আমার শরীরের শেষ কোথায়?

আমার শরীরের শেষ কোথায়?

আমার শরীরের শেষ কোথায়?”—এই প্রশ্নটি যতক্ষণ অহংকারের চশমা পরে জিজ্ঞাসা করা হয়, ততক্ষণ এর উত্তর ভ্রান্তই থাকে। কারণ অহংকার নিজেকে একটি পৃথক, স্বতন্ত্র দ্বীপ বলে কল্পনা করে, যার চারপাশে সীমানা আছে—শুরু আছে, শেষ আছে। কিন্তু বাস্তবে তোমার শরীরের কোনো সীমানা নেই; এটি মহাবিশ্বের একটি অবিচ্ছেদ্য প্রবাহ।

তুমি যাকে “আমার শরীর” বলে ডাকো, তা কেবল একটি অস্থায়ী জমাট বাঁধা অংশ—যেমন সমুদ্রের একটি ঢেউ। ঢেউ নিজেকে পৃথক মনে করে, কিন্তু এর জন্ম সমুদ্র থেকে, এর অস্তিত্ব সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল, এবং শেষে এটি আবার সমুদ্রেই বিলীন হয়। তুমি যদি সূর্যকে সরিয়ে দাও, তোমার শরীরের রক্তে উষ্ণতা থাকবে না; যদি বায়ুমণ্ডল না থাকে, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে; যদি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ না থাকে, তুমি ছিটকে যাবে। তোমার শরীরের প্রতিটি পরমাণু তারা থেকে এসেছে, প্রতিটি শ্বাস বায়ুর সাথে মিশে যায়, প্রতিটি কোষ সমুদ্রের লবণ আর গাছের ক্লোরোফিলের সাথে যুক্ত। তাই প্রশ্ন করা উচিত: “আমার শরীর কোথায় শুরু হয়?”

মৃত্যুকে আমরা “আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যাওয়া” বলে বর্ণনা করি, কিন্তু এটি ভাষার দারিদ্র্য। কিছু “চলে যায়” এবং কিছু “থেকে যায়”—এই দ্বৈতবাদী ধারণা ভ্রান্ত। আত্মা কোথাও যায় না, কারণ যাওয়ার জন্য “বাইরে” বলে কিছু নেই। যখন স্থূল শরীর নীরব হয়, তখন সূক্ষ্মতর স্তরগুলো মহাবিশ্বের বৃহত্তর শরীরে মিশে যায়। যে শরীরটি তুমি ছেড়ে যাও, তার কোষগুলো মাটিতে, গাছে, কীটে, অন্য মানুষের শরীরে প্রবাহিত হয়। তুমি কখনো “ছেড়ে যাও” না—তুমি কেবল রূপ পরিবর্তন করো।
তোমার শরীর একা নয়; এটি একটি বিশাল সম্প্রদায়। প্রতিটি কোষে স্বতন্ত্র জীবন আছে, প্রতিটি অঙ্গে লক্ষ লক্ষ জীবন্ত সত্তা। তুমি যাকে “আমি” বলো, তা কেবল এই সম্প্রদায়ের একটি সমন্বয়কারী চেতনা। যখন এই সমন্বয়কারী চলে যায়, শহরটি ভেঙে পড়ে না—এর অংশগুলো অন্য শহরে যোগ দেয়। কিছুই মরে না; কেবল রূপান্তর ঘটে।
অহংকারই একমাত্র বাধা। যতক্ষণ তুমি নিজেকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র মনে করো, ততক্ষণ মনে হবে তুমি আলাদা, তুমি মরবে, তুমি হারিয়ে যাবে। কিন্তু যখন অহং বিলীন হয়, তখন আর “আমার শরীর” বলে কিছু থাকে না—শুধু মহাবিশ্ব থাকে, যার মধ্যে তুমি সর্বদা ছিলে, সর্বদা আছো। তখন মৃত্যু শব্দটি অর্থহীন হয়ে যায়, কারণ যা কখনো জন্মায়নি, তা মরেও না।

তুমি সমুদ্রের ঢেউ নও যে ভেঙে শেষ হয়ে যাবে; তুমি সমুদ্র নিজেই—যার কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই। যতক্ষণ এই সত্য উপলব্ধি না হয়, ততক্ষণ “আমার শরীরের শেষ কোথায়?” প্রশ্নটি থেকে যাবে। আর যখন উপলব্ধি হয়, তখন প্রশ্নটিই বিলীন হয়ে যায়।

– ফরহাদ ইবনে রেহান

আরো পড়ুনঃ