বিস্ময়কর প্রতিভাময় কবি কাজি নজরুল ইসলাম।

বিস্ময়কর প্রতিভাময় কবি কাজি নজরুল ইসলাম।

– মুহাম্মদ নাসেরউদ্দিন আব্বাসী

বাঙালির হৃদয়পটে অঙ্কিত এক স্মৃতি, পারিবারিক সীমাহীন বেদনার মধ্যেও বাংলা কাব্য ও সাহিত্যচর্চায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি, বিস্ময়কর প্রতিভাযুক্ত কবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ, দেশপ্রেমিক কাজি নজরুল ইসলাম বাংলার ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ (১৮৯৯ সালের ২৬ মে) বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্ৰামে জন্মগ্ৰহণ করেন।

পিতা কাজি ফকির আহমেদ, পিতামহ কাজি আমিনুল্লাহ প্রপিতামহ কাজি গোলাম হোসেন, তাঁর পিতা কাজি খেবরাতুল্লাহ। পিতার দ্বিতীয় পত্নী মাতা জাহেদা খাতুনদের নয় ‘সন্তানের মধ্যে চার পুত্রের অকালমৃত্যু হয়। পুত্র কাজি সাহেবজান, কাজি নজরুল ইসলাম, কাজি আলি হোসেন। কন্যা সাজেদা খাতুন, উম্মে কুলসুম। ডাকনাম ছিল দুখু মিঞা, বংশের উপাধি কাজি ।পিতা স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মজারের মুত্তাওয়াল্লি।১৯০৮ সালে পিতার অকাল প্রয়াণে নজরুলের জীবন সংগ্রাম আরম্ভ হয়।

শৈশব থেকে ইসলামি চিন্তা ও ভাবধারায় প্রভাবিত হন। স্থানীয় মক্তব- মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। চুরুলিয়া মুক্তবের শিক্ষক মৌলানা কাজি ফজলে এবং পিতৃভ্রাতা বজলে করিমের সমীপে পবিত্র কুরআন, বাংলা, আরবি ও পারসি ভাষা অধ্যায়ন করেছিলেন।

১৯০৯ সালে অর্থ উপার্জনের তাগিদে নাচ-গান অভিনয় সমন্বিত লেটোর দলে সংযুক্ত হলেন। ফলে হিন্দু এবং মুসলিম শাস্ত্র, প্রাচীন সাহিত্য, ইতিহাস চর্চা করতে হয়। লেটো গানের দলে একাধিক গ্রন্থ-সহ সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান। কিশোর কবি নজরুলের রচিত লেটো গানের অংশ- ‘বুঝলাম নাথ এতদিনে যুবকের চলনা হে, কোথা শিখিলে এ প্রণয় আমারে বল না হে।

১৯১২ সালে বর্ধমান জেলার মাথরুল গ্রামের নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউটশনে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। উক্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। দারিদ্র্যে হেতু নজরুল বাসুদেবের কবিদলে গানের তালিম নেন। গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে রেলের একজন খ্রির্স্টান গার্ডকে খাবার পৌঁছানোর চাকরি নেন। পরে তিনি আসানসোলের এক পাঁউরুটির দোকানে দৈনিক এক টাকা মজুরিতে কাজে যোগ দেন।পুলিশ অধিকারিক কাজি রফিউল্লাহ-র বাসভবনে সময় অতিবাহিত করেন। কাজি রফিউল্লাহ ময়মনসিংহ জেলার দরিরামপুরের এক স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে নজরুলকে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন। ১৯১৪ সালে তিনি স্কুলের আবৃত্তি, নাটক, বিতর্কসভায় যোগ দিয়ে শিক্ষক মহলের স্নেহভাজন হন।

১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমানে শিয়ারশোল রাজস্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। স্কুলে তিন বন্ধু- হিন্দু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়,মুসলমান নজরুল আর খ্রিস্টান শৈলেন্দ্রকুমার ঘোষ। নজরুল শিয়ারশোল রাজস্কুল থেকে সাত টাকার বৃত্তি পান। এহেন সমায় সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলালের সমীপে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নেন। হাফিজ নুরুন্নবীর কাছে ফারসি ভাষা জ্ঞান অর্জন করেন। স্কুলের শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটকের সংস্পর্শে যুগান্তর দলে যোগ দেন। বিপীনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায় শিয়ারশোল রাজ এস্টেটে রাজ ছদ্মবেশে ছেলেদের লাঠি, ছোরা খেলার শিক্ষা দিতেন। ফলে নজরুল উক্ত খেলায় মনোনিবেশ করেন।

১৯১৭ সালে দশম শ্রেণীতে প্রিটেস্ট পরীক্ষার পর সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টন রেজিমেন্টের হাবিলদার পদ লাভ করেন। সেনা পদে পাকিস্তানের করাচিতে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে প্রোমোশন হয়। সেনাবাহিনীতে সহকর্মী ছিলেন কলকাতার মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়, চট্টগ্রামের মহিবুবুল আলম, কুষ্টিয়ার শম্ভু রায় ও মির্জাপুরের রণদাপ্রসাদ শাহ।

চাকরির অবসরে বাদ্যযন্ত্র, রবীন্দ্রসংগীত চর্চা, আরবি- ফারসি ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। করাচির সেনা ছাউনি থেকে গল্প, কবিতা কলকাতার সমকালীন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাঠাতেন।’ ‘সওগাত’ পত্রিকায় ‘বাউণ্ডুয়ের আত্মকাহিনী’ গল্প প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ যা ক্ষমা’ নামে মুদ্রিত হয়েছিল।

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ১৯১৯ সালে এপ্রিল মাসে পল্টন রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর তিনি চুরুলিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর কাব্যচর্চার সময় দৈনিক বসুমতী, মুসলিম ভারত, মাসিক প্রবাসী, বিজলী, ধুমকেতু প্রভৃতি পত্রিকায় তা প্রকাশ হতে থাকে।

১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় ৪৭/১ মির্জাপুর স্ট্রিটের ( সূর্য সেন স্ট্রিট) নীচের তলার একখানা ঘরে অফিস ছিল।২৮ জুন ১৯১৯ সালে ভার্সাইয়ের সন্ধির ফলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে ।রেজিমেন্ট থেকে ফিরে অন্য চাকরির জন্য নজরুল মুজাফফর আহমেদের পরামর্শে চাকরিতে যোগ দেন‌। সুধাকান্ত রায়চৌধুরীর উদ্যোগে মুহাম্মদ শাহিদুল্লাহ-র সঙ্গে নজরুল শান্তিনিকেতনে গিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে পরিচিতি হন।

১৯২০ সালের মার্চ মাসে নজরুল কলকাতায় শৈলজানন্দের বাসভবনে অবস্থান করেন। পরে বন্ধুবর মুজাফফর আহমেদের সঙ্গে নজরুল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ঘরে ছিলেন ।১৯২১ সালে মুহাম্মদ মোজাম্মেল হকের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় তাঁর ‘বাঁধনহারা’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়।এছাড়া কোরবাণী,শাত ইল আরব মোহররম, কামাল পাশা,খেয়া পারের তরুণী প্রভৃতি কবিতা মুদ্রিত হয়। নজরুলের অমর কবিতা ‘বিদ্রোহী’,যার জন্য বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন তিনি।

তার কিছু অংশ-
বল বীর
বল চির উন্নত মম শির শির নেহারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির।

১৯২২ সালে অক্টোবরে ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘যুগবাণী’পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবিতাটি। ব্রিটিশ- বিরোধিতায় ধূমকেতুর সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হয়। নজরুলের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় ।নজরুল সমস্তিপুরে আত্মগোপনে করেন।সেখান থেকে গিরিবালা দেবী ও প্রমীলা দেবী-সহ কুমিল্লায় ২৩ নভেম্বর ১৯২২ সালে পুলিশের হাতে আটক হন। নজরুল এই মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ লেখেন।কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যাটি নজরুলের নামে উৎসর্গ করেন। ‘বিজয়িনী’ কবিতার মধ্যে দিয়ে নজরুল প্রমীলাদেবীর প্রতি ভালবাসা ব্যক্ত করেছিলেন। কারাবাসে ব্রিটিশ পুলিশের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে ১৯২৩ সালে ১৪ এপ্রিল অনশন শুরু করেন তিনি।

দীর্ঘ চল্লিশ দিন গর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তারবার্তা- সহ বহু মানুষের অনুরোধ এবং বিরজাসুন্দরী দেবীর হাতে লেবুর রস পান করে অনশন ভঙ্গ করেন। ১৫ ডিসেম্বর ‘১৯২৩ সালে বহরমপুর জেল থেকে নজরুল মুক্তি পান। ৯ জানুয়ারি’ ১৯২৪ সাল পর্যন্ত মামলা চলে । ৭ ফেব্রুয়ারি শুনানি হওয়ার পর ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪ সালে মামলা থেকে অব্যাহিত পান। ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল নজরুল প্রেমিকা আশালতা সেনগুপ্তকে বিবাহ করেন।

১৯৩৩ সালে ফরিদপুর জেলায় মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে স্বেচ্ছায় নির্বাসন দণ্ড গ্রহণের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে কলম্বিয়া, পাইওনিয়ার,সেনেলা, হিন্দুস্থান গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানিতে যুক্ত ছিলেন। অক্টোবরে নজরুল সরাসরি কলকাতায় বেতারের অনুষ্ঠান মেলা মিলন, হারামণি, নবরাগ মল্লিকা প্রচার করতে থাকেন। ১৬ ডিসেম্বর ‘৩৯ সালে এ কে ফজলুল হক ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণী প্রচারের হেতু ‘ঢাকা ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র’ আরম্ভ হয়।

১৯৪১ সালে নজরুল শারীরিকভাবে ভাবে অসুস্থ হন। ৫ ও ৬ এপ্রিল ‘১৯৪১ সালে কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজত জয়ন্তী উৎসবে তিনি আধ্যাত্মিক চেতনার উপর জোর দেন। ১৯৪১সালের অক্টোবরে এ.কে. ফজলুল হকের প্রচেষ্টায় ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকা প্রকাশ হলে নজরুল সংযুক্ত হন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরলোক যাত্রায় কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে নজরুল শোকজ্ঞাপন করেন। ১৯৪২ সালের জুনে ‘নবযুগ’ পত্রিকায় ‘আমার সুন্দর ‘রচিত হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বি.ত্র পরীক্ষার পরীক্ষক নিযুক্ত করেন। ৮ জুলাই’ ৪২ সালে তিনি দুরারোগ্য মূক ও বধির পীড়ায় আক্রান্ত হন। ৯ জুলাই’ ৪২ সালে কলকাতা বেতার কেন্দ্রে মস্তিষ্ক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ফলে বাকশক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়।
১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত কবি জগত্তারিণী পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার নজরুলের জন্য অর্থসাহায্য অব্যাহত রাখেন।

১৯৪৯ সালের ১ এপ্রিল মাসিক দু’শো টাকা অনুদান মঞ্জুর করে পূর্ব-পাকিস্তান সরকার। ১৯৫২ সালে নজরুলকে রাঁচিতে পাঠানো হয়। ১৯৫৩ সালে কলকাতা নাগরিক সমাজ কর্তৃক ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’প্রতিষ্ঠা করা হয়। একাধিক বার ডা.বিধানচন্দ্র রায়ও তাঁকে দেখেন। ১০ মে’ ১৯৫৩ সালে নজরুলকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে লন্ডন থেকে ভিয়েনা। ‘পিকস রোগে তিনি আক্রান্ত ছিলেন।
১৪ ডিসেম্বর’১৯৫৩ সালে নজরুলকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়‌।

১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে একটি তথ্যাচিত্র তৈরি হয়।
১৯৬০ সালে ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে শোভিত হন তিনি। ১৯৬২ সালে ৩০ জুন জুন পত্নী প্রমীলা দেবীর মৃত্যু হয়‌। চুরুলিয়ায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। ১৯৬৪ সালের ২৪ মে ঢাকায় নজরুল অ্যকাডেমি, ১৯৬৬ সালে ১২ আগস্ট চুরুলিয়ায় নজরুল অ্যকাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭০ সালে বিশ্বভারতী কর্তৃক কবিকে ডি-লিট উপাধিতে সম্মিনিত করা হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্ম হয়। এই আন্দোলনে নজরুলের সাহিত্য ও গান বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। ১৯৭২ সালের জন্মদিনে কবিকে বাংলাদেশে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর আহ্বান জানালেন।

২৪ মে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বিমানে কবিকে ঢাকায় আনা হয়।১৯৭৩ সালে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডি-লিট’ দেয়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’প্রদান করা। ১৩৮৩ সালে সালের ১২ ভাদ্র (২৯ আগস্ট’ ১৯৭৬) ঢাকায় পিসি হাসপাতালে জ্বর ও নিউমোনিয়ার আক্রান্ত হয়ে সকাল দশটা দশ- মিনিটে পরলোকে পাড়ি দেন নজরুল।

তাঁর আদেশ অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন উত্তর পার্শ্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিকে মমাহিত করা হয়। মসজিদের পার্শ্বে কবি আজও চিরনিনদ্রায় শায়িত।
তাই কবি লিখেছেন- মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।

যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিমের আজানও শুনতে পাই।
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজিরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে।
গোর- আযাব থেকে গুনাহগার পাইবে রেহাই।

(বিশ্ব মনীষী কোষ)

আরো পড়ুনঃ