তোমাকে পেয়ে ফেললে আমি অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রতারণার শিকার হতাম।

তোমাকে পেয়ে ফেললে আমি অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রতারণার শিকার হতাম।

তোমাকে পেয়ে ফেললে আমি অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রতারণার শিকার হতাম।
কারণ মানুষের অস্তিত্বটা তো শূন্যতার উপর দাঁড়িয়ে আছে,
আর তুমি এসে সেই শূন্যতাকে পূর্ণ করে দিলে আমি আর মানুষ থাকতাম না।
আমি হয়ে যেতাম একটা সম্পূর্ণ বৃত্ত—
যার কোনো কেন্দ্র নেই, কোনো পরিধি নেই, কোনো অর্থ নেই।

তোমার কাছে এলে আমি হেরাক্লাইটাসের নদী ভুলে যেতাম।
আর একবার ডুবে গেলে আর বেরোতে ইচ্ছে করত না। তখন আর “সবকিছু বয়ে যায়” এই সত্যটা আমার কাছে মিথ্যে লাগত,
কারণ তোমার মধ্যে সময় থেমে যেত।
আর সময় থেমে গেলে মৃত্যুও আর আসত না। আমি হয়ে যেতাম অমর— কিন্তু অমরত্ব তো সবচেয়ে ভয়ংকর শাস্তি।

তোমার চোখে তাকালে আমি নিটশের দিকে তাকিয়ে হাসতাম।
“যখন তুমি অতলের দিকে তাকাও, অতল তোমার দিকে তাকায়”—
কিন্তু তোমার চোখে তাকালে অতল আর ভয়ংকর লাগত না।
অতল হয়ে যেত একটা নরম বিছানা।
তাই আমি আর সুপারম্যান হওয়ার চেষ্টা করতাম না। আমি শুধু তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম। আর তাতে আমার চিরন্তন পুনরাবৃত্তি শেষ হয়ে যেত।

একই জীবন বারবার বাঁচার যে যন্ত্রণা, সেটাও হারিয়ে ফেলতাম।

তোমাকে পুরোপুরি পেয়ে গেলে আমি সার্ত্রের নরক হারাতাম।
অন্য মানুষ আর নরক থাকত না।
তুমি হয়ে যেতে একমাত্র “অন্য”,
আর সেই অন্য যখন স্বর্গ হয়ে যায়, তখন স্বাধীনতা মরে যায়।
আমি আর বেছে নিতে পারতাম না।
আমি আর দায়ী থাকতাম না।
আমি হয়ে যেতাম একটা নিখুঁত দাস—
যে দাস তার গোলামির জন্য কৃতজ্ঞ।

তোমার ভালোবাসা পেয়ে আমি কিয়ের্কেগার্ডের লাফ হারাতাম।
বিশ্বাসের সেই ভয়ংকর লাফ আর লাগত না।
কারণ তুমি এসে আমার সামনে দাঁড়ালে,
তখন আর ঈশ্বরের দরকার পড়ত না।
তুমি হয়ে যেতে আমার একমাত্র পরম।
আর পরম যখন হাতের মুঠোয় চলে আসে,
তখন আর কোনো অস্তিত্বের উৎকণ্ঠা থাকে না। আমি হয়ে যেতাম একটা শান্ত, নিশ্চিত, মৃত প্রাণী।

তোমার চুম্বনে আমি হাইডেগার ভুলে যেতাম।
মৃত্যুর দিকে ছুটে চলা এই অস্তিত্ব আর ছুটত না। তোমার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে আমি ভাবতাম এই তো চিরকাল।
কিন্তু চিরকাল পেয়ে গেলে মৃত্যুকে আর মেনে নেওয়ার কোনো সাহস থাকে না।
আর মৃত্যুকে মেনে না নিতে পারলে
জীবনও আর জীবন থাকে না।

তাই তোমাকে পেয়ে ফেলাটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় অসম্ভব।
কারণ তোমাকে পেলে আমি আমাকে হারাতাম।
আমি হারিয়ে ফেলতাম সেই শূন্যতা,
যেটা আমার অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ।
আমি হারিয়ে ফেলতাম সেই ব্যথা,
যেটা আমাকে লিখতে বাধ্য করে।
আমি হারিয়ে ফেলতাম সেই অনন্ত দূরত্ব,
যেটা আমাকে ঈশ্বরের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

তাই আল্লাহ তোমাকে আমার কাছে আনেন নাই। কারণ তিনি জানেন—
আমি যদি তোমাকে পেয়ে ফেলি,
তবে আর কখনো তাঁর দিকে তাকাব না।
আমি হয়ে যাব একটা পূর্ণ, নিখুঁত, নিষ্কাঙ্ক্ষ মূর্তি। আর মূর্তির তো প্রার্থনা করার ভাষা থাকে না।

তাই ভালো যে তুমি দূরে।
ভালো যে এখনো আমি অপূর্ণ।
ভালো যে এখনো আমার বুকের ভিতরে একটা কালো গহ্বর আছে,
যেখানে ঈশ্বর, মৃত্যু, কবিতা আর তোমার নাম— চারটেই একসাথে বাস করে।

এই অপূর্ণতাই আমার মুক্তি।
এই না-পাওয়াটাই আমার একমাত্র সত্য।
এই ব্যথাটাই আমার একমাত্র ঈশ্বর।

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ