ফকির লালন সাঁই এর আধ্যাত্মিক দর্শনের অন্তর্যাত্রা
একটি গান, লালন এবং গাঁজার সাধনা….
সদা মন থাকো বাহুঁশ,
ধর মানুষ রূপ নিহারে।
আয়না-আঁটা রূপের ছটা,
চিলেকোঠায় ঝলক মারে।
স্বরূপ রূপে রূপ কে জানা,
সেই তো বটে উপাসনা,
গাঁ”জায় দম চড়িয়ে মনা,
ব্যোমকালী আর বলিস না রে।
বর্তমানে দেখ ধরি,
নরদেহে অটলবিহারী,
মর কেন হড়িবড়ি,
কাঠের মালা টিপে হা রে।
দেল ঢুঁড়ে দরবেশ যারা,
রূপ নিহারে সিদ্ধি তারা,
লালন কয় আমার খেলা,
ডাণ্ডাগুলি সার হলো রে।
ফকির লালন সাঁই বাংলার আধ্যাত্মিক দর্শনের এক ব্যতিক্রমী মুখ। তাঁর গান শুধু সুরের খেলা নয়, বরং দেহতত্ত্ব, চেতনা, আত্মোপলব্ধি এবং মানবমুখী ঈশ্বর চিন্তার এক অন্তর্যাত্রা।
“সদা মন থাকো বাহুঁশ,
ধর মানুষ রূপ নিহারে…”
গানটি লালনের সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে যেখানে তিনি প্রচলিত সাধনপথ, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, এবং মাদকনির্ভর তান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলেন,মানবদেহই সত্য সাধনার ক্ষেত্র, আর মানুষরূপেই ঈশ্বর বিরাজমান।
এই গানে লালন চেতনার জাগরণ, বাহ্যতন্ত্র বর্জন, ও হৃদয়তত্ত্ব-ভিত্তিক সাধনার আহ্বান জানিয়ে একটি গভীর আত্মপ্রশ্ন উত্থাপন করেন। “তুমি কি সত্যিই মানুষরূপে ঈশ্বর দর্শন করতে পারো?”
এই প্রশ্নই গানটির প্রতিটি স্তবকে উন্মোচন করে এক এক করে সাধনার পরম তত্ত্ব। আমরা গানটি নিয়ে সুবিস্তারে আলোচনা করবো।
“সদা মন থাকো বাহুঁশ,
ধর মানুষ রূপ নিহারে।
আয়না-আঁটা রূপের ছটা,
চিলেকোঠায় ঝলক মারে।।
“সদা মন থাকো বাহুঁশ”
“বাহুঁশ” শব্দটি এসেছে ফারসি ‘হুশ’ থেকে, যার অর্থ সচেতন, জ্ঞানবান, জাগ্রত।
এখানে লালন সাঁই সতর্ক করছেন,তোমার মন যেন সর্বদা ঘুমন্ত না থাকে। তুমি যেন আধ্যাত্মিক ভাবে জেগে থাকো।বাহ্যিক ধর্মাচরণের ভেতরে পড়ে আত্মার প্রকৃত রূপ ভুলে গেলে চলবে না।
“ধর মানুষ রূপ নিহারে”
এই লাইনটি লালন সাঁইয়ের মূল দর্শনের হৃদয় বা কেন্দ্র বিন্দু।তিনি বারবার বলেছেন, মানুষরূপেই স্রষ্টা প্রকাশ পায়।“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” এই তত্ত্বকে এখানে পুনরাবৃত্তি করছেন।
“নিহারে” মানে গভীর দৃষ্টিতে দেখা, উপলব্ধি করা।
শুধু চেহারা দেখা নয়, তাঁর আভ্যন্তরীণ রূপ, মানবধর্ম, দেহতত্ত্ব, এবং আত্মরূপ উপলব্ধি করা।
“আয়না-আঁটা রূপের ছটা”
এখানে লালন সাঁই মানুষের রূপকে “আয়নার মতো” বলেছেন।আয়না সবকিছু প্রতিফলিত করে, কিন্তু নিজে কিছু ধারণ করে না।এই রূপ “আঁটা”—অর্থাৎ লাগানো বা সাজানো, যেমন আয়নাতে সাজসজ্জা ধরা পড়ে, কিন্তু তা স্থায়ী নয়।
এখানে সাঁই বোঝাতে চাইছেন,মানুষরূপ ঝলমলে হলেও তা এক প্রতিফলন মাত্র। প্রকৃত রূপ আয়নার অন্তরালে, অন্তর্লোকে লুক্কায়িত।
রূপের ছটা মানে বাহ্যিক সৌন্দর্য, যা লোকচক্ষুকে মোহিত করে রাখে।
অর্থাৎ “বাহ্যরূপে মোহিত না হয়ে, আত্মার রূপ ধরতে শেখার কথা বলা হয়েছে।
“চিলেকোঠায় ঝলক মারে”
“চিলেকোঠা” হলো বাড়ির সর্বোচ্চ স্থান। দেহতত্ত্বে এটি ইঙ্গিত করে মাথার শীর্ষচক্র বা “সহস্রার”—যেখানে চৈতন্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে।
“ঝলক মারে” মানে: সেই চেতনার আলো মাঝে মাঝে দেখা যায়, অনুভূত হয়, কিন্তু ধরা দেয় না।
অর্থাৎ “সাধনার উচ্চতর স্তরে পৌঁছালে, সেই রূপ (সত্যরূপ) এক ঝলকে প্রতিভাত হয়। কিন্তু তুমি যদি ‘বাহুঁশ’ না থাকো, সেই ঝলকও অদৃশ্য হয়ে যায়।”
এবার আমরা গানের পরবর্তী অংশ নিয়ে আলোচনা করব।
স্বরূপ রূপে রূপ কে জানা,
সেই তো বটে উপাসনা,
গাঁজায় দম চড়িয়ে মনা,
ব্যোমকালী আর বলিস না রে।
“স্বরূপ রূপে রূপ কে জানা”
এখানে “রূপ” বলতে বোঝানো হয়েছে ঈশ্বর বা চৈতন্যের রূপ।
“স্বরূপ রূপে” মানে তার প্রকৃত বা আত্মিক রূপে—যে রূপ বাহ্যিক নয়, অন্তর্জাত।লালন সাঁই বলতে চান, যিনি ঈশ্বরকে বা পরমসত্তাকে তাঁর প্রকৃত রূপে চিনতে পেরেছেন, সেই-ই আসল সাধক।এখানে ঈশ্বরচিন্তার ‘নিরাকার’ ও ‘নির্বিশেষ’ রূপের ধারণা প্রকাশ পাচ্ছে। ঈশ্বর রূপী নয়—রূপের অতীত, তবু মানুষের মধ্যেই আত্মরূপে ধরা দেন।
“সেই তো বটে উপাসনা”
এই লাইনটি প্রথম লাইনের ব্যাখ্যা ও সমর্থন।
“গাঁ”জায় দম চড়িয়ে মনা”
এখানে লালন সরাসরি ছদ্ম-সাধকদের সমালোচনা করেছেন।
“গাঁ”জায় দম চড়িয়ে” অর্থাৎ যারা মাদকদ্রব্য সেবন করে কৃত্রিমভাবেই মোহ বা ধ্যানের অনুকরণ করে, তারা বিভ্রান্ত।এই পংক্তিতে তিনি বলেন, মন যদি গাঁ”জা টেনে, ঘোর তৈরি করে “সাধনার” নামে বুঁদ হয়, তাহলে তা প্রকৃত উপাসনা নয়, ভ্রান্তি ও ভণ্ডামি। এটা সাঁইয়ের সেই ধারার গান, যেখানে তিনি সমাজের কপট সাধক ও তান্ত্রিকদের বিদ্রুপ করেছেন।
“ব্যোমকালী আর বলিস না রে”
“ব্যোমকালী” হলো এক প্রকার তান্ত্রিক দেবীসাধনার প্রতীক।সাধকগণ প্রায়ই গাঁ”জা-ভা”ং খেয়ে কল্পনাবিলাসে ব্যোমে (আকাশে) কালীদর্শনের দাবি করে থাকেন।এসব বিভ্রমে ঈশ্বর চিন্তা হয় না, বরং আত্মবিভ্রান্তি জন্ম নেয়।
বহুদিন ধরেই লালন সাঁই ও গাঁ”জা সাধনা নিয়ে সমাজে চলে আসছে নানা রকম তথ্য বিভ্রাট এবং আচরণিক কদাচার।আজ সাঁইয়ের আখড়ায় যাওয়া যায় না গাঁ”জার গন্ধে। পরিবেশ প্রমাণ করে লালন যেন গাঁ”জার উদ্ভাবকের নাম। অনেকের কাছেই আমার এই কথাগুলো নতুন মনে হতে পারে ।আবার কারো কারো কাছে চরম বিরক্তির কারণও হতে পারে।
তাই আমরা এ বিষয়টাকে তথ্য, ইতিহাস ও তত্ত্বভিত্তিকভাবে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করবো।
প্রথমত আমরা যদি আলোচ্য পদে নজর দিই তাহলে দেখতে পাই ,উক্ত পদাংশে লালন সাঁই সত্যিকারের আধ্যাত্মিক বোধ ও সমাজ সংস্কারের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। সাঁইয়ের নিজের গানেই গাঁ”জা-বিমুখতা স্পষ্ট।
“গাঁ”জায় দম চড়িয়ে মনা,
ব্যোমকালী আর বলিস না রে”
এই লাইনেই সাইজী স্পষ্টত ব্যঙ্গ করেছেন সেইসব ভণ্ড সাধুদের যারা গাঁ”জা টেনে কেবল ঘোরের মধ্যে তত্ত্ব খোঁজে।
আরেকটি গানে তিনি বলেন:
“ভাং খেয়ে গান গেয়ে কি হবে রে মন,
যদি না হয় মন-দেহ এক সাধন?”
অথচ সাঁইয়ের দর্শনে ছিল আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও সজাগ চৈতন্য। সাঁই সাধনা করেছেন মানবদেহকে কেন্দ্র করে,যেখানে চেতনা, ইন্দ্রিয়, ও মনকে শুদ্ধ করে “সত্তার রূপ” অনুধাবনের কথা বলা হয়েছে।
ইতিহাস এবং গবেষণায় দেখা যায়, ড. জহির রায়হান, আশরাফ সিদ্দিকী, সলিমুল্লাহ খান সহ বহু গবেষক বলেছেন—
“লালন ছিলেন গাঁ”জা বিরোধী, এবং তাঁর আশ্রমে গাঁ”জা সেবন কখনোই সাধনার অংশ ছিল না।”
ড. আশরাফ সিদ্দিকী বলেন—
“লালনের আখড়ায় গাঁ”জা বা ভা”ং সেবনের কোনো নজির ইতিহাসে পাওয়া যায় না।”
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সলিমুল্লাহ খান প্রমুখ গবেষকরা জানান—
“এটা মূলত একটি অন্য তান্ত্রিক ঘরানার প্রভাব ও সামাজিক অপপ্রচার যার মাধ্যমে লালনের ভাবমূর্তিকে বিকৃত করা হয়েছে।”
অনেকে মনে করেন, নাথপন্থী বা শৈব তান্ত্রিকদের প্রভাবাধীন কিছু সাধক পরবর্তীতে লালনের নামে গাঁ”জাসেবার সংস্কৃতি চালু করে—যা মূলত লালনের ভাবের বিরোধী। ফকির-সন্ন্যাসীদের একাংশ যারা লালনের নাম নিয়ে গাঁ”জার ব্যবহার করে, তারা তাঁর ভাবমূর্তি বিকৃত করছে।
তাহলে লালনের সাথে গাঁ”জার ধারণা কোথা থেকে এলো?
তার পিছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে,
যেমন—
- ১. মহাত্মা ফকির লালন সাঁই ছিলেন যেমন ভাবে সর্বজনবিদিত এবং পূজিত, তেমনি ভাবে সাম্প্রদায়িক মতবাদে বিশ্বাসী একাংশ ব্যক্তিদের কাছে তিনি ছিলেন চরমভাবে নিন্দিত এবং ঘৃণিত। উনাকে ভালোবেসে উনার কাছে জাতি, ধর্ম ,বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ আসতেন। এবং সবাই একই মতবাদ বা সাম্প্রদায়িক ছিল না। তাদের একেকজনের একেক মতবাদ ছিল। কেবলমাত্র সাঁই দর্শনে এসে সবাই একই স্থানে সকল জাতি গোত্র ভেদাভেদ ভুলে জমায়েত হতো। তাদের মধ্যে কিছু তান্ত্রিক ও নাথ সাধক ও আসতেন যাদের মধ্যে গা”জা সেবন সিদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষ সাঁইয়ের প্রকৃত দর্শন ভুলে আগত মেহমানদের আচরণ অনুসরণ করে গাঁ”জাকে সাঁই সাধনার একটা অংশ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। যা পরবর্তীতে মহামারী রূপে প্রকাশ পায়। কিছু কপট সুবিধা ভোগী তান্ত্রিক বাউল গাঁ”জা খেয়ে শাইয়ের নামে চালিয়ে দিয়ে নিজেদের ব্যবসা চাঙ্গা করা শুরু করে দেয়। তবে সাঁইজীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, উনি জীবিত কালে উনার আখড়া বাড়িতে কেউই গা”জা সেবন করতে পারত না ।বরং কেউ যদি গা”জা সেবন করতো তাহলে, শাস্তি স্বরূপ তিন কোরবার অর্থাৎ ৩ শুক্রবার অর্থাৎ তিন সপ্তাহ আখড়া বাড়িতে তাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না।
- ২. বাইরে থেকে আগত গাঁ”জা সেদ্ধ সাধু সন্ন্যাসীদের গাঁ”জা সেবনকে কেন্দ্র করে আখড়া বাড়ির আশেপাশের এলাকায় বসবাসরত কিছু ধর্মান্ধ মৌলভী এবং ব্রাহ্মণরা অপপ্রচার চালিয়ে দেয় লালন গাঁ”জা সেবন করে। তাছাড়া বাউলদের প্রতি সমাজের কৌতূহল ও অবজ্ঞা,বহিরাগতদের দৃষ্টিতে “বাউল মানেই উদাস, উন্মাদ, গাঁ”জা খাওয়া লোক” ভাবটি গড়ে ওঠে।তারা ভাবেন, ভিন্ন পোশাক ও গান মানেই নেশা। এটা ছিল এক ধরনের সামাজিক প্রচারণা ও কুসংস্কার।
- ৩.লালন পদের অপব্যাখ্যা ও একটি অন্যতম কারণ হতে পারে। লালন সাঁই রচিত অনেক গান রয়েছে যেগুলো তে যোগ তত্ত্ব নির্ভর হাওয়া বা দম বা বাতাসের সাধনার কথা রয়েছে। অনেক ভ্রান্ত মতবাদীরা এই সকল গানে হাওয়ার সাধনা বলতে গাঁ”জার সাধনা বুঝে নিয়েছে।এটা নিতান্তই তাদের অজ্ঞতার ফসল। অনেক নামধারী সাধক আছে যাদের উদ্যেশ্য ই থাকে এমন, ভক্ত কুলকে ভুলভাল বুঝিয়ে নিজের অনুসারী হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেই সুবাদে কিছু ব্যবসাও হয়। নারী ভোগ থেকে শুরু করে পৃথিবীর কোন ভোগই তাদের মধ্যে বাকি থাকে না।
দ্বীনহীন শফিক যথার্থই বলেছেন –
গলায় মালা, চোখে টিকা, মুখে শুধু ধোঁকা,
বলে সত্যের কথা, করে মিথ্যার ঢোঁকা!
চুল লম্বা, মনটা খালি, সাধুত্বে নেই তেজ,
মনে মনে গুনে শুধু ভক্তের টাকার হেজ।
পড়ে থাকে গা ঘেঁষে, বলে “আমি গুরু”,
হাসে ভেতরে ভক্ত দেখে, চালায় তাদের পুরু!
আসল সাধু গাছে আছে, ফল দেয় নিঃস্বার্থে,
ভণ্ডটা তো বসে শুধু নিজের স্বার্থ খাতে।
একটা বিষয়ে পাঠক হয়তো আমার দিকে চোখ রাঙাতে পারে। কেননা আমরা সাধু সন্ন্যাসীদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই অনেক বাঘা বাঘা সন্ন্যাসীরা গাঁ”জা সেবন করতেন। তাহলে কি তারা ভুল পথে আছেন? এখানে আমার সরল স্বীকারোক্তি হল কাউকে ভুল বা সঠিক বলার কোন যোগ্যতা আমার নেই। আমি কেবল লালন দর্শনের সাথে তাদের মিল অমিল টা উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে আপাতত গাঁ”জা সেবন সমর্থন করতে পারছিনা। আবার ঐতিহাসিক দিক বিবেচনা করে গাঁ”জা কে একেবারে উড়িয়ে ও দিতে পারিনা।
কেন না, প্রাচীন ভারতে আয়ুর্বেদ, তন্ত্র, এবং যোগসাধনায় এক বিশেষ উদ্দেশ্যে গাঁ”জা ব্যবহৃত হতো।বিশেষ করে-
- নাথ যোগীদের মধ্যে গাঁ”জার ব্যবহার ছিল চেতনা প্রসার, দেহ-মন সংযমে সহায়ক হিসেবে।
- তান্ত্রিক সাধকরা গাঁ”জাকে ব্যবহার করতেন “ঘোর” বা “অতীন্দ্রিয় অনুভূতি”-র জন্য।
- শিবসাধক ও আঘোরীরা বিশ্বাস করেন গাঁ”জা সেবনে শরীরের মোহ কমে, চিন্তা শূন্য হয়, ফলে ঈশ্বরচিন্তা গভীর হয়।
কিন্তু এ ব্যবহার ছিল নিয়ন্ত্রিত, গুরু-পরিচালিত, উদ্দেশ্যনির্ভর এবং দেহতত্ত্বে অভিজ্ঞ সাধকদের জন্য। এটি কখনোই ভোগ বা আনন্দের বস্তু ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এর অপব্যবহার, অপব্যখ্যা ,অপপ্রচার সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা যুব সমাজকে ধ্বংস করার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। এটা মোটেও কাম্য নয়। গুটি কয়েক গুরু নির্দেশিত সাধকদের জন্য গাঁ”জার সিদ্ধতা থাকলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য আত্মবিকাশে সহায়ক নয়, বরং বিভ্রান্তিকর।
যেমন—
- আধ্যাত্মিক সাধনায় চাই “সজাগ চেতনা” (যাকে লালন বলেছিলেন “বাহুঁশ”)।গাঁ”জা চেতনাকে ধোঁয়াটে করে, সজাগ মন তৈরি করে না।ভ্রান্ত আনন্দে ডুবে গিয়ে, মানুষ ভাবে সে “তত্ত্ব” পেয়েছে—কিন্তু তা শুধু ঘোর।
- ইন্দ্রিয়সংযমের কথা বলে গাঁ”জা নেওয়া হলেও, পরবর্তীতে নেশা ও আসক্তি জন্ম নেয়।যোগের ভাষায়, ইহা “তামসিক প্রবৃত্তি” বাড়ায়—আলস্য, বিভ্রান্তি ও স্থবিরতা বাড়ে।দীর্ঘদিনের ব্যবহারে মস্তিষ্কের ডোপামিন রিসেপটর বিকল হয়ে যায়।
- গাঁ”জার নেশায় মানুষ একা থাকতে চায়, সমাজ ও মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে বিমুখ হয়।আধ্যাত্মিকতা যেখানে জাগরণ ও মানুষের কল্যাণে যুক্ত, গাঁ”জা সেখানে মানুষকে নির্জীব ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে।
- সাধক ভাবেন তিনি আলাদা কিছু অনুভব করছেন, কিন্তু সে অনুভব পরমতত্ত্ব নয়, একপ্রকার ইন্দ্রিয়-প্রলাপ।একে “ভোগানন্দ” বলা হয়, যা “ব্রহ্মানন্দ”-এর ছদ্মবেশ মাত্র।
- চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে-
স্বল্পমাত্রায় গাঁ”জা কিছু মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও বিষণ্ণতায় উপকার দেয়, তবে… দীর্ঘমেয়াদে সেবনে দেখা যায়-উদ্বেগ, মানসিক অবসাদ, স্মৃতিভ্রংশ ও মনঃসংযোগহীনতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস, আসক্তি, ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা।
গা”জা সেবনের আরো কিছু কুফল সম্পর্কে আলোচনা না করলেই নয়।
আধ্যাত্মিক, সূফিবাদ, লালনবাদ, বা বাউল ঘরানা সকল মতবাদেই সাধন প্রক্রিয়ায় বায়ুর সাধনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
আমার একান্ত মন্তব্য,”গাঁ”জা সেবনে বায়ুর ক্রিয়ায় বাধা আসে”। এই বক্তব্যকে আমরা যোগতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ, দেহতত্ত্ব ও শারীরবিজ্ঞান, এবং আধ্যাত্মিক ও প্রজ্ঞাসূত্রের আলোকে বিশ্লেষণ করতে পারি। - যোগতন্ত্রে, “প্রাণবায়ু” বা “পঞ্চপ্রাণ” (প্রাণ, অপান, সামান, উদান, ব্যান)–এর সচলতা ও নিয়ন্ত্রণকে বলা হয় “বায়ু-সাধনা”।এই বায়ুসমূহ শ্বাস-প্রশ্বাস, মনোসংযোগ, ধ্যান ও চেতনার ঘনত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।প্রাণায়াম, নাভি চক্র, আজ্ঞা চক্র, কুণ্ডলিনী জাগরণ—সবই বায়ু পরিচালনার ওপরে নির্ভরশীল।আর গাঁ”জা বা যেকোনো ধূমপায়ী পদার্থ ফুসফুসকে দুর্বল করে।যার ফলে শ্বাসনালীতে বাধা, অক্সিজেন শোষণের ঘাটতি, এবং বায়ুপ্রবাহের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। ফলে বায়ু সাধনা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মন-প্রাণ একাগ্র হতে পারে না।
- গাঁ”জা সেবনের ফলে, ফুসফুসের ক্ষতি হয়, ধোঁয়া শ্বাসনালির সিলিয়া কোষ নষ্ট করে, যা বাতাস পরিষ্কার রাখে। ফুসফুসে জমে থাকা টার (Tar) বায়ুপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। দেখা দেয় ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসকষ্ট ও কাশি। দীর্ঘমেয়াদে লাংস ফাইব্রোসিস ও ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস পায়।এমন পরিস্থিতিতে, শুদ্ধভাবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণায়াম বা ধ্যান করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে।
- এটা সেবনে হৃদপিণ্ডের উপর প্রভাব পড়ে। গাঁ”জা সেবনের পরপরই হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় ২০–৫০% পর্যন্ত। রক্তচাপ ওঠানামা করে, ফলে হার্টে স্ট্রেস পড়ে। যারা নিয়মিত গাঁ”জা সেবন করে, তাদের হৃদপিণ্ড ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ যোগতন্ত্রে হৃদপিণ্ড হলো “অনাহত চক্রের” আসন—যেখান থেকে করুণা, প্রেম ও চেতনার গভীর স্তর উদ্ভাসিত হয়।হৃদপিণ্ড দুর্বল হলে সেই চক্রও বিকল হয়।
মন ও প্রাণের সংযোগ ঘটে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে। এই সত্যটি বেদ-উপনিষদেও বলা হয়েছে—
“যথা প্রাণ তাথা মন;
যথা মন তাথা প্রাণ।”
অর্থাৎ, যেখানে মন, সেখানেই প্রাণ—এবং দুটোর নিয়ন্ত্রণ হয় নিঃশ্বাস ও বায়ুর মাধ্যমে।
গাঁ”জা এই নিঃশ্বাসকে ধোঁয়ার মাধ্যমে ভারী ও ভ্রান্ত করে। তার ফলে মনও ঘোলাটে হয়, স্মৃতি ও একাগ্রতা নষ্ট হয়। ফলে বায়ুর গতি শুধু দেহগত নয়, চেতনা গঠনের পথেও বাধা সৃষ্টি করে।
এ থেকেই স্পষ্ট হয় ,গাঁ”জা সেবনে বায়ুর গতিবিধিতে বাধা আসে, ফলে বায়ু-সাধনার প্রধান মাধ্যম—শ্বাস ও চেতনার ধারাবাহিকতা—পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়। আর এই গবেষণামূলক মন্তব্য গুলো আমার একার মন্তব্য নয়, চিকিৎসা বিজ্ঞান শরীর বিজ্ঞান ও তাই বলে। আর যে উপাদানে উপকারের চেয়ে সাধারণের জন্য অপকার বেশি সেটা কখনোই সাঁই নির্দেশিত কোন সাধন পন্থা হতে পারে না। উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমি এটাই বোঝাতে চেয়েছি গাঁ”জার সাথে লালন সাঁইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই ।তথাকথিত জ্ঞান পাপীরা তাদের নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে গাঁ”জা কে সাঁইয়ের নামের সাথে জরিয়ে তার বৈধতা দিতে চাচ্ছে।
এবার আমরা গানের পরবর্তী অংশ নিয়ে কথা বলব।
বর্তমানে দেখ ধরি,
নরদেহে অটলবিহারী।
মর কেন হড়িবড়ি,
কাঠের মালা টিপে হা রে।।
“বর্তমানে দেখ ধরি”
এখানে “বর্তমানে” শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।লালন সাঁই আধ্যাত্মিকতাকে ভবিষ্যৎ কল্পনা বা অতীত স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে “এই মুহূর্তে”, “এই দেহে”, “এই জীবনে” উপলব্ধি করতে বলেন।
“ধরি” মানে উপলব্ধি করো, বোঝো, ধারণ করো।
অর্থাৎ,এখন দেখো, এই দেহে, এই বোধে, এই সংসারে কি বিরাজমান আছে।
“নরদেহে অটলবিহারী”
“নরদেহ” মানে মানুষের দেহ, আর “অটলবিহারী” অর্থ চিরস্থায়ী ভাবে অবস্থানকারী, যা সরবে না, অনড়—এখানে বোঝানো হচ্ছে ঈশ্বর বা চৈতন্যসত্তাকে। অর্থাৎ, পরমাত্মা বা ঈশ্বর বহির্বিশ্বে নয়, মানুষের দেহেই অবস্থান করছেন,এমনকি তিনি চিরস্থায়ীভাবেই আছেন।
“মর কেন হড়িবড়ি”
এখানে সাঁই আমাদের সচেতন করতে চাইছেন।
“হড়িবড়ি” মানে তাড়াহুড়া করে, অস্থিরভাবে মারা যাওয়া বা মৃত্যুভয় নিয়ে ছুটোছুটি করা।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, যদি ঈশ্বর এই দেহেই আছেন, তাহলে তুমি কেন অযথা মৃত্যুভয়ে কাঁপছো?কেন এমন দ্রুত ও দিশেহারা জীবনে দেহকে নষ্ট করে ফেলছো?এটি একরকম মনুষ্যজীবনের অপচয় ও আত্মভ্রান্তির তীব্র সমালোচনা।
“কাঠের মালা টিপে হা রে”
এ লাইনটি বাহ্যিক সাধনার প্রতি তীব্র কটাক্ষ।কাঠের মালা টিপে নাম জপ করলেও, যদি চেতনা জাগে না,তবে তা ফলপ্রসূ নয়।এখানে “হা রে” শব্দটি তাচ্ছিল্যসূচক, যেন প্রশ্ন করছে,এই মালাটিপে যদি কিছুই না বোঝো, তাহলে করছোটা কী?এভাবেই লালন রূপ, সাধনা ও ঈশ্বরতত্ত্বকে মন-দেহ-চেতনার অভ্যন্তরীণ অনুধাবনের সাথে মিলিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
দেল ঢুঁড়ে দরবেশ যারা,
রূপ নিহারে সিদ্ধি তারা।
লালন কয় আমার খেলা,
ডাণ্ডাগুলি সার হলো রে।।
“দেল ঢুঁড়ে দরবেশ যারা”
- এখানে “দেল” শব্দটি এসেছে ফারসি থেকে, অর্থ হৃদয়।
- “ঢুঁড়ে” মানে—সন্ধান করে, খোঁজে।
অর্থাৎ, যারা বাহ্যিক জগত নয়, বরং নিজ হৃদয়ের গভীরে সত্যের সন্ধান করে, তারাই প্রকৃত দরবেশ।
দরবেশ শব্দের মধ্যেই রয়েছে ত্যাগ, সচ্চরিত্রতা, নিঃস্বার্থ অন্বেষার ইঙ্গিত।এরা বাহ্যিক পোশাকে নয়, আত্মানুসন্ধানে ব্যস্ত সাধক। তারা লৌকিক আচারের মধ্যে নয়, হৃদয়ের গভীরতাতেই ঈশ্বরের অবস্থান বোঝে।
“রূপ নিহারে সিদ্ধি তারা”
এখানে “রূপ নিহারে” বলতে বোঝানো হচ্ছে—যারা মানুষরূপে ঈশ্বর বা চৈতন্যরূপ দর্শন করতে পারে। সেই সাধকরাই আসল সিদ্ধ—যাঁরা তত্ত্বের কেন্দ্রস্থল বুঝতে পেরেছেন।এই ‘রূপ’ বাহ্যিক নয়, চেতনার—অন্তর্জাগতিক উপলব্ধির ‘মানুষরূপ’।
“লালন কয় আমার খেলা”
এখানে “খেলা” মানে সাধনা, এই দেহে বসে চেতনার অন্বেষণ।লালন সাঁই নিজের সাধনাকে খেলাই বলেছেন, কারণ এখানে কোনো ভয় নয়, চাপ নয়, বরং নির্ভীক অনুসন্ধান আছে।সাধনার এই পথকে তিনি আনন্দময় খেলার মতো দেখেন, কিন্তু গভীর তত্ত্বপূর্ণ এক খেলা।
“ডাণ্ডাগুলি সার হলো রে”
এই লাইনটি অত্যন্ত ব্যঙ্গধর্মী ও তাৎপর্যপূর্ণ।
“ডাণ্ডাগুলি” একটি জনপ্রিয় গ্রামীণ খেলা (একধরনের কাঠের ছক্কা খেলা)।
লালন সাঁই বলেন,আমার জীবন তো শেষ হয়ে গেল ডাণ্ডাগুলি খেলতে খেলতে, অর্থাৎ, কুসংস্কার, রীতিনীতির ভেতর দিয়ে সময় নষ্ট করে, কেউ যদি হৃদয়ের সন্ধান না করে,তবে সাধনার জীবনের পরিণাম হয় এক শিশুসুলভ খেলা মাত্র।
সদা মন রাখ বাহুঁশেতে, চোখ মেল অন্তরে,
মানুষ রূপে লুকায় সে জন, দেহঘরে ঘরে।
চোখ ভরে না মন্দির-দেওয়াল, না জপে মালা গুণে,
নির্বাণ ফোটে দেহের মাঝে, চিনলে রূপ-রসপণে।।
গাঁ”জার ধোঁয়ায় জাগে না মন, ভেসে যায় ঘোরেতে,
চিন্তা-চেতনা ঘোলাটে হয়, সাধন মরে তাতে।
সাঁই বলে, রে পাগল মন, নেশায় নয় সাধনা,
প্রাণের ভিতর পবন ধরে, কর সরল ভাবনা।।
দরবেশ যেই খোঁজে ‘দেল’ এ, রূপেরে চেনে মনে,
বাহির ছেড়ে ভিতর দেখে, অন্তরে যা রতনে।
না চিনে রূপ, গলা ছিঁড়লে নাম যাবে না ধরা,
নরদেহে অটল যে সাঁই, তাকেই কর ধরা।।
মোহন কয়, খেলায় কাটল, সাধন দিনের সার,
ডাণ্ডাগুলি মেরে চললি, ভুলে সত্যসার।
রূপ না দেখলে মানুষেরে, কিসে হবি সিদ্ধ?
সত্যে ফিরে আয় রে ভাই, কর অন্তরবিদ।।
আলোচিত গানের শেষ স্তবকে এসে লালন এক গভীর আত্ম-অভিযোগের স্বর উঁচিয়ে বলেন“লালন কয় আমার খেলা, ডাণ্ডাগুলি সার হলো রে”।
এ যেন এক প্রজ্ঞাবান সতর্কবার্তা,যদি সাধনার পথ ভুল বুঝি, চেতনার বদলে নেশায়, হৃদয়ের বদলে রীতিতে ডুবে থাকি,তবে গোটা জীবন হয়ে উঠবে শুধুই এক অনর্থক খেলা।লালন সাঁই এই গান দিয়ে আমাদের শেখায়,সত্যকে খুঁজতে হবে চেতনার আয়নায়,বায়ুপ্রবাহে জাগ্রত মনোযোগে,এবং মানুষরূপে নিহিত সত্তার মধ্যে।নেশা, নামগান, বা আনুষ্ঠানিকতা নয়—নিজের অন্তরলোকে, নিজের মানবসত্তায় ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়াই লালনের সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য।
এই গান শুধু একটি আধ্যাত্মিক উপদেশ নয়, বরং এক সজাগ দার্শনিক বিপ্লব, যা আমাদের ভাবায়, জাগায় এবং সত্যের দিকে ধাবিত করে।
লেখা: মোহন






