তোমার মূলে তুমি কে?

তোমার মূলে তুমি কে?

তোমার মূলে তুমি কে? এটি একটি বিস্ময়কর প্রশ্ন, যে প্রশ্ন নিজেকে খোঁজার জন্য বারংবার তাগিদ দিয়ে থাকে। যুগ যুগ ধরে এক’ই কথা চলে আসছে নিজেকে চেনো, কিন্তু এই নিজেকে চেনার উপায়’টা খুব কম মানুষেরা’ই দিয়ে থাকে। আমি আজ তোমাকে এমন কিছু পন্থা দেখাবো যা সত্যিকার অর্থে’ই তোমাকে চেনার জন্য সহজ উপায় দেখিয়ে দিবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ধরো তুমি এখন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করছো যে, আমার মূলে আমি কে? এবার দেখবে কিছুক্ষণ পরে’ই কেহ একজন তোমার ভিতর থেকে শব্দহীন কণ্ঠে বলে উঠবে আসলে’ই আমি কে? তা হলে অন্তত এটুকুতো বুঝতে বাকি নেই যে তোমার মাঝে অবশ্যই আরও কেহ আছে।

তথাপি এ বিষয়টি কেমন তোমার নিকট একটু ঘোলাটে লাগছে তাই না? সমস্যা নেই আমি তোমাকে আরও পরিস্কার ভাবে বুঝিয়ে দিবো এবং তার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি; যেমন, তুমি একটু আগে’ই একজন মানুষকে তার ভুলের জন্য তাকে সামনে বসিয়ে প্রচুর বকাঝকা করেছো, এবার সে মানুষ’টি তোমার সামনের থেকে চলে গেলো, কিন্তু তুমি এখনো তাকে নিঃশব্দে একা একা বকে যাচ্ছো! বিষয় কী? এই যে যাকে এতক্ষণ বকলে সে তো এখন তোমার সামনে নেই? তাহলে তুমি এখনো কাকে বকছো? আসলে তুমি কে? এটি বুঝতে কি তোমার এখনো অসুবিধা হচ্ছে? তাহলে আবার ভাবো, তুমি যখন একবার ঐ ব্যাক্তিকে মুখে মুখে বকাঝকা করলে সে ছিলে তুমি, এখন আবার যে নিঃশব্দে মস্তিষ্ক দিয়ে তাকে বকাঝকা করছে সেও কিন্তু তুমি! এবার আমার প্রশ্ন হলো তুমি এখনো নিঃশব্দে কাকে বকে যাচ্ছো? এই বকা এখন কে শুনছে? যাকে এই বকাঝকা করবে সে তো এখন তোমার সামনে নেই! তাহলে এই বকা কেন? তুমি তোমার মস্তিষ্ককে কী কখনো এই শব্দহীন বকাবকি করার জন্য জবাবদিহি করেছিলে? এবার কি ভাবছো অপরাধীকে ক্ষমা করে দিবে তাহলে’ই মস্তিষ্কের এই তর্কবিতর্ক বন্ধ হয়ে যাবে? এটি ভুল ধারণা, তুমি চাইলেও ক্ষমা করতে পারবেনা, কারণ ক্ষমা করার কৌশলও এখানে লুকিয়ে আছে যা তোমার নিকট অধরা। এমন অনেক অপরাধী রয়েছে যাকে তুমি ক্ষমা করে দিয়ে নিজেকে’ই ঠিক রাখতে পারবেনা।

দেখবে তুমি ক্ষমা করে দিয়েছো, কিন্তু সেই ক্ষমা তোমার মস্তিষ্কে এসে বার বার শব্দহীন চিৎকার করে আঘাত দিতে’ই থাকবে আর এতে তুমি আরও ক্রমাগত রাগান্বিত হয়ে যাবে। এবার বলা হবে ইন্দ্রিয়াদিকে নিয়ন্ত্রণ করলে’ই সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু সেই ইন্দ্রিয়াদিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে যুদ্ধ করতে হয়, সে যুদ্ধের ময়দান কোথায়? এ যুদ্ধের শিক্ষা কে দিবে? মুখ থাকলে’ই এক গাট্টি উপদেশ অপরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু পরিত্রাণ দেয়া যায় না, ইন্দ্রিয় থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জন্য কোনো তন্ত্রমন্ত্র কাজে দেয় না। এটার নিয়ন্ত্রণও এখানে, যেখানে এই শব্দহীন তর্কবিতর্ক করার জন্য অধরা কেহ বাস করে যাচ্ছে।

মনে রাখবে শুধু শুধু ইন্দ্রিয়াদির দোষ দিয়ে লাভ নেই, এরা দোষী নয়, এই যে চোখ তোমার ইন্দ্রিয় এই চোখ তোমাকে পাপ করায় না,পাপ করায় তোমার মস্তিষ্ক। ধরা যাক চোখ দিয়ে তুমি একটি সুন্দরী রমণী দেখলে, কিন্তু এই দেখাটি যদি তুমি চোখে’ই সীমাবদ্ধ করে রাখতে তাহলে রমণী তোমার চোখের আড়ালে চলে যাওয়া মাত্র’ই তুমি রমণীকে ভুলে যাতে। কিন্তু নাহ্! এবেলায় তুমি একদম ভিন্ন, কারণ তুমি রাতেও ঘুমাতে পারোনি এই রমণীর রূপের জন্য। আশ্চর্য! তোমার এই চোখ তো এখন সেই রমণীকে দেখছেনা! তবুও কেন তুমি ঘুমাতে পারছোনা বলো তো? মূলত তুমি দেখাটিকে চোখ পর্যন্ত রাখোনি, এটিকে তুমি মস্তিষ্কের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছো, তাই মস্তিষ্ক নিরবে একা একা তোমাকে সব বলে যাচ্ছে, আর তুমি পাগলের মতন হয়ে যাচ্ছো সেই রমণীকে কাছে পাওয়ার জন্য।

তোমার এই কর্মকাণ্ডের জন্য আমি তোমাকে কোনো উপদেশ দিবোনা, আমি শুধুমাত্র তোমাকে কিছু পন্থা দেখাবো তা তুমি অনুসরণ করতে পারো, আবার নাও করতে পারো এটা একান্ত তোমার ব্যাপার। দেখো তোমার মাঝে অনেকে’ই কথা বলে এবং তাঁরা কথা বলতে’ই থাকে যাহা শব্দহীন, আর সে কথা একমাত্র তুমি ছাড়া আর কেহ শুনতে পাবেনা। এবার তুমি পরিচিত হওয়া শুরু করে দাও তোমার মস্তিষ্কের শব্দহীন আলাপ গুলোর সাথে, এখন’ই তুমি তোমার মস্তিষ্ককে শুনতে শুরু করে দাও,যদিও তুমি প্রতিমুহূর্তে মস্তিষ্কের কথাগুলো পূর্বেও শুনেছিলে কিন্তু আজ একটু ভিন্ন ভাবে শোনার চেষ্টা করো, এবং এর জন্য তোমাকে হতে হবে একজন শ্রোতা তুমি শুধুমাত্র শ্রোতা হয়ে’ই তোমার মস্তিষ্কের কথাগুলো শুনতে থাকো।

হয়তো তুমি এখনো অনুমান করতে পারোনি আমি তোমাকে কি শুনতে বলেছি, আর এজন্য’ই তোমাকে একটি উদাহরণ দিচ্ছি; এই যে তুমি লেখাটি পড়তেছো, কিন্তু তার মাঝে’ই তোমার মস্তিষ্ক আমাকে নিয়ে ভাবতেছে, যেমন: আমি কে? আমি কই থাকি? আমার পরিচয় কি? প্রশ্ন হলো আমার বিষয় নিয়ে তোমার মস্তিষ্ক কেন তোমাকে ভাবাচ্ছে বলো তো! আমি তো তোমার মস্তিষ্ককে আমার ব্যাপারে ভাবতে বলিনি? আমি তো কেবল তোমাকে আমার লেখাটি পড়তে বলেছি, কিন্তু তোমার মস্তিষ্ক কেন আমার ব্যাপারে ভাবতেছে? তুমি তো শুধুমাত্র তোমার চোখ দিয়ে এই লেখাটি পড়তেছো, কিন্তু তোমার মস্তিষ্ক কেন বলে উঠলো এত বড় লেখা পড়বো কখন, এত সময় পাবো কই? তোমার চোখ লেখাটি দেখতেছে, কিন্তু তোমার মস্তিষ্ক অন্য কথা বলে যাচ্ছে যা একদম শব্দহীন, আর এ কথা তুমি ছাড়া অন্য কেহ-ই শুনতে পায়না। তুমি যদি তোমাকে চিনতে চাও তাহলে তার জন্য তোমাকে নিরব ভূমিকায় থাকতে হবে।

‘তোমার মূলে তুমি কে?’ তাকে বের করতে হলে কান পেতে রাখো তোমার মস্তিষ্কে, এবং শুনতে থাকো মস্তিষ্কের রচনা সমূহ। রচনা সমূহ শুনে থাকলে এবার নিজেকে সেই মস্তিষ্কের উপরে’ই শব্দহীন হয়ে জিজ্ঞাসা করো আমি তো বসে আছি কিন্তু আমার মস্তিষ্কে অনর্গল কথা বলে গেলো কে? তার উদ্দেশ্য কি?আমি তো আমার মস্তিষ্কে এতক্ষণ কথা বলিনি! তা হলে কে ছিলো সে? প্রকৃত সত্য হলো এই যে, এসব প্রশ্নকারী তুমি নয়, এবং মস্তিষ্কে আলোচনা করে বেড়াচ্ছে যে সেও তুমি নয়, মূলত তুমি হবে সেই যে কিনা প্রশ্নকারী এবং আলোচনাকারী এই দুই পক্ষের কথাকে’ই মন দিয়ে শুনছে।

মনে রাখবে যদিও মস্তিষ্ক তুমি ছাড়া অচল তবুও এই মস্তিষ্কে প্রশ্নকারী এবং আলোচনাকারী এর একটিও তুমি নয়। তুমি সেই যে নিরবে এদের আলোচনা শুনে যাচ্ছো এবং তাদের প্রতিযোগিতা দেখে চলছো। মস্তিষ্কের দিকে তাকিয়ে দেখলে তুমি বলবে ওখানে যারা রয়েছে এর একটিও আমি নয় এবং বলবে এরা অবান্তর বিষয় নিয়ে পড়ে আছে। তুমি যদি তোমার মস্তিষ্ককে নিয়ে নিজেকে গঠন করতে চাও, তাহলে চোখের দর্শন চোখে’ই সমাপ্তি ঘটাও, চোখের দর্শনকে তুমি মস্তিষ্কে নিক্ষেপ করিওনা। কানের শ্রবণ তুমি কানে’ই সমাপ্তি ঘটাও শ্রবণকে বিশ্লেষণ করার জন্য মস্তিষ্ককে সুযোগ দিওনা। জিহ্বার স্বাদ তুমি জিহ্বাতে’ই সমাপ্তি করো জিহ্বার অনূভুতি মস্তিষ্কে দিওনা তাহলে তুমি স্বাদের গোলামে পরিণত হবে।

নিজেকে চেনা এবং ইন্দ্রিয়াদিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কতগুলো পথ রয়েছে তা আমার জানা নেই, এবং কতগুলো পথে পরিক্ষা করে দেখা যায় তাও আমি জানিনা। কিন্তু এই পথে তুমি নিজেকে মূহুর্তে’ই পরিক্ষা করে দেখতে পারবে ফল আসে কিনা। একবার তুমি নিজেকে দেখার চেষ্টা করো এবং চেষ্টা করো ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, আমার বিশ্বাস এ পথে তুমি সফল হবে’ই হবে।

লেখা: বুদ্ধ মুহাম্মদ কৃষ্ণ

আরো পড়ুনঃ