মানুষের পরিচয়: ধর্মের ওপারে মানবতা

মানুষের পরিচয়: ধর্মের ওপারে মানবতা

একটা সময় ছিল, যখন মানুষ কেবল মানুষ হিসেবেই বেঁচে ছিল। তখন পরিচয়ের কোনো খোপ ছিলোনা না ধর্ম, না বর্ণ, না বিশ্বাসের বিভাজন। সবাই একই আকাশের নিচে, একই পৃথিবীর কোলে, একে অপরের পাশে জীবন কাটাত। তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠত হৃদয়ের ভাষায়, আর মর্যাদা নির্ধারিত হতো সদাচরণে। মানবতাই ছিল জীবনের একমাত্র সূত্র, আর মমতাই ছিল বিশ্বাসের নাম।

কিন্তু সভ্যতার পথে অগ্রসর হতে হতে মানুষ একদিন আবিষ্কার করল ধর্মের ধারণা। প্রথমে ধর্ম ছিল এক নির্মল আলোকরশ্মি নৈতিকতার দিশারী, শান্তি ও সুকর্মের বার্তাবাহক। কিন্তু সময়ের সাথে সেই আলোর চারপাশে গড়ে উঠল প্রাচীর। মানুষ ভুলে গেল তার সহজ পরিচয়, আর নিজেদের ছোট ছোট ঘরে বন্দি করল ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের নামে।

বিশ্বাস তখন আর সেতুবন্ধন রইল না, হয়ে উঠল বিভেদের কারণ। মানুষের মনে জন্ম নিল অহংকার, ভয়, আর প্রতিযোগিতা কে বেশি পবিত্র, কার ঈশ্বর শ্রেষ্ঠ। একসময় যারা একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজত, তারা এখন দাঁড়াল বিপরীত তীরে। ধর্মের পতাকা উঁচিয়ে তারা লড়তে লাগল, অথচ হারিয়ে ফেলল সেই মূল্যবোধ, যার জন্য ধর্ম একদিন সৃষ্টি হয়েছিল।

এভাবেই পৃথিবী ধীরে ধীরে রঙ হারাল মানবতার। ভালোবাসার স্থানে ঘৃণা জন্ম নিল, সহমর্মিতার জায়গায় এল সন্দেহ। যে ধর্ম একদিন শান্তির বার্তা বহন করত, আজ সেই ধর্মের নামেই বয়ে যাচ্ছে রক্তের নদী। মানুষ ভুলে গেছে সবচেয়ে বড় পরিচয় তার বিশ্বাস নয়, তার মানবতা।

তবুও, সব আলো নিভে যায়নি। এই অন্ধকার সময়েও কিছু মানুষ আছে, যারা এখনো বিশ্বাস করে মানুষ হওয়াই সর্বোচ্চ ধর্ম। তারা জানে করুণা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার চেয়ে বড় কোনো প্রার্থনা নেই। তাদের চোখে মানুষ মানেই মানুষ, তার নাম, জাত বা বিশ্বাস নয়। যদি সেই মানুষগুলো মানবতার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে, তবে একদিন আবার পৃথিবী আলোকিত হবে যেখানে কোনো ধর্ম নয়, মানবতা-ই হবে মানুষের প্রথম ও শেষ পরিচয়।

লেখক: ফকির জুয়েল সাধু

আরো পড়ুনঃ