৫০-৬০ বছর আগে এদেশের খানকা ও দরবারের উপর মানুষ যেভাবে আস্থা রাখতো।

৫০-৬০ বছর আগে এদেশের খানকা ও দরবারের উপর মানুষ যেভাবে আস্থা রাখতো।

একটা সময় ছিলো যখন এই দেশের গুরুভাগ মানুষ মাজার ও খানকার উপর আস্থা রাখতো। বেশি না ৫০-৬০ বছর আগেও এই আস্থাটা ছিলো আমাদের সমাজে। এর কারণ এই দেশে যেই সব মহান সুফিরা ইসলাম প্রচার করতে এসেছেন তাদের উদারতা। সুফিরা এই দেশে এসেছেন, খানেকা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তার সাথে মুসাফিরখানা, লঙ্গরখানার ব্যাবস্থাও করেছেন। লক্ষ্য করলে দেখবেন প্রত্তেকটা প্রাচীন দরগার আশপাশে একটা বা একের অধিক পুকুর রয়েছে। পূর্বের আমলে পানি একটা বড় সমস্যা ছিলো, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাওয়া লাগতো পানির জন্য।

এর জন্য খানেকাগুলোতে পুকুরের ব্যাবস্থা করা হয়েছিলো। মুসাফির অথবা অভাবগ্রস্থ লোকেরা একবেলা হলেও খেতে পেতো সুফিদের লঙ্গরখানায়। সুফিরা যেই এলাকায় গেছেন এবং খানেকা প্রতিষ্ঠা করেছেন সেইসব এলাকার লোকের এইরকম বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তারা কাজ করেছেন। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা না, সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যাক্তিগত সবধরনের সমস্যায় মানুষ খানেকার শরণাপন্ন হতো এবং খানেকা এই সব জায়গায় প্রভাব খাটাতে পারতো। এই সামাজিক কাজগুলো সুফিরা যে পুরোপুরি নিজস্ব অর্থায়নে করতো এমন নয়। খানেকায় নজরানা আসতো জমিদারদের অর্থকোষ থেকে, খানেকায় নজরানা আসতো কৃষকের কাটা ফসলের একটা অংশ থেকে। যে একেবারে অভাবগ্রস্থ সেও পীরের বাড়ি বা খানেকায় আসার সময় নিজের উৎপাদিত কোনো সবজি বা ঘরে পালিত মুরগী বা অন্য যে কোনো কিছু হাতে করে নিয়ে যেত।

এইগুলা কোনো জোরজবরদস্তি করে আদায় করা হতো না বা খানেকার এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে এখানে আসলে কিছু নিয়ে আসতে হবে। মানুষ নিজের ফসল বা সম্পদের একটা অংশ নিজের পীরকে দিতো ভালোবাসা থেকে, আর পীর সেই সম্পদ জমা করে কোটিপতি হতেন না, তারা তাদের লঙ্গরখানাগুলোকে উন্মুক্ত রাখতেন সব শ্রেনী, বর্ণ ও ধর্মের মানুষের জন্য। নজরানা কখনো ধর্মীয় অনুভূতির ব্যাবহার করেও আদায় করা হয় নাই। মোটকথা নজরানা কখনো আদায়ই করা হয় নাই, মানুষ তাদের ভালোবাসা থেকেই সবসময় খানেকার লঙ্গরখানাগুলো আবাদ রাখতে সহযোগিতা করতো।

দরগার পাশের পুকুর বা ছায়াদার কোনো গাছ নিয়ে আমাদের দেশের প্রায় সকল প্রাচীন দরগাতেই বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা লোকমুখে প্রচলিত। হ্যা, সুফিগন বিভিন্ন কারামাতও দেখিয়েছেন। কারামতির মাধ্যমেও মানুষকে উদ্ধার করেছেন বিভিন্ন বিপদাপদ থেকে। সবমিলিয়ে ধর্মীয় শিক্ষা, জীবনবোধের শিক্ষা ছাড়াও সামাজিক পারিবারিক সব ধরনের বিষয় নিয়ে খানেকা ছিলো মানুষের আস্থার জায়গা। বাৎসরিক ওরছের মাধ্যমে সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষকে একত্রিত করা হতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধনী-গরিব, হিন্দু-মুসলমান সব শ্রেনীর ভক্তরা এসে তিনদিন বা তার অধিক সময় একসাথে থাকতো, একসাথে খাওয়াদাওয়া করতো। এখনও এইরকম অনেক আনুষ্ঠানিকতাগুলো খানেকায় অবশিষ্ট রয়েছে কিন্তু এখন আর এই দেশের গুরুভাগ মানুষ খানেকা, দরগাহ বা মাজারের উপর আস্থা রাখে না। এর কারণ আমরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের আপডেট করতে পারিনি।

বর্তমান প্রজন্মের চাহিদাকে উপলব্ধি করতে পারিনি এবং বর্তমান প্রজন্মকে কিভাবে প্রভাবিত করা যায় সেই শিক্ষা অর্জন করতে পারিনি। একটা গোষ্ঠী দাবি করে আগেকার মানুষজন মূর্খ ছিল এতোকিছু বুঝতো না তাই তারা পীর ফকিরির মতো এইসব অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত ছিল। দাবিটা তখনকার জন্য সত্য না হলেও এখনকার জন্য অনেকাংশেই সত্য। আমাদের সমাজে অনেক ধরনের পীর আছেন কিন্তু একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যাক্তির সামনে তরিকত তাসাউফের গুরুত্ব বা তরিকত তাসাউফ যেই বিষয়টার উপর কাজ করে সেটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার মতো পীর নেই।

জ্ঞানের চর্চা এখন আর পীরদের দরকার নেই তাই তারা সেটা বাত দিয়েছেন। কাগজের কিতাবে কোনো ইলম নাই বলে নিজের মুরিদদের কিতাবাদী পড়া থেকে নিরুৎসাহিত করা পীর সাহেব যেই সিনার ইলম বা ইলমে লাদুনীর কথা বলেন সেটাও তার মধ্যে নাই। লুদুনীর ইলম বা সিনার ইলম যদি সেইসব পীর সাহেবদের থাকতো তবে অবশ্যই তারা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারতেন ও কাজ করতে পারতেন। একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যাক্তির সাথে আলোচনা করতে পারতেন কিভাবে জীবনবোধকে উপলব্ধি করা যায়।

পূর্বের এমন বহু আওলিয়াগন আছেন যারা কাগজী জ্ঞানে নিরক্ষর ছিলেন কিন্তু তাদের জীবনবোধ নিয়ে নেওয়া পদক্ষেপগুলো বা তাদের মুরিদদের দেওয়া শিক্ষাগুলোর উপর বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএচডি করানো হয়। কিন্তু বর্তমান পীরদের অধিকাংশেরই না আছে কাগজের ইলম না আছে সিনার ইলম। বংশপরম্পরায় গদ্দিনীশিন হয়ে তারা পীর হয়েছে এবং বুজুর্গীর ভাব ধরে গদিতে বসে জমিদারের মতো ভক্তদের নজরানা লুটতেছে। বংশপরম্পরার পীরদের মতো ভক্তরাও তাদের ভক্তিটা বংশপরম্পরায় ধরে রেখেছে। অনেকেই পূর্বপূরুষদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।

নতুন করে অনুরাগী তৈরি হচ্ছে না বা হলেও তা ভিন্ন ভ্রান্ত আকিদাগুলোর তুলনায় একেবারে সামান্য। সুফিবাদে বিশ্বাসী অনেক ভক্ত ও পীরেরা এখন দাবি করে যে ওহাবীবাদ বা সালাফিবাদের মতো আকিদাগুলো এইদেশে হুট করে মাথাচাড়া দিয়ে বেড়ে উঠেছে এবং তাদের জন্য মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাদের দ্বারা আমাদের সুফিদের মাজার খানেকাগুলোতে আক্রমণ হচ্ছে। এর পুরো দ্বায় কি ওহাবী সালাফীদের?এইদেশের মানুষ পূর্বে ছিলো হিন্দু কিন্তু আমাদের পূর্বের সুফিগণ তাদের মধ্যে এসে এতো প্রভাব তৈরি করতে পারেছেন আর এখন আমাদের তথাকথিত সুফিরা মুসলিমদের মধ্যেই সুফিবাদের সৌন্দর্য ও মূল নির্জাস ঢেলে দিতে পারতেছে না।

সমাজের কোথাও তারা কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারতেছে না। এর সম্পূর্ণ দ্বায় আমার বর্তমান সময়ের তথাকথিত গদ্দীনিশীন সুফি পীরদের। আমরা ভিন্ন আকিদার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারি নাই। গরিব মানুষেরা এতিমখানায় নিজেদের সন্তানদের দিয়ে এটা ভাবে যে তাদের সন্তান একজন বড় আলেম হবে এবং দুনিয়া আখিরাতে তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু সেখানে সেই শিশুগুলো হচ্ছে বলাৎকার।

আর ঐ শিক্ষাব্যাবস্থাগুলোকে না দ্বীনি শিক্ষা বলা যায় না দুনিয়াবি শিক্ষা বলা যায়। আমাদের গদ্দীনিশীন পীর সাহেবরা খুব কড়াভাবে ফেইসবুকে এইগুলার সমালোচনা করে থাকেন কিন্তু এইগুলার কোনো বিকল্প তারা তৈরি করতে পারেন নাই। তারা এমন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেন নাই যেখানে আমাদের দেশের গরিব অসহায় মানুষজন তাদের সন্তানদের দিয়ে নিশ্চিত থাকে পারে। সারাদিন ভিন্ন আকিদার আমেলদের সমালোচনা করে লাভ নাই। তারা আমাদের মোটাদাগের শত্রু নয়। তারা তাদের আকিদাকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছে এবং এদেশের একটা বড় অংশ তা গ্রহন করেছে।

এখন আমাদের গদ্দীনিশীন নজরানাভোগী পীর সাহেবদের উচিত নিজের গদি থেকে নেমে এসে নিজেদের ঘাটতিগুলো খুঁজে বের করা এবং এই ঘা কিভাবে খুব সহজে ভরাট করা যায় সেটার পন্থা খুঁজে বের করা। নিজেদের হাত থেকে নিজেদের তরিকাগুলোকে নিরাপদ করতে না পারলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে উঠবে। বাইরের ঘা বাতাসে শুকায় কিন্তু ভিতরের ঘা বাতাসে শুকায় না।

এই নজরানা ভোগী গদ্দীনিশীন পীর সাহেবেরা সুফি ঐক্যের নামে ইদানীং বিভিন্ন কার্জক্রম পরিচালনা করতেছে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এইগুলা সময়োপযোগী কোনো পদক্ষেপ নয়। এইগুলা করে কোনো লাভ নাই শুধু ভক্তদের নজরানায় সুফি ঐক্যের ব্যানারে বড় বড় অডিটোরিয়ামে বসে এসির বাতাস খাওয়া আর ফাও কিছু প্যাচাল পারা আরকি সাথে চা নাস্তাতো আছেই। সুফিবাদের সৌন্দর্য ও সুফিবাদের মাহাত্ম্য মানুষের মাঝে আগের মতো পৌঁছে দিতে হলে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের যারা সুফিবাদে বিশ্বাসী আছে তাদের এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন হতে হবে এবং গুটিকয়েক আওলিয়াগন যারা এখনও আমাদের মাঝে আছেন তাদের তাজিম ও এহতেরাম করতে হবে।

আত্মসমালোচনা বা নিজেদের ভিতরকার নিজেদের ভুলগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের না করলে আমাদের এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা অসম্ভব। আর নিজেদের ভিতরকার ইখতেলাফি যেই বিষয়গুলো নিয়ে পূর্ববর্তী বুজুর্গরা ফয়সালা দিয়েছেন সেইগুলা নিয়ে আমাদের এখন খুচাখুচি না করে পূর্ববর্তীরা যেইরকম চুপ থেকেছেন এবং প্রত্তেককে প্রত্তেকের জায়গায় স্বাধীনতা দিয়েছেন আমাদেরও উচিত সেটাই করা। এক তরিকা আরেক তরিকাকে খারেজ করার প্রবনতা আমাদের মধ্যেও ঢুকে গেছে। এটা নিয়েও যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে।

লেখা: ইমরান হাসান ইমন।

আরো পড়ুনঃ