শ্রীকৃষ্ণ কি আল্লাহর প্রেরিত নবী ছিলেন?
আল্লাহ সকল জাতিগোষ্ঠীতে ও জনপদে ঐ এলাকার ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থ সহকারে তাঁর নবী-রসুলদেরকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ঐ নবীদের বিদায়ের পরে তাঁর শিক্ষা ও ধর্মগ্রন্থ বিকৃত করে ফেলা হোয়েছে। ফলে ঐ এলাকার মানুষকে নতুন করে পথ দেখাতে আবির্ভূত হোয়েছেন অন্য নবী যারা পূর্বের বিকৃত গ্রন্থকে রদ ঘোষণা করেছেন এবং নতুন বিধান জাতিকে প্রদান কোরেছেন। কেউ তাকে মেনে নিয়েছে, কেউবা মেনে নেয়নি।
এভাবে জন্ম হয়েছে একাধিক ধর্মের। কালক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এক এলাকার ধর্মের অনুসারীরা অন্য এলাকায় অন্য ভাষায় নাযিলকৃত ধর্মকে ধর্ম হিসাবে এবং ঐ ধর্মের প্রবর্তককে নবী হিসাবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। যেমন ইহুদিরা ঈসা (আ:) কে আল্লাহর প্রেরিত বলে স্বীকার করে না, খ্রিস্টানরা আখেরী নবী মোহাম্মদ (দ:)-কে নবী হিসাবে স্বীকার করে না একইভাবে ভারতীয় অঞ্চলে ভারতীয় ভাষার মানুষের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত বুদ্ধ, রাম ও শ্রীকৃষ্ণ এঁদেরকে নবী হিসাবে স্বীকার করেন না। কিন্তু তাদের প্রচারিত ধর্মগ্রন্থের মধ্যে আখেরী নবী মুহাম্মাদ (স) এর আগমনের বহু ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখিত আছে যা গবেষণা কোরলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ঐ ধর্মগুলিও আল্লাহরই প্রেরিত (যা এখন বিকৃত হোয়ে গেছে), এবং স্বভাবতই সেগুলির প্রবক্তারা আল্লাহরই বার্তাবাহক অর্থাৎ নবী ও রসুল।
হজরত আলী বলেছেন “আল্লাহ এক কৃষ্ণবর্ণ নবী প্রেরণ করেছিলেন, যার কাহিনী আল্লাহ তাআলা কোরআনে উল্লেখ করেননি।”
এই বাণী সরাসরি সহিহ হাদিসের কিতাবে নেই, বরং তাফসির ও ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
আন সূরা ইউনুস ৪৮ নং আয়াতে বলা আছে-
“ওয়ালি কুল্লি উম্মাতির রাসুলুন। ”
অর্থঃ প্রত্যেক জাতীর জন্যই রয়েছে রাসুল।
সূরা ফাতির ২৫ নং আয়াতে বলা আছে-
“ওয়া ইম্মিল উম্মাতি ইল্লা খালাফিহা নাজির।”
অর্থঃ এমন কোন জাতি নেই যার কাছে সতর্ককারী আগমন করে নাই।
“ওয়া লাকাদ বায়াছনা ফি কুল্লে উম্মাতির রাসুলান ” (সূরা নাহল ৩৭ আয়াত)
অর্থঃ নিশ্চয় আমি প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে কোন না কোন রাসুল পাঠিয়েছিলাম।
সূরা রাদ ৮ নং আয়াতঃ
“ওয়া লিকুল্লে কাওমিন হাদ”-
অর্থাৎ প্রত্যেক জাতির জন্য হাদী বা পথ প্রদর্শক রয়েছে।”
পবিত্র কোর’আনে মাত্র ২৫ জন নবীর নাম উল্লেখ করা হোয়েছে। হাদিস পাঠে আমরা এক লক্ষ চব্বিশ হাজার বা মতান্তরে দু-লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী রসুলগণের পৃথিবীতে আগমনের কথা জানতে পারি। কোর’আন বলছে- আমরা তোমার পূর্বেও অনেক রসুল পাঠিয়েছি, যাদের মধ্যে কারো বিষয় তোমার কাছে বর্ণনা করেছি এবং তাদের মধ্যে কারো কারো বিষয় বর্ণনা করি নাই (সুরা মো’মেন-৭৯)।
যদি সব নবীদের নাম-ধাম বৃত্তান্ত আল-কোর’আনে বর্ণনা করা হত তাহোলে একটি বিশ্বকোষের আকার ধারণ করতো। বাইবেলে বর্ণিত সকল নবীর নামও কোর’আনে উল্লেখ করা হয় নাই, আর তার প্রয়োজনও নেই। প্রত্যেক নবী-রসুলগণ তাঁদের জাতির ভাষায় তথা মাতৃভাষায় ঐশীবাণী প্রচার কোরেছেন, যাতে তাদের জাতির লোকেরা সহজেই নবীর শিক্ষাকে বুঝতে ও অনুসরণ করতে পারে। আর এ বিষয়েই আল-কোর’আন বলছে– আমরা প্রত্যেক রসুলকেই তাঁর জাতির ভাষায় পাঠিয়েছি, এই জন্য যে, যেন তাদের নিকট স্পষ্ট করে (আমার বাণী) প্রচার করতে পারে (সুরা এব্রাহীম-৫)।
এই আয়াতের মর্মবাণী হোচ্ছে, অতীতের প্রত্যেক নবী-রসুলগণ যে যে অঞ্চল ও জাতিতে আগমন কোরেছেন, সেই জাতি ও সেই জাতির ভাষাতেই তারা ওহী, এলহাম, দিব্যজ্ঞান, বোধি লাভ করে সেই অঞ্চলে একই ভাষা-ভাষীর মধ্যে প্রচারকার্য চালিয়েছেন। ঐসব ভাষা হিব্র“ পার্শী, সংস্কৃত,পালি, চীনা বা অন্য যে কোনো ভাষাই হোক না কেন। সুতরাং অতীত জাতির নবীদের জানতে হলে আমাদের অবশ্য বিভিন্ন ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থগুলি যথা ‘বেদ-বেদান্ত, পুরাণ-গীতা-সংহীতা, উপনিষদ, মহাভারত, ত্রিপিটক, দিঘা-নিকায়া, জেন্দাবেস্তা, তওরাত-যবুর-ইঞ্জিল’ ইত্যাদি গবেষণা ও পাঠ করে কোর’আনের আলোকে অতীত নবীদের সম্বন্ধে সত্যিকার পরিচয় জানতে হবে।
উপরোক্ত আলোচনার সাপেক্ষে নিশ্চিত করে বলা যায় যে, পাক-ভারত উপমহাদেশেও আল্লাহ নবী-রসুল-অবতার প্রেরণ কোরেছেন এবং তাঁদের প্রচারিত বাণী-ঐশীগ্রন্থ বিকৃত অবস্থায় হলেও ঐ জাতির মধ্যে এখনও বংশ-পরম্পরায় অনুসৃত হোয়ে আসছে, তাদের ভক্ত-অনুরক্ত অনুসারীদের মাধ্যমে।
মাওলানা জাফর আলী খান লিখেছেন, এমন কোনো জাতি বা দেশ নেই; যার দোষ-ত্র“টি সংশোধনের জন্য উপযুক্ত সময়ে আল্লাহ তা’লা কোনো নবী রসুল প্রেরণ করেন নাই। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ কোরেছেন যে , শ্রীকৃষ্ণ মহান প্রভুর রেসালতের ধারায় ভারতীয় নবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন (প্রতাপ, ২৮ শে আগস্ট ১৯২৯)।
ইসলামের চতুর্থ খলিফা, আলী (রা:) বলেছেন, “আল্লাহ তা’লা কৃষ্ণবর্ণের এক নবী পাঠিয়েছিলেন, যার নাম কোর’আনে উল্লেখ করা হয় নাই।” (কাশশাফ, মাদারেক) এই বর্ণনা থেকে একজন কৃষ্ণ বর্ণের নবীর আবির্ভাবের সংবাদ পাওয়া গেল, যা নবী করিম (দ:) কর্তৃক ইতোপূর্বে উল্লেখিত হাদিসের “আসওয়াদুল ও এসমুহু কাহেন” কৃষ্ণবর্ণ ও কানাই নামে ভারতীয় নবী-অবতার শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
রাসূলের হাদীস-
হিন্দুস্তানে একজন কৃষ্ণবর্ণের নবি ছিলেন, যাঁর নাম ছিল ‘কানহা”
সূত্র: তারিখে হামযান লিল ইমাম দাইলামি,
অধ্যায়: কাফ। (জামেউল উলুম ফি ইসতিলাহাতিল ফুনুন-খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৮১)
মহামানব শ্রীকৃষ্ণ ধর্মীয় রীতি-নীতি শাস্ত্র মতই পালন করতেন। প্রতিদিন সকালে ‘ব্রহ্ম মুহূর্তে’ (ফজরওয়াক্তে) শয্যা ত্যাগ করে হাত-মুখ ধৌত করতঃ (আচমন-ওজু) অজ্ঞান অন্ধকারের অতীত পরমাত্মাকে (আল্লাহকে) ধ্যান (যেক্র, প্রার্থনা, উপাসনা) করতেন। ঐ পরমাত্মা এক ও অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম, যিনি স্বয়ং জ্যোতি (নুর), অব্যয়-নিত্য (হাইয়্যুল কাইয়্যুম) ও নিষ্কলঙ্ক (সোবহান)। সন্ধ্যাকালে উপাসনা করতেন (বিষ্ণুভগবৎ পুরণ)। তিনি রাত্রের অর্ধযাম বাকী থাকতে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হোয়ে সনাতন ব্রহ্মকে (পরম প্রভু) ধ্যান করতেন (মহাভারত-১২/৫৩/১-২)। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ‘ব্রহ্ম’ অর্থ- বৃহৎ বা বড় যা আরবীতে ‘আকবর’ বলে, মহান আল্লাহ নিজেই সাদৃশ্যহীন “বৃহৎ সত্ত্বা”। আল্লাহ বিরাট বা মহান, যাকে মোসলমানগণ আরবীতে “আল্লাহু আকবর” বলে থাকেন।
এবার গীতা ও হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে রাসূলের আগমনের বার্তা:-
মুহাম্মাদ (স) যখন মক্কা বিজয় করেন তখন তার অনুচর বা সাহাবির সংখ্যা ছিল ১০,০০০।
“অল্লো পনিষদ” এ বেদে উল্লেখ আছে- “হোতার মিন্দ্রো হোতার মিন্দ্রো মহাসুরিন্দ্রবো:। অল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূনং ব্রক্ষণং অল্লাম।
“অল্লো রাসুল মুহাম্মাদ রকং বরস্য অল্লো অল্লাম।
আদল্লাং বুকমেকং আল্লাবুকং ম্লান লিরখাতকম।”
অর্থাৎ- দেবতাদের রাজা আল্লাহ আদি ও সকলের বড় ইন্দ্রের বড় গুরু। আল্লাহ পূর্ন ব্রক্ষা, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল পরম বরনীয়, আল্লাহই আল্লাহ। তাহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কেহ নাই। আল্লাহ অক্ষয়, অব্যয়, সয়ংসম্পূর্ন।
১. ভবিষ্য পুরাণ (Bhavishya Purana)
শ্লোক (প্রতিসর্গ পার্ব, খণ্ড ৩, অধ্যায় ৩, শ্লোক ৫–৮):
“একজন বিদেশী গুরু, নাম হবে ‘মহামদ’, আরব দেশে জন্ম নিবে।
সে উটের আরোহী হবে, আর তার ধর্মের অনুসারীরা পরিচ্ছন্ন ও ন্যায়পরায়ণ হবে।”
এখানে সরাসরি “মহামদ” শব্দটি এসেছে, যা মুহাম্মদ ﷺ-এর সাথে মিলে যায়।
২. অথর্ববেদ (Atharvaveda)
কাণ্ড ২০, সূক্ত ১২৭, মন্ত্র ১–৩:
“তিনি (প্রবর্তক) মারুস্থলবাসী, রক্ষাকারী, ৬০,০৯০ লোকসহ আগমন করবেন। তিনি কেবল এক আল্লাহর উপাসনা প্রচার করবেন।”
এখানে মারুস্থলবাসী মানে আরব। অনুসারীর সংখ্যা ৬০,০৯০–কে অনেকে বদর, উহুদ ও পরবর্তী যুদ্ধের সাহাবিদের প্রতীক মনে করেন।
৩. ঋগ্বেদ (Rigveda)
ঋগ্বেদ ১/৫৩/৯:
“সুত্তম ধর্ম শিক্ষক, যিনি এক আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দেবেন, তিনি উটচালক হবেন।”
নবী ﷺ ছিলেন মক্কার মরুভূমির অধিবাসী, উট ব্যবহার করতেন, আর আল্লাহর একত্ব প্রচার করেছিলেন।
৪. গীতা
গীতায় সরাসরি মুহাম্মদ ﷺ-এর নাম নেই, তবে শেষ যুগে কল্কি অবতার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে —
শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৪:৭–৮
“যখনই ধর্মহানি হয় এবং অধর্ম বাড়ে, তখন আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই,
সাধুদের রক্ষা ও দুষ্কৃতিদের বিনাশের জন্য, ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য।”
হিন্দু গবেষক ও মুসলিম আলেমরা ব্যাখ্যা করেন যে, কল্কি অবতার হিসেবে মুহাম্মদ ﷺ-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছে।
৫. কল্কি পুরাণ
কল্কি পুরাণ, অধ্যায় ২, শ্লোক ৪–৫:
“কল্কি অবতার শম্ভল নগরে জন্ম নেবেন, তাঁর নাম হবে ‘মহামদ’,
তিনি মরিয়মার পুত্র হবেন, তাঁর শিক্ষক দেবদূত আসবেন,
আর তিনি একমাত্র সত্য ঈশ্বরের ধর্ম প্রচার করবেন।”
এখানে “মহামদ” ও “মরিয়মার পুত্র” (Maryam = আমেনা → মুসলিম ব্যাখ্যা অনুযায়ী মা আমেনার প্রতি ইঙ্গিত) নবী ﷺ-এর সাথে মিলে যায়।
এক্ষেত্রে বিষয়টি এমন হয়েছে যে ইসা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কে খ্রিস্টান রা আল্লহর পুত্র বলে মানে কিন্তু তিনি কখনোই বলেন নি আমি আল্লাহর পুত্র। তাঁর অনুসারীরা তার ধর্মকে বিকৃত করেছে। তবে প্রকৃত অর্থে শ্রী কৃষ্ণ একজন আল্লাহর নবী এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বি দ্রঃ- তথ্য গুলো বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত।
– Junayed Hasan Shuvo






