শ্মশান বা কবর কোনো শেষ ঠিকানা নয়

শ্মশান বা কবর কোনো শেষ ঠিকানা নয়

মানুষের জন্মের মুহূর্ত থেকেই মৃত্যু তার ছায়া হয়ে পাশে হাঁটে। শ্মশান বা কবর কোনো শেষ ঠিকানা নয়, বরং এক অবধারিত রূপান্তরের দরজা—
যেখানে “আমার” বলে ধরা সবকিছু নিঃশব্দে খুলে যায়। কিন্তু মানুষের আসল ট্র্যাজেডি মৃত্যু নয়— আসল ট্র্যাজেডি হলো, সে জীবিত থেকেও নিজের জীবনকে স্পর্শ করতে পারে না।

সে অন্যের চোখে নিজেকে গড়ে,
অন্যের ভাষায় নিজের মানে খোঁজে,
অন্যের ভয়কে নিজের নিয়তি বানায়।
এইভাবেই ধীরে ধীরে সে “নিজ” থেকে সরে যায়— এবং একসময় দেখে, তার জীবনের অধিকাংশই অন্যের ধারণার ভেতর বসবাস করেছে।

যৌবনে “লোকে কী ভাববে”— এটা আসলে নিজের অজানা ভয়কে সমাজের নামে চালানো। মধ্যবয়সে “লোকে কী বলবে”এটা নিজের অসম্পূর্ণতার হিসাব অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। বার্ধক্যে এসে যখন কেউ থাকে না, তখন হঠাৎ বোঝা যায়— যাদের জন্য এত আয়োজন, তারা তো কখনোই “আমার” ছিল না।

এখানেই ভালোবাসার প্রশ্নটি গভীর হয়।
ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, এটা অস্তিত্বের একটি অবস্থা— যেখানে তুমি আর তোমার ভেতরের বিভাজন থাকে না।
যে ভালোবাসা তুমি খুঁজছো, তা কোনো মানুষ, কোনো সম্পর্ক, কোনো স্বীকৃতির ভেতর সম্পূর্ণ নয়। সেগুলো দরজা হতে পারে, কিন্তু ঘর নয়।

কারণ— যদি ভালোবাসা অন্যের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে,তবে তা অনিত্য;
আর অনিত্য জিনিস কখনো অস্তিত্বকে স্থির করতে পারে না।
সত্যিকারের ভালোবাসা তখনই জন্ম নেয়,
যখন তুমি নিজের ভেতরের শূন্যতাকে এড়িয়ে না গিয়ে তার সাথেই বসতে শিখো।
এই শূন্যতা কোনো অভাব নয়— এটাই সেই স্থান,যেখান থেকে সমস্ত সম্পর্ক, অনুভব, অর্থ জন্ম নেয়।

যে এই শূন্যতাকে ভয় পায়, সে সারাজীবন ভালোবাসা খুঁজে বেড়ায়।
যে এই শূন্যতাকে আলিঙ্গন করে,সে নিজেই ভালোবাসার উৎস হয়ে ওঠে।
তখন শ্মশান আর কবরের ভয় থাকে না—
কারণ সে বুঝে ফেলে, যা মরে তা কখনোই “আমি” ছিল না, আর যা “আমি”, তা কখনোই মরে না এই অর্থে যে তা কোনো নির্দিষ্ট রূপে সীমাবদ্ধ নয়।

শেষ পর্যন্ত,
বেঁচে থাকা মানে সময় পার করা নয়— বেঁচে থাকা মানে প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে সত্যভাবে উপস্থিত রাখা। যেখানে ভালোবাসা আর অস্তিত্ব আলাদা নয়, সেখানেই জীবন— আর তার বাইরের সবকিছু ধীরে ধীরে এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ প্রস্তুতি শেষ যাত্রার দিকে।

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ