নীরবতার জন্ম (ধারাবাহিক পর্ব—২)

নীরবতার জন্ম (ধারাবাহিক পর্ব—২)

২. ভয়ের অন্তরালে

» গত পর্বগুলো পড়ুন এখান থেকে

ভয় মানুষের সবচেয়ে পুরোনো সঙ্গী। জন্মের মুহূর্তে যেমন কান্না, তেমনি জীবনের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য আশঙ্কা। মানুষ ভাবে—সে স্বাধীন। অথচ তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো না কোনো ভয়।

ভয় হারানোর। ভয় একা হয়ে যাওয়ার। ভয় না পাওয়ার। ভয় ব্যর্থতার। ভয় মৃত্যুর।

এই ভয়গুলো মিলেই মানুষকে গড়ে তোলে এক অন্তহীন দাসত্বের ভিত। আমি ভয়কে প্রথম চেনার সুযোগ পাই নিঃসঙ্গতার গভীরে। এক রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, ঘড়ির কাঁটার শব্দও যেন হৃদয়ের ওপর আঘাত করছিল, তখন হঠাৎ মনে হলো—এই জীবনের শেষ কোথায়? আমি কি একদিন হঠাৎ থেমে যাব? এই যে আমি—আমার স্মৃতি, আমার প্রেম, আমার স্বপ্ন—সব কি নিঃশেষ হয়ে যাবে?

এই ভাবনাই জন্ম দিল মৃত্যুভয়। কিন্তু গভীর ধ্যানে বসে বুঝলাম— মৃত্যুকে ভয় পাই কারণ আমরা জীবনকে জানি না। আমরা দেহকে জীবন ভেবে নিয়েছি। আমরা চিন্তাকে আত্মা ভেবে নিয়েছি। আমরা স্মৃতিকেই অস্তিত্ব বলে মেনে নিয়েছি। অথচ আমরা তারও গভীরে কিছু। যেদিন ধ্যানে বসে আমি প্রথম অনুভব করলাম—আমি আমার দেহ নই, আমি আমার ভাবনাও নই—সেদিন ভয় আমার কাছ থেকে ধীরে ধীরে সরে গেল।

কারণ আমি দেখলাম— যা জন্মায়, তার মৃত্যু আছে। কিন্তু যা কেবল উপলব্ধি—তার কোনো মৃত্যু নেই। ভয় আসলে অজানার প্রতি অনাস্থা। আর আস্থা জন্মায় কেবল নিজের সাথে পরিচয়ে। আমরা সমাজের ভয়েও বন্দী। মানুষ কী বলবে? লোকে কী ভাববে? আমি কি গ্রহণযোগ্য? এই প্রশ্নগুলো আমাদের সিংহভাগ জীবন শাসন করে। আমরা নিজের মতো করে হাসতে পারি না, কাঁদতে পারি না, ভালোবাসতে পারি না—কারণ সমাজের চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমি একদিন সমস্ত মুখোশ খুলে ফেললাম। নিজেকে বললাম— আজ থেকে আমি আর ভালো মানুষ হবো না, আমি সত্য মানুষ হবো। সেই মুহূর্তে আমি অনেক কিছু হারালাম—কিছু সম্পর্ক, কিছু নিরাপত্তা, কিছু প্রশ্রয়। কিন্তু আমি পেলাম—নিজেকে। ভয় কমে গেলে জীবনে এক অদ্ভুত মুক্তি নামে। তখন মানুষ বুঝতে পারে—জীবন মানে নিরাপদ খাঁচায় টিকে থাকা নয়, জীবন মানে খোলা আকাশে উড়ে যাওয়া। ভয়হীনতা কোনো বীরত্ব নয়। ভয়হীনতা গভীর গ্রহণ। যেদিন তুমি মৃত্যুকে বন্ধু বলে চিনবে, সেদিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসবে পরিণত হবে।

চলবে…

লেখক: ফরহাদ ইবনে রেহান
বই: নিজের পথে-নীরবতার যাত্রা

» নীরবতার জন্ম (সবগুলা পর্ব পড়ুন)

আরো পড়ুনঃ