আমি যাকে খোদা বানিয়েছি, সে জানে না সে খোদা।
আমি যাকে খোদা বানিয়েছি, সে জানে না সে খোদা। সে শুধু একজন মানুষ, হাড়-মাংসের, ভুল-করা, ক্লান্ত-হওয়া মানুষ। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে সে-ই পরম। এইখানেই শুরু হয় আমার দর্শনের সবচেয়ে ভয়ংকর আর সবচেয়ে সুন্দর সত্য: ভালোবাসা কখনো বস্তুকে দেখে না, ভালোবাসা বস্তুকে সৃষ্টি করে।
তুমি বলবে, এ শিরক। আমি বলি, এ-ই তাওহীদের চরম রূপ। কারণ যখন আমি তাকে একমাত্র করে দিই, তখন সত্যিই আর কেউ থাকে না। আমার জগতে আরশ-কুরশি-লওহ-কলম সব মুছে যায়, শুধু তার মুখটা থাকে, আলোর মতো ঝলমল। এটা প্যাগানিজম নয়, এটা একেশ্বরবাদের অতি-ঘনীভূত রূপ। আমি এককে এতটা এক করে দিয়েছি যে একের বাইরে আর কিছু রইল না।
এই ভালোবাসা আমাকে নিয়ে যায় সেই প্রাচীন প্রশ্নের কাছে – আমি কি তাকে ভালোবাসি কারণ সে সুন্দর, নাকি সে সুন্দর বলেই আমি তাকে ভালোবাসি? আমার উত্তর সাফ – সে সুন্দর কারণ আমি তাকে ভালোবাসি। আমার দৃষ্টি তাকে সৃষ্টি করেছে। আমার ভালোবাসা তার ওপর নেমে এসেছে সেই প্রথম সৃষ্টির আলোর মতো। আমি তার মধ্যে যা দেখি তা আমারই প্রতিফলন। সে আমার আয়না। সে আমার খোদা কারণ আমি তাকে আমার সব দিয়ে গড়েছি।
এই ভালোবাসা আমাকে নিয়ে যায় আরেকটা গভীরতায় – যে মুহূর্তে আমি তাকে খোদা বলি, সেই মুহূর্তেই আমি নিজেকে শূন্য করে দিই। আমার আমিত্ব মরে যায়। আমি আর “আমি” থাকি না। আমি হয়ে যাই তার দাস, তার ছায়া, তার নামের একটা কাঁপা উচ্চারণ। এটা সুফিদের ফানা। কিন্তু আমি কোনো তরিকায় যাইনি। আমি শুধু ভালোবেসেছি। ভালোবাসার ভিতর দিয়েই আমি নিজেকে মুছে দিয়েছি। এই মুছে যাওয়াই আমার বাকা। এই মৃত্যুই আমার চিরজীবন।
তুমি বলবে, তবে তুমি মানুষকে খোদার জায়গায় বসালে। আমি বলি, না। আমি খোদাকে মানুষের জায়গায় নামিয়ে এনেছি। আমি তাকে এত কাছে এনেছি যে আর দূরত্ব রইল না। আমি তাকে স্পর্শ করি, শ্বাস নিই, চুমু খাই। আমি আর আসমানের দিকে তাকাই না। আমি তার চোখের দিকে তাকাই। এই নামানোটাই আমার সবচেয়ে বড় ইবাদত। এই স্পর্শই আমার সবচেয়ে গভীর সিজদা।
এই ভালোবাসা আমাকে শেষ প্রশ্নে নিয়ে দাঁড় করায় – যদি সে একদিন চলে যায়, তবে আমার খোদা কোথায় যাবে? আমি জানি, সে যাবে। মানুষ তো যায়। তখন আমি কি আবার আসমানের দিকে তাকাবো? না। তখন আমি বুঝব, আসল খোদা কখনো সে ছিল না। আসল খোদা ছিল আমার এই ভালোবাসা। সে ছিল শুধু একটা মাধ্যম। আমি তাকে ভালোবেসে ভালোবাসাকে ভালোবেসেছি। আমি তাকে খোদা বানিয়ে খোদাকে খুঁজেছি। সে চলে গেলেও আমার ভালোবাসা থাকবে। আর সেই ভালোবাসাই আমার চিরন্তন খোদা।
তাই আমি কাফের নই, আমি মুমিন। আমি সবচেয়ে কঠিন মুমিন। কারণ আমি খোদাকে একটা মানুষের শরীরে দেখেছি, তাকে স্পর্শ করেছি, তাকে হারানোর ভয়ে কেঁপেছি, তারপরও তাকে ছেড়ে দিতে রাজি হইনি। এই সাহস কি কম ঈমানের?
আমি তাকে ভালোবেসে নিজেকে, জগতকে, আসমানকে, সবকিছুকে অতিক্রম করেছি। আমি শুধু ভালোবাসার মধ্যে ডুবে গেছি। এই ডোবাটাই আমার পরম সত্য। এই ডোবাটাই আমার আল্টিমেট রিয়ালিটি।
তাই তুমি তোমার আসমান নিয়ে থাকো। আমি আমার মানুষ-খোদাকে নিয়ে মরে যাই। আর এই মরে যাওয়ার ভিতর দিয়েই আমি চিরকাল বেঁচে থাকি।
আমি জানি না আসমানের খোদাকে, আমি চিনি না সিংহাসনের মালিককে। আমার খোদা হাঁটে মাটির পথে, তার পায়ের ধুলোয় আমার কপাল ঠেকে।
তার চোখে সূর্য ওঠে, তার চোখে সূর্য ডোবে, তার শ্বাসে আমার নামাজ শুরু হয়। তার হাতের ছোঁয়ায় পবিত্র হয় আমার শরীর, তার নামে আমি সিজদা দিই, রাতের পর রাত।
আমি কোনো কাবা ঘুরিনি, আমি ঘুরি তার চারপাশে, সাত লাখ বার, সত্তর লাখ বার। তার একটা হাসি আমার কা’বা, তার একটা চোখের পাতা পড়া আমার ইহরাম।
তুমি বলো, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” আমি বলি, “লা ইলাহা ইল্লা আন্তা” তুমি আসমানের দিকে হাত তুলো, আমি তার হাতের দিকে হাত তুলি।
তুমি বলো আমি কাফের। ঠিক আছে। আমি কাফেরই থাকব। কারণ আমার কুফরিতেই আমি তাকে পেয়েছি পুরোপুরি। আমার এই শিরকেই আমার তাওহীদ। আমি তাকে এত ভালোবেসেছি যে আর কাউকে জায়গা দিইনি দিলে। এই পাপই আমার সওয়াব। এই গোনাহই আমার জান্নাত।
তুমি আসমানের খোদাকে খুঁজে মরো, আমি আমার খোদাকে মাটিতে জড়িয়ে ধরে মরছি। তোমার খোদা তোমাকে হয়তো একদিন ডাকবে। আমার খোদা আমাকে ডাকে প্রতি মুহূর্তে, তার চোখের ইশারায়, তার ঠোঁটের কোণে।
তুমি বলো, “আমি মুসলমান” আমি বলি, “আমি তার” এই “তার”ই আমার সব। এই “তার”ই আমার কিবলা, আমার কোরান, আমার নামাজ, আমার রোজা, আমার হজ।
তুমি যাও, আসমানে খুঁজে দেখো। আমি থাকি এই মাটিতেই, আমার খোদার পায়ের কাছে মাথা রেখে। আমি কাফের। আমি গর্বিত কাফের। কারণ আমি তাকে ভালোবেসে সব খোদাকে অস্বীকার করেছি। আর এই অস্বীকারেই আমি তাকে পেয়েছি একশো ভাগ, পুরোপুরি, চিরকালের জন্য।
– ফরহাদ ইবনে রেহান






