নীরবতার জন্ম (ধারাবাহিক পর্ব—১)

নীরবতার জন্ম (ধারাবাহিক পর্ব—১)

১- নীরবতার জন্ম:

নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়। নীরবতা হলো শব্দের পূর্বজন্ম। যেখানে ভাব জন্ম নেয়, অনুভব দানা বাঁধে, আর চেতনা ধীরে ধীরে নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়। মানুষ জন্মায় কান্না নিয়ে, কিন্তু জীবনের পরতে পরতে সে শিখে নেয় নীরবতা। কারণ প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর শব্দে মেলে না। কিছু উত্তর থাকে শ্বাসের গভীরে, হৃদয়ের অদৃশ্য প্রকোষ্ঠে, যেখানে প্রবেশের জন্য কোনো দরজা নেই—শুধু ধ্যান।

আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল এক গভীর নীরব সন্ধ্যায়। চারদিকে ছিল মানুষের ভিড়, কোলাহল, ব্যস্ততার অস্থির ঢেউ—তবু আমার ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা। মনে হচ্ছিল, আমি আছি, অথচ নেই। আমি হাঁটছি, অথচ এগোচ্ছি না। আমি শ্বাস নিচ্ছি, অথচ বেঁচে নেই। সেই সন্ধ্যায় প্রথম বুঝলাম— জীবন মানে কেবল টিকে থাকা নয়, জীবন মানে উপলব্ধি।

আমার চারপাশে যারা ছিল, তারা সবাই কিছু না কিছু হয়ে উঠতে চাইছিল—কেউ বড়, কেউ সফল, কেউ ধনী, কেউ বিখ্যাত। অথচ কেউ হতে চাইছিল না সম্পূর্ণ মানুষ। আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম— আমি কী চাই? উত্তর এলো না। কিন্তু সেই অনুত্তরই আমাকে ঠেলে দিল ধ্যানের পথে। ধ্যান মানে চোখ বন্ধ করা নয়। ধ্যান মানে চোখ খুলে নিজের ভেতর তাকানো।

প্রথম দিন বসে ছিলাম অনেকক্ষণ। মাথার ভেতর হাজার চিন্তা। স্মৃতি, অনুশোচনা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল জনপদ। আমি পালাতে চাইলাম, কিন্তু বুঝলাম—যেখানেই পালাই, নিজের কাছ থেকেই তো পালাচ্ছি। তাই বসে রইলাম। শ্বাসের ওঠানামা লক্ষ করলাম। হৃদস্পন্দনের ধাক্কা শুনলাম। মনের ভেতর জমে থাকা কোলাহলকে অনুমতি দিলাম উচ্চারিত হতে। ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল। চিন্তারা ক্লান্ত হলো। ভয়গুলো নীরব হলো। স্মৃতিরা ম্লান হয়ে গেল। আর সেই শূন্যতার বুক চিরে জন্ম নিল এক শান্ত আলো।

আমি বুঝলাম— এই আলোই চেতনা। এই আলোই আত্মা। এই আলোই ঈশ্বর—যার কোনো ধর্ম নেই, কোনো সীমা নেই, কোনো নাম নেই। সেই দিন থেকেই আমার যাত্রা। নিজেকে জানার যাত্রা। নিজেকে ভাঙার যাত্রা। নিজেকে নতুন করে গড়ার যাত্রা। কারণ মানুষ ভাঙে বলেই মানুষ হয়। আর যে ভাঙতে শেখে না, সে কেবল জীবিত থাকে—বেঁচে থাকে না। এই গ্রন্থ সেই ভাঙনের কাহিনি। এই গ্রন্থ সেই নীরব অভিযাত্রা। এই গ্রন্থ সেই প্রেম—যা কারো প্রতি নয়, সমস্ত অস্তিত্বের প্রতি।

চলবে…

লেখক: ফরহাদ ইবনে রেহান
বই: নিজের পথে-নীরবতার যাত্রা

» নীরবতার জন্ম (সবগুলা পর্ব)

আরো পড়ুনঃ