কাব্য হলো হৃদয়ের গোপন সুর

কাব্য হলো হৃদয়ের গোপন সুর

কাব্য হলো হৃদয়ের গোপন সুর, যা শব্দের ঝংকারে প্রকাশ পায়। ভাবের গভীরতা ছাড়া কাব্য জন্ম নেয় না, আর পাঠকের হৃদয় যদি সেই ভাবের সঙ্গে সুর মেলাতে না পারে, তবে কাব্যের রহস্য তার কাছে অধরাই থেকে যায়। কবি শব্দের আলোয় একটি অনুভূতির জগৎ রচনা করেন, আর পাঠক সেই জগতে প্রবেশ করে যদি নিজের হৃদয়ের প্রতিধ্বনি শুনতে পান, তবেই কাব্যের আনন্দ সত্যি হয়ে ওঠে। ‘তুমি আমার প্রিয়’—এই সহজ কথাটি বলার জন্য কাব্যের প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রিয়ার একটি হাসি আমার বুকের মাঝে কী ঝড় তুলেছে, কীভাবে আমাকে অসহায় করে দিয়েছে—এই অকথ্য বেদনা আর আনন্দের গল্পই কাব্যের উৎস।

কাব্য একটি বিশাল ক্যানভাস, যেখানে সকল শিল্পের ছোঁয়া মিশে যায়। এই কাব্যই যখন সুরে বাঁধা পড়ে, তখন তা সঙ্গীত হয়; যখন রঙে রূপ নেয়, তখন তা চিত্রকলা হয়; যখন শরীরে নাচে, তখন তা নৃত্য হয়। কাব্যই সেই মূল স্রোত, যা থেকে সব শিল্পের জন্ম।কবিতা হলো ইশারার ভাষা, যেখানে না বলা কথাই বলা হয়। কঠিন সত্য, গভীর অনুভূতি, যা সরাসরি বলা যায় না, তা কবিতার রূপকের আড়ালে প্রকাশ পায়।

লালন ফকির তাঁর গানে এই ইশারার জাদু বুনে গেছেন। “আমি একদিনও না দেখিলাম তারে, বাড়ির পাশে আরশিনগর”—এই শব্দগুলো কেবল শব্দ নয়, একটি রহস্যময় জগতের দ্বার খুলে দেয়। এর তাৎপর্য কী? যে যেমন হৃদয় দিয়ে পড়ে, তেমনই অর্থ খুঁজে পায়। কেউ বুঝিয়ে দিলে কাব্যের স্বাদ পাওয়া যায় না; লালনকে বোঝার জন্য লালনের মতো হৃদয় হতে হয়।

কাব্যের শৈলীই তার শিল্প। উপমা, রূপক, চিত্রকল্প—এগুলো কাব্যের অলঙ্কার, কিন্তু কাব্যের প্রাণ নয়। শব্দ হলো কাব্যের দেহ, উপমা তার পরিধান, আর প্রেমই তার প্রাণ। কবি শব্দের মাধ্যমে একটি দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন, কিন্তু সেই দৃশ্য পাঠকের মনে কী ছবি আঁকে, তা পাঠকের নিজস্ব সৃষ্টি। চিত্রশিল্পী রঙে যে ছবি আঁকেন, তা চোখে দেখা যায়, কিন্তু কবিতার ছবি হৃদয়ে আঁকা হয়। চাঁদের আলো কবির মনে কী জাগায়—তারই গল্প কবিতা। চাঁদকে কখনো প্রিয়ার চোখের তারা, কখনো নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী বলে কবি। এই স্বাধীনতা কেবল কাব্যেই সম্ভব।কবি সৌন্দর্য দেখেন হৃদয়ের চোখে।

চর্মচক্ষু থাকলেই যদি কবি হওয়া যেত, তবে সবাই কবি হতো। আবার চোখ না থাকলেও সৌন্দর্য দেখা যায়—হোমার, মিল্টন, সুরদাস এই সত্যের প্রমাণ। তাঁদের অন্ধত্বই কাব্যের আলো হয়ে উঠেছে। এই দেখার নাম প্রেম। প্রেম ছাড়া চোখ কেবল একটি যন্ত্র, যা দৃশ্য দেখে, কিন্তু সৌন্দর্য উপলব্ধি করে না।

কাব্য কখনো শেষ হয় না, কারণ প্রেমের শেষ নেই। পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রের জল কালি হলে, সমস্ত বৃক্ষ কলম হলে, তবু প্রেমের গল্প লেখা শেষ হবে না। প্রেমই সেই চিরন্তন শক্তি, যা কাব্যকে অমর করে। এই প্রেমই ঈশ্বরের রূপ, যা কবিতার শব্দে, সুরে, রঙে, নৃত্যে প্রকাশ পায়।

—ফরহাদ ইবনে রেহা

আরো পড়ুনঃ