মারফতের আলোকে আত্মার জাগরণ
সূচনা:
এই দুনিয়া একটি পরীক্ষাগার, আর আত্মা হলো সে পরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। মানুষ শুধু মাটি দিয়ে তৈরি নয়, তার ভেতরে রয়েছে এক অলৌকিক বাতাস—রুহ। এই রুহের উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমেই মানুষ পৌঁছায় তার সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে, যার শেষ গন্তব্য মারফত—আল্লাহকে জানা, অনুভব করা, উপলব্ধি করা।
মারফতের সংজ্ঞা (আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা):
‘মারফত’ এসেছে ‘মা‘রিফাহ’ (معرفة) থেকে, যার অর্থ—“গভীর জ্ঞান, চিন্তা ও উপলব্ধি”। মারফতের মানুষ কেবল মুখে আল্লাহর নাম নেয় না, তাঁর অস্তিত্বকে অন্তরে ধারণ করে।
ইমাম গাযযালি বলেন-
“মারফত এমন এক আলো, যা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর অন্তরে জ্বালিয়ে দেন।”
কোরআনের আলোকে মারফত-
﴿سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ﴾
“আমি শীঘ্রই তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাবো দিগন্তে ও তাদের নিজেদের মাঝে, যতক্ষণ না তাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইহা সত্য।” (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৫৩)
এই আয়াতে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহর পরিচয় মানুষ পাবে বাহ্যিক জগতেও এবং অন্তরের জগতেও। অন্তর্জগতের সেই গভীর উপলব্ধিই হলো মারফত।
হাদিসের আলোকে মারফত-
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “যে নিজেকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে।”
(هَرْفِيٌّ: “مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ”)
যদিও এটি হাদিস হিসেবে দুর্বল, তবে সুফি দর্শনে এটি বিশেষভাবে মূল্যায়িত। এই বাণী আমাদের শেখায়—আত্মজ্ঞানই ঈশ্বর-জ্ঞান।
চার ধাপের আধ্যাত্মিক সিঁড়ি-
- শরিয়ত – ইসলামী বিধিবিধান পালন
- তরিকত – আত্মার শুদ্ধি, মুর্শিদের ইরশাদে সাধনা
- মারফত – আল্লাহর গুণাবলি ও উপস্থিতির গভীর চেতনা
- হাকিকত – চরম সত্যের অনুধাবন
সুফিদের ভাষ্যে মারফত-
বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) বলেন:- “আমি আমার রবকে চিনি আমার অন্তর দিয়ে, বইয়ের পৃষ্ঠা দিয়ে নয়।”
জুনায়েদ বাগদাদী (রহ.) বলেন: “মারফত হলো, যখন বান্দা নিজের অস্তিত্ব ভুলে যায়, শুধু রবের অস্তিত্ব অনুভব করে।”
মারফতের ফলাফল
অহংকার বিনাশ হয়
হৃদয় হয় কোমল, কাঁদতে শেখে
নিজের ত্রুটি আগে দেখতে শেখে
দুনিয়ার মোহ কেটে যায়, আখিরাত মুখ্য হয়
বান্দা আল্লাহর ইচ্ছার সাথে একাত্ম হয়
উপসংহার-
মারফত কোনো অলৌকিক চমক নয়, বরং এক নিরব সাধনার ফল।
- এর জন্য দরকার—
- ইখলাস (নিখাদ নিয়ত)
- জিকির (আল্লাহর স্মরণ)
- মুরাকাবা (আত্ম-চিন্তা)
- এবং একজন মুর্শিদের সহচর্য
একবার অন্তর আল্লাহর প্রেমে জেগে উঠলে, সেখান থেকে শুরু হয় চিরন্তন সফর—রুহের মুক্তি, অন্তরের প্রশান্তি, আল্লাহর সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মহান উপলব্ধি। যারা মারফতের আলোয় পথ চলে, তাদের হৃদয় হয় নূরের বাতিঘর। আল্লাহ আমাদের সেই আলোয় পথ চলার তাওফিক দিন। আমিন।






