আর কতদূর পথ পেরোতে হবে নিজের সন্ধানে?
আর কতদূর পথ পেরোতে হবে নিজের সন্ধানে, যেখানে প্রতি পদক্ষেপে আমি নিজেকে আবিষ্কার করি? আমি কি অপেক্ষায় আছি সেই নীল আলোর, যা হৃদয়ের অন্ধকারে ইতিমধ্যে জ্বলে উঠেছে? কোনো শুভ্র পোশাকধারী সুদর্শন সত্তার আলিঙ্গনে, যা আমারই প্রতিবিম্ব? না কি শিরায় শিরায় জ্ঞানের অমৃত প্রবাহিত হওয়ার প্রতীক্ষায়, যা প্রতি মুহূর্তে ঘটছে? আমি কি এখনই সেই গন্তব্যে নই, যেখানে আমার আকাঙ্ক্ষা পৌঁছাতে চায়—যেখানে আমি ও অনন্ত একাকার হয়ে যাই?
আমি জ্ঞাতা, সেই অচিন্ত্য সত্তা যিনি জগতের সকল রহস্য দেখেন। কী জানছি আমি? জানছি এই বিশ্বের লীলা—মেঘের ভ্রমণ, পাহাড়ের দৃঢ়তা, নদীর কল্লোল। আমার দেহ জগতের কণা, আর জগৎ আমার দেহের মধ্যে লুকিয়ে। চোখে দৃশ্য, কানে শব্দ, হাতে স্পর্শ—জানি আমার সংবেদনের তরঙ্গ, চিন্তার জাল, আবেগের ঝড়। কিন্তু যা জানা যায়, যার মাধ্যমে জানা যায়—তা আমি নই। যে জানে, সেই নিরাকার, অসীম সত্তাই আমি—যেমন আকাশ তারাদের পিছনে, নীরব কিন্তু সর্বব্যাপী।
জ্ঞাতা কোনো ব্যক্তিগত সীমায় আবদ্ধ নয়। তাকে ব্যাখ্যায় বাঁধা যায় না, তার জ্ঞানের পরিমাণ সংখ্যায় গণনা করা যায় না। তার কোনো সীমানা নেই, রং নেই, আকার নেই, ওজন নেই, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা নেই। এটি বিমূর্ত, কিন্তু এই বিমূর্ততার গর্ভেই ফুটে ওঠে সকল মূর্ততা। যেমন সাগরের গভীরে মুক্তোর জন্ম, তেমনি জ্ঞাতার শূন্যতায় জগতের উদয়।
দেহ মূর্ত, কিন্তু বিমূর্তের ছায়ামাত্র। মূর্ত জগৎ উদিত হয় স্থান-কালের ক্যানভাসে, নানা রূপে, নানা রঙে। কিন্তু আমি স্থান-কালের গণ্ডি পেরিয়ে, এক অসীম শূন্যতা—নিরাকার, অনন্ত, অবর্ণনীয়। এই শূন্যতা চিরন্তন, সর্বদা উপস্থিত, সর্বদা জানছে, অভিজ্ঞতার সাক্ষী। জ্ঞাতা চিরবর্তমান—ধারণার জন্মের পূর্বে, বর্তমানে, পরে—শুধু এক আছে-ময়তা, যেমন নদীর স্রোতের নিচে নীরব গভীরতা।
মূর্ত জগৎ আর বিমূর্ত আমি—এ দুইয়ের মধ্যে কি সত্যিই পার্থক্য? আমার সংবেদন, চিন্তা, আবেগ, আকাশের মেঘ, পাহাড়ের দৃঢ়তা, নদীর প্রবাহ, পাখির গান—সব কি একই সত্তার প্রকাশ? মূর্ত আর বিমূর্তের ভেদ কি চিন্তার মায়া? যদি আমি সব ধারণা, চিন্তা, প্রত্যক্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে তাকাই, তবে কী দেখব? চিন্তাহীন অবস্থায় জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের মধ্যে কি কোনো ভেদ? আমার হাত, যা স্পর্শ করে, স্পর্শের সংবেদন—সব কি একাকার? জগৎ ও আমি, মূর্ত ও বিমূর্ত—কি একই সুরের গান?
জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের মধ্যে পর্দা সেই চিন্তার, যা আমিকে জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। চিন্তার আবরণ উন্মোচন করি—কোথায় জগৎ? কোথাও কিছু নেই। ফুলের সৌরভ লুপ্ত, পাখির গান নীরব, পাহাড় অদৃশ্য। আছি শুধু আমি—অনন্ত শূন্যতা, যেমন স্বপ্নহীন নিদ্রায় শান্তি।
শূন্যতার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। আমি মুক্তি পেতে পারি না, কারণ আমি কখনো বদ্ধ ছিলাম না। মুক্তি অর্জনের কিছু নয়, এটি আমার স্বভাব। কারাগার চিন্তার সৃষ্টি, আর চিন্তাই তার নিজের কারাগার থেকে মুক্তির চিন্তা করে। আসলে কারাগার নেই, মুক্তিও নেই। মুক্তির চিন্তাই কারাগার। চিন্তাহীনতায় আমি-তুমি এক। আমি নেই, তুমি নেই—শুধু একত্বের সাগর।
আকারই নিরাকার, নিরাকারই আকার। প্রথমে নিরাকার, পরে আকার—এমন নয়। দুইয়ের মধ্যে ভেদ নেই, যেমন সোনার অলংকার সোনা থেকে পৃথক নয়। আকার ও নিরাকার এক সত্তা।
শূন্যতা আলো নয়, অন্ধকার নয়। এটি আলো-অন্ধকারের ঊর্ধ্বে, কিন্তু উভয়কে ধারণ করে। অসীম শূন্যতা ধারণ করা যায় না, কারণ আধার সীমিত। অসীমকে ধারণ করতে অসীমই হতে হয়।
অসীম অসীমই, তার সবকিছু অসীম। এটি স্থান নয়, কাল নয়, কিন্তু স্থান-কাল তার অন্তর্গত। আমরা আকার দেখি, বর্ণনা করি, কিন্তু আকারের পিছনে নিরাকার। একটি চেয়ার দেখি—তার শুরু-শেষ আছে, কিন্তু তার অস্তিত্ব নতুন নয়। চেয়ার কাঠ, কাঠ গাছ, গাছ বীজ—সব একই সত্তার রূপান্তর। যেমন ভ্রূণ পিতামাতার কোষ থেকে জন্মে, কিন্তু অস্তিত্ব চিরন্তন। অস্তিত্বের শুরু নেই, শেষ নেই। অনিত্য আকার সত্য নয়, নিত্যই সত্য। অস্তিত্ব শূন্যতা, আকার তার ছায়া।
ঘট মৃত্তিকা খোঁজে—ধ্যানে, সাধনায়, আশায়, গ্রন্থে, গুরুর কাছে। গুরু বলেন, “তুমিই মৃত্তিকা, স্বরূপ দেখো।” ঘট ভাঙে, মৃত্তিকা অটুট। নিরাকারের আসা-যাওয়া নেই। চেয়ার, ঘট, দেহ—সব পূর্বসত্তার রূপ। পরমাণুতে শূন্যতা এক, যেমন মেঘ বাতাস থেকে জন্মে। দেহ প্রকৃতির উপাদান—হাইড্রোজেন, অক্সিজেন—সব একত্বের অংশ। প্রকৃতিতে উপাদানগুলি পৃথক নয়, জীবনের মূলসূত্র এক।
অস্তিত্বমাত্রই এক। অনন্ত, স্বয়ম্ভু, স্বনির্ভর, স্বয়ংপ্রতিষ্ঠিত, সর্বব্যাপী—এই সত্তা জগতের মূল। একের বাইরে কিছু নেই, কারণ বাইরের কিছু এককে সীমিত করবে। ভেদ অজ্ঞানতার কল্পনা। এক দেশ-কালাতীত, অপরিনামী, নিরপেক্ষ। তার অনুরাগ-বিরাগ নেই, অভাব নেই, উদ্দেশ্য নেই। সবকিছু তার মধ্যে—জল, স্থল, আকাশ, অশুভ-শুভ। এক আত্মার আত্মা, তার উপলব্ধি উপলব্ধির বিষয়।
যে অবস্থায় শুভ-অশুভের বোধ নেই, দ্বন্দ্ব নেই, অনুশোচনা নেই—সে অবস্থা একত্ব। ‘এক’ জগতের মহা আকর্ষণ। প্রত্যেক অস্তিত্বে তার স্ফুলিঙ্গ। নারী-পুরুষের আকর্ষণ, অর্থের লোভ, সন্তানের মায়া—সব একের প্রতি। এক ব্যতীত আর কিছু আকর্ষণ করে না।
আত্মা পরমাত্মা হয় স্বরূপ সন্ধানে, না অন্যের সত্তায় ডুবিয়ে। আমি এক হয়েও বহু, নিত্য হয়েও পরিবর্তনশীল। ‘হ্যাঁ’, ‘না’, ‘হ্যাঁ-না’র মাধ্যমে সত্তা ক্রমোন্নয়নশীল। সৃষ্টি চিরন্তন ক্রিয়া, আর আমি তার মধ্যে নিত্য নাচি।
লেখা: ফরহাদ ইবনে রেহান






