যাহা আছে এই বিশ্বভ্রম্মান্ডে, তাহা আছে এই মানব দেহভান্ডে।

যাহা আছে এই বিশ্বভ্রম্মান্ডে, তাহা আছে এই মানব দেহভান্ডে।

যাহা আছে এই বিশ্বভ্রম্মান্ডে, তাহা আছে এই মানব দেহভান্ডে।” এই বাক্যটির বিস্তারিত ব্যাক্ষা নিম্নে প্রদান করা হলো:-

এই গভীর ও প্রাচীনতম দার্শনিক বাণী — “যাহা আছে এই বিশ্বভ্রম্মান্ডে, তাহা আছে এই মানব দেহভান্ডে।”
— মূলত সুফি-মারফতি চিন্তা এবং উপ- মহাদেশের গূঢ় আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি সারকথা। নিম্নে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিভিন্ন স্তরে দেওয়া হলো:

১. আক্ষরিক অর্থ:
বাক্যটির আক্ষরিক অর্থ হলো — বিশ্বজগতে (ব্রহ্মাণ্ডে) যা কিছু আছে, তার প্রতিচ্ছবি বা উপস্থিতি মানবদেহেও রয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের দেহ একপ্রকার সার্বজনীন প্রতিচ্ছবি (microcosm), আর মহাবিশ্ব একটি বৃহৎ দেহ (macrocosm)। মানুষ হল এক ক্ষুদ্র অথচ পরিপূর্ণ জগৎ।

২. সুফি ও মারফতি ব্যাখ্যা:
আল্লাহর “আয়নায়ে জাহান” (দুনিয়ার আয়না) হিসাবে মানব: সুফি দর্শনে, আল্লাহ তাআলা নিজেকে “চিনা”র জন্য সৃষ্টি করেছেন এই জগৎ ও মানুষকে।

হাদীসে কুদসিতে ইরশাদ হয়েছে:

“كنت كنزاً مخفياً فأحببت أن أعرف، فخلقت الخلق.”

অর্থ: “আমি ছিলাম এক গোপন ধনভাণ্ডার; আমি চাইলাম চিনা যাক, তাই আমি সৃষ্টি করলাম।”

এই সৃষ্টির শিখর হল মানুষ। কারণ মানুষ এমন এক সত্তা যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর সমস্ত নাম ও গুণাবলির নিদর্শন।

আল-ইনসানাল-কামিল (পরিপূর্ণ মানব):
পরিপূর্ণ মানব হল এমন এক সত্তা যার মধ্যে পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয় আল্লাহর রুহ ও আস্মা ও সিফাত।

কুরআনে এসেছে:

“وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي”

অর্থ: “আমি তাকে আমার রুহ থেকে ফুঁক দিয়েছি।” (সূরা হিজর, ১৫:২৯)

অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর গুণাবলির ছায়া, যা গোটা সৃষ্টি জগৎকে ধারণ করে।

৩. শারীরিক ও মহাজাগতিক সমান্তরালতা:

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা আছে—মানবদেহে তার প্রতিফলন নীচে দেখানো হলো:

[অতি সংক্ষেপিত]
সূর্য > হৃদয় [রূহানী আলো ও প্রাণ]
চন্দ্র > বা কল্পনাশক্তি
নক্ষত্র > কোষ ও নিউরন
নদী/সমুদ্র > রক্ত প্রবাহ/তরল প্রবাহ
বাতাস/হাওয়া > শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রাণশক্তি
সাত আকাশ > সাতটি লতিফা

[সুফিতত্ত্ব মতে]
আরশ/লওহে মাহফূজ > অন্তঃকরণ/চেতনা।

এই প্রতিটি উপাদান মানব দেহে প্রতীকীভাবে বিদ্যমান, তাই সুফিরা বলেন— “তু তানেহ্ খোদা’স্ত” — তুই নিজের দেহেই আল্লাহর নিদর্শন।

৪. কুরআনিক ভিত্তি:

“سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ”

অর্থ: “আমি তাদের দেখাবো আমার নিদর্শনসমূহ দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও।” (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৫৩)

এখানে ‘আফাক’ মানে বাইরের জগৎ, আর ‘আনফুস’ মানে আত্মিক বা আভ্যন্তরীণ জগৎ। এই আয়াত প্রমাণ করে যে মানুষের ভিতরেই মহাজগতের সত্য প্রতিফলিত।

৫. পরিশেষে:
এই বাক্যটি আমাদের শেখায় —

  • নিজেকে জানো, তবে জগৎকে জানতে পারবে।
  • নিজেকে চেনো, তবে আল্লাহকে চিনবে।

তাই সুফি সাধনার অন্যতম মূলমন্ত্র:

“من عرف نفسه فقد عرف ربه”

অর্থ: “যে নিজেকে চিনেছে, সে তার রব্বকে চিনেছে।”

এই একটি বাক্যে নিহিত রয়েছে তাওহীদের, মারেফাতের, এবং আধ্যাত্মিক দর্শনের এক গূঢ় চাবিকাঠি। মানুষ শুধু একটি মাটি-পানি-রক্ত-মাংসের দেহ নয়, বরং একটি আলৌকিক আয়না যার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে সমগ্র বিশ্বচরাচর এবং সৃষ্টিকর্তার রহস্যময় সত্তা।

আরো পড়ুনঃ