জীবনে বন্ধন এড়ানো যায় না।
জীবনে বন্ধন এড়ানো যায় না। আমরা সবাই কোনো না কোনো সম্পর্কের মধ্যে বাঁধা পড়ি পরিবার, কাজ, অভ্যাস, ইচ্ছা, ভয়, আশা। কিন্তু এই বন্ধনগুলো সব এক রকম নয়। কিছু বন্ধন আমাদেরকে ঘুরপাক খাওয়ায়, সীমাবদ্ধ করে রাখে, জীবনকে একটা অবিরাম চক্রে পরিণত করে। আবার কিছু বন্ধন আমাদেরকে সেই চক্র থেকে বের করে আনে, মনকে প্রসারিত করে, নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। এই দুই ধরনের বন্ধনের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রথম ধরনের বন্ধন হলো আবদ্ধতার বন্ধন। এটা এমন সম্পর্ক বা অভ্যাস যা আমাদেরকে ছোট রাখে। এতে অহংকার, লোভ, ভয়, অভিমান, অতিরিক্ত আশক্তি মিশে থাকে। এই বন্ধন যেন একটা চড়কা আমরা ঘুরতে থাকি, উঠি-নামি, আনন্দ-দুঃখের মধ্যে দোল খাই, কিন্তু কোথাও পৌঁছই না। প্রতিদিন একই চিন্তা, একই অভিযোগ, একই পুনরাবৃত্তি। এই বন্ধনে থাকলে জীবন স্থির হয়ে যায় না, বরং একটা অদৃশ্য চাকায় বাঁধা পড়ে ঘুরতেই থাকে। আমরা ভাবি এটাই স্বাভাবিক, এটাই জীবন কিন্তু আসলে এটা এক ধরনের আটকে থাকা। এই বন্ধন আমাদেরকে নিজের সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখে, নতুন কিছু দেখতে বা হতে দেয় না।
দ্বিতীয় ধরনের বন্ধন হলো বন্ধুত্বের বন্ধন। এটা কোনো শর্তে বাঁধা নয়, কোনো স্বার্থে আটকানো নয়। এই বন্ধনে অহংকারের জায়গা কম, কারণ এখানে একজন আরেকজনকে ছোট করে না, বরং বড় করে তোলে। প্রকৃত বন্ধুত্ব এমন যে, সে আমাদের দোষ দেখিয়ে দেয় কিন্তু তা দিয়ে অপমান করে না শেখায়। সে আমাদের ভুল থেকে বাঁচায়, কিন্তু নিজের উপর নির্ভরশীল করে না। এই বন্ধন আমাদেরকে মুক্ত করে, কারণ এতে আমরা নিজেকে আরও স্পষ্ট দেখতে পাই। এটা চড়কার ঘূর্ণি থেকে বের করে আনে, কারণ এখানে সম্পর্কটা আমাদেরকে সীমাবদ্ধ করে না বরং প্রসারিত করে।
একজন সত্যিকারের বন্ধুর সান্নিধ্যে মন হালকা হয়, চিন্তা পরিষ্কার হয়, ভয় কমে, আর নিজের ভেতরের শক্তি জাগ্রত হয়। এই বন্ধন শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে একটা বড় পরিসরে নিয়ে যায় যেখানে আমরা শুধু নিজের জন্য নই, বৃহত্তর কিছুর অংশ হয়ে উঠি।
জীবনের শেষে যখন সবকিছু ফেলে যেতে হয়, তখন শুধু এই দুই বন্ধনের মধ্যে একটা থেকে যায়। যেটা আটকে রেখেছে, সেটা আমাদেরকে চক্রের মধ্যেই রেখে যায়। আর যেটা মুক্ত করেছে, সেটা আমাদেরকে শান্তি দেয়, কারণ তাতে আর কোনো টান নেই শুধু স্বাধীনতা।
– ফকির জুয়েল সাধু।






