পৃথিবীর সকল সৃষ্টি হলো মায়ার এক-একটা উপাদান।

পৃথিবীর সকল সৃষ্টি হলো মায়ার এক-একটা উপাদান।

পৃথিবীর সকল সৃষ্টি হলো মায়ার এক-একটা উপাদান। এ মায়া নামক সমুদ্রে যে পা ভিজায় সে তার নিজের অজান্তেই এ সমুদ্রে ডুবে যায়। যার ফলে জরাজীর্ণতার শিকল বেরি পরে অরুজ-নজুলেই গুরেফিরে আসতে হয়। -সৈয়দ মামুন চিশতী

এই বাক্যটি সৈয়দ মামুন চিশতীর গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক অলৌকিক প্রকাশ। এখানে “মায়া”, “সৃষ্টি”, “সমুদ্র”, “জরাজীর্ণতা”, এবং “অরুজ-নজুল” শব্দগুলির মাধ্যমে তিনি আমাদের অস্তিত্বের প্রকৃতি, আত্মার ভ্রমণ, এবং সংসারের বন্ধনের রহস্যময় জালকে উন্মোচন করেছেন। চলুন একে একে ব্যাখ্যা করি—

“এ পৃথিবীর সকল সৃষ্টি হলো মায়ার এক-একটা উপাদান।”
এই বাক্যে বলা হয়েছে, আমরা যেসব বস্তু দেখি—প্রকৃতি, মানুষ, সম্পদ, সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা—সবই একেকটি “মায়া” বা “আবরণ”।

এই মায়া বাস্তব মনে হলেও, আধ্যাত্মিক সত্যের দৃষ্টিতে এগুলো ক্ষণস্থায়ী, পরিবর্তনশীল, ও ফাঁকি দেওয়া চিত্রমাত্র। এটি উপনিষদের “মায়াবাদ” দর্শনের মতো, যেখানে সব সৃষ্টি “মায়া”—আত্মা ছাড়া কিছুই চিরস্থায়ী নয়।

“এ মায়া নামক সমুদ্রে যে পা ভিজায়…”
এখানে “মায়া” কে তুলনা করা হয়েছে সমুদ্রের সঙ্গে—গভীর, বিস্তৃত, মোহময়, এবং ডুবিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন।

কেউ যদি এই মায়ায় সামান্য পা ডুবায়—অর্থাৎ এতে আসক্ত হয়, আকর্ষিত হয়—সে ধীরে ধীরে এর গভীরে ডুবে যায়।

এই পংক্তি একটি সতর্ক সংকেত—মায়ার খেলা নিষ্পাপ মনে হলেও, তা অজান্তেই আত্মাকে গ্রাস করে ফেলে।

“…সে তার নিজের অজান্তেই এ সমুদ্রে ডুবে যায়।”
আত্মা প্রথমে মায়ার প্রতি কৌতূহলী হয়—ভোগ, সুখ, পরিচয়, সম্পর্ক, সম্মান ইত্যাদির আকর্ষণে ধীরে ধীরে তা ডুবে যেতে থাকে।

‘নিজের অজান্তে’ বলার অর্থ হলো, কেউ সচেতনভাবে পতন বেছে নেয় না—কিন্তু মায়ার মোহ এমনই ধূর্ত যে তা ধীরে ধীরে আত্মাকে গ্রাস করে।

এই অবস্থায় মানুষ নিজের মূল পরিচয়—আত্মা, চৈতন্য, বা সত্যস্বরূপ—কে ভুলে যায়।

“যার ফলে জরাজীর্ণতার শিকল বেরি পরে…”
মায়ার ফাঁদে পড়া মানে শুধু আসক্তি নয়, জরার—অর্থাৎ বার্ধক্য, মৃত্যু, দুর্ভোগ, ক্লেশ—এই সবকিছুর শৃঙ্খলে বাঁধা পড়া।

‘শিকল’ বা ‘বেরি’ এক প্রতীক যা বন্ধন, আত্মার কষ্টকর পরিণতি বোঝায়। যখন আত্মা মায়ার বস্তুর প্রতি আকর্ষিত হয়, তখন তা চিরন্তন থেকে ক্ষণস্থায়ী জগতের অধীন হয়ে পড়ে।

এই শিকল থেকেই জন্ম হয় পুনর্জন্মের, দুঃখের, এবং অপূর্ণতার।

“…অরুজ-নজুলেই গুরেফিরে আসতে হয়।”
অরুজ মানে আত্মার আরোহন বা উপরে ওঠা, এবং নজুল মানে পতন বা নিচে নামা। এ দুটি আরবী শব্দ এখানে চক্রাকার যাত্রাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

অর্থাৎ আত্মা উপরে উঠতে চায়, আলোর দিকে যেতে চায়—কিন্তু মায়ার মোহে আবার পড়ে যায়, নিচে নামে।
এই চক্রে পড়ে আত্মা মুক্তি পায় না—চলতেই থাকে জন্ম-মৃত্যুর, আকর্ষণ-বিচ্ছেদের, আশা-হতাশার পথে।

গভীর সারাংশ:
সৈয়দ মামুন চিশতী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—
পৃথিবীর মোহময়তা যতই রঙিন হোক না কেন, সেটি চিরন্তন নয়। যারা মায়ায় পা রাখে, তারা ধীরে ধীরে নিজের আত্মার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। মুক্তির একমাত্র পথ—এই মায়ার মোহ থেকে নিজেকে সরিয়ে, আত্মসত্যের পথে ফিরে যাওয়া।

আরো পড়ুনঃ