সূফী হওয়ার জন্য কেবল একটি হৃদয় চাই
সূফী হওয়ার জন্য কেবল একটি হৃদয় চাই—যে হৃদয় দম্ভহীন, মমতাপূর্ণ, এবং মুক্ত। এর জন্য প্রয়োজন নেই কোনো গীর্জা, মসজিদ, মন্দির কিংবা উপাসনালয়। যেখানে ঈশ্বর নেই, সেখানে ঈশ্বরের নামে নির্মিত স্থাপনাগুলোও কেবল পাথরের স্তূপ। আর যেখানে ঈশ্বর আছেন, সেখানে হৃদয়ই হয়ে ওঠে মন্দির, আত্মা হয়ে ওঠে নামাজ, এবং মানবিকতা হয়ে ওঠে ধর্ম।
আজকের বিশ্বে আমরা দেখি, মসজিদের জন্য মানুষ যুদ্ধ করে, মন্দির নিয়ে হানাহানি চলে, গীর্জার নামে রক্ত ঝরে, অথচ কোনো বিদ্যালয়ের জন্য কাঁদে না কেউ, হাসপাতালের জন্য কেউ শহীদ হয় না। কারণ বিশ্বাসকে ব্যবহার করা যায় ক্ষমতার যন্ত্র হিসেবে, কিন্তু জ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। সূফী সেইজন্যই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে ক্ষমতাধারীদের কাছে—তিনি মূর্খতায় বিশ্বাস করেন না, অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাস করেন না।
ধর্মের নামে যারা শহীদ হয়েছে, তারা শহীদ হয়েছে বিশ্বাসের এক ঘোরে। কিন্তু সেই একই যুদ্ধে প্রতিপক্ষও মরেছে, তারাও তো কারো চোখে শহীদ! তাহলে কোন শহীদ স্বর্গে যাবে আর কোন শহীদ নরকে? এই প্রশ্নই সূচনা করে আত্মজিজ্ঞাসার, যেখানে সূফী জন্ম নেন।
সূফী জানেন, ‘স্বর্গ’ হলো শান্ত চৈতন্য; যে শান্তি আসে আত্মবোধ থেকে, মমতা থেকে, অন্যের দুঃখে হৃদয়বিদারিত হবার ক্ষমতা থেকে। ধর্মের নামে হত্যা, হিংসা ও লোভ যে স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দেয়, তা সূফীর কাছে নরকের প্রতিচ্ছবি। সূফী বলেন, “তোমার বিশ্বাস যদি অন্যকে ছোট করে, যদি অন্যের রক্ত ঝরায়, তবে সে বিশ্বাস নয়—সেটা বিষ।”
আজ আমরা ধর্ম দিয়ে মানুষ গড়ি না, বরং মানুষকে ভাঙি ধর্ম দিয়ে। কিন্তু সূফী সে পথের যাত্রী নন। তিনি একাকী চলেন নিজের আত্মার আলোর পানে, যেখানে কোন দেয়াল নেই, কোন ধর্মনাম নেই—শুধু আছে গভীর মানবতাবোধ।
যে সমাজ মসজিদ-মন্দির-গীর্জা বানাতে ব্যস্ত, কিন্তু বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, গবেষণাগার বানাতে আগ্রহী নয়—সে সমাজ সভ্য নয়, বর্বর। সূফী এ বর্বরতাকে চ্যালেঞ্জ জানান, বলেন: “মানবতা যেখানে হারায়, ঈশ্বর সেখানে মৃত।”
সুতরাং সূফী হওয়া মানে নিজেকে প্রশ্নে ফেলতে শেখা, হৃদয়কে মুক্ত করা, এবং এমন এক প্রেমের ধর্ম ধারণ করা যা সকল বিভাজনের ঊর্ধ্বে। সূফী জানেন, শহীদ হওয়া নয়, মানুষ হওয়াই আসল ত্যাগ। আর বিশ্বাস নয়, জ্ঞানই হলো আত্মার মুক্তির সোপান।
এই সত্য বুঝতে পারলেই সূচনা হয় আত্মমুক্তির, আর সেই মুহূর্তেই সূফীত্ব তোমার অন্তরে জেগে ওঠে—নিঃশব্দ, নিরাকার, অথচ আলোকময়।
– ফরহাদ ইবনে রেহা






