক। লোকেরা আমার হজরতের প্রতি অধিক বিশ্বাসী ও আস্থাবান হল। আস্থাশীল হল এই নগণ্যের প্রতিও। আমরা নিরাপদে গন্তব্যস্থানে পৌছে গেলাম।

(৭) লেখক বদরুদ্দিন সিরহিন্দী রাহ. একবার স্বপ্নের মধ্যে দেখলেন, খাজা মুহাম্মদ মাসুম এক আলোময় বাদশাহের আসনে উপবিষ্ট। তাঁর পবিত্র মস্তকের উপরে বিশাল এক চত্বর ছায়া দান করছে। সুখ্যাতিফলক ধরে রয়েছে এক খাদেম। ওই স্তরের বিশালতা সম্পর্কে কী আর বলবো। যেনো তা আসমান সদৃশ এবং সকল জগতকে পরিবেষ্টন করে আছে। ওই চত্বর মণি-মুক্তাখচিত এবং তার চতুর্দিকেও অসংখ্য মণি-মুক্তা ঝুলছে। ওই চত্বরের সৌন্দর্য বর্ণনার অযোগ্য। তাঁর বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনাবলী কী আর বর্ণনা করবো! তিনি তো অভিজাত বংশদ্ভূত। তাঁর কারামত লেখার জন্য পৃথক গ্রন্থের প্রয়োজন। তাঁর মুরিদগণ, পথপ্রাপ্তগণ এবং খলিফাবৃন্দের বর্ণনা থেকে অনেক আশ্চর্যজনক ও দুর্লভ ঘটনাবলী জানা যায়। অধিকাংশ বিস্ময়কর ঘটনাবলী তাঁর কারামতের প্রমাণ বহনকারী। (হাজরাতুল কুদুস-২ খন্ড, পৃষ্ঠা-২৫৪)

কাইউম উপাধি: আল্লাহতায়ালা হজরত আলফেসানী রাহ.-কে কাইউম উপাধি প্রদান করেছিলেন ১০১০ হিজরিতে। এই সম্পর্কে তিনি নিজেই বর্ণনা করেন যে, একদিন জোহরের নামাজের পর আমি মুরাকাবায় বসে আছি এবং একজন হাফেজ কুরআন পাঠ করছিলেন। এহেন সময় আমি আমার পরিধানে একটি নূরানী পোশাক দেখতে পেলাম। মনে হল সেটি কাইউমিয়াতের পোশাক। কাইউম হচ্ছে-সারা সৃষ্টির উপর কর্তৃত্ব, যা হজরত আখেরী নবী সা.-এর ওয়ারিশ হিসাবে তাঁর তাবেদারীর জন্য আমাকে সেই পোশাক অর্পণ করা হয়েছে।
পরক্ষণে হজরত রাসূল সা. তশরিফ নিলেন এবং নিজ পবিত্র হস্তে আমার মাথায় একটি মুকুট পরিয়ে দিয়ে কাইউমিয়াত পদবী লাভের জন্য মুবারকবাদ জানালেন।

চার কাইউম:

  • (১) হজরত আলফেসানী রাহ. -সময়-১০১০-১০৩৪ হিজরি।
  • (২) হজরাত মাসুম ফারুকি রাহ. – সময়-১০৩৪-১০৭৯ হিজরি।
  • (৩) হজরত খাজা মুহাম্মদ ফারুকি রাহ.-সময়-১০৭৯-১১১৪ হিজরি।
  • (৪) হজরত মুহাম্মদ জুবায়ের ফারুকি রাহ.-সময়-১১১৪-১১৫২ হিজরি।

গদ্দিনিশীন: ১০৩৩ হিজরিতে তিনি গদ্দিনিশীন হন। সেই দিনে পঞ্চাশ হাজার ভক্ত তাঁর সমীপে বাইয়াত হন।

পীর: শায়েখ পিতার ওফাত–১০৩৪ হিজরির ২৮ সফর, ১০ ডিসেম্বর ১৬২৪ সালে এশরাকের সালাত আদায়ের পর পিতা মুজাদ্দিদ- ই- আলফেসানী রাহ.- এর ওফাত হয়।

সন্তানসন্ততি: তাঁর ছয় পুত্র ও পাঁচ কন্যা ছিলেন। প্রত্যেকেই কামেল ও মুকাম্মিল ছিলেন।

পুত্র- (১) শায়খ মুহাম্মদ সিবগাতুল্লাহ, (২) শায়খ খাজা মুহাম্মদ, (৩) শায়খ মুহাম্মদ উবায়দুল্লাহ, (৪) শায়খ মুহাম্মদ আশরাফ, (৫) শায়খ মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন, (৬) শায়খ মুহাম্মদ সিদ্দিক রাহ.।

কন্যা– (১) উম্মাতুল্লাহ, (২) আয়েশা, (৩) আরিফা, (৪) আকিলা (৫) সাফিয়া রাহ.।

(১) শায়খ মুহাম্মদ সিবগাতুল্লাহ রাহ. (১০৩২-১১২১ হি.)- ১০৩২ হিজরিতে সিরহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন চারপুত্র ও সাত কন্যার পিতা। পুত্র-(১) শায়খ আবুল কাসেম, (২) শায়খ ইসমাইল, (৩) শায়খ আহলুল্লাহ, (৪) শায়খ মুহাম্মদ পীর রাহ.। কন্যা-(১) সায়েমা, (২) রাজিয়া, (৩) আলিয়া, (৪) মারিয়া, (৫) রাফিয়া, (৬) রাকিয়া, (৭) রওশন আরা রাহ.। ১১২১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। সিরহিন্দে মাজার অবস্থিত।

(২) শায়খ খাজা মুহাম্মদ রাহ. (১০৩৪-১১১৪ হি.)–১০৩৪ হিজরিতে সিরহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃত নাম-খাজা মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন নকশবন্দ বুখারী। উপাধি-হুজ্জাতুল্লাহ। তিনি কুতুবুল আকতাব ও তৃতীয় কাইউম-এর পদবী ও দায়িত্ব লাভে ধন্য হন। ১১১৪ হিজরির ২৯ মহররম ফজরের আজানের পর ইন্তেকাল করেন।

ছয়পুত্র– (১) শায়খ মুহাম্মদ আবুল আলী (১০৬৪-১১০৪ হি.) (২) শায়খ মুহাম্মদ উমর (ওফাত-১০১৭ হি.) (৩) শায়খ মুহাম্মদ কাজেম (ওফাত-১১২৫ হি.), (৪) শায়খ মুহাম্মদ আবদুর রহমান (ওফাত-৫ বছর বয়স), (৫) শায়খ মুহাম্মদ আবদুর রহিম (ওফাত-৭ বছর বয়সে) (৬) শায়খ মুহাম্মদ মীর আবদুল্লাহ (শৈশবে ওফাত) রাহ.। কন্যা-তিন।

(৩) শায়খ মুহাম্মদ উবায়দুল্লাহ রাহ. (১০৩৮-১০৮৩ হি.)–১০৩৮ হিজরিতে সিরহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতার কায়েমে মাকাম খলিফা ও কুতুবে আফতাব।
তিনপুত্র-শায়খ মুহাম্মদ হাদি, শায়খ মুহাম্মদ পারসা, শায়খ মুহাম্মদ সালেম. রাহ। ১০৮৩ হিজরিতে সিরহিন্দে ইন্তেকাল করেন। সিরহিন্দে মাজার আছে।

(৪) শায়খ মুহাম্মদ আশরাফ রাহ. (১০৪৩-১১১৮ হি.)–১০৪৩ হিজরিতে সিরহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুত্র-শায়খ জাফর, শায়খ রুহুল্লাহ, শায়খ হায়াত, শায়খ শাফিউল হাল রাহ.। ১১১৮ হিজরিতে ওফাত হয়। সিরহিন্দে সমাহিত হন।

(৫) শায়খ মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন রাহ. (১০৪৯-১০৯৬ হি.)- ১০৪৯ হিজরিতে সিরহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতার পক্ষ থেকে বাদশাহ আলমগীর রাহ.- কে তালিম দেওয়ার দায়িত্ব ন্যাস্ত করেন। তাঁর প্রত্যেক পুত্র উচ্চ কামালত হাসিল করেছিলেন। প্রথম পুত্র পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। ১০৯৬ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। সিরহিন্দে রামপুর খানকাহ-এর পেছনে সমাহিত আছেন।

পুত্র– (১) শায়খ মুহাম্মদ আজম (ওফাত-১১১৪ হি.), (২) শায়খ মুহাম্মদ হোসাইন (ওফাত-১১১৬ হি.), (৩) শায়খ মুহা. শোয়ায়েব (ওফাত-১১২১ হি.), (৪) শায়খ মুহাম্মদ ঈসা, (৫) শায়খ মুহাম্মদ মুসা, (৬) শায়খ মুহাম্মদ কলিমুল্লাহ (৭) শায়খ মুহাম্মদ উসমান, (৮) শায়খ মুহাম্মদ আবদুর রহমান রাহ.।

(৬) শায়খ মুহাম্মদ সিদ্দিক রাহ. (১০৫৯-১১৩১ হি.)–১০৫৯ হিজরিতে সিরহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। দুই পুত্র-শায়খ মাহদি, শায়খ আবদুল বাকি রাহ. দুইকন্যা-মেহেরুন্নেসা, আজিমুন্নেসা রাহ.। ১১৩১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। সিরহিন্দে মাজার অবস্থিত।

শিয্য-খলিফা- হজরত খাজা মুহাম্মদ মাসুম রাহ.- প্রায় নয় লক্ষ:শিয্য তথা মুরিদ এবং সাত হাজার খলিফা তথা প্রতিনিধি ছিলেন।খলিফাদের সকলেই উচ্চ দরজার কামিল- মুকাম্মিল ছিলেন।বিশেষ কয়েকজনের নাম লিপিবদ্ধ করা হল।

  • ১) খাজা মুহাম্মদ সিবগাতুল্লাহ রাহ. ( বড়ো সাহেবজাদা)
  • ২) খাজা মুহাম্মদ নকশাবন্দ হুজাতুল্লাহ রাহ. (মেজো সাহেবজাদা)
  • ৩) খাজা মুহাম্মদ উবায়দুল্লাহ রাহ. (তৃতীয় সাহেবজাদা)
  • ৪) খাজা মুহাম্মদ আশরাফ রাহ. ( চতুর্থ সাহেবজাদা)
  • ৫) খাজা মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন রাহ. (পঞ্চম সাহেবজাদা)
  • ৬) খাজা মুহাম্মদ সিদ্দিক রাহ. (ষষ্ঠ সাহেবজাদা)
  • ৭) খাজা আবুল কাসেম সিরহিন্দী রাহ.
  • ৮) খাজা আবদুল আহাদ ওয়াহদাত রাহ.
  • ৯) খাজা মুহাম্মদ সিদ্দিক পেশওয়ারী রাহ.
  • ১০) খাজা আবদুল গফুর সমরকন্দী রাহ.
  • ১১) হাফেজ মুহাম্মদ মহসিন দেহলভী রাহ.
  • ১২) মির্জা আমানুল্লাহ বুরহানপুরী রাহ.
  • ১৩) আবুল মুজাফফর বুরহানপুরী রাহ.
  • ১৪) মুহাম্মদ আলিম জালালাবাদী রাহ.
  • ১৫) মুফতি মুহাম্মদ জাকির লাহোরী রাহ.
  • ১৬) মির্জা উবাইদুল্লাহ বেগ রাহ.
  • ১৭) মাওলানা হাসান আলী পেশওয়ারী রাহ.
  • ১৮) মাওলানা মুসা ভাট্রিকোঠী রাহ.
  • ১৯) মাওলানা বদরুদ্দিন সুলতানপুরী রাহ.
  • ২০) হাফেজ আবদুল করিম তুহানী রাহ.
  • ২১) শায়খ বায়োজিদ সাহারানপুরী রাহ.
  • ২২) হাজি হাবিবুল্লাহ বুখারী রাহ.
  • ২৩) শায়খ মুহাম্মদ সুরাদ কিশ্মিরী শামী রাহ.
  • ২৪) মগদুম আদম ঠাট্রাভি সিন্ধী রাহ.
  • ২৫) সৈয়দ ইউসুফ গাফেজী সুলতানী রাহ.
  • ২৬) মীর সরফুদ্দিন হুসাইন লাহোরী রাহ.
  • ২৭) শায়খ আনোয়ার নূরসারাই রাহ.
  • ২৮) শায়খ হোসেন মনসুর জলন্ধরী রাহ.
  • ২৯) আখুন্দ সিজাওয়াল সিরহিন্দী রাহ.
  • ৩০) মীর রিফাত বেগ গুরজদার রাহ.
  • ৩১) শায়খ পীর দেহলভী রাহ.
  • ৩২) শাহ হোসেন উশাক আওরঙ্গবাদী রাহ.
  • ৩৩) খাজা আব্বাস আস- সামাদ কাবুলী রাহ.
  • ৩৪) শায়খ আবদুল করিম কাবুলী রাহ.
  • ৩৫) শায়খ কাসিম কাবুলী রাহ.
  • ৩৬) মুহাম্মদ আমিন হাফিজাবাদী রাহ.
  • ৩৭) আতাউল্লাহ সুরাটী রাহ.
  • ৩৮) নূর মুহাম্মদ সুরাটী রাহ.
  • ৩৯) হাফেজ মহসিন শিয়ালকোটী রাহ.
  • ৪০) মুহাম্মদ শরিফ লাহোরী রাহ.
  • ৪১) মুহাম্মদ ফারুক লাহোরী রাহ.
  • ৪২) মুহাম্মদ আরিফ লাহোরী লাহ.
  • ৪৩) মুহাম্মদ আমিন বুখারী রাহ.
  • ৪৪) ড়াজি সেলিম বলখী রাহ.
  • ৪৫) হাজি মুহাম্মদ আশুর বুখারী রাহ.
  • ৪৬) হাফেজ মুহাম্মদ সাদিক কাবুলী রাহ.
  • ৪৭) শায়খ নাজার রাহ.
  • ৪৮) বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলমগীর রাহ. প্রমুখ।

ওফাত: ১০৭১ হিজরির ৯ রবিউল আউয়াল, ১৬ আগস্ট ১৬২৮ সালে আস-সালামু আলাইকুম বলার সময় তিনি ইন্তেকাল করেন।

মাজার: পাঞ্জাবের সিরহিন্দের পুরানওয়ারে পিতার মাজারের উত্তরদিকে খাজা মুহাম্মদ জুবায়ের রাহ.- এর মাজারের পরে, মাসুমী মসজিদের পাশে বিশাল গম্বুজকৃত স্থানে শায়িত আছেন।(সীরাতুল মাশায়েখ- ২ খন্ড)

- মূহাম্মদ নাসেরউদ্দিন আব্বাসী
আরো পড়ুনঃ