পীরের প্রহার পরীক্ষা (খাজা ওয়াজেদ আলী ও খাজা এনায়েতপুরির ঘটনা)
কোন একদিন হজরত খাজা সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রহ.) সাহেব তাঁহার প্রধান প্রধান মুরিদানকে ধ্যাণে বসাইয়া দিয়া বক্তৃতা প্রদান করিতে লাগিলেন। হঠাৎ তিনি ভাবোন্মত্ত হইয়া শিষ্যগণকে ফরমাইলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে কে খেলাফৎ নিবে এস।” এই বলিয়া তিনি যাঁহাকে সম্মুখে পাইলেন তাহাকেই হস্তস্থিত যষ্টি দ্বারা ভীষণভাবে প্রহার করিতে লাগিলেন। যে যেদিকে পারিলেন, ছুটিয়া পলায়ন করিলেন।
কেবল তাঁহার প্রকৃত ভক্ত-মুরিদ এনায়েতপুরি বালকটি ধ্যাণমগ্ন অবস্থায় স্থির রহিলেন। সৈয়দ সাহেব (রহ.) তাঁহাকে দর্শন করিয়াই ভীষণভাবে প্রহার করিতে লাগিলেন। কিন্তু পাছে যষ্টির আঘাতে মস্তক ফাটিয়া যায়, এই ভয়ে তিনি জানুর অভ্যন্তরে শির স্থাপন করিয়া উপুর হইয়া অটলভাবে প্রস্তরবৎ পড়িয়া রহিলেন।
তদ্দর্শনে উক্ত তাসপ্রবর বলিতে লাগিলেন:- “এ মানুষ, না কাঠ”। প্রহারের বেগ কিছুতেই থামিতেছে না দেখিয়া, হজরত সৈয়দ (রহ.) সাহেবের পূত্রদ্বয় তাঁহাকে সরাইয়া লাইবার জন্য ছুটিয়া আসিলেন। তাঁহাকে তথা হইতে সরাইবার পূর্বেই হজরত সৈয়দ (রহ.) সাহেব বলিতে লাগিলেনঃ “এরাই আবার খেলাফতি নেবে!”
এইভাবে হজরত সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রহ.) সাহেব এনায়েতপুরি সাহেবকে বাতেনি বিদ্যা শিক্ষা দান করেন।
এনায়েতপুরি সাহেবের প্রেম, প্রীতি, ত্যাগ প্রতিভা ধৈর্য্য ও ভক্তি দেখিয়া তাঁহার পীর-সাহেব পূর্ব হইতেই তাঁহার যোগ্যতার সম্যক পরিচয় পাইয়াছিলেন। ভীষণ দুঃখ- কষ্ট, যাতনা ও সাধনা জীবনের কঠিন তপস্যার মধ্যে তাঁহার জীবন কুসুম প্রস্ফুটিত হইতেছে দেখিয়া একদিন তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া -সৈয়দ ওয়াজেদ আলী মেহেদীবাগী (রহ.) সাহেব গাহিয়াছিলেনঃ
গোলুমে ফুল চামেলী নরগেছ খাড়ে একেলী,
গোলাবে নামে মীরব কাঁটুকা বন্ চমকলী।
ভাবার্থ: পুষ্পের মধ্যে নরগেছ ও চামেলী বিনা বাধায় একাই প্রস্ফুটিত হয়। কিন্তু গোলাপ তাহা পারে না। সে শত বাধা অতিক্রম করিয়া কণ্টকের ভিতর দিয়া প্রস্ফুটিত হইয়া কণ্টকবন উজ্জ্বল করে।
একদিন সৈয়দ সাহেব (রহ.) উক্ত গজলটি গাহিয়া এনায়েতপুরি সাহেবের দিকে স্বীয় মোবারক হস্ত দ্বারা ইঙ্গিত করিয়া তাঁহাকে গোলাপ ফুলের সহিত তুলনা করিয়াছিলেন। যেরূপ গোলাপকে প্রস্ফুটিত হইয়া কাটার বাগান উজ্জ্বল করিতে বিভিন্ন কণ্টক ভেদ করিয়া, শত বাধা -বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া, একটি পূর্ন -প্রস্ফুটিত -ফুলে পরিণত হইতে হয়; ঠিক সেইরূপ এনায়েতপুরি সাহেবকেও তাঁহার জীবন কুসুম পূর্ণ -প্রস্ফুটিত করিয়া আধ্যাতিক তত্ত্ব লাভ করিয়া ওলীয়ে কামেল হইতে, ভোগ করিতে হইয়াছিল – অসহ্য যাতনা, শত মুখী বাধা -বিঘ্ন এবং কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হইতে হইয়াছিল – সৈয়দ সাহেবের ভীষণ অগ্নি পরিক্ষায়।
তত্ত্বসূত্র: “আদর্শ মুর্শীদ” কিতাব






