সূফি আব্দুস সাদেক (দা:বা:) এর জীবনী: এক আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক, কায়ছার উদ্দীন আল—মালেকী
সূচনা: আধ্যাত্ম জগতের নব সূর্য
হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) এক মহান আধ্যাত্মিক সত্ত্বা, যাঁর জীবন আল্লাহর স্মরণে, দ্বীনি প্রচারে ও মানবতার সেবায় পূর্ণ। তাঁর শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই আল্লাহর রাহে নিবেদিত। তিনি এক নিভৃতচারী, সৎ, ও জীবনদর্শনে গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তি, যাঁর অবদান শুধুমাত্র তাঁর আশপাশের মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, বরং তাঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শন ও কেরামতী কর্মকাণ্ড পুরো সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
জন্ম: আলোকিত মানুষের আগমন
হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) ৩০ মে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে, আল্লাহর কৃপায়, এক অত্যন্ত বরকতপূর্ণ পরিবেশে, নিজ মাতুলালয়ে, চর পূর্বরায়, কেন্দুয়া, নেত্রকোণায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম স্থানটি শান্তি, নির্ভাবনা ও আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ, যেখানে শিশু বয়স থেকেই তাঁর অন্তরে খোদার প্রেম ও সুফি দর্শন প্রতিফলিত হতে শুরু করে। আল্লাহর বিশেষ রহমতে, এই সজীব জন্মস্থান থেকে তাঁর জীবনের একটি মহাসফরের সূচনা হয়ে, যা পরবর্তীতে একটি মহান সুফি মুর্শিদের জন্ম হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শাহ্ সূফী হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) এর আধ্যাত্মিক বংশধারা ও পরিবার
হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) একজন বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, যিনি আজও জীবিত আছেন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি ও পথনির্দেশনা দিয়ে বহু মানুষের জীবন আলোকিত করছেন। তিনি একটি মহৎ এবং ধর্মনিষ্ঠ পরিবারের সন্তান, যা তাঁর জীবনের প্রতি আধ্যাত্মিক এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে। তাঁর পিতা, হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ্ সূফী ছৈয়দ আলী আহমদ (রহ.) একজন প্রখ্যাত পীরে কামেল, যিনি নূরে চর্মের মাধ্যমে বিশ্বে হিদায়াতের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। মাতা, মরহুমা মোছা: আয়শা আক্তার খাঁনম, এক পর্দানশীন ও তাক্বওয়াবান নারী, যিনি ইসলামের আদর্শে জীবন কাটিয়েছেন এবং সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন।
তাঁর দাদা, হযরত শাহ্ সূফী হযরত শমশের আলী মাহমুদ (রহ.)—এর আধ্যাত্মিক কৃপার মাধ্যমে কেন্দুয়া, নেত্রকোণার আধ্যাত্মিক জগতে তাঁর নাম সুপরিচিত। তাঁর নানা, মরহুম মুহাম্মদ হাসন খাঁন, চর পূর্বরায়, কেন্দুয়া, নেত্রকোণায় এক সম্মানিত ব্যক্তি। হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) এর জীবনের অন্যতম সাফল্য হলো তাঁর পরিবারিক জীবন। তাঁর স্ত্রী, মোছা: সুরাইয়া খাঁনম, একজন ধার্মিক ও সৎ নারী, যিনি শ্বশুরবাড়ির সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিকতা বজায় রেখে জীবনযাপন করছেন। তাঁর শ্বশুর, মরহুম মো: করিম নেওয়াজ খাঁন, কলুমা, তাড়াইল, কিশোরগঞ্জ এলাকার এক সম্মানিত ব্যক্তি, এবং শ্বাশুড়ী, মরহুমা মোছা: নার্গিস আনার খাঁনম, একজন আধ্যাত্মিক ও শিষ্টচরিত্র সম্পন্ন নারী।
জ্ঞানরথের সূচনা: শাহ্—সূফি আব্দুস সাদেক (দা:বা:)—শিক্ষাজীবন
আলোকিত পথের শুরুর ইতিহাস: যে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি, জ্ঞানের দীপ্তি ও তাসাউফের নূরে যুগের পাথেয় হয়ে উঠেছেন, তাঁর জ্ঞানের যাত্রাও ছিল তেমনি এক নিরব কিন্তু দীপ্ত আলোয় মোড়ানো। শাহ্—সূফি আব্দুস সাদেক (দা:বা:)—শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে, কিন্তু তাঁর আত্মার গন্তব্য ছিল অনন্ত উচ্চতা।
হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) তাঁর ধর্মীয় শিক্ষার শুরু করেন তাঁর পিতার কাছ থেকে। তিনি তাঁর পিতার নিকট কোরআন, হাদীস, ফিকহ এবং ইসলামী জ্ঞান লাভ করেন, যা তাকে এক পবিত্র আধ্যাত্মিক পথের অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলে।
পুরুড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক দীপ্তি (এস.এস.সি— ১৯৬৭): তাড়াইল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পুরুড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি এস.এস.সি উত্তীর্ণ হন। এই বিদ্যালয়ের পাঠশালাতেই তাঁর মন ও মগজে ইসলামী মূল্যবোধের বীজ রোপিত হয়। তখন থেকেই তাঁর মধ্যে গড়ে উঠছিল এক ভবিষ্যৎ আলোকিত ব্যক্তিত্বের অবয়ব।
গৌরীপুর সরকারি কলেজে মননের বিকাশ (এইচ.এস.সি — ১৯৬৯): এরপর গৌরীপুর সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ থেকে ১৯৬৯ সালে এইচ.এস.সি পাস করেন। এই সময় তিনি নিজেকে শুধু একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে দেখেননি; বরং জ্ঞানের সাধনায় একজন পথিকরূপে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেন। অধ্যয়ন, চিন্তা, এবং আত্মসমীক্ষার এই সময়েই তিনি সুফিবাদের প্রাথমিক ধ্যান—ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হতে থাকেন।
নেত্রকোণা সরকারি কলেজে উচ্চতর অধ্যয়ন (বি.এ— ১৯৭১): ১৯৭১ সালে তিনি নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। এই সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলমান ছিল, একটি নবযুগের সূচনা হচ্ছিল; আর হযরত সাদেক সাহেব নিজেও নিজের আত্মিক এবং চারিত্রিক স্বাধীনতার জন্য এক নতুন যাত্রায় পা রাখছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বপ্নের অধ্যায় শুরু কিন্তু ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে এম.এ কোর্সে ভর্তি হন। মহানগরের বুকে এক তরুণ জ্ঞানপিপাসু—সুফিবাদের আলো নিয়ে আরও গভীরে প্রবেশের প্রয়াস চালান। কিন্তু নিয়তির ভিন্ন ইশারা ছিল তাঁর জন্য সংরক্ষিত। সে বছরই একজন ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হন, ফলে তাঁর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের যাত্রা অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
তবে তাঁর শিক্ষা থেমে থাকেনি ডিগ্রির সীমায়। তাসাউফ, হাদীস, তাফসীর এবং নৈতিক শিক্ষায় তিনি যে আত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন—তার পরিধি কাগজে লেখা যায় না। তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে, প্রতিটি মুরিদের অন্তরস্পর্শী প্রশ্নের জবাবে, এক ধ্রুপদী শিক্ষার ছায়া ফুটে ওঠে।
ভাষাগত দক্ষতা: হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) আরবী, ইংরেজি, উর্দু এবং ফার্সি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ। তিনি এসব ভাষায় প্রচুর জ্ঞান রাখেন এবং সেগুলোর মাধ্যমে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আলোচনায় সমৃদ্ধ আছেন।
জ্ঞানদানের মিম্বর থেকে আত্মশুদ্ধির আহ্বান: শাহ্—সূফি হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা.বা.)—একজন আলোকিত আধ্যাত্মিক মনীষী—তাঁর শিক্ষকতা জীবনে জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন সাধনার স্পর্শ। তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে সুপন্ডিত হয়ে দেশের তিনটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর শিক্ষাদানের বৈশিষ্ট্য কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদানে সীমাবদ্ধ ছিল না—তিনি ছাত্রদের আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নেও যথার্থ দিকনির্দেশনা দিতেন।
তাঁর এই বহুমাত্রিক শিক্ষাদান বাংলাদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে ছিল, যেমন:
- ১. বিন্নাটি উচ্চ বিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জ। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় জেলার অবস্থিত বিন্নাটি উচ্চ বিদ্যালয় একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে স্থানীয় জনপদের মেধাবী ছাত্র—ছাত্রীদের মাঝে। এখানেই হযরত আব্দুস সাদেক (দা.বা.)। তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। তাঁর পণ্ডিতামণ্ডিত বক্তৃতা ও মানবিক গুণাবলী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে এক অনন্য আলোর রেখা সৃষ্টি করে।
- ২. গগডা উচ্চ বিদ্যালয়, কেন্দুয়া, নেত্রকোণা:
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার গগডা উচ্চ বিদ্যালয় গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষার মণিকোঠা। এখানে সাধারণ মানুষের সন্তানরা শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। হযরত আব্দুস সাদেক (দা.বা.)—এখানে একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কেবল ইংরেজি ভাষার জ্ঞানই দেননি, বরং আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের বীজ বপন করেছেন। - ৩. সাবেরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কেন্দুয়া, নেত্রকোণা:
নারীশিক্ষার অগ্রগতিতে এই বিদ্যালয়টি কেন্দুয়া অঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মেয়েদের শিক্ষায় অবদান রাখার পাশাপাশি আত্মমর্যাদা ও নৈতিকতা অর্জনে এই প্রতিষ্ঠানের ভুমিকা অনস্বীকার্য। এখানেও হযরত আব্দুস সাদেক (দা.বা.)—তাঁর শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীদের আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানান এবং তাদের মধ্যে সাহস ও সম্মানের বীজ রোপণ করেন।
এই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি কেবল ভাষা ও সাহিত্যই শেখাননি, বরং ছিলেন নৈতিক দীক্ষাদাতা, আত্মিক পথপ্রদর্শক ও চরিত্রগঠনের কারিগর। তাঁর পাঠ ছিল বিশ্লেষণধর্মী, অন্তর্দর্শন—নির্ভর ও চিন্তাপ্রবণ—যা শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলত আত্মমর্যাদা, আল্লাহভীতি ও মানবিক বোধের সূক্ষ্ম সঞ্চার।
শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি যেমন ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষক, তেমনি শ্রেণিকক্ষের বাইরে হয়ে উঠতেন এক দরদী মুরব্বি, একজন আত্মিক অভিভাবক। তিনি ছাত্র—ছাত্রীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতেন, অনুপ্রাণিত করতেন বড় হতে—কেবল ডিগ্রিতে নয়, বরং মর্যাদায়, মানবিকতায় ও মারিফাতে।
আজ তাঁর অসংখ্য ছাত্র—ছাত্রী দেশ—বিদেশের নানান উচ্চপদে কর্মরত। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কেউ প্রশাসনের উচ্চচূড়ায়, কেউবা সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ। তাঁরা কেবল পেশাগত সাফল্যে নয়—আদর্শ, সততা ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যে দীপ্তিমান। তাঁদের অনেকেই আজো স্মরণ করেন হযরতের সেই মৃদু অথচ অর্থবহ উপদেশ:
“পাঠ্যবই পড়ে পাশ করবে ঠিকই, কিন্তু আত্মাকে না জাগালে জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে।”
বর্তমানে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও নৈতিক আলোকচ্ছটা আজও তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে দীপ্তিমান। তাঁর পাঠ ছিল শুধু পাঠ্যবিষয়ের অনুশীলন নয়—বরং আত্মার দরজাগুলো খুলে দেওয়ার এক—একটি চাবিকাঠি।
এইভাবেই শাহ্—সূফি মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা.বা.)। শিক্ষকতার মঞ্চকে রূপ দিয়েছিলেন এক সুফিময় মিম্বারে, যেখানে কলমের কালি শুধু জ্ঞানের বাহক ছিল না—বরং নৈতিকতা, আদর্শ ও আত্মশুদ্ধির দীপ্ত বার্তাও ছড়াত।
বাইয়াত ও খেলাফত
পীর ও মুর্শিদ: হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) তার আধ্যাত্মিক জীবনযাত্রার সূচনা করেন তাঁর পিতা, নূরে চর্মে হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ্ সূফী ছৈয়দ আলী আহমদ (রহ.)। এর পবিত্র মর্জি ও দিকনির্দেশনায়। তিনি নিজে এক মহা পীরে কামেল, যার দৃষ্টিতে এক গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও আল্লাহর রাস্তা দেখানোর ব্যতিক্রমী ক্ষমতা।
তরিকা: হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) তাঁর পিতার মাধ্যমে চারটি মহান তরিকার অনুসরণ করেন — চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া—মোজাদ্দেদিয়া এবং মোহাম্মদিয়া তরিকা। তাঁর মুর্শিদি চিশতিয়া তরিকার মাধ্যমে তিনি সুফীজীবনের গভীরে প্রবেশ করেন, যেখানে তিনি হৃদয়ের পরিস্কারতা, আধ্যাত্মিক আভা এবং আল্লাহর প্রেমে স্নাত হতে সক্ষম হন। এই তরিকা তার অন্তরে এমন এক স্নিগ্ধতা এবং পরিশুদ্ধতা আনে যা তাঁর প্রভূত আধ্যাত্মিক অর্জন ও সফলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
খেলাফত: হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) তাঁর পিতার কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং খেলাফত লাভ করেন, তা কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে নয় বরং সাধনার মানদণ্ডে, যা তাঁর জীবনে পরবর্তী আধ্যাত্মিক পদক্ষেপের একটি মৌলিক অংশ হয়ে ওঠে। বাইয়াতের মাধ্যমে তিনি তাঁর অনুসারীদের কাছে আধ্যাত্মিক সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করতে শুরু করেন, যা তাঁর মুল্যায়ন, পরিশ্রম এবং মহান আত্মিক ক্ষমতার মাধ্যমে সমস্ত দুনিয়াকে আলোকিত করে। এভাবে তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের জীবনদর্শন এবং মুর্শিদগণের শানকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার ফলে তিনি একটি চিরকালীন আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের অধিকারী হয়ে উঠেছেন।
আধ্যাত্মিক কর্মযাত্রা: তাসাউফ, সুন্নাহ ও দ্বীনের দাওয়াত
তাসাউফ ও সুন্নাহ প্রচার: তিনি তাসাউফের প্রচার ও সুন্নাহর আলোকে মানুষকে জীবনের সঠিক পথ দেখানোর জন্য সচেষ্ট থাকেন। তার বক্তৃতায় তাসাউফের নৈতিকতা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)—এর সুন্নাহর অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
চিশতিয়া তরিকার শাজরা (আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতা): হজরত শাহ্—সূফি আব্দুস সাদেক (দ.বা.)—তার পীর হযরত মাওলানা ক্বারী শাহ সুফি ছৈয়দ আলী আহম্মদ (রহ.)—তার পীর হযরত মাওলানা শাহ্—সূফী ইছমাঈল আলী জাহাঙ্গীর নওধারী (রহ.)—তার পীর ছিলেন শামসুল ওলামা হযরত গোলাম সালমানী আব্বাসী (রহ.)। তার পীর ছিলেন সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি বর্ধমানী (রহ.), এরপর তার পীর শায়খুল হাদিস সুফি নূর মুহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.)। এছাড়া তার পীর সৈয়দ আহমদ শহীদ রায়বেরেলভি (রহ.), তার পীর শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.), এবং তার পীর শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) ছিলেন। এভাবে চিশতিয়া তরিকার ধারায় তিনি হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) হয়ে সরাসরি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সম্পর্ক যুক্ত।
ইসলামী জনসভায় বয়ান: তিনি বিভিন্ন ইসলামী জনসভায় বয়ান করেন, যেখানে তিনি দ্বীনের প্রচার ও মানুষের মধ্যে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও পরকালমুখী হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টির চেষ্টা করে। তার বয়ানে মানুষ সঠিক জীবনযাপন ও নৈতিকতা অনুসরণ করতে উৎসাহিত হয়। এ খেদমতে ৪০টি বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি ক্লান্তিহীনভাবে এ মহান কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন এখনোও।
দ্বীনের দাওয়াত: তিনি মুসলিম সমাজে দ্বীনের দাওয়াত প্রদান করেন, এবং বিশেষভাবে পরকালমুখী হওয়া ও আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য কাজ করেন।
মৃত্যুভীতি সৃষ্টি নয় বরং খোদা প্রেমের মাধ্যমে অন্তরের পরিশুদ্ধির আহবান: তার বয়ানগুলো এমন, যা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। তিনি খোদা প্রেম ও নবী প্রেমের মাধ্যমে মানুষের মাঝে আল্লাহর প্রতি ভয়, মুহাব্বত ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, যাতে তারা তার দুনিয়াবী কাজগুলোর পাশাপাশি পরকালের প্রতি মনোযোগী হয়।
এই কাজগুলো তাকে সাধারণ মানুষের কাছে এক অভ্যন্তরীণ ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র
হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) এক অত্যন্ত সরল, সদাচারী ও আল্লাহর স্মরণে মগ্ন ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবনে কিছু বৈশিষ্ট্য যা তাঁকে অন্যদের থেকে বিশেষভাবে আলাদা করে তুলেছে। তাঁর জবানের মিষ্টতা, সুন্দর চরিত্র, এবং সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি একজন পরম নিরহংকারী ব্যক্তি, এবং দ্বীনি কাজে আপত্তিহীনতা তাঁর জীবনধারার অংশ। তাঁর হৃদয় পরিপূর্ণ ভালোবাসায়, যা শুধু মানুষের প্রতি নয়, বরং সৃষ্টির প্রতি সকল সত্তার প্রতি।
আব্দুস সাদেক (দা:বা:) এর দর্শন সমূহ
১. তাক্বওয়া (আল্লাহ ভীতি ও ধার্মিকতা:
তাক্বওয়া এক প্রকার আল্লাহর প্রতি ভয়, মুহাব্বত ও ভক্তি প্রদর্শন যা একজন মুসলিমের জীবনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। হযরত আব্দুস সাদেক (দা:বা:) এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে ধারণ করেন। কুরআনে বলা হয়েছে: “তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, এবং সৎকর্মে লিপ্ত হও, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সুরক্ষা সৃষ্টি করবেন” সূরা তালাক, ৬৫:২।
২. সততা/সত্যবাদিতা:
সত্য কথা বলার গুরুত্ব ইসলাম অত্যন্ত দেয়। হযরত আব্দুস সাদেক (দা:বা:) কখনোই মিথ্যা বলেন না, বরং তাঁর জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সৎ ও সত্য। কুরআনে বলা হয়েছে: “তুমি যে সময় সত্য বলো, তা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়” সূরা আল—আযাব, ৩৩:৭০।
৩. একনিষ্ঠতা বা একাগ্রতা:
হযরত (দা:বা:) অত্যন্ত একনিষ্ঠ ও একাগ্র। তাঁর জীবনের সকল কাজ আল্লাহর রাস্তায় নিবেদিত। কুরআনে একনিষ্ঠতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে: “যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি একনিষ্ঠ এবং তাদের কর্মে সতর্ক, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রহমত ও বরকত” সূরা আল—ফাতহ, ৪৮:২৯।
৪. নির্জনতা:
আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নির্জনতা বা মুনাজাত গুরুত্বপূর্ণ। হযরত (দা:বা:) নির্জন অবস্থায় আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করে। হাদিসে বলা হয়েছে: আল্লাহ বলেন, “তোমরা আমাকে মনে কর, আমি তোমাদের মনে রাখব” বুখারি।
৫. তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা:
তাওয়াক্কুল মানে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা। হযরত (দা:বা:) তাঁর জীবনে এ দর্শন অনুসরণ করছেন। কুরআনে বলা হয়েছে: “যে আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট” সূরা তালাক, ৬৫:৩।
৬. সুক্ষ্মদর্শীতা:
হযরত (দা:বা:) অত্যন্ত সুক্ষ্মদর্শী, তাঁর দৃষ্টিতে সবার হৃদয় ও আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রকাশ পায়। কুরআনে বলা হয়েছে: “তারা তাদের হৃদয় দিয়ে লক্ষ্য করে, কিন্তু তা বুঝতে পারে না” সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯১।
৭. অন্তর্দৃষ্টিতা:
একটি সত্যিকারের মুমিনের অন্তর্দৃষ্টি থাকে, যার মাধ্যমে তিনি পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর হুকুম বুঝতে পারেন। হাদিসে বলা হয়েছে: “আল্লাহ যে মানুষকে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেন, সে দেখতে পায় যা অন্যরা দেখতে পায় না” সাহীহ বুখারি।
৮. আত্মশুদ্ধি:
হযরত (দা:বা:) আত্মশুদ্ধি ও তাসফিয়ার প্রতি গভীর মনোযোগী । কুরআনে আল্লাহ বলেন: “যে নিজেকে শুদ্ধ করেছে, সে সফল হবে” সূরা আশ—শামস, ৯১:৯।
৯. মুরাকাবা—মুশাহাদা (আধ্যাত্মিক পর্যবেক্ষণ:
মুরাকাবা বা আত্মবিশ্লেষণ একজন মুমিনের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে বলা হয়েছে: “আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকা শীর্ষস্থানীয় ইবাদত” সাহীহ মুসলিম।
১০. উস্তাদ—মুরিদের সম্পর্ক ও বাইয়াত:
হযরত (দা:বা:) মুরিদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ও সহানুভূতিশীল । বাইয়াতের মাধ্যমে মুরিদরা তাঁর কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করে। কুরআনে বলা হয়েছে: “তোমরা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন কর, তাঁর রাসূলের মাধ্যমে” সূরা আল—ফাতহ, ৪৮:১০।
১১. মুহাব্বত (ভালোবাসা):
ভালোবাসা ইসলামি জীবনধারার একটি অমূল্য অংশ। হযরত (দা:বা:) সকলের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করে। কুরআনে বলা হয়েছে: “তোমরা একে অপরকে ভালোবাসো, তোমাদের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা থাকবে” সূরা আল—হুজুরাত, ৪৯:১০।
১২. খলওয়াত ও জালওয়াত (নিঃসঙ্গতা ও মানুষের সাথে থাকা:
হযরত (দা:বা:) নিঃসঙ্গতা ও মানুষের সাথে থাকা—উভয় দিকের গুরুত্ব বুঝেন। কুরআনে বলা হয়েছে: “যারা আল্লাহর পথে মোনাজাত ও তাসবিহ করতে থাকেন, তারা একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে” সূরা আনফাল, ৮:৭২।
১৩. হিকমাহ (আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞা):
হযরত (দা:বা:) অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান , তাঁর সিদ্ধান্ত ও উপদেশে গভীর জ্ঞান ও আল্লাহর অনুগ্রহ । কুরআনে বলা হয়েছে: “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন, এবং তিনি যাকে প্রজ্ঞা দান করেন, সে এক বড় মঙ্গল লাভ করে” সূরা বাকারা, ২:২৬৯।
১৪. খিদমাতুল খালক (সৃষ্টির সেবা:
হযরত (দা:বা:) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সৃষ্টির সেবা করে। তাঁর দর্শনে মানবতার সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে বলা হয়েছে:-
“তোমরা সৃষ্টির সেবা করো, আল্লাহর দয়া পাবে” সূরা দোহা, ৯৩:১১।
১৫. সাম্য ও মানবাধিকারের সম্মান:
হযরত (দা:বা:) ইসলামের মূল দর্শন “সাম্য” ও “মানবাধিকার” অনুসরণ করে। তাঁর জীবনে সকল মানুষের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, বিশেষ করে বিপন্ন, নিপীড়িত এবং অবহেলিত মানুষের প্রতি। কুরআনে বলা হয়েছে: “অবশ্যই, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক তাক্বওয়া রাখে” সূরা আল—হুজুরাত, ৪৯:১৩।
১৬. দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে ভারসাম্য:
হযরত (দা:বা:) জানতেন যে, একজন মুসলিমের জীবনকে দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখে পরিচালিত করতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে: “তুমি দুনিয়ার উপভোগ নিয়ে থাক, তবে আখিরাতের জীবনকে ভুলে যেও না” সূরা আল—কাশফ, ২৮:৭৭।
১৭. নেকী ও সৎকর্মের প্রতি আগ্রহ:
হযরত (দা:বা:) সবসময় নেকী ও সৎকর্মে আগ্রহী । তাঁর জীবনে সৎকর্মের প্রতি কঠোর অধ্যবসায় । কুরআনে বলা হয়েছে: “সৎকর্ম এবং নেকী করতে তোমাদের একে অপরকে উৎসাহিত করো” সূরা আল—মুত্তাফিফিন, ৮৩:৩।
১৮. ইতফাক (সহানুভূতি ও সহমর্মিতা:
হযরত (দা:বা:) সকল মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করে। তাঁর দৃষ্টিতে, সমাজের সবার সাথেই সমঝোতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। কুরআনে বলা হয়েছে: “যারা একে অপরকে সহানুভূতি এবং সদ্ভাব দেখায়, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন” সূরা আল—হুজুরাত, ৪৯:১০।
১৯. অবিচার ও অত্যাচারের প্রতি ঘৃণা:
হযরত (দা:বা:) অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার। তাঁর জীবনে আল্লাহর প্রতি অবিচার ও মানুষের প্রতি জুলুম করার কোনো স্থান না। কুরআনে বলা হয়েছে: “অবিচারকারীরা কখনও সফল হবে না” সূরা আল—মুমিনুন, ২৩:১১৭।
২০. অধ্যবসায় ও ধৈর্য:
হযরত (দা:বা:) তাঁর জীবনে সকল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করে। যখন পরিস্থিতি কঠিন হত, তিনি দুনিয়ার প্রতি তার সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে আল্লাহর উপর নির্ভর করে। কুরআনে বলা হয়েছে: “হে মুমিনগণ! ধৈর্য ধারণ করো এবং সাহসী হও, তোমরা বিজয়ী হবে” সূরা আল—ইমরান, ৩:২০০।
২১. মানসিক শান্তি ও প্রশান্তি:
হযরত (দা:বা:) মানসিক শান্তি ও প্রশান্তির প্রতীক । তিনি বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর স্মরণে অন্তরের প্রশান্তি পাওয়া যায়। কুরআনে বলা হয়েছে: “জেনে রেখো! আল্লাহর স্মরণে অন্তর শান্তি পায়” সূরা আর—রাদ, ১৩:২৮।
২২. একতা ও সৌহার্দ্য:
হযরত (দা:বা:) মুসলিম উম্মাহর একতা ও সৌহার্দে্যর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে। তিনি সবসময় ইসলামিক সমাজের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে চেয়ে। কুরআনে বলা হয়েছে: “তোমরা সবাই আল্লাহর রশি আঁকড়ে ধরো, বিভক্ত হয়ো না” সূরা আল—ইমরান, ৩:১০৩।
২৩. আল্লাহর পথে দাওয়াত:
হযরত (দা:বা:) সর্বদা আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার জন্য সংগ্রাম করে। তিনি বিশ্বাস করে যে, একমাত্র আল্লাহর পথে ফিরে আসলেই মানুষের জীবনে প্রকৃত সুখ ও শান্তি আসবে। কুরআনে বলা হয়েছে: “তুমি নিজেকে ও তোমার পরিবারকে আল্লাহর পথে ডাক” সূরা তাহা, ২০:১৩২। হযরত মুহাম্মদ আব্দুস সাদেক (দা:বা:) এক নিভৃতচারী ও প্রচার বিমূখ মানুষ, যার জীবন আল্লাহর স্মরণে নিবেদিত।
অলীক কেরামত নয়, বরং আল্লাহর এক অঙ্গীকারবদ্ধ ওলীর প্রমাণ। যেমন:
১. আল্লাহর বিশেষ রক্ষা:
বাল্যকালে একবার হযরত (দা:বা:) পানিতে ডুবে যায় এবং প্রায় ৩—৪ ঘণ্টা পর লোকজন তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেন। এ ঘটনার মাধ্যমে একেবারে স্পষ্ট যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর অলিদের বিশেষ রক্ষা করেন এবং এ ঘটনা আল্লাহর অপার করুণার নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত হয়।
২. ঝড়—বৃষ্টির মাঝে সুরক্ষা
বিগত ৪০ বছর ধরে হযরত (দা:বা:) অবিরত দ্বীনি সফরে চলেছেন, কখনও ঝড়, কখনও বৃষ্টি, কখনও অতি গরম বা ঠান্ডা—এই সব প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁকে একটুও বিরত করেনি। তবে এক অদ্ভুত ঘটনা প্রচলিত রয়েছে—তিনি যখন দ্বীনি সফরে থাকেন, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর মাহবুব বান্দাকে সুরক্ষিত রাখেন। বৃষ্টির পানি কখনও তাঁর শরীরে স্পর্শ করতে চোখে পড়েনি। এটি তাঁর জীবনে আল্লাহর মহিমার বহিঃপ্রকাশ এবং অলি আউলিয়াদের সুরক্ষার পরিচায়ক।
সুফি উত্তরাধিকার: শাহ—সূফি আব্দুস সাদেক (রহ.)—এর সন্তানদের পরিচয়:
সুফি সাধক, শিক্ষক ও সমাজদরদী মাওলানা আব্দুস সাদেক (দা.বা.)—এর সন্তানগণ তাঁর আধ্যাত্মিক ও শিক্ষাগত উত্তরাধিকারের গৌরবময় ধারক ও বাহক। তাঁদের প্রতিটি জীবনচর্যা ধর্ম, শিক্ষা ও নৈতিকতা ভিত্তিক এক আলোকিত পথের প্রতিচ্ছবি। সুফি মাওলানা আব্দুস সাদেক (রহ.)—এর বড় ছেলে শাহ মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ, এম.এ ও এম.বি.এ ডিগ্রিধারী। তিনি দি প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি—তে সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে কর্মরত। তার দ্বিতীয় ছেলে শাহ মুহাম্মদ সাকী কাউসার, ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। তিনি কেন্দুয়া, নেত্রকোণার ভরাপাড়া কামিল মাদ্রাসায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন। তৃতীয় পুত্র মুফতি ক্বারী শাহ মুহাম্মদ ফজলে এলাহী একজন আলেম। তিনি একজন শিক্ষক ও ধর্মীয় দাঈ হিসেবে পরিচিত।
চতুর্থ পুত্র মাওলানা শাহ মুহাম্মদ রাকিব রায়হান, কামিল (হাদিস) ও বি.এস.এস ডিগ্রিধারী। তিনি কেন্দুয়ার সাবেরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ইঞ্জিনিয়ার শাহ মুহাম্মদ নাঈম, চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমি থেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষালাভ করেছেন। বর্তমানে কর্মসূত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। তাঁর বড় কন্যা আলিয়া সুলতানা, বি.এ ডিগ্রিধারী এবং হাফিজা। তিনি বিবাহিত ও ধর্মীয়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত পরিবারে গৃহিণী। দ্বিতীয় কন্যা সাবিহা সুলতানা, এস.এস.সি পাশ। তিনিও বিবাহিত এবং স্বামী—সন্তান নিয়ে পারিবারিক জীবনে নিবেদিত। তৃতীয় কন্যা রাজিয়া সুলতানা, সমাজকর্ম বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স, বি.এড ডিগ্রিধারী শিক্ষিত নারী। তিনি বিবাহিত ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত।
উপসংহার: আধ্যাত্মিক চেতনার দীপ্ত অনুরণন: এ মহান আত্মিক সাধক পুরুষের জীবন আল্লাহপ্রেম, খালিছ ইবাদত, নিঃস্বার্থ খিদমত ও অন্তর্জাগতিক অন্বেষণের উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর দিকনির্দেশনা শুধু নির্জনতার ভিতর সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজ ও জাতির চিন্তা—চেতনায় জাগরণ এনেছে। তিনি একাধারে আত্মসংযমী সাধক, তরিক্বতের অভিভাবক ও মানবিক মূল্যবোধের নিরব প্রদীপ। তাঁর চলমান দুআ, জিকির, তাকওয়া ও আধ্যাত্মিক আদর্শ—আমাদের সামনে আলো জ্বালায়। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন একেকটি জ্যোতির্ময় শিক্ষা, যা যুগ থেকে যুগান্তরে হৃদয়জগতে অনুরণিত হতে থাকবে। এই উপসংহারে এসে আমরা বলতে পারি—তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং এক চলমান দরসগাহ্, এক জীবন্ত আত্মিক দরবার, যেখান থেকে মানবতার জন্য ঝরে পড়েছে প্রেম, পরিশুদ্ধতা ও পরম সত্যের অমীয় বারিধারা। এই অন্তিম কথার পর হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি থেকে উৎসারিত একটি কবিতা নিবেদন করছি, যেটি যেন তাঁর আধ্যাত্মিক মহিমার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
নূরের ঝর্ণাধারা: শাহ্—সূফি মাওলানা আব্দুস সাদেক
দূর হতে দেখলেম তাঁরে—নীরব, অথচ বজ্রবানী,
শাহ্ সাদেক নামে পরিচিত, হৃদয়ে বহে কুরআনের সুর,
নববী জ্ঞান যাঁর বুকে—শুধুই মুখ থেকে ঝরে ফুল,
দেখলে বুঝি, তিনি শুধু সুফি নন, তিনি এক নূরের দূত।
তাঁর নজর ফেলে দিলে—পাথরও কাঁদে, হৃদয় হয় সজল,
মরা ক্বলব জেগে ওঠে, লা—ইলাহার ঢেউয়ে উঠে আলো,
স্মরণে আসে বসরা—কুফা, বাগদাদের সে সোনালী যুগ—
চিশতিয়া ধারা বয়ে চলে, বাংলার এই নিঃশব্দ ফকিরে।
নেই তাঁর মাঝে অহঙ্কার, নেই তামাশা, নেই জৌলুস,
শুধু দাওয়াত, শুধু ইলম—পাখির ডাকে ভোরের জিকির,
তিনি শহরের লোক নন কেবল, গ্রামের পথচলাও জানে,
কে বলেছে অলিরা অতীত?—শাহ্ সাদেক সাহেব তো বর্তমান।
তাঁর জবানে নববী ধ্বনি, তাহরীক নয়—তাজকিয়া,
মসজিদের মেহরাবে তিনি, আবার খেতখামারে হাকিম,
হাজারো মুরিদ তাঁর পাশে, হৃদয় খুলে করে বাই’আত,
তবুও নিজেকে ভাবেন না কিছু, কেবল বলেন—“আমি পথের ধুলা।”






