সুফিবাদ কোন পথে চলছে, আর আমরা কোন পথে যাচ্ছি?
জন্মলগ্ন থেকে হয়ে আসা সুফিবাদ আমাদের জন্য বিবর্তনের মাধ্যমে হয়ে গেলো সুবিধাবাদ। বদ্ধ ঘরে অট্টহাসি দিলে প্রতিধ্বনি সর্বপ্রথম নিজ কর্ণে’ই আঘাত করে বলে লম্বা আলোচনার লাগাম টেনে, আলোচনা’টি সংক্ষিপ্ত করেছি। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহ. সুফিবাদ সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন;- আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য একমাত্র সুস্পষ্ট পথ সুফিজমে’ই বিদ্যমান। সুফিবাদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহ. আরও বলেন;- স্রষ্টা ব্যাতিত সকল প্রকার মন্দ থেকে আত্মাকে পবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ণভাবে আল্লাহতে নিমগ্ন থাকার নাম’ই হলো সুফিবাদ।
মুসলিম সমাজে উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে’ই একের পর এক বিতর্কিত দলিল জন্ম দিয়েছিলেন এই শাসক বংশ, মুয়াবিয়া পুত্র ইয়াজিদ তার শাসন কালে ইসলামের শরিয়া আইন নামকরণে যে আইন চালুকরেছিলেন তা ছিলো উমাইয়া বংশের স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা। দিনের পর দিন বিতর্কিত দলিল জন্ম দিয়ে উমাইয়া খিলাফত যখন ইসলামে নামকরণে নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠায় ব্যাস্ত ছিলেন, ঠিক তখন’ই মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা ইসলামের সঠিক নিয়ম অনুসরণ করার জন্য সুফিবাদের আশ্রয় নিয়েছিলেন।
তরিকতের দুই একটি তরিকা ব্যাতিত প্রায় সকল তরিকাতে’ই হযরত মুহাম্মদ সাঃ এবং হযরত আলী রাঃ ছিলেন তারিকার মূল কেন্দ্রবিন্দু। নিজ আত্মার কু-প্রবৃত্তির সাথে বিরতিহীন জিহাদ করে জড়জগত থেকে মুক্তি নেয়াই হলো সুফিবাদের মুখ্য বিষয়। নিজ আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা’ই হলো সুফিজমের মর্মকথা। সুফিবাদে রয়েছে জীব-স্রষ্টার মিলন ব্যাবস্থা, আর জীব-স্রষ্টা মিলনে জন্য প্রেমের ভূমিকা সেতু স্বরূপ, আর সুফিবাদে জীব-পরম মিলনে যে কর্ম করা হয় তার নাম আধ্যাত্মিক ধ্যান সাধনা।
এ সাধনার প্রথম পর্যায়ে পাওয়া যায় ‘ফানা ফিশ শাইখ’ যার মর্মকথা হলো মুর্শিদের উপর গভীর ভক্তি ও একাগ্রতা অর্জন করে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তার মাঝে বিলীন হওয়ার চেষ্টা করা।
দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে ‘ফানাফির রাসুল’ যার মর্মকথা হলো নিজ সত্তাকে মুর্শিদ কেন্দ্রীভূত করে কঠোর ধ্যান সাধনার মাধ্যমে মুহাম্মাদী সত্তায় বিলীন হওয়া। তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে ‘ফানাফিল্লাহ’ যার মর্মকথা হলো গভীর ধ্যানমগ্নতার মাধ্যমে পূর্বের সকল বিষয়সমূহকে সম্পূর্ণভাবে নাই করে আল্লাহতে বিলীন হওয়া। চতুর্থ পর্যায়ে রয়েছে ‘বাকাবিল্লাহ’ যার মর্মকথা হলো আল্লাহর সাথে একাকার হয়ে স্থায়ী ভাবে অবস্থান করা, আর এ অবস্থায় সুফি সর্বক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকেন এবং একা একা চরম আনন্দ উপভোগ করেন। পৃথিবীতে সর্বাধিক জনপ্রিয় তরিকার মাঝে অন্যতম তরিকা হলো তরিকায় কাদেরিয়া, এ তরিকার প্রবর্তক সুফিবাদের তাজ হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহ. তিনি দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ তরিকা চালু করেন।
কাদেরিয়া তরিকার মাঝে ইসলামের শুরুর দিকে যে আদর্শ ছিলো তা ব্যাতিত নতুন কোনো মতাদর্শ বা শিক্ষা কাঠামো পাওয়া যায় না। জিকির ধ্যানমগ্নতা ও ইসলামের মৌলিক নীতি গুলোর সারাংশের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করেন এ তরিকা। এশিয়া মহাদেশে জনপ্রিয়তার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তরিকায় চিশতিয়া। এ তরিকা আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশে হরি নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত চিশত নামক শহরে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন। চিশত শহরে খাজা আবু ইসহাক শামি কতৃক ঊনিশশো ত্রিশ সালের দিকে চিশতিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়, পরে খাজা আবু ইসহাক শামি-এর শিষ্য খাজা আবু আহমদ আবদাল চিশতি তার বশংধরদের মাধ্যমে এই তরিকার প্রচার প্রসার ঘটান। চিশতিয়া তরিকায় ন্যায্যতা, উদারতা ও ভালোবাসার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়, এ তরিকা হাক্কুল ইয়াকিনের উপর সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তাঁরা বাস্তবতার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করতে অভ্যস্ত।
চিশতিয়া তরিকার অষ্টম ব্যাক্তি হিসেবে খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রহ. বারো শতাব্দীর দিকে তরিকায় চিশতিয়া লাহোর এবং আজমিরে প্রতিষ্ঠা করেন, তরিকায় চিশতিয়া বর্তমানে অনেক শাখাপ্রশাখায় পরিনত হয়েছে। হযরত ওয়াইস আল-করনী রহ. কর্তৃক ওয়ায়েসি তরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়, ওয়ায়েসিয়া তরিকা প্রবল ইশকে নিমজ্জিত এবং এ তরিকার ইবাদত শিক্ষা সরাসরি হযরত আলী রাঃ বরাতে আল্লাহ ও তার রাসুলের কাছ থেকে প্রাপ্ত বলে বিবেচনা করা হয়। তেরোশো শতাব্দীর প্রখ্যাত কবি ও ধর্মতাত্ত্বিক মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি রহ.-এর অনুসারীরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মেভলেভিয়া তরিকা বা মৌলভি তরিকা, এ তরিকা রুহ নফসের উপর অসম্ভব ভাবে প্রভাবিত করেন, নানা কাব্যিক দৃষ্টিকোণে পাওয়া যায় রুমি তার কবিতার মাধ্যমে রূপক কথা দিয়ে মানুষের আপন অস্তিত্বের ব্যাপারে জানান দিয়ে থাকেন যার ফলে মানুষ ইশকে ফানা হয়ে নৃত্য করেন। তরিকায় নকশেবন্দী চৌদ্দশো শতাব্দীতে সৈয়দ বাহাউদ্দিন নকশবন্দী কর্তৃক এ তরিকা প্রকাশিত হয়, সৈয়দ বাহাউদ্দিন নকশবন্দীকে স্রষ্টার নকশা ধারণকারী বলা হয়ে থাকে, এই তরিকা আদবের দিকে সর্বোচ্চ নরজ দিয়ে থাকেন, নীরবে জিকিররত থাকা’ই তাদের মূল কর্ম।
স্পেনের হযরত ইউসুফ কলন্দর কর্তৃক কলন্দারিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, এ তরিকা নির্জনতায় ধ্যানমগ্ন থেকে জমিনে ভ্রমণ করার তাগিদ দিয়ে থাকেন, ধ্যানের ব্যাপারে কোনো প্রকার ছাড় না দেয়ায় এই তরিকাকে বুদ্ধ অনুসারীও বলা হয়, ধ্যানমগ্ন থেকে বোধের চরম অবস্থানে পৌঁছানো’ই এই তরিকার মূল লক্ষ্যে। আবুল হাসান আশ-শাজিলি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শাজিলিয়া তরিকা এবং আবু আব্বাস আহমদ আল-তিজানি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত তীজানিয়া তরিকা মরক্কো’র ফেজ শহরে প্রকাশিত হয়। আবু আল-নাজিব সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকা। হযরত বাইজিদ তইফরিয়া বোস্তামী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত তইফরিয়া তরিকার। হযরত আলী রাঃ মারফত, হযরত খাজা হাসান বসরির শিষ্য খাজা হাবিবে আজমি স্থাপন করেন মাদারিয়া তরিকা। ইবনে আলী আস-সেনুসি নামক এক ধর্মতত্ত্ববিদ আঠারোশো সাইত্রিশ সালের দিকে সেনুসি তরিকা চালু করেন।
সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কর্তৃক প্রকাশিত তরিকায় মাইজভান্ডারিয়া বাংলাদেশের জনপ্রিয় একটি তরিকা, এ তরিকার মূল লক্ষ্যে হলো প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টাকে লাভ করা। বলা হয়ে থাকে সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কঠোর সাধনায় এতটাই বিভোর ছিলেন যে সপ্তাহ চলে যেত কিন্তু তিনি ঘর থেকে বের হতেন না, এবং বছর বছর ধরে পাহাড়ে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ছিলেন। সুফিবাদের মূল উদ্দেশ্য আপন সত্তার কুপ্রভৃতিকে নাশ করে স্রষ্টায় বিলীন হওয়া। সকল তরিকা প্রবর্তক মহাপুরুষদের জীবনীতে কয়েকটি চমৎকার নিদর্শন দেখতে পাই, যেমন: সভ্যতা, কঠোর সাধনা, ভোগবাসনার বিসর্জন এবং দুঃখী মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা।
আমাদের এ অনুসন্ধান চলাকালে আমরা খুব করে চেষ্টা করেছিলাম কিছু পীর-সাধকদের উপকার করার জন্য, যারা কিনা কাম সাধনা, রস-রতি সাধনা, কচি মেয়ের ফুল সাধনা, নারীর রক্ত সাধনা, গোপন তালিম নামে যৌনতা, বোরাক মেরাজের বাহক নামকরণে নারীর দেহ ব্যাবহারের বিধান অনুসরণ করেন, তাদের এ বিধান কোনো তরিকার প্রবর্তক মহাপুরুষ চালু করেছিলেন কিনা না সে বিষয় নিয়ে আমরা সর্বোচ্চ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, আমরা আপনাদের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও কোনো মহাপুরুষদের জীবনী থেকে এমন কর্ম নমুনা সনাক্ত করতে পারিনি যা দিয়ে আপনাদের কর্মকে আমরা সঠিক বলে প্রমাণিত করতে পারি।
এর পরের অনুসন্ধানীতে আমরা মহাপুরুষদের প্রেমের অবস্থান সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে থাকি, প্রেম সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় চলে যায়, একাধিক মহাপুরুষদের প্রেম বিষয়ে আমরা চিরুনি অনুসন্ধান চালাই। সুফি তাজ আব্দুল কাদের জিলানী রহ. থেকে শুরু করে মাওলা রুমি সহ সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী পর্যন্ত আমরা সবার প্রেম বিষয়ে বিশ্লেষণ করতে থাকি, তাদের প্রেমের মাঝে আমরা কোনো লিঙ্গবাদী প্রেম খুঁজে পাইনি এবং তাদের প্রেমের আলিঙ্গন ছিলো ধ্যানের আলিঙ্গন, লিঙ্গভেদে শরীর স্পর্শের কোনো প্রেম আলিঙ্গন তাদের মাঝে ছিলোনা। যদিও মহাপুরুষদের ক্ষেত্রে এসব নমুনা খুঁজে দেখা আমাদের জন্য একটি বোকামি সিদ্ধান্ত ছিলো, তথাপি খুঁজে দেখাও আমাদের জন্য জরুরী ছিলো, কারণ প্রায় লোকেদের কর্মসাধনার মাঝে এমন নষ্টামির ছাপ বিদ্যমান থাকে যে সুফিজম তাতে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আসছে।
আমাদের এ নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে প্রতিটি মহাপুরুষের জীবনীতে আমরা দেখতে পাই তাঁরা কঠোর সাধনায় নিমজ্জিত ছিলেন, বিরতিহীন জিকির ও নীরব ধ্যানে লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে সর্বোচ্চ আরাধনায় ব্যাস্ত ছিলেন। এমতাবস্থায় তাদের দ্বারা এমন কোনো কর্ম মত চালু করার সুযোগ ছিলোনা বলে’ই আমরা জোর দিচ্ছি। দুঃখী মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন বলে আমরা লক্ষাধিক সাক্ষী পাই, কিন্তু দুঃখী মানুষদের মাথায় ভর করে ভোগ বাসনার সাগরে নিমজ্জিত ছিলেন তারিকা প্রবর্তকদের মাঝে এমন কোনো নজির উপস্থাপন করতে আমরা ব্যার্থ হই। সাধনার নামে যৌনাচার, প্রেম নামকরণে লিঙ্গভেদে পরনারী ভোগ এবং আত্মার মিলন অযুহাতে দেহস্পর্শ, দুঃখী মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর পরিবর্তে তাদের মাথায় চড়েবসে খাওয়া এই ফকিরি জন্ম কে দিলো?
এর উত্তর তালাশ করতে গিয়ে আমরা বারংবার পিছ’ পা হয়েছি, কারণ অমুকের মাধ্যমে তমুকের হয়ে তাহার ছেলের ঘরে নাতীর ছোট ঝিয়ের বড় মেয়ের ছোট ছেলে হওয়ার কারণে এই সিলসিলাতে ঐ সব ব্যাক্তিরা পীর হয়ে বসে আছেন বলে আমরা একাধিক প্রমাণ পাই। আমরা আরও প্রমাণ পাই, বর্তমান পীরের বড় বোনের শ্বশুরের মেজো জ্যাঠার শালার মেয়েকে বিয়ে করে ছিলেন এক প্রখ্যাত পীর, তাহার বরাতে আজ তিনিও পীর হয়ে স্পেশাল রুমে মেয়ে ভক্ত মুরিদদের দিয়ে হাত-পা টিপাচ্ছেন এমন পীরের মুখোমুখিও আমাদেরকে হতে হয়েছে।
আশাকরি আপনারাও অনুমান করতে পেরেছেন সুফিজমের মাঝে এসব আগাছা কোথা হতে জন্ম নিয়েছে। প্রতিটি মানুষ বীজ রূপে জন্ম নেয় এ কথাটি সম্ভবত তাঁরা ভুলে গেছেন, তাদের জানা উচিৎ ছিলো আপনি যেই হোন, আপনি কারো নামের উপর বড় হতে পারেন না, কারণ আপনি মুকুল রূপে এসেছেন এবং আপনাকে’ই ফুটতে হবে। সুফিবাদ বারংবার তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে স্রষ্টার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আত্মা পরিশুদ্ধির বিকল্প কিছু নেই, কিন্তু আপনি যদি ভাবেন প্রখ্যাত সুফির সাথে আপনার লতাপাতার সম্পর্ক থাকার কারণে আপনি নিজেও সেই প্রখ্যাত ফকির হইয়া গেছেন তা তাহলে আপনার মাধ্যমে সুফিজম বিক্রিত হওয়া’টা অত অস্বাভাবিকের কিছু নয় বলে আমরা মনে করছি। প্রতিটি তরিকা স্রষ্টাদের জীবনী অনুসন্ধান কারে আমরা দেখতে পাই তাঁরা ছিলেন চরম ত্যাগী এবং দুঃখী মানুষদের নেওয়াজ। কিন্তু কালের বিবর্তনের পালায় পরে আমরা পেয়ে গেলাম ভয়ংকর রকমের খাদোক নেওয়াজ। তাদের চলাফেরা ও তাদের জীবনযাপন পদ্ধতি দেখলে মনে হয়না তাঁরা কখনো তারিকা প্রবর্তকদের অনুসরণ করেছিলেন।
দেশের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দরবারে আমরা অনুসন্ধান করেছিলাম, অনুসন্ধান চলা কালে আমাদের চোখের সামনে অনেক কিছু পরলেও সকল বিষয় নোট করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে যা নোট করতে পেরেছি তা হুবহু আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরবো। আমরা নোট করেছিলাম;-পীরের সন্তান হয়েছে এবং সেই নবজাতক সন্তানের জন্য শুধু স্বর্ণ দিয়ে’ই চামচ বানানো হয়েছে যে চামচ দিয়ে সন্তানকে মধু খাওয়ানো হচ্ছে। তখন আমাদের ভিতরে একটি চাপা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছিলো যে, এই স্বর্ণের চামচ বানাতে যে টাকা ব্যয় করা হয়েছে সে টাকা যদি কোনো হাসপাতালে দেয়া হতো তা হলে কিছু পথশিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা করাতে যেতো।
আমরা নোট করেছিলাম;- ওরশ আসার আগে ভক্ত মুরিদদেরকে ফোন করে অথবা চিঠি পাঠিয়ে হাদিয়া আদায় করা হয়, ভক্ত মুরিদ ওরশে দিন হাদিয়া নিয়ে উপস্থিত হলে পীর সাহেব হাদিয়া গ্রহণ করেন এবং কিছু ভক্তদেরকে আবার তার স্ত্রীর নিকটেও পাঠান স্ত্রীকে হাদিয়া পাইয়ে দিতে’ই নাকি এ কৌশল অবলম্বন করা হয়। পীর সাহেবের স্ত্রী হাদিয়া গ্রহণ করে সে আবার তার ছেলে মেয়ে যারা থাকেন তাদের কাছে ভক্তদের পাঠিয়ে দেন, এবং কিছু কিছু ভক্ত মুরিদগণ চক্ষুলজ্জায় তাদেরকে হাদিয়া দিতে না পেরে পালিয়ে গেছেন বলেও প্রমাণ পাই, যারা পালিয়ে গেছেন তাঁরাই পরক্ষণে আবার নিজেদেকে পাপী ভেবে কষ্ট পেয়েছেন হাদিয়া দিতে ব্যর্থ হওয়াতে। এই বিষয়টি আমাদেরকে কঠিন ভাবে আঘাত করেছিলো, উনারা ভক্তের মাথায় বারি দিয়ে ফকিরি করছে।
আমরা নোট করেছিলাম;- দরবারের দায়িত্বরত খাদেম সাহেবরা জমি ক্রয় থেকে শুরু করে নতুন বিল্ডিং করা সহ সকল প্রকার বিলাসবহুল জিনিসের ছক ওরশের পূর্বেই করে রাখেন, আর ওরশের পরে’ই সে কাজ গুলো সম্পূর্ণ করে নেন, কারণ ওরশ তাদের নিকট একটি আল্লাহর অলৌকিক দান যাকে আলাদিনের চেরাগও বলা যেতে পারে। নিজেদের পেট ভরতে’ই দিন যায় দুঃখী মানুষদের মর্ম তাঁরা বুঝবে কখন? তাদের এমন বিলাসিতা দেখে আমরা মোটামুটি আশ্চর্য হয়েছিলাম। কিন্তু যাদের রওজা নিয়ে এমন করা হয় তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনীও আমরা অনুসন্ধান করেছিলাম তবে তাদের জীবদ্দশায় এমন কোনো ঘটনা আমরা পাইনি যেখানে বিলাসিতা ছিলো।
সর্বশেষ আমাদের জন্য স্বস্তির বিষয় ছিলো এত-এত দরবারের অনুসন্ধান কালে আমরা অনেক দরবার পেয়েছিলাম যেখানে প্রকৃত সুফিবাদের কর্ম প্রচলন রয়েছে এবং তাদের আত্মশুদ্ধির তালিমে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেখানে আমাদের একটি আফসোসের ব্যাপার ছিলো যে, ঐ সব দরগুলো লোক চক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে এবং তাঁরা ব্যাবসায়ী না হওয়ার কারণে মানুষদেরকে চাকচিক্য দেখাতে ব্যার্থ হয়েছে বলে তাদেকে ছোট করে দেখা হয় এবং সে সব দরবারের ভক্ত মুরিদও হাতেগোনা কয়েকজন পাওয়া যায়। আমরা চরম ভাবে হতাশ হয়েছিলাম তরিকা প্রবর্তকদের জীবনী এবং তাদের লকবধারীদের জীবনী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, আমরা বুঝে উঠতে পারছিলাম না আসলে কারা সঠিক? তরিকা প্রবর্তকরা সঠিক নাকি তাদের লকবধারীরা সঠিক?
আমাদের এই আলোচনাটি সম্পূর্ণরূলে নিরপেক্ষভাবে এবং বাস্তবিক অবিজ্ঞতা ও স্বচক্ষে দর্শন করে প্রকাশ করেছি, যদি কারো সাথে মিলে যায় আমাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং নিজ বিবেকের কাছে প্রশ্ন করবেন পূর্বের সুফিবাদ এখন আমাদের জন্য সুবিধাবাদ হয়ে গেছে কিনা?
লেখা: বুদ্ধ মুহাম্মদ কৃষ্ণ






