বিরহ ই প্রেমের মূল আনন্দ (সূফি দরবেশের ঘটনা)

বিরহ ই প্রেমের মূল আনন্দ (সূফি দরবেশের ঘটনা)

একদা এক নির্জন নদীর তীরে এক সূফি দরবেশ বসে ছিলেন। সূর্যাস্তের শেষ আলোয় তাঁর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, আর তাঁর চোখে ছিল এক গভীর প্রশান্তি। তাঁর কাছে এক যুবক এসে বসলো, যার চোখে ছিল অশ্রুর ভার আর হৃদয়ে প্রেমের অসীম বেদনা।

দরবেশ যুবকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাছা, তোমার চোখের গভীরে যে বেদনা দেখছি, তা প্রেমের বেদনা। কিন্তু তুমি কি জানো, প্রেমের মূল আনন্দ কোথায়?”

যুবক মাথা নেড়ে বলল, “না, হুজুর। আমি তো শুধু এই বেদনাটুকুই অনুভব করছি। এই বেদনা আমাকে ভেঙে ফেলছে, আমার হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।”

দরবেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন, “প্রেম হলো এক অনন্ত সমুদ্রের মতো। তার গভীরতা অগাধ, তার বিস্তৃতি অসীম। যখন আমরা প্রিয়জনের সঙ্গে থাকি, তখন আমরা সেই সমুদ্রের উপরের ঢেউয়ের মতো। কিন্তু যখন বিরহ আসে, তখন আমরা সেই সমুদ্রের গভীরে ডুব দেই।”

“বিরহের বেদনা কি করে আনন্দ হয়?” যুবক জিজ্ঞেস করলো, তার কণ্ঠে অভিমান আর বেদনার সুর।

দরবেশ হাসলেন, তাঁর চোখে এক অদ্ভুত আলো। “বিরহের বেদনা হলো আত্মার পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা। যখন আমরা প্রিয়জনের থেকে বিচ্ছিন্ন হই, তখন আমাদের আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে। এই আকাঙ্ক্ষাই হলো প্রেমের মূল শক্তি।”

যুবক কিছুটা অবাক হলো। “কিন্তু হুজুর, এই বেদনা তো আমাকে গ্রাস করে ফেলছে। এই বেদনা আমাকে বাঁচতে দিচ্ছে না, শ্বাস নিতে দিচ্ছে না।”

দরবেশ বললেন, “এই বেদনাই তোমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে। এই বেদনাই তোমাকে তোমার নিজের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করবে। তুমি শুধু এই বেদনাটুকুকে গ্রহণ করো, আর দেখো তোমার ভেতরে কী পরিবর্তন আসে।”

“কীভাবে গ্রহণ করবো এই বেদনাকে?” যুবক জিজ্ঞেস করলো, তার কণ্ঠে হতাশার সুর।

দরবেশ বললেন, “বেদনাকে গ্রহণ করার অর্থ হলো বেদনার সঙ্গে লড়াই না করে, বেদনাকে অনুভব করা। তুমি বেদনাকে এড়িয়ে যেতে চাইছো কেন? বেদনাকে আলিঙ্গন করো, দেখবে বেদনা তোমাকে নতুন কিছু শেখাবে।”

যুবক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলো, “হুজুর, প্রেমের এই বিরহের বেদনা কি কখনো শেষ হবে?”

দরবেশ হাসলেন। “এই বেদনা কখনো শেষ হবে না। কারণ, প্রেমের কোনো শেষ নেই। প্রেম হলো এক অনন্ত যাত্রা। এই যাত্রায় বেদনা আছে, আনন্দ আছে, আছে মিলন আর বিরহ। কিন্তু সবকিছুর মাঝে প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা অটুট থাকে।”

যুবক দরবেশের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। তার চোখে এখনো পানি, কিন্তু হৃদয়ে এক নতুন প্রশান্তি। সে জানে, প্রেমের এই বিরহের বেদনাই তাকে পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

দরবেশ যুবকের মাথায় হাত রেখে বললেন, “তুমি একা নও, বাছা। প্রেমের এই বেদনা সবাইকে স্পর্শ করে। তুমি শুধু প্রেমকে অনুভব করো, আর প্রেমের পথে চলতে থাকো।”

যুবক চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে এখনো অশ্রু, কিন্তু হৃদয়ে এক নতুন আশা। সে জানে, প্রেমের পথে সে একা নয়, তার সঙ্গে আছে প্রেমের অমোঘ আকর্ষণ।

লেখক: ফকির জুয়েল সাধু

আরো পড়ুনঃ