আজকাল বায়াত বা দীক্ষা নেওয়াটা একটা ফ্যাসান হয়ে দাড়িয়েছে।

আজকাল বায়াত বা দীক্ষা নেওয়াটা একটা ফ্যাসান হয়ে দাড়িয়েছে।

আজকাল বায়াত বা দীক্ষা নেওয়াটা একটা ফ্যাসান হয়ে দাড়িয়েছে। ভজন সাধন কিছুই করা নেই, শুধু মুখে বলে বেড়ানো- আমি অমুক দরবারের অমুক পীর বা অমুক আকড়ার / আশ্রমের অমুক গুরুর শিষ্য ভক্ত। আজকাল এই জন্যই বায়াত বা দীক্ষার সন্মান মূল্য হ্রাস পেয়েছে। সৃষ্টিকর্তার জন্য প্রান আকুল হলো না, তার জন্য চিত্ত অধীর হলো না, তারপরও একটা লোক দেখানো বায়াত/দীক্ষা নিতেই হবে,আর লোক দেখানো সাধুগিরি ফলিয়ে বেড়াতে হবে। আমি অমুক আউলিয়া, অমুক নাম করা পীর, অমুক বড় সাধু, অমুক ত্যাগি সন্ন্যাসি,অমুক পরমহংসদেবের শিষ্য।নিজের মধ্যে আত্ম সুদ্ধি হচ্ছে কিনা তা আমরা দেখিনা, শুধু মহত মানুষের দোহায় দিয়ে বেড়ায়। এই এতেই হচ্ছে গুরুবাদের সর্ব্বনাশ।

বায়াত বা দীক্ষার ফলে অনেকের ও প্রানে সৃষ্টিকর্তার জন্য আকুলতা জন্মে, একথাও ঠিক। কিন্তু আত্মগঠন আগে প্রয়োজন বায়াত বা দীক্ষার জন্য। বিশুদ্ধ শ্রদ্ধা ব্যাতিত কেউ বায়াত বা দীক্ষা লাভের যোগ্য হয় না। একজন ওলি বা সাধু দেখলাম,আর ওমনি বললাম দীক্ষা দাও, আমাকে বায়াত করেন, এর মত বোকামি আর নেই। আগে ভক্তকে নিজের আত্মপরীক্ষা করে দেখতে হবে বায়াত বা দীক্ষার জন্য প্রকৃত আগ্রহ অন্তরে এসেছে কিনা? বায়াত বা দীক্ষা নেয়ার পর গুরু হতে প্রাপ্ত কর্ম ঠিকঠাক করতে পারবে কিনা? না দুদিন পরেই হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে কিনা??? তারপর ভক্তকে পরীক্ষা করতে হবে যার কাছে বায়াত বা দীক্ষা নিচ্ছে, তার মধ্যে বায়াত বা দীক্ষাদানের যোগ্যতা আছে কিনা? তিনি ভক্তের প্রানের পিপাসা মিটাতে পারবে কিনা। তিনি ত্যাগি কিনা,জ্ঞানী কিনা, সৃষ্টিকর্তার প্রেমিক কিনা, তিনি ভয়ের সময়ে অভয় দিতে পারবে কিনা, দুর্ব্বলতার সময়ে হৃদয়ে বলসঞ্চার করতে পারবে কিনা।

দেখতে হবে ভিতরে প্রকৃত নুরিবীর্য্য বা ব্রক্ষবীর্য্য আছে কিনা? তার বাক্য অনুভুতির ফল কিনা, আর সেই অনুভুতি তীব্র সাধনার ফল কিনা? তার বাহ্যিক প্রতিষ্ঠার লোভ আছে কিনা, না তিনি নিষ্কাম প্রমেরই প্রেরনায় ভক্তকে বুকে তুলে নিবেন। ভক্ত গুরু পরিচয় কোথায় পাবে? পাবে ভক্তের ইন্দ্রিয় দমনের ক্ষমতার ভিতর। গুরু সঙ্গ ভক্তকে নারীজাতির প্রতি মাতৃবুদ্ধি আরপ করতে সামর্থ্য দেবে, নরীর প্রতি ভোগবুদ্ধি বর্জন করে ভক্তি বা পুজাবুদ্ধি আরোপ করবার শক্তি দেবে।

ভক্তের অন্তরের সমস্ত কামনা, বাসনা আন্ধকার দুর করে সত্যের আলোয় এনে দেবে। অন্ধকার যিনি দুর করন তিনিই গুরু বা মূর্শিদ। যিনি অন্ধকার দুর করতে পারে না, তিনি কি করিয়া গুরুর গুরুতর পদবী দাবী করবে? যাহারা বর্তমানে দেশ প্রচলিত গুরুবাদ সমর্থন করেন, তাদের আগে এই প্রশ্নের উত্তর পাইয়া নিতে হবে।

পীর/গুরু হতে বা অনেকের নিজ পিতা পীর, তাদের নিকট হতে কিছু কিতাব প্রাপ্ত হয়ে অনেক আয়াত, শাস্ত্র যার অধ্যায়ন করা আছে,কথায় কথায় যিনি ঝুড়ি ঝুড়ি আয়াত, শ্লোক, তালিম তত্ব,মাকাম তত্ব,ষট্ চক্র তত্ব,লতিফা তত্ব,ব্যোম তত্ব,বায়ু তত্ব কতো রকমের তত্ব উদগার করতে পারে,কিন্তু আয়াতের, কিতাবের, শাস্ত্রার্থের প্রত্যক্ষ অনুভুতি তার নিজ জীবনের মধ্যে এক কনিকাও নাই, তিনি কি প্রকৃত গুরু বা মুর্শিদ তারা শুধুই চালাকি করে চলে। বর্তমান গুরুবাদকে এই প্রশ্নর উত্তর খুজতে হবে।

প্রকৃত গুরু বা মুর্শিদ ভক্তের প্রানের সুপ্ত শক্তিকে নিজের জাগ্রত শক্তির অদৃশ্য স্পর্শ দিয়া নিদ্রোণ্থিত করেন। যিনি স্বার্থ সেবায় সাময়িক সুখ অপেক্ষা ধর্ম্মার্থে সর্বস্ব ত্যাগের আনন্দকে যিনি অধিকতর কাম্য বলিয়া ভক্তের মনের উপর চিহ্ন আকিয়া দিতে পারে তিনিই সদ্ গুরু।যাহার সংস্পর্শে আসিলে আত্ম সুখের তৃষ্ণা লজ্জায় মাথা লুকায়, ভোগ লিপ্সা পালাই, তিনিই গুরু যিনি ছোটকে করেন বড়,আর বড়কে করেন বৃহত্তর,যিনি ভক্তকে প্রেমের শাসনের অধীন করেন এবং কামের বন্ধন, মোহের ও মিথ্যার বন্ধন হতে মুক্ত করেন। তিনিই গুরু,যিনি পরাধীনতার লৌহ শৃঙ্খল চূর্ণ করিয়া দেন।

এক কথায় গুরু একটি ভক্তের সবা করিয়াই সমগ্র জগতের সেবা করিতে পারেন। যদি কোন ভক্তের মন কুপ্রবৃত্তির পথে চলে,গুরু কি তাকে জোর করে নিবৃত্তির পথে টেনে আনবে?সে চায় স্বেচ্ছাচার করতে,চায় উচ্ছৃঙ্খল হতে।গুরু কি তখন যুক্তির জালে নিষেধের দেয়াল গাথিয়া তাকে আটকাবে? নিশ্চয় না।কেন না তা হলে উপায়টা হবে কৃত্রিম, ক্ষন ভঙ্গুর। স্বভাবেরই শক্তিতে যাহাতে ভক্তের মন সংযমের পথে,সন্নীতির পথে,সদাচারের পথে ফিরিয়া আসে,আদেশ নিষেধের মুখ চাহিয়া নয়,পরন্তুু নিজ স্বাধীন ইচ্ছায়, স্বাধীন রুচিতে,স্বধীন বুদ্ধিতে যাহাতে তাহার মন মঙ্গলের দিকে আবর্ত্তিত হয়,শুধু সেই ব্যবস্থাটুকুই করে গুরু।নিষেধ আদেশ করতে পারলেই গুরু হয় না। এই জন্যই গুরু সবাই হতে পারে না, অতি অল্পসংখ্যক লোকই জগতে যথার্থ গুরুর জগৎমান্য স্থান অধিকার করেন।

আবার উপযুক্ত ভক্তকেও গুরু মান্য,সেবা করা দরকার। ভক্তের অধীন ভগবান বা গুরু। কি ভাবে – ভক্তের ভক্তির অধীন,শ্রদ্ধার অধীন,প্রেমের অধীন ভক্তের কল্যানের অধীন,পূর্ণতার অধীন, মুক্তির অধীন।কিন্তুু গুরু যদি হয় ভক্তের অর্থের অধীন,ভক্ত প্রদত্ত অন্ন বস্ত্রের অধীন,আর তাতে গুরুর ধর্ম কিছুই থাকতে পারেনা।তখন তিনি নামেই গুরু,তিনি পরাধীন,যে পরাধীন, সে না পারে নিজেকে কল্যান করতে না পারে ভক্তকে কল্যান করতে। এবার একটু নারী প্রসংগে আসবো।

গুরুতে সর্ব্বস্ব সমর্পন সর্ব্বশাস্ত্রের বিধান।নারী সর্ব্বগ্রে তার নারী ধর্মকে বজায় রাখবে।কেন না,সতীত্ব না থাকলে কারো শিষ্যত্ব সত্য হয় না। আরও একটি কথা মনে রাখতে হবে যে,গুরুতে সর্ব্বস্ব সমর্পন মানে এই নয় যে,গুরুর ইন্দ্রিয় পরিতপর্ণের জন্য নিজেকে ব্যবহার করতে হবে,গুরুকে ইন্দ্রিয় সেবার নামে রতি কর্মে গুরুক দেহ দিতে হবে। আজকাল এইটাই চলছে বেশি, রতি সুখ যাকে বলে। গুরুতে সর্ব্বস্ব সমর্পনের মানে গুরুর চরনে সকল স্বার্থ-বুদ্ধি বিসর্জন দেওয়া, গুরুকে করুনাময়ি কৃপাসিন্ধু জেনে তার আদেশ পালনের জন্য মরনপন করা, পরমআত্মা বা মুক্তি লাভ করার জন্য তিনি যে সুপবিত্র পন্থা নির্দেশ করে দেয়,তা দৃড়তার সাথে আকড়ে ধরে থাকা আর মেনে চলা।

গুরু যে সাধন দান করেন, তার উপরে পূর্ণ নির্ভরেরই নাম গুরুতে আত্ম-সমর্পণ। ভক্তরা একটা জাগায় গোল বাধিয়ে ফেলে, অনেক ভক্তই মনে করে থাকে, গুরু একটা মাংসপিন্ড, ক্ষুধা-তৃষ্ণাদির আধার ও প্রবৃত্ত।

– ফকির ইশরাখউদ্দিন রাজু সাঁই

আরো পড়ুনঃ