কোন ধর্ম বেশি শক্তিশালী?
তোমার ধর্ম যদি তোমাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শুভ অশুভ বিষয়সমূহ উপলব্ধি করাইয়া দিতে ব্যার্থ হয় তাহা হইলে তোমার ধর্ম মেকি ও পঙ্গু বলিয়া জানিবে। আর তোমার ধর্ম যদি তোমাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল বিষয়সমূহ উপলব্ধি করাইয়া দেয়, তাহা হইলে উহা শক্তিশালী ধর্ম বলিয়া জানিও।
ধর্ম তাহা’ যাহা তোমাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল বিষয়ে অবগত করাইয়া দেয়, ধর্ম তাহা নয় যাহা অবান্তর কথা দিয়া সাজানো হয়। আমি অনেক ধর্ম পণ্ডিতদের দেখিয়াছি যাহারা নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া দাবি করিয়া থাকেন, কিন্তু তাহাদের মাঝে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি ক্ষুদ্র বালুকণার জ্ঞানও দেখতে পাওয়া যায় না। মৌখিক ভাবে নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া দাবি করিয়া কি পাওয়া যাইতে পারে যদি সে ধর্ম তোমাকে প্রকৃতির নিয়ম বুঝাতে অক্ষম হয়? চোখের সামনে ধর্মের এই পরাজয় দেখিতে হইতোনা যদি ধর্ম পণ্ডিতদের মাঝে ধর্মের সারসত্য পাওয়া যাইতো।
তোমরা খেয়াল করিয়া দেখিতে পারো ধর্মগুরুগণ ধর্মের মূল থিম থেকে সরে গিয়ে ধর্ম জ্ঞান প্রদান করিয়া থাকেন, মুলত ধর্মের চেয়ে ধর্মের আগাছায় পরিচর্যা করতে ব্যাস্ত তাহারা। তাই দিন দিন মানুষেরা ধর্মের বাইরে গিয়ে অত্যাধুনিক ভাবে বিশ্বকে রিপ্রেজেন্ট করে চলছে, আর ধর্মগুরুগণ এখনো স্বর্গের চাবি হাতে নিয়া স্বর্গের দরজায় বসে আছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যখন মানুষের জীবনদর্শনকে দিন দিন উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে তাগিদ দিচ্ছে, ঠিক তখন’ই ধর্মযাজকদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ছয় হাজার বছর আগে যীশু খ্রীষ্ট কেন হেসে ছিলেন? যীশু খ্রীষ্ট কোন মরা মানুষটাকে জীবিত করেছিলেন? পাঁচ হাজার বছর আগে শ্রী কৃষ্ণ বৃন্দাবনে কয়জন সখী নিয়ে রাত্রিযাপন করেছিলেন, শ্রী কৃষ্ণের অষ্ট সখীদের মাঝে কার পরনে কাপড় ছিলো আর কে বিবস্ত্র ছিলো এ নিয়ে নানান কথা।
এদিকে সুন্নাত আর ফরজের যোগবিয়োগে জান্নাতি হুর ভাগাভাগিতে ব্যাস্ত মুসলিম ওয়াজীরা, নবী কয়টা খেজুর খেতেন, কোন ভাবে ঘুমানো সুন্নাত, ওয়াশরুমে বসার নিয়ম, ঢিলা কুলুখের সঠিক ব্যাবহার বিধি, বিয়া কয়টা করলে সুন্নাত টাইট করে রক্ষা হবে, স্ত্রীর কোথায় কোথায় চুমু দেয়া সুন্নাত, দাড়ি বড় রাখলে দাড়ির খোঁচায় স্ত্রীর যৌন উত্তেজনা বেড়ে যায়, এমন সব অদ্ভুত গবেষণায় ব্যাস্ত আলেম সমাজ।
জগতের মঙ্গল বিষয় নিয়ে চেতন মানুষেরা দিন দিন উন্নতির দিকে চললেও বিপরীতে জায়েজ নাজায়েজের মাপজোপ নিয়ে ধর্মগুরুদের ঘুম হারাম, বিশ্বের দুই ভাগ মানুষ যাদেরকে অনুসরণ করে চলছে আর তারা’ই হালাল হারামের সবক দিয়ে উপহার দিচ্ছে পঙ্গুত্ব সমাজ। আমি তোমাদেরকে অনেক ধর্মের ব্যাপারে বলতে পারি যে ধর্মগুলো এখন অচল হইয়া গেছে, ঐ সমস্ত ধর্ম পতনের পিছনে রয়েছে এসব কিচ্ছা কাহিনী। তাঁরা জগতের বাস্তবতা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলো, যুক্তি প্রমাণে তাঁরা ছিলো দূর্বল, বর্তমানে পপুলার ধর্মগুলোর মাঝেও দেখতে পাই ধর্মের মূল কার্যকারণ দূরে চলে গেছে ধর্মের আগাছার জন্য। আর এসব আগাছা থেকে দ্রুত বেড়িয়ে আসতে না পারলে প্রচলিত ধর্মগুলোও চুরমার হইয়া যাইবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
ঠিক একই ভাবে আমাদের আধ্যাত্মবাদের ক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম থাকবেনা, কারণ আধ্যাত্মবাদীরাও দিন দিন তাদের মূল থেকে সরে যাচ্ছে, প্রায় দশম শতাব্দীর শেষ দিক থেকে শুরু করে আঠারোশো খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জগতে আধ্যাত্মবাদীদের স্বর্ণ সময় ছিলো। এই সময়কালে মানুষদেরকে সভ্যতায় প্রবেশ করানো এবং বিভাজন মুক্ত করা ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উগ্রতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে দাড়ানো’ই ছিলো তাদের চরিত্র। সে সময় কালে রাজা বাদশারা দেশ পরিচালনা করা থেকে শুরু করে সকল প্রকার পরামর্শ নেয়ার জন্য আধ্যাত্মবাদীদের শরণাপন্ন হতেন। এবং তাঁরা আধ্যাত্মবাদীদের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য অপেক্ষায় বসে থাকতেন, আবার উগ্রবাদী জুলুমবাজ শাসকদের জন্য তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত কঠোর এবং আধ্যাত্মবাদীরা ছিলেন সে সব শাসকদের প্রতিদ্বন্দ্বী।
কিন্তু সেই আধ্যাত্মিকতার সুপ্রিম পাওয়ার এখন কই? আমাদের নাভীমূলের দশা এমন হয়ে গেলো কেন? আমরা দিন দিন কেন সমাজের বোঝা হয়ে যেতে লাগলাম? আমরা পরনির্ভরশীল কেন হয়ে গেলাম? আমাদেরকে কোন অলসতায় গ্রাস করলো? আগে ধর্ম বলতে কেবল আধ্যাত্মিকতা’ই বুঝানো হতো, কিন্তু এখন ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা আলাদা হয়ে গেল কেন? মূলত আমরা আমাদের স্থান ধরে রাখতে পারিনি, বিশেষ করে আঠারোশো খ্রিস্টাব্দের পর থেকে আধ্যাত্মিকতার করুণ দশা শুরু হয়ে গেছে। আর এর জন্য আধ্যাত্মবাদীরা’ই দায়ী।
যে আধ্যাত্মবাদীদের অবস্থান ছিলো জ্ঞানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এবং রাজা বাদশাদের পরামর্শদাতা ও জুলুম শাসকের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বরূপ, আজ সেই আধ্যাত্মবাদীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গেলো মোল্লা পুরোহিতরা, কতটা পতন আমাদের হয়ে গেলো! রাস্তা ঘাটে মোল্লা সহ সাধারণ মানুষদের হাতে মার খাওয়া আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। আর এসব ঘটনার মূলে রয়েছে আমাদের মুখের এবং আমাদের চলাফেরা। এখন মোল্লা পুরোহিতরা মাজার খানকার নিয়ম নীতি ঠিক করে দেয় আমাদেরকে কোন ভাবে চলতে হবে! যে আধ্যাত্মিকতার জন্মলগ্ন থেকে’ই জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্থানে ছিলো, আজ সেই আধ্যাত্মিকতা নিয়ে’ই আমরা সবচেয়ে বেশি ভণ্ডামি ফাজলামি করছি।
তো আধ্যাত্মবাদীদের পতন কেন হবেনা বলো তো? আধ্যাত্মিকতায় যে ঝলক থাকার কথা ছিলো, আমাদেরকে যে জ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর কথা ছিলো, মানুষকে চৈতন্য করার জন্য আমাদের যেসব চেষ্টা থাকার উচিত ছিলো তার একটিও আমাদের মাঝে নেই। আমরা আধ্যাত্মিকতার পরিচয় দিয়ে দিন রাত কিসের পিছনে ছুটে চলছি? আমরা কি নিয়ে এমন দর কষাকষিতে ব্যাস্ত যে আমরা আমাদের নাভীমূল ভুলে গেছি? এর উত্তর আমার জানা নেই।
মনে পড়ে যায় সেই ঋষি নারদের কথা, ঋষি নারদ সত্যলাভের জন্য ঋষি সনৎকুমারের কাছে গেছিলেন, এবং সনৎকুমার নারদকে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কোন কোন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেছো? ঋষি নারদ বললেন আমি বেদ জ্যোতিষ সহ আরও বিভিন্ন বিষয় জ্ঞান লাভ করেছি, তখন ঋষি সনৎকুমার নারদকে বললেন এসব জ্ঞান তোমাকে কোনো কাজে সাহায্য করবেনা। তোমার সেই জ্ঞান লাভ করতে হবে যে জ্ঞান তোমাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল বিষয় উপলব্ধি করিয়ে দেয়।
কাজে’ই আমাদের আধ্যাত্মবাদীদেরকেও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জ্ঞানের সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাইতে হবে এবং কিচ্ছা কাহিনীর আলাপ ছেড়ে দিয়ে বাস্তবতায় প্রবেশ করতে হবে যদি পূর্বের আসনে বসতে হয়, আর তা না পারলে পতনের চুড়ান্ত সময় অতি নিকটে’ই রয়েছে।
লেখা: বুদ্ধ মুহাম্মদ কৃষ্ণ






