জগতের সকল ধর্মের গভীরতম সার।
জগতের সকল ধর্মের গভীরতম সার যদি প্রেম হয়, তবে কেন এই প্রেম এত অধরা, এত দুর্গম? আমরা প্রেমের ছায়ায় বাস করি—লায়লি-মজনুর অমর কাহিনীতে মুগ্ধ হই, রুমির গজলে হারিয়ে যাই, হাফিজের শায়েরিতে মাতোয়ারা হই—কিন্তু প্রেমের সত্যিকারের আলিঙ্গনে নিজেকে সমর্পণ করি না। প্রেমের ছায়া যেন একটা মরীচিকা: দূর থেকে দেখে মনে হয় জলের ধারা, কাছে গেলে শুধু বালুকণা। জগতে প্রেমের প্রতিফলন আছে অজস্র—গানে, কবিতায়, সিনেমায়—কিন্তু প্রেমের মূল উৎস, সেই অকৃত্রিম আলো, আমাদের হৃদয় থেকে অন্তর্হিত।
প্রেম কি মতবাদ? না। মতবাদ তো সেই শুকনো পাতার মতো, যা বইয়ের পৃষ্ঠায় আটকে থাকে—পড়া যায়, আলোচনা করা যায়, কিন্তু তা থেকে জীবনের রস উঠে আসে না। প্রেম তো সেই বসন্তের হাওয়া, যা কোনো গ্রন্থের সীমায় বাঁধা পড়ে না; তা বয়ে যায় সব মতবাদের ওপারে, যেখানে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব নেই, শুধু একত্বের মিলন। মতবাদ যেন একটা কঠিন দেওয়াল: তা নির্মাণ করে আমরা নিজেকে রক্ষা করি, কিন্তু প্রেম তো সেই নদী, যা দেওয়াল ভেদ করে সমুদ্রে মিশে যায়—কোনো সীমান্ত মানে না। যদি প্রেমকে মতবাদের খাঁচায় বন্দি করি, তবে তা হয়ে যায় একটা যান্ত্রিক অনুশীলন, যেন একটা ঘড়ির কাঁটা—চলে যায়, কিন্তু হৃদয় স্পন্দিত হয় না।
প্রেম কি ধর্ম? না। ধর্ম তো সেই পথের মানচিত্র, যা দিকনির্দেশ দেয়, কিন্তু পথচলা নয়। ধর্মের নামে আমরা বিভেদ সৃষ্টি করি—যেন একটা বাগানে বিভিন্ন ফুলের মধ্যে কাঁটার বেড়া দিয়ে আলাদা করি—কিন্তু প্রেম তো সেই মালীর হাত, যা সব ফুলকে একসঙ্গে জল দিয়ে ফুটিয়ে তোলে। ধর্ম যদি প্রেমের ভিত্তি হয়, তবে কেন ধর্মের ছায়ায় এত হিংসা, এত সন্ত্রাস? প্রেম তো সেই অগ্নি, যা সব ধর্মের লেবেল পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, এবং অবশিষ্ট থাকে শুধু মানুষের মানুষত্ব। যেন একটা প্রদীপ: ধর্ম তার কাচের আধার, কিন্তু প্রেম সেই জ্বলন্ত শিখা—আধার ছাড়াই জ্বলে উঠতে পারে।
প্রেম কি ধারণা? না। ধারণা তো মনের তৈরি মায়া, যেন একটা স্বপ্নের ছবি—দেখা যায়, কিন্তু ধরা যায় না। প্রেম তো সেই জাগরণ, যা সব ধারণার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। আমরা হৃদয় ভরে দিয়েছি নানা ধারণায়—আমি প্রগতিশীল, তুমি প্রতিক্রিয়াশীল; আমি সাদা, তুমি কালো; আমি ভালো, তুমি মন্দ। এই ধারণাগুলো যেন হৃদয়ের আকাশে মেঘের দল—প্রেমের সূর্যকে আড়াল করে। হৃদয় যেন একটা খালি ক্যানভাস: আমরা তাতে রং মাখিয়ে ছবি আঁকি—মতবাদের রং, পূর্বধারণার ছোঁয়া—ফলে ক্যানভাস আর খালি থাকে না, প্রেমের সত্যিকারের ছবি আঁকা যায় না। রুমি বলেছেন, “প্রেম নয় কোনো ধারণা বা বিশ্বাস; প্রেম তো সেই মৃত্যু, যা তোমাকে পুনর্জন্ম দেয়।” ধারণা অতীতের ছায়া, প্রেম বর্তমানের আলো—যেন একটা নদীর প্রবাহ: অতীতের কাদা জমিয়ে রাখে না, সর্বদা নতুন হয়ে বয়ে যায়।
মতবাদ, ধর্ম ও ধারণা কি প্রেমের ভিত্তি হতে পারে? না। এগুলো যেন প্রেমের পথে পাথর—হোঁচট খাইয়ে দেয়, কিন্তু পথ নয়। প্রেমের ভিত্তি তো সেই নীরবতা, যেখানে সব মতবাদের গোলমাল থামে; যেন একটা গভীর কুয়ো: উপরের পাথর সরালে তবেই জলের স্বাদ পাওয়া যায়। যদি এগুলোকে ভিত্তি করি, তবে প্রেম হয়ে যায় একটা ভারী বোঝা—যেন একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠার চেষ্টা, কিন্তু প্রেম তো সেই উড়ান, যা পাহাড়ের ওপারে নিয়ে যায়।
যে হৃদয়ই খুঁজে পায় না, সে ভালোবাসবে কী করে? হৃদয় তো সেই অন্ধকার গুহা, যেখানে আমরা আলো জ্বালাই না; পরিবর্তে ভরে দিয়েছি চিন্তার ধুলোয়—যেন একটা প্রাচীন মন্দির, যার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে ধুলো-ময়লায়। আমরা হৃদয় খুঁজি বাইরের জগতে—প্রতিবেশীর চোখে, স্ত্রীর হাসিতে, সন্তানের কোলে—কিন্তু ভেতরে তাকাই না। ভেতরে তাকালে দেখি শুধু অন্ধকার: স্বার্থের ছায়া, ভয়ের জাল, বিভেদের কাঁটা। কৃষ্ণমূর্তি বলতেন, “হৃদয়কে খোঁজো না; হৃদয় তো সেই, যা চিন্তার শেষে শুরু হয়।” যেন একটা সমুদ্রের তলদেশ: উপরের তরঙ্গ দেখে মনে হয় অশান্ত, কিন্তু গভীরে গেলে নীরবতা—সেখানেই প্রেমের মুক্তা লুকিয়ে আছে।
যদি কেউ এমন একটি হৃদয়ের খোঁজ পায়, যেখানে পূর্বধারণা নেই, মতবাদ নেই, মতবিরোধ নেই, সম্প্রদায় নেই, ধর্ম নেই, তরিকা নেই, রাজনীতি নেই—তবেই প্রেম সম্ভব। সেই হৃদয় যেন একটা খালি আকাশ: কোনো মেঘ নেই, শুধু অনন্ত নীল—প্রেম তো সেই তারা, যা সেখানে জ্বলে উঠে। হাফিজ বলতেন, “প্রেমের দরজা খোলা রাখো; কোনো ধারণা দিয়ে বন্ধ করো না।” রুমি বলতেন, “সত্য-মিথ্যার ধারণার বাইরে একটা মাঠ আছে—সেখানে মিলব তোমার সাথে।” সেই মাঠে পৌঁছতে হলে হৃদয়কে খালি করতে হবে—যেন একটা বাঁশি: নিজের শব্দ হারিয়ে শুধু প্রেমের সুর বাজাতে পারে। যেন একটা খালি কলস: ভর্তি হলে জল ধরে না, খালি হলে সমুদ্রের জলও ধরে রাখতে পারে।
আমরা কি এই প্রেমহীন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে পারি? আমরা কি অকপটে স্বীকার করতে পারি নিজের স্বার্থপরতা, নিজের ভয়? যেন একটা আয়নায় তাকিয়ে নিজের ছায়া দেখা—না লুকিয়ে, না অস্বীকার করে। যদি একবার হৃদয়কে খালি করি—যেন একটা পুরনো বাড়ি পরিষ্কার করা, সব পুরনো আসবাব ফেলে দিয়ে—তবেই প্রেম আসবে। প্রেম আসবে না জোর করে, আসবে যখন আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলব—যেন একটা নদী সমুদ্রে মিলে গেলে নিজের নাম হারায়। তখন দেখব, প্রেম কোনো মতবাদ নয়, কোনো ধর্ম নয়, কোনো ধারণা নয়—প্রেম তো সেই অসীম শূন্যতা, যা সবকিছু ভরে দেয়, সবাইকে এক করে দেয়।
প্রেমের গভীরতায় ডুব দিই, প্রিয় আত্মা। হৃদয়ের দরজা খুলে দিই। তবেই প্রেম ফুটবে—যেন একটা অমর ফুল, যা কখনো শুকায় না, শুধু সুবাস ছড়ায় অনন্তকাল।
– ফরহাদ ইবনে রেহান






