নীরবতার জন্ম (ধারাবাহিক পর্ব—৫)
পঞ্চম অধ্যায় : অহং — সবচেয়ে সূক্ষ্ম কারাগার।
মানুষ ভাবে—সে স্বাধীন।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষ বন্দী।
এই বন্দিত্বের নাম অহং।
অহং মানে নিজেকে আলাদা ভাবা।
অহং মানে নিজের অস্তিত্বকে কেন্দ্র করে সমগ্র বিশ্বকে ব্যাখ্যা করা।
অহং মানে—“আমি আছি, তাই সব আছে।”
এই ‘আমি’—এটাই সবচেয়ে বড় মিথ্যা।
কারণ গভীরে তাকালে দেখা যায়—
এই ‘আমি’ কেবল স্মৃতির সমষ্টি, অভিজ্ঞতার জমাট বাঁধা স্তূপ, সমাজের চাপিয়ে দেওয়া পরিচয়।
তবু এই ‘আমি’কে বাঁচিয়ে রাখতেই আমরা সারাজীবন যুদ্ধ করি।
আমি সবার চেয়ে ভালো।
আমি আলাদা।
আমি শ্রেষ্ঠ।
আমি জ্ঞানী।
আমি পবিত্র।
এই সব ঘোষণাই অহংয়ের শব্দ।
অহং যত সূক্ষ্ম, তত বিপজ্জনক।
ধর্মীয় অহং সবচেয়ে মারাত্মক।
কারণ সেখানে মানুষ নিজের পবিত্রতার দাবি তোলে।
যে বলে—আমি ঈশ্বরের কাছের মানুষ,
সে অজান্তেই মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
যে বলে—আমি মুক্ত,
সে তখনও বন্দী।
কারণ মুক্তি কখনো ঘোষণা করে না।
অহং আমাদের দৃষ্টি সংকীর্ণ করে।
আমরা কেবল নিজেদের স্বার্থ দেখি।
অন্যের কষ্ট আমাদের স্পর্শ করে না।
কিন্তু যেদিন অহং ভাঙে,
সেদিন মানুষ মানুষকে নতুন চোখে দেখে।
আমি একদিন গভীর ধ্যানে অনুভব করলাম
আমার ভেতরের ‘আমি’ ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে।
ভয় লাগল।
কারণ অহং ভাঙা মানে পরিচয়ের মৃত্যু।
কিন্তু সেই মৃত্যুর পর আমি পেলাম এক বিশালতা,
যার কোনো সীমা নেই।
অহং না থাকলে তুমি কাউকে ছোট করতে পার না।
অহং না থাকলে তুমি কাউকে শাসন করতে পার না।
অহং না থাকলে তুমি কাউকে পূজা গ্রহণ করতেও পার না।
অহংহীন মানুষ নীরব, নম্র, স্বচ্ছ।
সে গুরু নয়।
সে অনুসারীও নয়।
সে কেবল পথিক।
অহং ভাঙাই আধ্যাত্মিক বিপ্লব।
চলবে….
লেখক: ফরহাদ ইবনে রেহান
বই: নিজের পথে – নীরবতার যাত্রা
পঞ্চম অধ্যায় : অহং — সবচেয়ে সূক্ষ্ম কারাগার।



