সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.) এর জীবনী ও কর্ম
সূচনা- (আধ্যাত্মিক যাত্রার আলোকবর্তিকা): সময়ের স্রোতে বহু বড় বড় নাম হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু নাম এমন থাকে যা চিরকাল সজীব, যা যুগ যুগ ধরে মানব হৃদয়ে অনুপ্রেরণা ও শান্তির উৎস হয়ে থাকে। এমনই এক অসীম আধ্যাত্মিক পুরুষ হলেন হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.)। তাঁর জীবন যেন এক মহাসমুদ্র, যেখানে আত্মজ্ঞান, তাসাউফ, মানবতা ও আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেমের অমলিন আলো ছড়িয়ে পড়েছে। এক মরমী কণ্ঠের রুদ্ধশ্বাস রূপে তিনি আমাদের সামনে এসেছেন, তাঁর সুশৃঙ্খল জীবন, কর্ম ও দর্শন যেন মানবতার পথপ্রদর্শক। বিশ্বে যখন দৈনন্দিন জীবনের জটিলতায় মানুষ অবগাহন করছে, তখন এমন একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সঠিক পথের সন্ধান নিতান্তই সহজ নয়, কিন্তু তা অবশ্যই সম্ভব যদি মনুষ্যত্ব ও প্রজ্ঞার পরিসরকে বিস্তৃত করা যায়।
হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.) ছিলেন সেই পথপ্রদর্শক, যিনি কেবল একটি অঞ্চলের নয়, বরং সমগ্র মানবতার জন্য এক অনন্য আধ্যাত্মিক আদর্শ রেখে গেছেন। বাংলার এক শান্তিপূর্ণ গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মহান পীরের জীবন ছিল পূর্ণতা, ত্যাগ ও আত্মবিশ্বাসের এক মর্মস্পর্শী কাহিনী। তাঁর শিক্ষার আলোয় শুধু ধর্মীয় জ্ঞানের প্রসার ঘটেনি, বরং তিনি শিখিয়েছেন মানবতার প্রকৃত সংজ্ঞা—যার ভিত্তি ছিল ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, এবং দয়া। তাঁর আধ্যাত্মিক যাত্রা ছিল স্বপ্নের মতো, এক অনন্ত খোঁজ, যা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে এমন এক অবস্থানে, যেখানে একমাত্র আল্লাহর জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়া সম্ভব। তাঁর হৃদয়ের গহীনে চিরকালীন সত্য ছিল—আত্মজ্ঞান, তাসাউফ এবং আল্লাহর প্রতি প্রেমের এক অমোঘ যোগসূত্র, যা আজও আমাদের পথ দেখাচ্ছে।

জন্মস্থানের প্রাকৃতিক রূপ
নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার গগডা গ্রামটি একটি শান্তিপূর্ণ গ্রামীণ এলাকা, যা প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যে ভরপুর। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক নিখুঁত উদাহরণ। গগডা গ্রামটির চারপাশে বিস্তৃত রয়েছে খাঁটি সবুজ চারণভূমি, নদ—নদী, ছোট বড় পুকুর, হাওর, বনবাগান, এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য। প্রকৃতির এই শোভাময় পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.), যেখানে শৈশব ও যুবক বয়সে তিনি প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে এক আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। গগডা গ্রামের সৌন্দর্য এখানকার পরিবেশের শান্তিপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। গ্রামটিতে রয়েছে বিশাল পুকুর, যার পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি ও নীল জলাশয় সবুজ ঘাসে আবৃত হয়। নদীর পাশ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে, তাঁকে প্রাকৃতিক রূপ দেখে আরাম ও প্রশান্তি পেয়েছিলেন।
এখানে বসন্তকাল, বর্ষা, শীত—সব মৌসুমে প্রকৃতি তার রূপ পাল্টে তাজা ও নতুন সাজে হাজির হয়। বসন্তকালে গগডা গ্রামের স্নিগ্ধ বাতাসে ফুলের গন্ধ মিশে থাকত, যার ফলে গ্রামের বাতাসে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিকতা ছিল। শীতকালে, ধূসর আকাশের নিচে জমে থাকা শিশিররাশি চমৎকার দৃশ্য সৃষ্টি করত। বর্ষাকালে নদী ও হাওরের জলে স্নানরত পাখিরা এক এক অমলিন শান্তির বার্তা নিয়ে আসত। গগডা গ্রামটি ছিল এক অমৃত স্বর্গ, যেখানে প্রতিটি দৃশ্যই মনে হতো যেন আধ্যাত্মিক অভ্যন্তরের এক গভীর প্রতিফলন। এ পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে হযরত শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.)—এর হৃদয়ে সৃষ্টির প্রতি এক অসীম ভালোবাসা ও তার স্রষ্টার প্রতি গভীর বিশ্বাস জন্মেছিল, যা তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছিল। শৈশবে যেই শিশুটি ছিল লাজুক ও পরহেযগার, তাকেই পরবর্তীতে সমাজ চিনল “শাহ ক্বারী” নামে—একজন আধ্যাত্মিক অভিভাবক, দরবেশ, চিশতিয়া তরিকার ধারক ও বাহক।
প্রারম্ভিক জীবন: বাংলা ১৩০৯ সনের ১৯ কার্তিক, সোমবার। বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার গগডা গ্রামে এক পূণ্যময় আলোয় ভেসে ওঠে একটি ঘর। সেই ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন এক আলোকিত আত্মা— হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.)। তাঁর পিতা হযরত শামশের আলী মাহমুদ (রহ.) ছিলেন একজন দ্বীনদার, আলেম ও তাসাউফ দর্শনের অনুরাগী।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন: তাঁর শৈশব ছিল সংযম, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির ছায়ায় বেড়ে ওঠা এক পরিশুদ্ধ অধ্যায়। প্রাথমিক শিক্ষায় কোরআন, হাদীস, আরবি ও ফার্সি ভাষার ওপর দখল অর্জনের পর, তিনি ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ের বরেণ্য আলেম ও সুফীদের কাছ থেকে তিনি সরাসরি দীক্ষা নেন, যেমনঃ মৌলানা রাজনগরী (রহ.) ও মৌলানা দেওপুরী (রহ.)।
তিলাওয়াতে পারদর্শিতা ও ‘‘শাহ ক্বারী’’ উপাধি: তাঁর মধুর কণ্ঠ ও বিশুদ্ধ ক্বিরাতের কারণে তিনি “শাহ ক্বারী” নামে খ্যাতি লাভ করেন। কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অপার এক শিল্পী।
তাসাউফ দর্শন ও খেলাফত লাভ: তাসাউফের অনুশীলনে তিনি আত্মনিয়োগ করেন স্বীয় মুর্শিদ শাহ সুফি ইসমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারী (রহ.)—এর সান্নিধ্যে থেকে। চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া—মুজাদ্দেদিয়া ও মুহাম্মদীয়া তরিকায় তিনি খেলাফত লাভ করেন। তাসাউফ তার জীবনে শুধু দর্শন নয়, তা ছিল জীবন পদ্ধতি। তিনি ফানা ফিশ শাইখ, ফানা ফির রাসুল, ফানা ফিল্লাহ এবং বাকাবিল্লাহর ধাপে ধাপে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন। তিনি বলেন, “আল্লাহর প্রেমই ইবাদতের প্রকৃত রূহ। যে মহব্বতের মাধ্যমে বান্দা ফানার গহীনে বিলীন হয়ে আল্লাহর অস্তিত্বে নিজের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলে — সেই মহব্বতই সর্বোচ্চ সাধনা।”
তাঁর ভাববাদ ও লেখনী: তাঁর হামদ, নাত ও সুফিপ্রেমের কবিতা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। শাহ ক্বারী লিখেছেন:
“মোহাম্মদ নাম খোদার তারিফ,
ঐ নাম করিয়া জরিপ
ভাঙ্গিয়া মিমের দেয়াল,
ধরা দিলেন খালিক।”
তাঁর লেখা দো’আ, হামদ ও গজলে আধ্যাত্মিক আবেশ, জিকির, নবীপ্রেম ও অন্তর্দর্শনের গভীর অনুরণন পাওয়া যায়।
চিশতিয়া তরিকার শাজরা (আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতা): হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.)—তার পীর হযরত মাওলানা শাহ্—সূফী ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারী (রহ.)—তার পীর ছিলেন শামসুল ওলামা হজরত গোলাম সালমানী আব্বাসী। তার পীর ছিলেন সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি বর্ধমানী, এরপর তার পীর শায়খুল হাদিস সুফি নূর মুহাম্মদ নিজামপুরী। এছাড়া তার পীর সৈয়দ আহমদ শহীদ রায়বেরেলভি, পীর শাহ আবদুল আজিজ দেহলভী, এবং পীর শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী ছিলেন। এভাবে চিশতিয়া তরিকার ধারায় তিনি হযরত হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) হয়ে সরাসরি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সম্পর্ক যুক্ত।
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি: তিনি বিশ্বাস করতেন, তাসাউফের মূল হল—নফসের সংশোধন, আল্লাহর মহব্বতে আত্মার সম্পূর্ণ বিলয়, এবং নবী প্রেমের মধ্যে আল্লাহকে চিনে ফেলা। তিনি মানবজাতিকে উদ্বুদ্ধ করতেন “তাওবা”, “তাকওয়া”, “মুহাসাবা” এবং “মুরাকাবা”র মাধ্যমে আত্মার উন্নতির পথে।
সামাজিক ও শিক্ষামূলক অবদান: তাঁর পরিবার ও শিষ্যরা বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি নিজেও এলাকায় ইসলামি জীবনধারার পুনর্জাগরণ ঘটান। বহু লোক তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে আত্মশুদ্ধির পথে ধাবিত হন।
সাধনা, চরিত্র ও আধ্যাত্মিক অবদান: তিনি ছিলেন চার মারহালার সাধনায় সিদ্ধ — শরিয়ত, ত্বরীকত, হাকীকত, মারেফাত। এই পথে চলতে গিয়ে তিনি অর্জন করেন ফানা ফি শাইখ, ফানা ফি রাসুল, ফানাফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহ পর্যায়ের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ। তাঁর হৃদয় ছিল নবী প্রেমে উদ্বেল, জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নবীজীর প্রেমে অশ্রুসিক্ত ছিলেন।
বিবাহিত জীবন ও উত্তরসূরি: বাংলা ১৩৩৭ সালে তিনি মোছা: আয়শা আক্তার খাঁনমকে বিবাহ করেন। তাঁদের তিন পুত্র ও দুই কন্যা ছিলেন। তিনজন পুত্রই ছিলেন শিক্ষিত, ধর্মপ্রাণ ও সমাজসেবী। শাহ সুফি হযরত আব্দুস সাদেক (মাঃ জিঃ আঃ) বর্তমানে ছয়আনী দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন।
জীবনাদর্শ ও লেবাস: তিনি ছিলেন সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণকারী। তাঁর পোশাকে ছিল ফারাবিহীন জামা, পাগড়ী, পরিপূর্ণ দাঁড়ি ও সুন্নতি আমল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও তাহাজ্জুদ, এশরাক, চাশত ও আওয়াবীন আদায় করতেন নিয়মিত।
সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক কাব্যচর্চা: চিশতিয়া তরিকার মূলভাব — আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রেম, দুনিয়াবিমুখতা ও মানবতার শিক্ষা — তিনিই ছিলেন তার অনুশীলনকারী ও প্রচারক। তাঁর লেখা বহু হামদ, নাত ও আধ্যাত্মিক কবিতা মুসলিম সমাজে আজও দিকনির্দেশনা দেয়।
নিম্নে তাঁর কিছু পংক্তি:
‘‘নবীর দুঃখ শুইনে কানে, ধৈর্য কভু নাহি মানে
জল বহে তার দু’নয়নে, বিদরে পরান…”
“শাহ ক্বারী বলে থাকতে ঘরে, ভক্তি ডোরে বান্দ তারে
ছুটলে পাখি যাবে উড়ে…”
তাসাউফ দর্শন সমূহ
১. শিরক ও দুনিয়াবাদিতা থেকে মুক্তি:
তাঁর তাসাউফ দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল শিরক (অলৌকিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন) থেকে বিরত থাকা এবং দুনিয়াবাদিতা তথা তার হৃদয়ে শান্তি ও প্রশান্তি প্রদান করেন।
৩. পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি:
তাঁর তাসাউফ দর্শনে পবিত্রতা এবং আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাসাউফের মূল লক্ষ্য ছিল আত্ম—পরিশুদ্ধি। তিনি মনে করতেন, মানুষকে প্রথমে নিজেকে শুদ্ধ করতে হবে, তার অন্তর থেকে খারাপ আচরণ ও মোহ মুছে ফেলার মাধ্যমে তবেই সে স্রষ্টার মাটির প্রতি ভালোবাসা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। তিনি ইসলামের শুদ্ধতার পক্ষে ছিলেন এবং তাকে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করতেন। তাঁর মতে, সৃষ্টির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, কিন্তু স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া এক ধরনের শিরক। সুতরাং, স্রষ্টার একত্ববাদই ছিল তাঁর অন্যতম তাসাউফ দর্শন।
২. আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম ও বিশ্বাস:
হযরত শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.) এর তাসাউফ দর্শন ছিল আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম ও বিশ্বাস। তাঁর মতে, আল্লাহর প্রেম ও ভালোবাসাই ছিল আত্মিক জীবনের মূল লক্ষ্য। তাঁর শিক্ষা ছিল—যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তাঁকে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা নৈকট্য লাভ করতে পারবে।
৪. অলৌকিক ক্ষমতা লাভ ও আধ্যাত্মিক শক্তির অর্জন:
তাঁর তাসাউফ দর্শনে আধ্যাত্মিক শক্তির অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তিনি তরিকতের চর্চা করে আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করেছিলেন। ‘‘ফানা ফি শাইখ’’ থেকে “ফানা ফি রাসূল” হয়ে “ফানা ফিল্লাহ” এবং শেষে “বাকা বিল্লাহ” পর্যন্ত তিনি ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক পথে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
৫. মুহব্বত—এ—নবি (নবী প্রেম):
তাঁর অন্যতম তাসাউফ দর্শন ছিল নবী প্রেম। তিনি নবী মুহাম্মদ (সা.)—এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রাখতেন। তাঁর লেখায় নবী প্রেমের চর্চা ছিল পরিপূর্ণ। তিনি মনে করতেন, নবী প্রেমই আল্লাহর প্রতি প্রকৃত আনুগত্যের চিহ্ন। নবী (সা.)—এর প্রতি সশ্রদ্ধ ভালোবাসা এবং আনুগত্য ছিল তাঁর তাসাউফ জীবনের এক বিশেষ দিক।
৬. মুসলিম সমাজে উদারতা, সহিষ্ণুতা ও ভালোবাসা:
তাঁর তাসাউফ দর্শন ছিল সহিষ্ণুতা ও উদারতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তিনি মনে করতেন, মানুষকে ভালোবাসা এবং সহিষ্ণুতা দেখানোই প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা। তাই তিনি ধর্মের সকল ধারাকে সম্মান করতেন এবং কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য রাখতেন না। এই দর্শনটি তাঁর ইসলামী ঐক্যবদ্ধতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় বাস্তবায়িত হয়েছিল।
৭. বিশ্বজনীনতা ও আত্মত্যাগের দর্শন:
তাঁর তাসাউফ দর্শনে বিশ্বজনীনতা ও আত্মত্যাগ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল। তিনি বলতেন, সত্যিকারের সুলুক অর্জন করার জন্য মনের সমস্ত মোহ—মায়া ত্যাগ করতে হবে এবং নিজের আত্মাকে আল্লাহর জন্য নিবেদিত করতে হবে। তাঁর জীবন ছিল একান্তভাবে আত্মত্যাগ এবং পরোপকারের একটি উদাহরণ।
৮. তাসবিহ ও জিকিরের গুরুত্ব:
জিকির (আল্লাহর স্মরণ) ছিল তাঁর তাসাউফ দর্শনের অন্যতম অঙ্গ। তিনি আল্লাহর নাম স্মরণ করতে এবং তাঁকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করতে বারবার উৎসাহিত করতেন। এই স্মরণ বা জিকিরই ছিল তাঁর মন ও হৃদয়ের প্রশান্তির মূল। তাঁর মতে, তাসবিহ ও জিকিরের মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ করা যায়।
৯. মনের প্রশান্তি ও আত্মবোধ:
তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আধ্যাত্মিক শান্তি ও মনের প্রশান্তি অর্জনের জন্য আল্লাহর পথে চলা এবং সঠিক কাজ করা অপরিহার্য। ব্যক্তি যদি মনের ভেতর প্রশান্তি অনুভব করে, তবে সে একদিকে আত্মিক দিক দিয়ে উন্নত হবে, অন্যদিকে সামাজিকভাবে তার জীবন সার্থক হবে। তাঁর এই দর্শন সমাজে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে পরিচালিত করেছিল।
১০. শরীয়ত, ত্বরীকত, হাকীকত ও মারেফাতের সুষম সমন্বয়:
তিনি মনে করতেন যে, শরীয়ত, ত্বরীকত, হাকীকত এবং মারেফাত—এই চারটি স্তরকে সমন্বয় করেই একজন ব্যক্তি তার আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। শরীয়ত ছিল তৃতীয় স্তর এবং ত্বরীকত (সুফি পথে এগিয়ে যাওয়ার পথ), হাকীকত (আধ্যাত্মিক বাস্তবতা) এবং মারেফাত (আল্লাহর প্রকৃত জ্ঞান) ছিল পরবর্তী স্তর। তাঁর জীবন ছিল এই চার স্তরের সুষম সমন্বয়ের বাস্তব উদাহরণ।
ইন্তিকাল ও উত্তরাধিকার
১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর, সকাল ১০ ঘটিকা, সোমবার তিনি ইন্তিকাল করেন। তাঁর দরগাহ শরীফ নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার ছয়আনী গ্রামে তীর্থস্থানতুল্য মর্যাদা লাভ করেছে। তাঁর উত্তরসূরি শাহ সুফি আব্দুস সাদেক (মাঃ জিঃ আঃ) আজও সেই আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন।
উপসংহার:
হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.) ছিলেন একাধারে তাফসীর বিশারদ, তাসাউফ সাধক, কবি ও সমাজ সংস্কারক। তাঁর জীবনী এক অনন্য জীবন দর্শন, যা আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর প্রেমে নিজেকে উৎসর্গ করার এক উজ্জ্বল পাঠ। শেষবাক্যের আবরণে আবৃত এই কবিতাটি, যেন তাঁর রুহানিয়াতের দীপ্ত প্রতিধ্বনি হয়ে পাঠকের হৃদয়ে বাজে।
তুমি আছো নীরবে-
তুমি আছো নীরবে, জিকিরে ভেজা প্রাণে,
তোমার ছোঁয়ায় জেগে ওঠে মাটি, জলে ও গগনে।
চিশতিয়ার প্রেমে তুমি ছিলে মগ্ন,
আল্লাহু ধ্বনি তোল একান্ত নির্জনে।
তাওয়াক্কুলে ভরা ছিল তোমার সব পথ,
মুরাকাবায় দেখেছ নূর, পেলে ইলমে লাদুনী রত্ন।
দুঃখী—গরিবের সাথী, সেবাই ছিল সাধনা,
তোমার প্রেমে আজো বাজে—রুহানিয়াতের বাঁশি—সুরে গাথা
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক, কায়ছার উদ্দীন আল—মালেকী






