একজন নবীপ্রেমিক আলোকিত ব্যক্তিত্ব: আলহাজ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.)

একজন নবীপ্রেমিক আলোকিত ব্যক্তিত্ব: আলহাজ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.)

লেখক: কায়ছার উদ্দীন আল—মালেকী

হযরতুল আল্লামা শাহ সুফি হাফেজ আহমদ (রহ.) ছিলেন সেই আলোকিত ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য ও রূহানী প্রেমের প্রতীক। তার অন্তর থেকে জন্ম নিত নবীজীর প্রতি অটল আনুগত্য ও গভীর ভালবাসা, যা সমাজের মধ্যে নবীপ্রেমের দীপ্তি ছড়িয়ে দিত। তিনি জীবনকে পূর্ণ করেছেন রূহানী প্রশিক্ষণ, দাওয়াতি তৎপরতা এবং মানবসেবার মাধ্যমে, যা তাকে অনন্য ও প্রেরণামূলক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। চুনতি সিরাতুন্নবী মাহফিল কেবল নবীর জীবন ও শিক্ষাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়নি; বর্তমানেও ১৯ দিনব্যাপী এই মাহফিলে বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, আলেম ও পীরগণ বয়ান প্রদান করেন, যা হযরতের শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও প্রভাবকে জীবন্ত রাখে। হযরতের জীবন আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি রূহানী দৃষ্টিভঙ্গি, নবীপ্রেম ও দাওয়াতি কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রতি হৃদয়ে তিনি ‘শাহ সাহেব’ নামে অমর হয়ে আছেন। হেফজ না থাকলেও, সুমধুর কণ্ঠে অনর্গল কোরআন তেলাওয়াতের কারণে তিনি ‘হাফেজ আহমদ’ নামে সুপরিচিত হন।

জন্ম ও পূর্বপুরুষদের আগমন:

হাফেজ আহমদ চুনতি (র.) জন্মগ্রহণ করেন চুনতি গ্রামে, ১৯০৪ ইং সালে। তাঁর পিতার নাম হযরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ (রহ.), মাতার নাম মোছাম্মৎ হাজেরা খাতুন, এবং দাদা মাওলানা কাজী মুহাম্মদ ইউসুফ আলী (রহ.)।

শিক্ষাজীবন

হযরত শাহ সাহেব (রহ.) বাল্যকাল থেকেই পিতার তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। প্রাথমিক শিক্ষা নেন হযরত মাওলানা বজলুর রহমান (রহ.) এর তত্ত্বাবধানে। অল্পদিনের মধ্যে পবিত্র কুরআন মজিদ সম্পূর্ণ পড়া (খতম) সম্পন্ন করেন এবং মাতৃভাষা, উর্দু, ফারসি ও আরবিতে দক্ষতা অর্জন করেন। হাশতুম (বর্তমানে ৭ম শ্রেণী) পর্যন্ত দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেন। এরপর সাতকানিয়ার আফজল নগরের হযরত মাওলানা আবদুল বারী (রহ.) এর মাদরাসায় ভর্তি হয়ে জমাতে হাফতুম (বর্তমানে ৮ম শ্রেণী) পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে বাঁশখালীর ছনুয়া মাদরাসা—তে দ্বীনি শিক্ষা অব্যাহত রাখেন, যেখানে হযরত মাওলানা ফজলুল হক (রহ.) প্রখ্যাত শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। চট্টগ্রামের সেকালের উচ্চতর মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসা, চন্দনপুরা—এ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহদের ছোহবতে জ্ঞান অর্জন করেন এবং জামাতে ছিওম (আলিম ২য় বর্ষ) উত্তীর্ণ হন। এরপর কলকাতার আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ফাজিল ডিগ্রি অর্জন করেন হযরতুল আল্লামা ছফিউল্লাহ (রহ.) এর তত্ত্বাবধানে। শেষে হাদিস শরিফ অধ্যয়ন শুরু করার জন্য চুনতীর হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসা—তে অবস্থান নেন। তবে গুরুতর অসুস্থতার কারণে চূড়ান্ত হাদিস পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এই পরীক্ষা পাশ করলে শিক্ষার্থীকে হাদিসে উচ্চতর দক্ষতার স্বীকৃতি ও শিরোনাম দেওয়া হত।

রূহানী শিক্ষা ও তরিকতের উজ্জ্বল পথ

হযরত শাহ সাহেব (রহ.) শরিয়তের পূর্ণ জ্ঞান অর্জনের পর তরিকতের উচ্চতর রূহানী শিক্ষা লাভ করেন। এই শিক্ষা তিনি ভারতের প্রসিদ্ধ রূহানী শিক্ষক হযরত হাফেজ হামেদ হাসান আজমগড়ী (রহ.) থেকে গ্রহণ করেন। পরিবারের মধ্যে তরিকতের ধারাবাহিকতা ছিল; বিশেষ করে চাচা মাওলানা ফয়েজ আহমদ (রহ.) আজমগড়ী হজরতের রূহানী মুরিদ ছিলেন।

পারিবারিক জীবন ও স্নেহময় বন্ধন

হযরত শাহ সাহেব (রহ.) ছিলেন দুইজন স্ত্রীসহ গৃহপরিচারিত। প্রথম স্ত্রী মোছাম্মৎ মাহমুদা খাতুন এর গর্ভে হযরত শাহ সাহেব (রহ.) দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তান লাভ করেন। সন্তানদের নাম যথাক্রমে: ১. হযরত শাহ জমাল আহমদ, ২. মোছাম্মৎ আমেনা বেগম, ৩. বহুদিন পরে জন্ম নেন আরও এক পুত্র, জাকের আহমদ; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৮ দিন পর তিনি ইন্তিকাল করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী মোছাম্মৎ জয়নব বেগম এর গর্ভে কোনো সন্তান সন্ততি হয়নি। প্রথম স্ত্রী মোছাম্মৎ মাহমুদা খাতুন ইন্তিকাল করেন ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ, ২০ এপ্রিল সোমবার, দুপুর ১টায় চট্টগ্রাম শহরের একটি ক্লিনিকে। তাকে দাফন করা হয় শাহ মঞ্জিল সংলগ্ন পূর্ব উত্তর পার্শ্বের কবরস্থানে। হযরত শাহ সাহেব (রহ.) এর ইন্তেকালের পরে দ্বিতীয় স্ত্রী মোছাম্মৎ জয়নব বেগমকে অন্যত্র বিবাহ দেওয়া হয়।

রূহানী জীবনের অববাহিকা: বনজঙ্গল ও ধ্যান

১৯৩৬—৩৭ খ্রিস্টাব্দে, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের কাচিন রাজ্যের ভামো শহরে অবস্থিত জামে মসজিদে অবস্থানকালে হযরত শাহ সাহেব (রহ.) শবে কদরের রাতে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন। এই অমোঘ ইলাহি প্রেমে বিভোর হয়ে তাঁকে গভীর সাধনায় নিমগ্ন করে। ধীরে ধীরে তাঁর ধ্যানমগ্নতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে নানান ঘটনা ঘটতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে হযরত আজমগড়ী (রহ.) বললেন: “তোমরা তাঁকে বাঁধে রাখো না; তিনি পাগল নন, একদিন স্বাভাবিক হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্য প্রাপ্তি দেখাবেন।” হযরত মাওলানা আবদুস সালাম আরকানী (রহ.) একাধিকবার মন্তব্য করেছিলেন: “হাফেজকে ছোট মনে করো না; একদিন তিনি স্বাভাবিক হয়ে পরিচয় দেবেন এবং বড় বুযুর্গের মর্যাদা লাভ করবেন।” এইভাবেই ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রায় ২০—২৫ বছর হযরত শাহ সাহেব সাংসারিক জীবন ত্যাগ করে ইরফানী সাধনায় নিমগ্ন থাকেন। তিনি পাহাড়—পর্বত, বনজঙ্গল, নদীর তীর, শহরতলি এবং শহর—বন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে, শীতে—গরমে, ঝড়—বৃষ্টিতে আল্লাহর জিকর (স্মরণ ও বন্দেগী) এবং হযরত রাসুল (স.) এর প্রশংসা করে বেড়াতেন।

পার্থিব সুখ—স্বাচ্ছন্দ্য তাঁকে কখনো প্রলোভন দিতে পারেনি। একাকীত্ব বরণ করে তিনি পরিপূর্ণ ধ্যান ও গভীর ইরফানী জীবনযাপন করতেন। হযরত শাহ সাহেব (রহ.) বছরের অধিকাংশ সময় রোযা রাখতেন। খাওয়া—দাওয়া ও পোশাকের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল অতি কম। ভক্তদের দেওয়া লুঙ্গি, কোরতা, জুতা ইত্যাদি, তিনি আল্লাহর রাসূল (স.) এর সুন্নাত অনুযায়ী গ্রহণ ও ব্যবহার করতেন। এ অবস্থাতেও সবসময় আলেমানা পোষাক পরিধান করতেন, কখনো মসজিদের বাইরে বসে হামদ ও নাত পড়তেন, ঝড়—বৃষ্টিতেও ছাতা ব্যবহার করতেন না। এক নির্দিষ্ট ধ্যানমগ্ন স্থানে পৌঁছলে তিনি মজজুব হাল—তে (আল্লাহর নৈকট্যে অত্যন্ত অভ্যস্ত ও মুগ্ধ অবস্থায়) প্রবেশ করতেন। তখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কষ্ট হতো, তবে একে একে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে আসতেন এবং আমৃত্যু পর্যন্ত মাঝে মাঝে জালালি হাল—তে থাকতেন। কখনো কখনো কয়েকদিন অব্যাহতভাবে একটানা ধ্যানমগ্ন থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর জীবনের অংশ ছিল। এভাবেই হযরত শাহ সাহেব (রহ.) পার্থিব জীবন থেকে সরাসরি পরিপূর্ণভাবে রূহানী জীবন ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। মজজুব হাল: ইসলামী সুফি পরিভাষায়, মজজুব হলো সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহর নৈকট্যে এতটাই বিমুগ্ধ ও অভ্যস্ত, যে পার্থিব জগৎ তাঁর জন্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তিনি স্বাভাবিক জীবনকর্মে অনায়াসে মনোযোগ দিতে পারেন না এবং প্রায়শই ধ্যানমগ্ন বা ইলাহী প্রেম—তে মগ্ন থাকেন।

হজ্বে গমন ও ইলাহী প্রেম

হযরত শাহ সাহেব (রহ.) জীবনে ছয়বার হজ্বব্রত পালন করেছেন— ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৭৪, ১৯৭৬, ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে। প্রতিটি হজ্ব ছিল তাঁর ইলাহী প্রেমের এক অনন্য প্রকাশ। পবিত্র মক্কা ও মদিনার ময়দানে তিনি তাওয়াফ, সাই, রুকু ও সিজদার মাধ্যমে হৃদয় ও আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ করেছেন এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করেছেন। এই পবিত্র যাত্রা ছিল শুধু শরীরের জন্য নয়, বরং তাঁর রূহানী অনুশীলনের এক গভীর অভিজ্ঞতা, যেখানে আত্মা ও মনন আল্লাহর ইরফানী জ্ঞানের আলোতে আলোকিত হয়েছে। ড. প্রফেসর নুরুল আলম স্মৃতিচারণ করেছেন— ১৯৭৯ সাল আমার জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায়।

আলহামদুলিল্লাহ, সেই বছর আল্লাহ আমাকে একদিকে পেশাগত সম্মান দান করেছিলেন, অন্যদিকে ইরফানী সৌভাগ্যে সিক্ত করেছিলেন। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি—এর অধীনে আমাকে হিসাবরক্ষণ ও ফাইন্যান্সের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, এবং আমার কর্মস্থল নির্ধারিত হয় নাইরোবি, কেনিয়ায়। পেশাগত জীবনের এই নতুন সূচনার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা আমাকে সেই বছর হজ্জ পালনের সুযোগও দান করেন। আমি কেনিয়া থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি, পবিত্র হজ্জ আদায়ের জন্য। তখন বায়তুল্লাহর পরিস্থিতি আজকের মতো সুবিন্যস্ত ছিল না। সুবিধা—অসুবিধা, কষ্ট ও সীমাবদ্ধতা সবই থাকত। কিন্তু সেই সমস্ত কষ্টই তখন এক অপার আনন্দে রূপ নিত, কারণ একই বছর হযরত শাহ সাহেব (রহ.)—ও হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় উপস্থিত ছিলেন।

তাঁর উপস্থিতি সেই হজ্জকে আমাদের জন্য দ্বিগুণ বরকতময় করে তুলেছিল। প্রতিদিন আসরের নামাজ শেষে শাহ সাহেব (রহ.) বাব—এ—উম্মে হানি নামক স্থানে বসতেন। এটি বাংলাদেশি হাজীদের মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত। শত শত মানুষ তাঁকে দেখার ও তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য সেখানে ভিড় করত। আমি যখনই সেখানে যেতাম, তাঁর দৃষ্টিতে এক অপার্থিব শান্তি ফুটে উঠত। যেন তিনি সদ্যোজাত নিষ্পাপ শিশুর মতো, সারাক্ষণ কাবাতুল্লাহর দিকে মনোযোগী। তাঁর চোখে, চেহারায় এবং নিঃশ্বাসে আল্লাহর প্রতি নিষ্পাপ ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা যেত। আমি নিজেকে সামলাতে না পেরে মনে মনে বলতাম— “সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর কী মহান বান্দা—যাঁর অন্তরে এত একনিষ্ঠতা, যে বায়তুল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যেন এক শিশু; প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি নীরবতা আল্লাহর প্রেমের সাক্ষ্য বহন করছে।” শাহ সাহেব (রহ.)—এর উপস্থিতিতে হজ্জ পালন করা আমার জন্য এক অনন্য সৌভাগ্য ছিল। তাঁর ইরফানী প্রভাব ও নিষ্পাপ দৃষ্টির বরকতে আমার অন্তর ভরে গিয়েছিল প্রশান্তি, ঈমান ও কৃতজ্ঞতায়। নিঃসন্দেহে এটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হজ্জ—এক বরকতময় স্মৃতি, যা আজও হৃদয়ের গভীরে জীবন্ত। আলহামদুলিল্লাহ!

শাহ সাহেব (রহ.)—এর সাথে তাহাজ্জুদ নামাজের স্মরণীয় রাত

ড. প্রফেসর নুরুল আলম স্মৃতিচারণ করেছেন—এক সময় আমার জীবনের সবচেয়ে ইরফানী ও অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি ঘটে। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর অশেষ রহমতে আমাকে সেই সৌভাগ্য দান করেছিলেন। হযরত শাহ সাহেব (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত নিয়মিত ইবাদতকারী মানুষ। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি প্রতিদিন তাহাজ্জুদ নামাজও আদায় করতেন। এক রাতে আল্লাহর কৃপায় আমি কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর সঙ্গে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। যখন আমরা নামাজে দাঁড়ালাম, হঠাৎ তিনি মুখ ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন এবং বিশেষ দোয়া করলেন। তাঁর সেই মুহূর্তের দোয়া আজও আমার কানে বাজে—অতুলনীয় আন্তরিকতা এবং রহমতের আবেশে ভরা।

আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি কী অদ্ভুত বিনয় ও আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে আল্লাহর সামনে স্থির। তাঁর চোখে, দেহভঙ্গিতে এবং নীরবতায় ফুটে উঠছিল এক নিষ্ঠাবান আল্লাহপ্রেমীর প্রতিচ্ছবি। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইরফানী জগতে হারিয়ে গিয়েছেন, আর প্রতিটি অশ্রুবিন্দু আল্লাহর দরবারে সিজদাহ করছে। পরে, যখনই আমি এই ঘটনা স্মরণ করতাম বা অন্যদেরকে বলতাম, আমার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যেত। আমি নিজেও কেঁদে ফেলতাম ভেবে যে কীভাবে একজন আল্লাহপ্রেমী বান্দা তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহর সামনে এত বিনয়, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা নিয়ে দাঁড়াতে পারেন। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের এই অবস্থা শুধু দেখা নয়, তাদের কাছাকাছি থাকা এবং তাদের ইবাদতের ঘ্রাণ পাওয়াও এক অমূল্য নিয়ামত।

ভারত সফর ও রূহানী সংযোগ

হযরত শাহ সাহেব (রহ.) জীবনে দুইবার ভারত সফর করেছেন। তবে বৃটিশ আমলে কলকাতা আলিয়া মাদরাসার ছাত্র হিসেবে কলকাতায় যাওয়া—আসা স্বাভাবিক ছিল। পাকিস্তান আমল পেরিয়ে বাংলাদেশে তাঁর কার্যকালীন সময়ে তিনি দুইবার ভারত সফরে গমন করেন। প্রথম সফরটি ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে হজ্ব পালনকালে ছিল। এই সফরে তিনি দিল্লী থেকে সৌদি আরবের ভিসা গ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারত গমন করেছিলেন। দ্বিতীয় সফরটি ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে শুধুমাত্র ভারত দর্শনের উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়। দিল্লীতে অবস্থানকালে হযরত শাহ সাহেব দিল্লী জামে মসজিদে নামাজ পড়েন এবং মসজিদের ইমাম সাহেবের সঙ্গে রূহানী আলাপচারিতা করেন। এছাড়া তিনি দিল্লীতে বেশ কয়েকজন মহান আল্লাহর ওলী ও মাশায়েখের মাজার জিয়ারত করেছেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে— হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.), হযরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.), হযরত হামিদ উদ্দিন নাগুরী (রহ.), হযরত নাসির উদ্দিন চেরাগে দেহলভী (রহ.), হযরত আবদুর রহমান জামী (রহ.), দ্বিতীয় সফরে তিনি বিশেষভাবে জিয়ারত করেন— দাদাপীর হযরত সৈয়দ আবদুল বারী (রহ.) এবং রূহানী শিক্ষক হাফেজ হামেদ হাসান আজমগড়ী এই জিয়ারতসমূহ হযরত শাহ সাহেবের রূহানী বিকাশ ও ইলাহী নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রতিটি মাজারে তিনি মাশায়েখদের বারকত এবং রূহানী দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতেন, যা তাঁর রূহানী যাত্রাকে সমৃদ্ধ করেছে। ভারত সফরের সময় হযরত শাহ সাহেব (রহ.) শুধুমাত্র ইসলামী শিক্ষা ও রূহানী বিকাশের জন্য নয়, বৈশ্বিক রূহানী সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং রূহানী প্রেরণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

সিরাতুন্নবী মাহফিল: রূহানী উদ্দীপনা ও শিক্ষার মেলবন্ধন

স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে হযরত শাহ সাহেব (রহ.) ঐতিহাসিক সিরাতুন্নবী মাহফিল চালু করেন। আজকের দিনেও এই মাহফিল প্রতি বছর ১৯ দিনব্যাপী ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। মাহফিলে বৈশ্বিক এবং দেশীয় ইসলামিক স্কলার, চিন্তাবিদ, লেখক, গবেষক, আলেম ও উলামা, পীর—মাশায়েখ, রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা সহ সকল শ্রেণীর শিক্ষিত ও রূহানী আগ্রহী মানুষ অংশগ্রহণ করেন। হযরত শাহ সাহেব বিশেষভাবে ১৯ দিনের প্রতিটি আলোচনার জন্য বিষয়ভিত্তিক আলেমদের দাওয়াত দিতেন, এমনকি আন্তর্জাতিক স্কলারদেরও আমন্ত্রণ জানাতেন। মাহফিলের আয়োজনের প্রতিটি বিষয় তাঁর গভীর ভেবেচিন্তে পরিকল্পিত হত। খাবারের ব্যবস্থা ছিল সুবিন্যস্ত—সকল অতিথির জন্য পর্যাপ্ত, এমনকি শিশু ও মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হতো। মহিলাদের জন্য সকল সুযোগ—সুবিধা সম্পূর্ণ আলাদা ও নিরাপদ পরিবেশে নিশ্চিত করা হত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারেন। সিরাতুন্নবী মাহফিল শুধুমাত্র ধর্মীয় আলোচনা বা অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল রূহানী উজ্জীবন, শিক্ষণীয় সংযোগ এবং ইসলামী ঐতিহ্যের জীবন্ত উদাহরণ, যেখানে হযরত শাহ সাহেব (রহ.) সকলের জন্য এক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানবাণী সংযোজিত করতেন।

বিশেষ রূহানী অনুষ্ঠানসমূহ

হযরত শাহ সাহেব (রহ.) জীবদ্দশায় কিছু বিশেষ রূহানী অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন, যা আজও ধারাবাহিকভাবে পালন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: মেরাজুন্নবী: হযরত মুহাম্মদ (স.)—এর আকাশভ্রমণের স্মরণে আয়োজন। শবেবরাত: অতিরিক্ত ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য প্রার্থনার রাত। শবেকদর: রাত যখন আল্লাহর রহমত বিশেষভাবে নাযিল হয়। আশুরা: হযরত হুসাইন (রহ.)—এর ত্যাগ ও ইসলামের প্রতি অনুগত্য স্মরণে। ফাতেহা—ই—ইয়াজদাহম: বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)’র জন্য ফাতেহা পাঠ ও দোয়া। প্রতি বছর সফর মাসের ২৩ তারিখে শাহ সাহেবের “ইসালে সাওয়াব মাহফিল” অনুষ্ঠিত হয়।

দৃষ্টিহীনতা ও অসীম ধৈর্য

১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ৪ আগস্ট, সোমবার, রমজান মাসে হযরত শাহ সাহেব (রহ.) আরকান মহাসড়কে একটি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন, যার ফলে তিনি দুটি চোখের দৃষ্টি হারান। এই পরিস্থিতিতে তিনি প্রায় তিন বছর পর্যন্ত হায়াতে ছিলেন, কিন্তু তাঁর ধৈর্য, মনোবল ও রূহানী দৃঢ়তা অপরিসীম। অবিশ্বাস্য হলেও, দৃষ্টিহীনতার পরও তাঁর চলাফেরা, কথাবার্তা ও দৈনন্দিন কার্যক্রম ছিল সযত্ন এবং স্বাভাবিক মানুষের মতো। তিনি দেখিয়েছেন, রূহানী শক্তি ও আল্লাহর নৈকট্য দৃষ্টিশক্তি হারানো সত্ত্বেও জীবনের গুণমান, ভক্তি ও সাধনায় কখনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

শাহ সাহেব হযরত—এর প্রিয় কাসিদা: নবীজীর প্রতি অগাধ রূহানী প্রেম:

হযরত শাহ সাহেব (রহ.)—এর অন্তরের গভীরে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—এর প্রতি যে অগাধ রূহানী প্রেম বিরাজমান ছিল, তার এক জীবন্ত প্রকাশ এই কাসিদা। তিনি প্রায়ই এটি পাঠ করতেন এবং শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করত তাঁর কণ্ঠস্বর। প্রতিটি চরণে নবীর প্রতি উম্মতের প্রেম, আনুগত্য ও শাফায়াতের আশা ধ্বনিত হয়েছে।

নিচে কাসিদার চরণগুলো উচ্চারণসহ বাংলা অর্থ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো—

  • ১. হাম মাজারে মুহাম্মদ (দ.) পে মর জায়েঙ্গে (আমরা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—এর মাজারে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেব। নবীর দরগাহে আত্মনিয়োগই জীবনের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য),
  • ২. জিন্দেগি মে ইয়াহি কাম কর জায়েঙ্গে (জীবনভর আমরা এই কাজকে সর্বোচ্চ কর্তব্য ভাবব। নবীর পথে জীবন উৎসর্গ করাই জীবনের প্রধান লক্ষ্য)
  • ৩. আরসা—এ হাশর মে দহুম হোগী বড়ী (কিয়ামতের ময়দানে উঠবে এক মহাসমারোহ ধ্বনি। হাশরের দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—এর মহিমা ও শাফায়াতের সাড়া মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়বে),
  • ৪. হুর ও গিলমান মিলকর খুশী মনায়েঙ্গে (জান্নাতের হুর ও গিলমান আনন্দে মেতে উঠবে। স্বর্গীয় সুখের দৃশ্য, যেখানে নবীর উম্মত মিলিত আনন্দ উপভোগ করবে)
  • ৫. খুলদ মে যখন শাহে বেহর—ও—বর জায়েঙ্গে (যখন সমগ্র জগতের সম্রাট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতে প্রবেশ করবেন। এটি নবীর সর্বোচ্চ মর্যাদার নিদর্শন),
  • ৬. বখশওয়ানে কো উম্মত কি জরম ও খতা (উম্মতের ভুল ও অপরাধ ক্ষমা করাবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের পক্ষ থেকে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন),
  • ৭. তাজ পেহনে শাফায়াত কা রোজ—এ জজা (কিয়ামতের দিনে তাঁর মাথায় শাফায়াতের মুকুট শোভিত হবে। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতের রক্ষাকর্তা হবেন),
  • ৮. পেশ মাবুদ খায়েরুল বাশার জায়েঙ্গে (তিনি যাবেন আল্লাহর দরবারে, যিনি মানবকুলের শ্রেষ্ঠ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের প্রতিনিধি হবেন),
  • ৯. আম্বিয়া আউলিয়া হোঙ্গে সব সাথ সাথ (সকল নবী ও ওলিয়া তাঁর সঙ্গে থাকবেন। হাশরের ময়দানে পবিত্র আত্মারা মিলিত হবেন),
  • ১০. লেতি জায়েগি রহমত বালা সাথ সাথ (আল্লাহর রহমতও সমানভাবে প্রবাহিত হবে। নবীর উম্মত আল্লাহর অনুগ্রহ ও শান্তির সান্নিধ্যে থাকবে),
  • ১১. হাশর মে মেরে মাওলা জিদ্হর জায়েঙ্গে (হাশরের দিনে আমার প্রিয় নবী যেদিকে যাবেন। তাঁর অনুসরণই আমাদের একমাত্র আশ্রয়),
  • ১২. নূর লাগানা জিনে ইয়ে রঞ্জ হুমেঁ (তাঁর নূরের ছোঁয়া ছাড়া এই দুঃখ আমাদের সহ্য হয় না। নবীর দৃষ্টি ভক্তের জন্য শান্তি ও প্রেরণা)
  • ১৩. গর বালায়েঁ না আকা মাদীনে হুমেঁ। (যদি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মদিনায় ডাকেন না। নবীর সান্নিধ্যের তৃষ্ণা ভক্তের জীবনের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা।),
  • ১৪. হিন্দু মে জান সে হাম গুজর জায়েঙ্গে (ভারতে থেকেও আমরা প্রাণ বিসর্জন দেব। নবীর প্রতি প্রেম কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয়—যেখানেই থাকি তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গ করব)।

ড. নুরুল আলমের স্মৃতিচারণ: চুনতির শাহ সাহেব (রহ.)—এর রূহানী অভিজ্ঞতা

ড. প্রফেসর নুরুল আলম স্মৃতিচারণ করেছেন—হযরত বড় হুজুর কেবলা (রহ.)—এর ইন্তেকালের পর সময়টা আমার জন্য ছিল অত্যন্ত কষ্টের। মনে পড়ে, সম্ভবত ১৯৭৭ সালের কোনো একদিন। সেদিন ঢাকায় খবর পেলাম যে শাহ সাহেব (রহ.) তাঁর এক প্রিয়জনের বাসায় অবস্থান করছেন। খবর শুনেই হৃদয় টানল তাঁকে দেখার জন্য। দ্রুত ছুটে গেলাম সেখানে। দরজায় পৌঁছে সালাম দেওয়ার পরপরই চোখের জল বাঁধ মানল না। বুক ভেঙে কান্নায় ভেসে উঠলাম—“বড় হুজুর কেবলা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন!” ব্যথায় ভরা কণ্ঠে কথাগুলো বেরিয়ে এলো। শাহ সাহেব (রহ.) আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাঁর চোখেও গভীর বেদনার ছাপ। সেই মুহূর্তের ইরফানী পরিবেশ আমি আজও ভুলতে পারিনি। এরপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার সবক কোথায়?” উত্তর প্রদান করলে তিনি বলেন, “এখানে মুরাকাবা কর, আল্লাহর ফেরেশতারা এখানেই আসবে!” এই কথাগুলো আমার অন্তরকে নতুন আলোয় ভরিয়ে দিল। আল্লাহর প্রিয় বান্দার মুখ থেকে ফেরেশতাদের আগমনের সংবাদ শোনা ছিল আমার জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সেই মুহূর্তে মনে হলো আকাশের দরজা খুলে গেছে, আর রহমতের স্রোত নেমে আসছে। সুবহানাল্লাহ! এমন মুহূর্ত, যেখানে দুঃখ ও কষ্ট মিলেমিশে রূহানী আনন্দে পরিণত হয়, তার আভা আজও আমার হৃদয়ে জ্বলজ্বল করে।

হযরত শাহ সাহেব (রহ.)—দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি

হযরত শাহ সাহেব (রহ.) প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বিনয় ও ধ্যানমগ্ন হয়ে আদায় করতেন। নফল ও সুন্নাত নামাজও নিয়মিত পড়তেন। পকেটে তাসবীহ রেখে দরূদ শরিফ পাঠ করতেন এবং নামাজের পর মসনুন দোয়া আদায় করতেন। তিনি কুরআন মুখস্থ পড়তেন, মাঝে মাঝে উচ্চস্বরে তেলাওয়াত করতেন। প্রিয় সূরা ছিল ফাতাহ, বিশেষভাবে ২৮ ও ২৯ নম্বর আয়াত। হাদিস ও কুরআনের তাফসীরের মাধ্যমে শিক্ষাদান করতেন। একাকী সময় ধ্যান ও মোরাকাবায় লিপ্ত থাকতেন, কখনো এক বা দেড় দিনও একাকী থাকতেন। সকাল বা রাতের নির্জন সময়ে একাকী প্রার্থনায় যেতেন। পারিবারিক ও ভক্তবৃন্দের সঙ্গে সদালাপী ও মমত্বপূর্ণ ছিলেন, সকলকে প্রাণ খুলে দোয়া করতেন এবং বলতেন, “ছোট ছোট প্রাণকেও দোয়া করতে হবে, তারা আল্লাহর সৃষ্টি।”

হযরত বড় হুজুর কেবলা (রহ.)—এর প্রতি শাহ সাহেব (রহ.)—এর অটুট শ্রদ্ধা

ড. প্রফেসর নুরুল আলম স্মৃতিচারণ করেছেন— শাহ সাহেব (রহ.) সর্বদা হযরত বড় হুজুর মাওলানা আবদুল মজিদ (রহ.)—এর প্রতি এক অগাধ ভক্তি ও গভীর শ্রদ্ধা ধারণ করতেন। তিনি বড় হুজুরের ইবাদাতের সর্বোচ্চ প্রশংসা করতেন এবং কোনো ধরনের সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না। একবার চুনতিতে আমি তাঁকে সালাম দিতে গিয়েছিলাম; তখন তিনি মজজুব হালতে ছিলেন। কিন্তু কেউ বড় হুজুরের (রহ.) কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করলে শাহ সাহেব (রহ.) তীব্র রাগ প্রকাশ করলেন এবং বললেন, “যে সমালোচনা করছে, বড় হুজুরের একটি কলবের সবকের সমান তার পুরো জীবনের ইবাদাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায়, বড় হুজুর (রহ.)—এর প্রতি শাহ সাহেবের (রহ.) ভক্তি ছিল নিখাদ, নিঃস্বার্থ ও পূর্ণ ইরফানীতা দ্বারা অনন্য। একবার হজ্জ থেকে ফিরে তিনি ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “আল্লাহ পাক মাওলানা আবদুল মজিদকে অগাধ ভালোবাসেন, তাই মদীনাতুল মুনাওয়ারায় একটি দরজার নাম রাখা হয়েছে ‘বাব—এ—আবদুল মজিদ’। সুবহানাল্লাহ!” বড় হুজুর কেবলা (রহ.)—এর ইন্তিকালের দিনে, শাহ সাহেব (রহ.) ভক্তদের বললেন, “সকলি, গারাংগিয়া চলে যাও।” তখন মাত্র সকাল হয়েছে মাত্র। সেদিন সকাল ৮টায় বড় হুজুর ইন্তিকাল করেন। তৎপর তিনি জানাজার নামাজে অংশ নিলেন। নামাজ শেষে ফেরার পথে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলছিলেন, “তোমরা তো নিচে দেখতে পারছ, অথচ আসমানে কী ঘটছে তা বোঝা যাচ্ছে না।” সুবহানাল্লাহ! এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে শাহ সাহেব (রহ.)—এর হৃদয়ে হযরত বড় হুজুর কেবলা (রহ.)—এর প্রতি এক বিশেষ, অটুট ও চিরস্থায়ী রূহানী শ্রদ্ধা বিরাজ করত। এই শ্রদ্ধা ছিল নিখাদ ভক্তি, যার প্রতিফলন তাঁর প্রতিটি ভাব, কথা এবং কাজের মধ্যে স্পষ্ট দেখা যেত।

মিলাদুন্নবী মাহফিলের প্রতি হযরত শাহ সাহেব (রহ.)—এর অনন্য শ্রদ্ধা

ড. প্রফেসর নুরুল আলম স্মৃতিচারণ করেছেন— ১৯৭৬ সালে আমি পটিয়া ডিগ্রি কলেজে শিক্ষকতা করছিলাম। পটিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর খুরশীদ আলম। তিনি পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসের মাহাত্ম্যে এক মিলাদুন্নবী মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন, যা পটিয়া হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। মাহফিলের জন্য আল্লাহর প্রিয়বান্দা ও রূহানী মহাপুরুষদের আমন্ত্রণ জানানোর দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছিল। যাঁদের মধ্যে ছিলেন গারাংগিয়া দরবার শরীফের মাওলানা আবদুল মজিদ (রহ.), চুনতি শাহ মঞ্জিলের মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.) এবং কুতুব শরীফ দরবারের মাওলানা শাহ আবদুল মালেক আল—কুতুবী (রহ.)। সৌভাগ্যের বিষয়, খবর পেলাম চুনতির শাহ সাহেব হযরত তখন চট্টগ্রাম শহরেই অবস্থান করছেন। এতে আমি ভীষণ আনন্দিত হলাম, কারণ তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আর দূরে চুনতিতে যেতে হবে না। তিনি শহরের এক প্রিয়জনের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

আমি সেখানে গিয়ে তাঁকে সরাসরি আমন্ত্রণ জানানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু দেখলাম, অনেক খ্যাতনামা আলেম—ওলামা তাঁকে ঘিরে আছেন। ফলে আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হলো না। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বারদোনা সাতকানিয়ার প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আমীনুল্লাহ সাহেবও। আমি কিছুটা হতাশ মনে বাইরে বসে রইলাম। ঠিক সেই সময় হঠাৎ দেখি, শাহ সাহেব (রহ.) নিজেই বাইরে অপেক্ষমাণ কক্ষে চলে এলেন এবং সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বললেন। মুহূর্তেই আমার মন আনন্দে ভরে উঠল। আমি তাঁকে মাহফিলে আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি সস্নেহে দোয়া করলেন এবং মাহফিলের জন্য অনুদান হিসেবে কিছু টাকা আমাকে প্রদান করলেন। অবশেষে আমি তাঁর দোয়া ও আশীর্বাদ গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করলাম। সেদিন আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম—মিলাদুন্নবী মাহফিলের প্রতি তাঁর গভীর ভক্তি, আন্তরিক ভালোবাসা এবং অনন্য শ্রদ্ধা।

ইবাদতের নীড়: মসজিদে বায়তুল্লাহ সীরত ময়দান জামে মসজিদ

১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে শাহ সাহেব (রহ.) প্রতিষ্ঠা করেন ‘মসজিদে বায়তুল্লাহ সীরত ময়দান জামে মসজিদ’। সূচনালগ্নে এটি ছিল অতি সাধারণ কাঠামো—বাঁশের খুঁটি, ছনের ছাউনি ও তলের বেড়া দিয়ে নির্মিত। কিন্তু শাহ সাহেবের রূহানী দৃষ্টি ও ইলাহী অনুপ্রেরণার ফলেই এই সাধারণ কুঁড়েঘরের মতো মসজিদ আজ পরিণত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ পাকা স্থাপনায়। মুমিন—মুসলমানদের সালাত, যিকর এবং সীরাতুন্নবীর আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল—একটি এমন ইবাদতের কেন্দ্র গড়ে তোলা, যেখানে আল্লাহর স্মরণ, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর সীরাতচর্চা এবং ইসলামী ঐক্যচেতনা বিকশিত হবে। আজও এই মসজিদে প্রতিদিন মুসল্লিগণ সমবেত হন, এখানে প্রতিধ্বনিত হয় তাওহীদের আহ্বান এবং সীরাতের আলোচনার সুবাস। শাহ সাহেবের রেখে যাওয়া এ নেক আমল তাঁর জন্য সাদাকায়ে জারিয়া হয়ে আছে।

চুনতীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাতাকনিয়া কলেজের প্রতি দরদ

হযরত শাহ সাহেব (রহ.) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি গভীর যত্ন ও দরদ রাখতেন। কোনো প্রতিষ্ঠানে দাওয়াত পেলে তিনি তা গ্রহণ করতেন এবং প্রয়োজনে নিজের পকেট থেকে অর্থ ব্যয় করতেন। চুনতী হাকিমিয়া আলিয়া, চুনতী হাকিমিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, চুনতী উচ্চ বিদ্যালয়, চুনতী মহিলা কলেজ এবং সাতকানিয়া কলেজের কর্মকাণ্ডে তিনি নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। সময় পেলেই অফিসে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি পরিদর্শন করতেন; কখনও অল্পক্ষণ, কখনও দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতেন। মাহফিলে সীরাতুন্নবী (স.) বা অন্য সময় দেশের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ হযরত শাহ সাহেবের মোলাকাতে চুনতী গেলে, অনেকে চুনতী মাদরাসা ছাড়াও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতেন। এই পরিদর্শন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চুনতী ফাতেমা বতুল মহিলা মাদরাসা হযরত শাহ সাহেবের ইন্তিকাল পরবর্তী প্রতিষ্ঠা হলেও, এটি অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো সমাজে শিক্ষার প্রসারে অবদান রাখছে।

ইন্তিকালের মুহূর্ত

১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৯ নভেম্বর, রাত ১২:১৫ মিনিটে হযরত শাহ সাহেব (রহ.) ইন্তিকাল করেন। শেষ শব্দ ছিল— “লা—ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (দ.)”, যা তাঁর জীবন ও রূহানীর সমাপ্তি ও আল্লাহর নৈকট্যের সূচনা।

শিক্ষণীয় পাঠ

শাহ সাহেবের জীবন আমাদের সামনে সেই বাস্তব দৃষ্টান্ত হাজির করে, যেখানে ইমান, খিদমত ও সত্যনিষ্ঠা মিলেমিশে আলোকিত জীবন গড়ে তোলে।

তথ্যসূত্র,

  • ১. ড. প্রফেসর নুরুল আলম, ইয়র্কভিল বিশ্ববিদ্যালয়, টরন্টো, কানাডা।
  • ২. হযরত শাহ সাহেব (রহ.), আহমদুল ইসলাম চৌধুরী।
আরো পড়ুনঃ