বাঁশির সুর: আত্মার আর্তি ও ফিরে যাওয়ার আহ্বান!

বাঁশির সুর: আত্মার আর্তি ও ফিরে যাওয়ার আহ্বান!

বাঁশির সুর আমাদের কানে যেমন মধুর মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে তা হলো এক গভীর আর্তনাদ। মানুষ তা আনন্দ, প্রেম বা মায়ার ভাষা মনে করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি হলো বিচ্ছিন্ন আত্মার ডাক—একটি অস্তিত্বের আহ্বান, যা মূল উৎসের দিকে ফিরে যাওয়ার তৃষ্ণা প্রকাশ করে।

বাঁশ একদিন বনভূমির অংশ ছিল। বাতাসে দুলত, বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজত, আলো-ছায়ার খেলা ভেতরে বয়ে যেত। প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে তার অস্তিত্ব শান্ত ও সমন্বিত ছিল। কিন্তু মানুষের হাতে এসে তাকে ছিন্ন করা হলো। বুক কেটে ফাঁপা করা হলো, ছিদ্রে ছিদ্রে আঘাত এঁকে দেওয়া হলো।এই ক্ষতবিক্ষত দেহ থেকেই জন্ম নিল বাঁশি, যা কাঁদতে কাঁদতেই সুর হয়ে উঠেছে।

যখন ঠোঁট ছুঁয়ে বাতাস প্রবাহিত হয় তার ফাঁপা অন্তরে, তখন যে শব্দ বের হয় তা নিছক সুর নয়। এ হলো বিচ্ছেদের ক্রন্দন, নির্বাসিত অস্তিত্বের আহ্বান, মূলের প্রতি ফিরে যাওয়ার ডাক। মানুষ মুগ্ধ হয় এবং আনন্দ অনুভব করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাঁশি কাঁদে।তার প্রতিটি সুর হলো তৃষ্ণার প্রতিধ্বনি মূল উৎসের দিকে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

এই সুর যেনো আত্মার আর্তি। “আত্মা সবসময় তার আদি নিবাসের টান অনুভব করে, আর সেই টানই তাকে কাঁদায়, খোঁজায়, ফেরার আহ্বান জানায়।” তেমনি বাঁশিও এসেছে বনভূমির মূল থেকে। আত্মা দেহে বন্দি হয়ে কাঁদে, বাঁশি মানুষের হাতে বন্দি হয়ে কাঁদে। উভয়ের কান্না এক-মূল উৎসের দিকে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

বাঁশির সুর আমাদের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, কারণ আমরা শুনতে পাই—এই কান্না আমাদেরও। বেদনা, বিচ্ছেদ, আকাঙ্ক্ষা—সবই আমাদের প্রতিচ্ছবি। বাঁশির ধ্বনি স্মরণ করিয়ে দেয়, শিল্প, সঙ্গীত, কবিতা সবই জন্ম নেয় এই আত্মিক তৃষ্ণা থেকে।

এই সুর শুধু বেদনার নয়, এটি আমাদের শিক্ষা দেয়। বেদনা ছাড়া সৌন্দর্য নেই, বিচ্ছেদ ছাড়া ফিরে যাওয়া নেই, কান্না ছাড়া সঙ্গীত নেই। বাঁশির প্রতিটি ধ্বনি যেন বলে- “ফিরে যাও উৎসের দিকে, ফিরে যাও প্রিয়তমের কাছে,যার সান্নিধ্য ছাড়া আত্মা চিরকাল অপূর্ণ।”

চিন্তা করলে দেখা যায়,প্রকৃতপক্ষে বাঁশি হলো যেনো এক আধ্যাত্মিক ডাক, এক অনন্ত আহ্বান, যা মানুষের কানে নয়, মানবিক হৃদয়ের গভীরে প্রতিধ্বনিত হয়।আমরা শুনি, মুগ্ধ হই, আনন্দ পাই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাঁশি শিখায়-বেদনা বরণ করো, বিচ্ছেদ স্বীকার করো, তারপরই মূল উৎসের দিকে ফিরে যাও।

সুরের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এই সত্য বিচ্ছেদ হলো শিক্ষা, বেদনা হলো শিক্ষক, সঙ্গীত হলো ভাষা। বাঁশির আর্তি আমাদের জন্য, যেন আমরা বুঝি, আত্মা চিরকাল ফিরে যেতে চায় তার আসল উৎসে। এবং সেই যাত্রাই হলো জীবনের গভীর অর্থ।

বাঁশি আমাদের শেখায়, যে কাঁদে সে বাঁচে, যে কাঁদে সে বুঝে।বেদনার মধ্যেই নিহিত থাকে জীবন, বিচ্ছেদের মধ্যেই জন্ম নেয় আকাঙ্ক্ষা। আমরা যতই আনন্দ খুঁজতে চাই, প্রকৃত আনন্দ আসে মূল উৎসের সঙ্গে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে। বাঁশির সুর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি সঙ্গীত, প্রতিটি শিল্পকর্ম, প্রতিটি কবিতা সবই জন্ম নেয় বেদনা ও তৃষ্ণার মধ্য দিয়ে।

আত্মার যাত্রা হলো এক অবিরাম ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া। যেমন বাঁশি বনের মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষের হাতে বন্দি,তেমনি মানব আত্মাও দেহে বন্দি হয়ে আধ্যাত্মিক মুক্তির জন্য আকুল। বাঁশির প্রতিটি সুর যেন আমাদের ডাক দেয়- “চুপিচুপি নয়, সচেতন হয়ে শুনো, ফিরে যাও মূল উৎসের দিকে।”

এভাবেই বাঁশির সুর হয়ে ওঠে জীবনের আধ্যাত্মিক প্রতীক। এটি আনন্দের গান নয়, এটি আত্মার আহ্বান।এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা যেখানেই থাকি, যে পরিস্থিতিতেই থাকি, মূল উৎসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক চিরন্তন। বাঁশির কান্না সেই সম্পর্কের প্রতিফলন, যা আমাদের জীবনে সঙ্গীতের রূপ নেয়।

শেষমেষ, বাঁশির আর্তি আমাদের শিক্ষা দেয়- বেদনা বরণ করো, বিচ্ছেদ স্বীকার করো, অন্তরের তৃষ্ণা অনুভব করো।তারপরই আসল শান্তি, আসল সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব। বাঁশির সুর তাই শুধু শিল্প নয়, এটি আধ্যাত্মিক শিক্ষা, একটি চিরন্তন ডাক,যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আত্মার যাত্রা কখনো শেষ হয় না; এটি চিরকাল ফিরে যায় মূল উৎসের দিকে, ফিরে যাওয়ার আনন্দে মিলিত হয়, আর সেই আনন্দেই নিহিত জীবন, সৌন্দর্য এবং সত্য।

সুফিদের দৃষ্টিতে প্রেমই হলো সব কিছুর মূল। বাঁশির আর্তি তাই কেবল দুঃখ নয়, এটি হলো এক প্রেমময় আকাঙ্ক্ষা। বাঁশিও তার মূল উৎসকে ভোলে না। তার বুকের ফাঁকা গহ্বর দিয়ে যখন সুর বেরোয়, তখন তা হয়ে ওঠে প্রেমিকের আর্তি- “হে প্রিয়তম, তোমার ছাড়া আমার অস্তিত্ব শূন্য।” বাঁশির সুর সেই প্রেমের প্রতীক, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আত্মা শুধু ফিরে যেতে চায় না, সে প্রেমময় আলিঙ্গনে ডুবে যেতে চায়। তার প্রতিটি সুর যেন অদৃশ্য ভাষায় বলে- “তুমি ছাড়া আমি কিছুই নই, তোমার সান্নিধ্যেই আমার পূর্ণতা।” বাঁশির কান্না তাই কেবল বিচ্ছেদের নয়, এটি হলো প্রেমের ভাষা, প্রেমের আকুলতা।

সুফিবাদ শেখায় প্রেমই হলো মুক্তি, প্রেমই হলো সত্য। বাঁশির প্রতিটি ধ্বনি সেই মুক্তির ডাক, সেই সত্যের ইশারা।শেষ পর্যন্ত, বাঁশি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা সবাই পথিক, আমরা সবাই আকুল প্রেমিক। আমাদের অন্তরের বাঁশিও প্রতিদিন বাজছে, কাঁদছে, ডাকছে ফিরে যাও প্রিয়তমের কাছে, আলিঙ্গন করো চিরন্তন প্রেমকে।

– সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

আরো পড়ুনঃ