ধর্মের জন্ম কোনো সত্যের উপলব্ধি থেকে হয়নি।

ধর্মের জন্ম কোনো সত্যের উপলব্ধি থেকে হয়নি।

ধর্ম – ভয় থেকে জন্ম, শাসনে পরিণতি। ধর্মের জন্ম কোনো সত্যের উপলব্ধি থেকে হয়নি। ধর্মের জন্ম হয়েছে মানুষের গভীরতম ভয় থেকে। মৃত্যুর ভয়। অজানার ভয়। একাকীত্বের ভয়। অর্থহীনতার ভয়। মানুষ যখন এই ভয়গুলোর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেনি, তখন সে কল্পনা করেছে এক অতিমানবীয় সত্তা—যে তাকে রক্ষা করবে, পথ দেখাবে, আশ্রয় দেবে। এই কল্পনাই ধীরে ধীরে ঈশ্বর হয়ে উঠেছে, আর ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ধর্ম। ধর্ম তাই প্রথমে ছিল সান্ত্বনার ভাষা।

কিন্তু খুব দ্রুত তা ক্ষমতার ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। যেখানে ভয় আছে, সেখানে নিয়ন্ত্রণ সহজ। যেখানে নিয়ন্ত্রণ সহজ, সেখানে শাসন অনিবার্য। এই সহজ সূত্র ধরেই ধর্ম পরিণত হয়েছে শাসনব্যবস্থায়। ধর্ম মানুষের অস্তিত্বকে দুই ভাগে ভাগ করেছে—পবিত্র ও অপবিত্র। এই বিভাজনই সকল সহিংসতার মূল। মানুষ যখন কাউকে অপবিত্র ঘোষণা করে, তখন তাকে আঘাত করা সহজ হয়ে যায়। কারণ তখন সে আর মানুষ থাকে না—সে হয়ে ওঠে শত্রু, পাপী, অধম। এই বিভাজনের মাধ্যমেই ধর্ম যুগে যুগে যুদ্ধ, হত্যা, নির্যাতন, দমন ও গণহত্যাকে বৈধতা দিয়েছে।

ধর্ম বলেছে—“আমরা সত্য, তারা মিথ্যা।” এই একটি বাক্যই লক্ষ লক্ষ প্রাণের মৃত্যু ডেকে এনেছে। ধর্ম মানুষকে ভয় দেখিয়ে শাসন করে। নরকের ভয়। পাপের ভয়। ঈশ্বরের ক্রোধের ভয়। এই ভয়গুলো মানুষকে অন্তর থেকে দুর্বল করে দেয়। দুর্বল মানুষ প্রশ্ন করে না। দুর্বল মানুষ প্রতিবাদ করে না। দুর্বল মানুষ শাসকের আদেশ মেনে নেয়। এই দুর্বলতার উপর দাঁড়িয়েই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ক্ষমতা ধরে রেখেছে। ধর্মীয় শাসন রাজনৈতিক শাসনের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ রাজনৈতিক শাসন বাহ্যিক—তুমি জানো তুমি শাসিত। কিন্তু ধর্মীয় শাসন অন্তর্গত—তুমি জানো না তুমি বন্দী। তোমার চিন্তা, তোমার ভয়, তোমার নৈতিকতা, তোমার অপরাধবোধ—সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় ধর্মীয় কাঠামোর মাধ্যমে। এটাই প্রকৃত দাসত্ব।

ধর্ম মানুষকে শেখায়—বিশ্বাস করো, বোঝার দরকার নেই। কিন্তু বিশ্বাস মানেই চিন্তার মৃত্যু। যেখানে বিশ্বাস, সেখানে অনুসন্ধান নেই। যেখানে অনুসন্ধান নেই, সেখানে উপলব্ধি নেই। যেখানে উপলব্ধি নেই, সেখানে কেবল অনুকরণ। মানুষ তখন যান্ত্রিক হয়ে ওঠে—প্রার্থনা করে, নিয়ম মানে, আচরণ পালন করে—কিন্তু জানে না কেন। এই যান্ত্রিকতা থেকেই জন্ম নেয় ভণ্ডামি। বাইরে পবিত্র, ভেতরে অসততা। বাইরে নৈতিক, ভেতরে দমন। বাইরে ধার্মিক, ভেতরে হিংসা।

ধর্ম মানুষের প্রকৃত রূপকে ঢেকে দেয় এক পবিত্র মুখোশে। ধর্ম কখনো মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করতে চায়নি। সে চেয়েছে তা লুকিয়ে রাখতে। কারণ যে নিজের অন্ধকারকে চেনে, সে আর সহজে শাসিত হয় না। ধর্ম তাই বলেছে—“পাপ করো না।” কিন্তু বলেনি—“পাপ কেন জন্মায় তা বোঝো।” সে নিষেধ করেছে, কিন্তু ব্যাখ্যা দেয়নি। সে শাস্তি দিয়েছে, কিন্তু সচেতনতা জাগায়নি। এই কারণেই ধর্ম নৈতিক মানুষ তৈরি করতে পারেনি—শুধু ভীত মানুষ তৈরি করেছে। প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা ধর্মের বিপরীত পথে হাঁটে। এটি বলে—নিজেকে জানো। নিজের ভয়কে দেখো। নিজের লোভকে বোঝো। নিজের অন্ধকারকে আলোকিত করো। যেখানে সচেতনতা, সেখানে নৈতিকতা স্বতঃস্ফূর্ত। যেখানে সচেতনতা, সেখানে আইন অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু ধর্ম সচেতন মানুষ চায় না—সে চায় অনুগত মানুষ।

ধর্ম মানুষকে ভবিষ্যতের স্বর্গ দেখিয়ে বর্তমানকে বিসর্জন দিতে শেখায়। সে বলে—“এই জীবনে কষ্ট সহ্য করো, পরকালে সুখ পাবে।” এই ভাবনা শাসকদের জন্য আশীর্বাদ। কারণ এতে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না। সে সব কষ্টকে ঈশ্বরের পরীক্ষা বলে মেনে নেয়। এইভাবেই ধর্ম অন্যায়কে পবিত্র করে তোলে। প্রকৃত মুক্তি কোনো পরকালের প্রতিশ্রুতি নয়। প্রকৃত মুক্তি এই মুহূর্তের জাগরণ। এই জীবনই ক্ষেত্র। এই দেহই মন্দির। এই চেতনাই উপাসনা। যে এই মুহূর্তকে সচেতনভাবে বাঁচে, তার আর কোনো ধর্মের প্রয়োজন হয় না। তার জীবনই তার প্রার্থনা। তার শ্বাসই তার মন্ত্র। তার উপস্থিতিই তার উপাসনা।

ধর্ম ভাঙা মানে ঈশ্বর অস্বীকার নয়। ধর্ম ভাঙা মানে ভয়ের ভিত্তিতে নির্মিত কাঠামো ভাঙা। ধর্ম ভাঙা মানে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া। ধর্ম ভাঙা মানে আত্মাকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা। যেদিন মানুষ ধর্ম ছাড়িয়ে আধ্যাত্মিকতায় প্রবেশ করবে, সেদিন পৃথিবী প্রথমবারের মতো শান্তির স্বাদ পাবে। কারণ তখন আর “আমার ঈশ্বর” ও “তোমার ঈশ্বর” থাকবে না— থাকবে কেবল এক বিস্তৃত চেতনা, এক অখণ্ড মানবতা।

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ