ধর্ম, আইন এবং সত্যের অসঙ্গতি

ধর্ম, আইন এবং সত্যের অসঙ্গতি

মানুষের জীবনে সত্যের সন্ধান এক অবিরাম যাত্রা, যেখানে শব্দের ওজন কখনো বাতাসের মতো উড়ে যায়, আবার কখনো পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়ায়। আদালতের কঠোর দরজায় শোনা কথা প্রায়শই অস্বীকৃত হয়, কারণ তা অদৃশ্য ছায়ার মতো অস্থির এবং অপ্রমাণিত; কিন্তু যখন সেই একই শোনা কথা লিপিবদ্ধ হয় ধর্মগ্রন্থের পাতায়, তখন তা পায় এক পবিত্র স্বীকৃতি, যেন অমরত্বের ছোঁয়ায় সত্যের সিংহাসন দখল করে। এই অসঙ্গতির মাঝে লুকিয়ে আছে মানুষের মনের গভীরতম দ্বন্দ্ব—যেখানে বিশ্বাসের শক্তি আইনের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে, এবং সত্য কখনো মিথ্যার ছদ্মবেশে প্রকাশিত হয়।

ধর্মগ্রন্থগুলো মানুষের শোনা কথার সংকলন মাত্র, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে প্রবাহিত হয়ে এসেছে, অথচ লিখিত রূপে তা অর্জন করে এক অলৌকিক মর্যাদা। আদালতে যখন কোনো সাক্ষী ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করে শপথ নেয়, তখন সেই স্পর্শ যেন এক জাদুমন্ত্র, যা মিথ্যাকে সত্যের আলোয় আলোকিত করে। কিন্তু এই প্রথা কি সত্যিই সত্যের রক্ষক, নাকি মানুষের দুর্বলতার আশ্রয়? ইতিহাস সাক্ষী যে, অনেক সময় এই শপথের ছায়ায় মিথ্যা কথা উচ্চারিত হয়েছে, যেন ধর্মের পবিত্রতা মিথ্যার পাপকে ধুয়ে দেয়। সুন্দরতম ফুলের মধ্যেও কাঁটা লুকিয়ে থাকে; তেমনি ধর্মগ্রন্থের গভীর অর্থের মধ্যে মানুষীয় ভুলের ছাপ পড়ে, যা আইনের চোখে অন্ধকার হয়ে যায়।

আইনের দৃষ্টিতে সাক্ষ্যের মানদণ্ড কঠোর এবং যুক্তিভিত্তিক, যেখানে শোনা কথা—হোক তা গুজব বা স্মৃতির টুকরো—প্রায়শই অগ্রাহ্য হয়, কারণ তা প্রমাণের শৃঙ্খলে দুর্বল কড়ি। কিন্তু ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে এই নিয়ম ব্যতিক্রমী; এখানে শোনা কথার লিখিত রূপ ধর্মীয় স্বীকৃতি লাভ করে, যেন কালের স্রোতে ধুয়ে যাওয়া শব্দগুলো হঠাৎ অমর হয়ে ওঠে। এই স্বীকৃতি দেয়ার পিছনে রয়েছে সমাজের বিশ্বাসের ভিত্তি, যা আইনকে বাধ্য করে ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে। তবু, যখন কোনো ব্যক্তি ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করে মিথ্যা বলে, তখন সেই স্পর্শ কি সত্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়? এটি মানুষের অন্তর্নিহিত দ্বৈততাকে প্রকাশ করে—যেখানে ভয়, লোভ বা প্রয়োজনের তাড়নায় সত্যকে বিকৃত করা হয়, এবং ধর্মের ছায়ায় তা লুকিয়ে রাখা হয়। জীবনের নদীতে সত্যের প্রবাহ অবিরত, কিন্তু মানুষের হাতে তা কখনো বাঁক নেয়, কখনো থমকে যায়।

এই অসঙ্গতির মূলে রয়েছে মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং বিশ্বাসের শক্তি। ধর্মগ্রন্থগুলো শুধু শব্দের সংগ্রহ নয়, তা মানবতার আধ্যাত্মিক যাত্রার দলিল, যা আদালত স্বীকার করে সমাজের ঐক্য রক্ষা করে। কিন্তু যখন সেই গ্রন্থ স্পর্শ করে মিথ্যা উচ্চারিত হয়, তখন তা প্রশ্ন তোলে সত্যের সার্বজনীনতা নিয়ে। সম্ভবত, সত্যের সন্ধানে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে—যেখানে শব্দের বাইরে হৃদয়ের বিশুদ্ধতা এবং যুক্তির আলো মিলিত হয়। শেষমেষ, ধর্ম এবং আইন উভয়ই মানুষের সৃষ্টি; তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়াই হবে সত্যের চিরন্তন বিজয়।

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ