সাধনার নামে মুখোস পড়েছিলে, নাকি কামে ডুবেছিলে?
তুমি আমাকে পড়তে এসেছো? দাঁড়াও, আমাকে পড়ার আগে আমার সামান্য কিছু কথা মাথায় গেঁথে রাখো, না হয় তুমি পক্ষপাতিত্ব হয়ে যেতে পারো। এবার শোনো, আমি তোমাকে হিট করতে আসিনি, এবং তুমি কি করো আর কি করোনা তা জানার ইচ্ছাও আমার নেই। তোমাকে ছোট করে উপস্থাপন করবো এটাও আমার উদ্দেশ্য নয়। তোমার মতবাদ কি? এবং তুমি কাকে ধারণ করো এটাও আমার জানা দরকার নেই। আমি কেবল তোমাকে নিয়ে কিছু মন্তব্য করবো, আর হতে পারে এ মন্তব্য তোমাকে নতুন করে জন্ম দিবেন।
দেখো, এ জগতে এমন বহু মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন, যাঁরা তোমার মতন করে ধর্মকে মানেনি এবং তোমার মতন করে আমার লেখাকেও পড়েনি, তথাপি তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ জড়তা মুক্ত। আর এরা যে কেবল নিজেরা’ই নিজেদেরকে জড়তা মুক্ত করেছিলেন বিষয়টি এমন নয় বরং তাঁরা বিশ্বব্যাপী মানুষদেরকেও জড়তা মুক্ত থাকার জন্য নতুন নতুন রাস্তা দেখিয়েছিলন।
যদিও তোমার আধ্যাত্মিকতার উদাহরণ এদের চেয়ে অনেক বেশি এবং তুমি বলতে পারো আমি তিন মাস, ছয় মাস ধ্যান করেছি, আমি নারীর দেহে ভজনা করে ঈশ্বরকে পেয়েছি, কিন্তু তুমি এখনোও এটা বলতে পারোনি যে আমি আলবার্ট আইনস্টাইনের মতন একটি থিওরি বা নিউটনের মতন একটি সূত্রের জন্ম দিয়েছি, এরা তোমার মতন এতকিছু না করেও মহাপুরুষ হয়েছেন। আর এদিকে তুমি এখনো নারীর দেহে ঈশ্বরকে পাওয়ার গল্প শুনাচ্ছো।
হতেও পারে তোমার মতবাদ তাদেরকে আধ্যাত্মিক বলে স্বীকার করছেনা, কিন্তু তুমি খুঁজে দেখতে পারো, তোমার আধ্যাত্মিকতায় যতটা না স্পষ্টতা রয়েছে তার চেয়েও বহুগুণ স্পষ্টতা তাদের ধ্যান ধারণায় রয়েছে। অনেক মানুষকে পাবে যারা তোমার মতে অধার্মিক, এবং ধর্ম তো দূরের কথা দেখবে তাঁরা ঈশ্বরকেও মানেনা, তথাপি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারো তাঁরা তোমার চেয়েও ঈশ্বরে বড় বিশ্বাসী হয়ে বসে আছেন। থাকতে’ই পারে ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বর, অথবা ঈশ্বর নাও থাকতে পারে, তোমার ঈশ্বর আছে তাই বলে অপরেরও ঈশ্বর থাকা লাগবে বিষয়টি এমন করে দেখার কিছু’ই নেই।
মনে রাখতে হবে যাহা কিছু সৎ ও মহৎ, তাহা এসবের মানদণ্ডে নেই, ঈশ্বর বিষয়ে কারো কোনো বিশেষ ধারণাকে ছোট করে দেখার সুযোগ তোমার নেই। মনে রাখবে, আমি কেবল তোমাকে দিয়ে তোমার নিজস্ব অবস্থানের উপর আক্রমণ করাতে চাইছি, আমি তোমার মতবাদের উপর আক্রমণ করানোর জন্য বসে নেই। আমার আজকের উদ্দেশ্য কেবল তোমার উপর তোমাকে দিয়ে’ই আক্রমণ ঘটানো। তোমার উপর তোমাকে দিয়ে এই আক্রমণ কেবল তোমাতে’ই সীমাবদ্ধ এতে অপরের ভালো মন্দ নিয়ে তর্কবিতর্ক থাকবেনা।
এই মূহুর্তে তুমি একজন গবেষক, হ্যাঁ এখন আমি দেখতে চাই তুমি একজন উচ্চমাত্রার গবেষক। আর গবেষক হিসেবে তোমার প্রথম কাজ হলো তোমার ইহকালের সকল মুহুর্তের পারফর্মেন্স নিয়ে একটি চিরুনি অভিযান চালানো। এখন তুমি প্রশ্ন করতে পারো, আমি আর কি নিয়ে এবং কাকে নিয়ে গবেষণা করবো?
আমার উত্তর হলো এখনো তুমি তোমার তুমি’কে নিয়ে’ই গবেষণা করবে। গবেষণা করো আর জিজ্ঞাসা করো তোমার তুমি কি আসলে’ই তুমি? নাকি মুখোশ পড়া তুমি নামক ভিন্ন কেহ? তোমার সত্য কি? তোমাকে পরিচালনা করছে কে? তুমি তোমার অপকর্মের উপর কঠোর, নাকি স্বাভাবিক? কতদিন নিজের কর্মের উপর নিজে’ই লজ্জিত হয়েছো? কতদিন ঘুমন্ত থেকেও স্বপ্ন দেখেছিলে? তুমি যা করছো তা কি খাঁটি ছিলো?
নিজের উপর এসব জবাবদিহি নিয়ে নিজে’ই নিজের মুখোশ উপস্থিত করা সম্ভব। তুমি যোগ করেছিলে, নাকি ধ্যান? প্রশ্ন করো। তুমি সাধনার জন্য কোন পন্থাকে বেছে নিয়েছিলে জিজ্ঞাসা করো, প্রেম নামকরণে প্রেম করেছিলে নাকি কামে ডুবে ছিলে? নিজেকে প্রশ্ন করো এবং কাঠগড়ায় দাঁড় করাও। এই যে এই! আমি তোমাকে’ই বলছি, তুমি’ই তো সেই যে কিনা মক্কা আর মদিনা কেবল নারীর দেহে’ই খুঁজেছিলে? সাধনার মুক্তি’ই নারী এই বলে না বার বার যুক্তি দিয়েছিলে? তুমি না তোমাকে নিয়ে গবেষণা করা ছেড়ে দিয়ে নারীর দেহকে গবেষণা করেছিলে?
এখন নিজেকে প্রশ্ন করে দেখো এতে কি পেয়েছো! তোমার এই ‘তুমি’ তোমাকে ছাড়া আর কোথাও নেই, তোমার সকল অনুসন্ধান, তোমার সকল প্রশ্ন থাকা উচিৎ কেবলমাত্র তোমাকে’ই। তোমার অনুসন্ধান হওয়া উচিৎ তোমার মাঝে, কিন্তু তুমি অনুসন্ধান করছো অপরের দেহে। এটুকু বুঝ কি তোমার মাঝে নেই, যে তোমার তুমি কখনো আমার দেহে বা অন্যকারো দেহে থাকোনা, একমাত্র তোমার দেহ ছাড়া? পূর্বে যা করে এসেছো তা নিয়ে একটু ভেবে দেখো এবং জিজ্ঞাসা করো এর আগে নিজের উপর কখনো প্রশ্ন করার দিন এনেছিলে কিনা? তোমার মাঝে দিন রাত যে কথা বলে গেলো, তার কথা তুমি কখনো কান পেতে একটি বার শুনতে পেরেছিলেন কিনা? মক্কা মদিনা আর ঈশ্বর অনুসন্ধানে তুমি বার বার নারীর দেহকে বেছে নিয়েছিলে এ দিয়ে তুমি কি পেলে?
তোমার এসব কর্মে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু যে তোমাকে দিন রাত উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে তাকে’ই তুমি চিনলানা। তুমি নিজেকে এ সব প্রশ্ন করে দেখতে পারো, আর যদি তা করো তাহলে বুঝতে পারবে যে তুমি যাকে তুমি হিসাবে চেনো সে আসলে’ই তুমি নয়, সে মূলত তোমার বিপরীত কিছু। নিজেকে এসব প্রশ্ন করার আগে অহংকার ছিলো তোমার পথপ্রদর্শক, আর যখন এসব প্রশ্ন করতে শুরু করে দিবে ঠিক তখন’ই দেখতে পাবে তোমার মুখোশ খুলতে আরম্ভ হয়ে গেছে।
তুমি এখন জিজ্ঞেস করো! এবং এক্ষুনি চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞাসা করো এটা কি আসলে’ই আমি? আমি কয়জন? আমি ছাড়া আমার সাথে মুখোশ পরা আরও কি কেহ আছে? আমার রূপ কয়টা, একটা নাকি দুইটা? আমার উদ্দেশ্য কত? আমি যে উদ্দেশ্য ধারণ করে আসছি তার মূল এক নাকি একাধিক? তুমি যদি নিজেকে জানার উপর গবেষণা চালাও, তবে নিজেকে মুক্তি দেয়াও তোমার জন্য কঠিন কিছু নয়, কিন্তু নিজেকে মুক্তি দিবে কি দিবেনা, তা একান্ত তোমার সিদ্ধান্ত। তুমি যদি তোমার তুমিকে টেনে বের করে আনতে পারো, তবে দেখতে পাবে সব তুমি’ই তুমি, না এতে কোনো অভিযোগ থাকবে, না এতে কোনো দ্বিতীয় সত্তা আসবে।
লেখা: বুদ্ধ মুহাম্মদ কৃষ্ণ






