খুলির স্বপ্ন

খুলির স্বপ্ন

খুলির স্বপ্ন
-শ্যামলী আক্তার

একদিন এক বুড়ো লোক মাঠের মাঝে হাঁটছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটা সাদা হয়ে যাওয়া মাথার খুলির ওপর, যা ঘাসের মধ্যে পড়ে ছিল। খুলিটা এখনো তার আকার ধরে রেখেছে, যেন কিছু একটা বলতে চায়। বুড়ো লোকটা লাঠি দিয়ে খুলিটাকে একটু ঠেলে দিয়ে বলল, “হে খুলি, তুমি কি কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী লোক ছিলে? যে স্বপ্ন দেখত রাজা হবার, কিন্তু শেষে এই অবস্থা? নাকি কোনো রাজনৈতিক নেতা, যে দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজের মাথা হারিয়েছে? নাকি কোনো দরিদ্র, যে ক্ষুধায়-শীতে মরে গেছে? অথবা শুধু জীবনের স্বাভাবিক পথে এসে পৌঁছেছ?”

খুলিটা চুপ। কোনো উত্তর নেই। বুড়ো লোকটা খুলিটাকে তুলে নিল। রাতে মাথার কাছে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে খুলিটা এসে বলল, “তুমি বড় চতুর কথা বললে, কিন্তু সব কথাই জীবিতদের দুনিয়ার। মৃত্যুর দেশে এসবের কিছুই নেই। শোনো মৃত্যু কেমন- মৃত্যুতে কোনো রাজা নেই, কোনো প্রজা নেই। কোনো উপরওয়ালা নেই, কোনো নিচের তলা নেই। কোনো বছরের গণনা নেই, কোনো ঋতু নেই। সময়ের বাঁধন নেই, দুঃখ-সুখের তফাৎ নেই। এমনকি ‘আমি’ বলে কিছু থাকে না।

আমরা এখানে সবাই একসাথে, অথচ কেউ কাউকে বিরক্ত করে না। রাজার সুখও এখানকার সুখের কাছে তুচ্ছ। তুমি যদি সত্যি আমাকে ফিরিয়ে দিতে চাও জীবনে মা বাবা, বউ-ছেলে, বন্ধু-বান্ধবের কাছে তাহলে বলো, আমি কি সত্যি ফিরে যেতে চাইব?” বুড়ো লোকটা বলল, “নিশ্চয়ই চাইবে! কে না চায় জীবন ফিরে পেতে?” খুলিটা হাসল যেন মৃদু একটা হাওয়া বয়ে গেল। “দেখো, তুমি এখনো জীবনের স্বপ্ন দেখছ। আমি কিন্তু আর সেই স্বপ্ন দেখি না। জীবন ছিল একটা ছোট্ট ঘুরপাক এখন আমি বড়ো নদীর মতো হয়ে গেছি। ফিরে গিয়ে আবার ছোট্ট ঘুরপাকে আটকে পড়তে কেন চাইব?”

সকালে বুড়ো লোকটা উঠে দেখল খুলিটা তেমনি পড়ে আছে। সে আর কিছু বলল না। শুধু খুলিটাকে আলতো করে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিয়ে চলে গেল। পেছনে ফিরে তাকাল না। কারণ সে বুঝেছিল মৃত্যু কোনো শেষ নয়, আবার কোনো শুরুও নয়। শুধু একটা পরিবর্তন। যেমন মেঘ ভেঙে বৃষ্টি হয়, বৃষ্টি মাটিতে মিশে গাছ হয়, গাছ পুড়ে ছাই হয়, ছাই আবার মাটি হয়। কেউ কাঁদে না যখন মেঘ ভাঙে। তাহলে কেন কাঁদব মানুষ যখন ভাঙে?

আরো পড়ুনঃ