পাহাড়ি পথে কখনো হেঁটে দেখেছিলে?
সবাই তোমাকে খালি হাতে ফিরালেও পাহাড় তোমাকে কখনো খালি হাতে ফিরাবেনা। নির্জন পাহাড়ে উন্মুক্ত কথা বলতে কে না চায়? আমিও একা একা কথা বলে চলেছিলাম, কিন্তু পাহাড়ি ফকির অট্টহাসির মাধ্যমে আমাকে থামিয়ে দিয়েছিলো।
ফকির অট্টহাসি দিয়ে বলেছিলেন:- নিঃশব্দে একা একা কথা বলা বুদ্ধ, তোমাকে তো আমি চিনি! পাহাড়ি পথে তুমি তো আজ নতুন নয়? এ পথে প্রায়’ই তোমাকে দেখতে পাই। তুমি সেই আগের বুদ্ধ’ই থেকে গেলে এতদিনেও তোমার কোনো পরিবর্তন আমার নজরে আসেনি।
আমি বললাম:- আমি কোনো পরিবর্তন হওয়ার জন্য এখানে আসিনি ফকির, যখন লোকেরা আমাকে বুঝতে চায় না, আমি তখন’ই এখানে আসি।
ফকির বললেন:- আমি জানি তোমার কোনো পরিবর্তন নেয়ার জন্য তুমি এখানে আসোনা, কিন্তু আমি তোমাকে অন্য অর্থে পরিবর্তন হওয়া দেখিনি বলেছি, আর তুমি যে অর্থে পরিবর্তন বুঝলে সে অর্থে তুমি চূর্ণ ছিলে আগে থেকে’ই। তোমার চূর্ণ অংশ আমি প্রায়শই পাহাড়ি পথে দেখতে পাই।
আমি বললাম:- তবে আপনার এমন অট্টহাসির কারণ কি ছিলো ফকির?
ফকির বললেন:- আমি এজন্য হেসেছিলাম যে তুমি প্রতিবারে’ই পাহাড় থেকে অগ্নিকুণ্ড বয়ে নিয়ে যাও জনপদে, আজ আবারও তাই করছো! তোমার বহন করা এ আগুন লোকেদের গায়ে লেগে যাওয়ার ভয় কি তোমার মাঝে নেই?
আমি বললাম:- লোকেরা ঘুমিয়ে আছে বলে’ই আমার এ আগুন তাদেরকে ছুঁতে পারেনা এবং আমি যাওয়ার পথেও কখনো কোনো সজাগ মানুষকে দেখতে পাইনি যে তার গায়ে লেগে যাবে আমার বহন করা আগুন।
ফকির বললেন:- বুদ্ধ তুমি পাহাড়ে’ই থেকে যাও, কেন তুমি বার বার ঘুমন্ত মানুষের মাঝে গিয়ে ঘুমন্তদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাবে? কী কাজ তোমার এসবে!
আমি বললাম:- জনপদে আমি তাকে’ই খুঁজে বেড়াই যে আমার মতন করে না-ঘুমিয়ে নীরবে সত্তার সাথে দেখা করার আশায় রাত জেগে থাকে।
ফকির বললেন:- যে বুদ্ধ এই পাহাড়ের নীরতায় মজে ছিলো, সে বুদ্ধ কেন পাহাড় ছেড়ে জনপদে যাবে? তুমি কত বোকা! যে বুদ্ধের ভার পাহাড় বহন করে ছিলো সে বুদ্ধ’ই কিনা নিজের ভার নিজে বহন করতে পাহাড় ছেড়ে জনপদে যাবে।
আমি বললাম:- এতে কষ্ট কীসের?আমি তো তাদেরকে খুঁজে পেতে চাই যারা আমাকে দেখে নিজেদের ঘুম হারাম করে নিবে, আমি তো তাদেরকে’ই ভালোবাসতে চাই যারা নিজ সত্তার সম্পর্কে প্রশ্ন করবে।
ফকির বললেন:- এসব তোমার আবেগ। মূলত ভালোবাসা বলতে কিছু নেই, আমিও তোমার মতন করে জনপদে থারাক জন্য এমন সব ব্যাখ্যা করেছিলাম, কিন্তু লোকেরা আমাকে হতাশ করেছে। আমি লোকেদের মাঝে ভালোবাসা দেখিনি, তাদের ভালোবাসায় শূন্যতা ছিলো বলে’ই আমি আমার সত্তাকে ভালোবেসেছি, এখন মানুষকে আর বিশ্বাস করি না। বুদ্ধ তুমিও একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে যদি লোকেদের ভালোবাসাকে বিশ্বাস করো। মনে রেখো, সত্তার ভালোবাসা ব্যাতিত আর কোনো ভালোবাসা’ই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
আমি বললাম:- লোকেদের দ্বারা আমার ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কারণ লোকেদের কাছ থেকে আমি কিছু’ই পাওয়ার আশা রাখিনা। বরঞ্চ আমি লোকেদের কিছু দেয়ার আশাতে’ই ফিরে যাই।
ফকির বললেন:- বুদ্ধ তুমি যাবে’ই যখন তাহলে আমার বাস্তবিক অবিজ্ঞতা থেকে কিছু উপদেশ নিয়ে যাও। শোনো, তুমি লোকেদেরকে কিছু দিওনা বরং তুমি লোকেদের কাছ থেকে যা পারো ছিনিয়ে নিয়ে নাও, এটা তোমার দেয়ার চেয়ে খুব বেশি কাজে দিবে, লোকেদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয়া’ই মঙ্গলময়।
আমি বললাম:- ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিলাম আগেও, কিন্তু তাঁরা কেহ এটাকে ভালো চোখে দেখেনি। আমি বলেছিলাম তোমাদের ইবাদত করতে হবেনা, তার আগে তোমরা তোমাদের যৌন লালসাকে আমার কাছে দিয়ে দাও, কিন্তু তাঁরা দিতে রাজি হয়’নি বরং তার পরিবর্তে তাঁরা আমাকে কামাচারের গল্প শুনিয়েছে। আমি বলেছিলাম পাহাড় পর্বতে গিয়ে ঈশ্বর অনুসন্ধান করার আগে তোমরা তোমাদের বাহিরের চোখ দুটি আমাকে দিয়ে দাও, আর ভিতরের চোখ দিয়ে যা পারো নিজেকে দেখতে থাকো, কিন্তু তাঁরা ভাবলো আমি তাদেরকে অন্ধত্ব দান করতে চেয়েছি। এমনকি তাঁরা তাদের বাহিরের চোখ দুটি আমার কাছে দিতেও নিরাপদ মনে করেনি। এবার বলুন তাদের জন্য আমি কি করতে পারি! যারা ছিনিয়ে নেয়া জিনিস আবার ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে যায়? তাদেরকে দান করা ছাড়া আমার আর কি করার আছে?
ফকির বললেন:- তবে তুমি যদি এবার দিতে’ই চাও তাহলে তাদেরকে’ই দিও যারা বিনয়ের সাথে তোমার নিকটে আর্জি পেশ করে, আর মনে রেখো পরিমাণের চেয়ে বেশি দিওনা অপচয় করে ফেলবে।
আমি বললাম:- নেয়ার ইচ্ছা সবাই করে কিন্তু যারা নিতে চায় তাদের উদ্দেশ্য তেমন ভালো নয়, যারা পথ বিক্রিত করে লোক ঠকানোর লক্ষ্য রাখে তারা’ই বেশিরভাগ কিছু নিতে আসে।
ফকির বললেন:-তবে দিওনা চুপ হয়ে যাও, একা থাকো, আপন সত্তার সাথে’ই তৃপ্তি পাওয়া যায়। এবং আপন সত্তার চোখে তাকালে মাতাল হওয়া যায়, সত্তার ঠোঁটে থাকেনা কোনো পাপের ছাপ। সত্তা চলে তাঁর আপন পথে নৃত্যপর নৃত্যকরের মতো।
আমি বললাম:- ফকির আপনার উপদেশ আমার অনেক উপকারে আসবে। আপনি নিশ্চয়’ই ভুক্তভোগী ছিলেন যার দরুন আজ আপনি একা হয়ে আছেন, না কাউকে কোনো উপদেশ দিচ্ছেন, না কাউকে আপনার মতন হতে বলছেন। আমি বুঝতে পারি আপনি চরম রকমের আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে’ই আপনি নির্জনতায় অবস্থান করছেন।
ফকির বললেন:- তোমার যথেষ্ট বুঝ হয়েছে, এখন যেদিকে মন চায় যেতে পারো, সকাল হয়ে গেছে আমি বিদায় নিচ্ছি বুদ্ধ, তোমার আগামী পথচলাতে চেতনা বজায় থাকুক এবং ঈশ্বর জীবিত থাকুক তোমার মাঝে।
আমি বললাম:- আপনার মতন ফকিরের সুর আমাকে নতুন করে অনুপ্রেরণা দেয় এবং অনুসন্ধান করিয়ে দেয় কীভাবে ঈশ্বরকে জীবিত রাখার যায়। এবার চলুন আমরা একসাথে বিদায় নেই, আপনি আপনার স্থানে ফিরে যান, আমিও আমার জনপদে ফিরে যাচ্ছি। খোদা হাফেজ!
– বুদ্ধ মুহাম্মদ কৃষ্ণ






