তিন প্রকার মুরীদের পরিচয়ঃ

ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी العربية العربية

তিন প্রকার মুরীদের পরিচয়ঃ

খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের আলোকে বিশ্ব জাকের মঞ্জিল পাক দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্বওলী হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেবের প্রদত্ত নসিহত সমূহের ১ম খন্ড: আদাবুল মুরীদ এর নসিহত নং-৩ থেকে প্রদান করা হচ্ছে-

মুরীদে দেলীঃ

মুরীদে দেলী ঐ মুরীদকে বলা হয়, যে খোদাতায়ালাকে পাওয়ার পথে নিজের দেলকে সদাসর্বদা নিযুক্ত রাখে। আপন পীর ছাহেব কেবলাজান তাহাকে যে কর্ম ও ইবাদতের নির্দেশ দান করেন মুরীদ সেই নির্দেশই সর্বতোভাবে প্রতিপালনে নিয়োজিত থাকে। সেই নির্দেশিত কর্মের প্রতি কখনই উদাসীনতা বা অবহেলা প্রদর্শন করে না। আপন পীরের প্রতি ভয় ও ভক্তি সর্বদা তাহার দেলের মধ্যে থাকে। কোন মন্দ কর্ম সম্মুখে আসিলে পীরের ভয় তাহাকে ঐ কর্ম হইতে নিরস্ত রাখে। আপন পীরের প্রতি ভক্তি এমন প্রবল থাকে যে, তাহার খেদমত করিয়া নিজেকে চরিতার্থ মনে করিয়া তাহাতে সন্তুষ্ট থাকে। তাহার এই অবস্থা উদ্দেশ্য সাধনের পথে প্রধান অবলম্বন চিন্তা করে। এই রুপ মুরীদকে যোগ্য ও প্রকৃত মুরীদ বলে।

মুরীদে মালীঃ

মুরীদে মালী ঐ মুরীদগনকে বলে, যাহারা পীরের দরবারে প্রচুর আর্থিক খেদমতে করে অথচ পীরের নির্দেশিত নিয়মে ইবাদত বন্দেগী নিত্য ও রীতিমত করিতে সততই ত্রুটি করিয়া থাকে। যদিও ঐ মুরীদ এক সময়ে মন নিবিষ্ট করিয়া নির্দেশিত পথে নিত্য ইবাদতের আদেশ পালনে রত হয়, অপর সময়ই আবার পরিত্যাগ করে। আপন পীরের ভয় তাহাদের মনের মধ্যে অতি অল্প থাকে। আপন পীরের নির্দেশিত পথে নিত্য ইবাদতের আদেশ পালনের অক্ষমতা সম্বন্ধে তাহার পীরের নিকট বিভিন্ন কারন দর্শাইয়ে তাহাকে সম্মত করাইতে চেষ্টা করে। এই রূপ মুরীদগনও পীর হইতে কিছু উপকার প্রাপ্ত হয়। উহাদের মুরীদ হওয়া একেবারে নিস্ফল হয় না।

মুরীদে রছমিঃ

মুরীদে রছমি ঐ মুরীদগনকে বলে যাহারা পীর ছাহেবের অবস্থাদি দেখিয়া মনে ভক্তি মহব্বত না করিলেও অপরের দেখাদেখি মুরীদ হয়। আপন পীরের আদেশ পালনে উহাদিগকে কখনোই তৎপর দেখা যায়না । বরং কেহ কেহ দ্বিতীয় বার পীরের সহিত সাক্ষাত করারও চেষ্টা করেন না। তাহারা মনে করে যে, “যাহার পীর নাই তাহার পীর শয়তান, সুতরাং পীর ধরা নিতান্ত আবশ্যক, পীর ধরিলেই উদ্ধার পাওয়া যায়। তাহার নিকট সবসময় যাওয়া আসার কোন প্রয়োজন নাই।” এই বিবেচনা করিয়া কোন প্রকারে কাহারও নিকট মুরীদ হতে পারিলেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইয়া গিয়াছে বলিয়া মনে করে। পীরের নির্দেশিত পথে নিয়োজিত থাকিবার কোন প্রয়োজন তাহারা অনুভব করে না। ইহাদিগকে কেবল নামের মুরীদ বলিয়া জানিতে হইবে।

দেলী মুরীদগনের পীর ভক্তির বিবরনঃ

যে সকল মুরীদ প্রকৃত পক্ষেই আল্লাহ পাককে পাওয়ার পথে আকংখি হন, তাহাদের মনে আল্লাহ পাকের প্রেম এতই প্রবল ভাবে আবির্ভূত হয় যে, ঐ পথের প্রদর্শক পীরকেও আপন প্রান, সন্তান সন্ততি ও সহায় সম্পত্তি হইতেও অধিক প্রিয় মনে করেন। আপন পীর ছাহেব কেবলাকে সন্তষ্ট করিতে, তদীয় হুকুম প্রতি পালনে নিজের ধন ও প্রানের মায়াকে তুচ্ছ মনে করেন। যাহাতে আপন পীর সদয় থাকেন সতত সেই চেষ্টায় ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে তাহার সেবা করিতে প্রস্তুত থাকেন । পীরকে অভীষ্ট সিদ্ধির উপায় জানিয়া মুরীদ তাহার ভালভাসার এমন মত্ত হয় যে, তাহার স্মরনে আপনাকে ভুলিয়া যায় এবং যে দিকে তাকায় সেই দেকেই আপন পীরকে দেখিতে পায়। প্রকৃত প্রস্তাবে মুরীদ ঐ রুপ না হইলে সম্পর্ন্ রুপে মাঞ্জিলে মাকছুদ পৌছান তাহার পক্ষে কখনই সম্বব নয়। খোদাতায়ালার দোস্তদিগকে ভালবাসা খোদাতায়ালাকে ভালবাসারই প্রমানস্বরুপ জানিতে হইবে। মুনিবের গুনগাণকারী ও বার্তাবহ সংবাদদাতাকে সমাদর ও সম্মান করিলে মুনিবকেই সম্মন করা হয়।

একদিন হযরত জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহতায়ালার নিকট নিবেদন করিলেন, “হে রাব্বুল আলামীন! আপনি কি কারনে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে দোস্ত বলিয়াছেন?” বাণী হইল “প্রেমের জন্য; সে আমাকে যারপরনাই প্রেম করে; উহার নিকট গেলে জানিত পারিবে।” ইহা শুনিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) এক দরিদ্রের বেশ ধারন করিয়া হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর বাড়ীর নিকট এক স্থানে উপস্থিত হইলেন এবং মধুর সুরে আল্লাহতায়ালার গুনগান করিতে লাগিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাহা শুনিয়া অধির হইয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন এবং ঐ গুণগান শুনিয়া তিনি কাদিতে লাগিলেন। জিব্রাইল (আঃ)এই অবস্থা দেখিয়া চুপ করিলেন। এমন সময় হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কাতর স্বরে বলিতে লাগিলেন, “হে গায়ক! খোদার দিকে দৃষ্টি করতঃ আর কিছুক্ষল গান কর।” হযরত জিব্রাইল (আঃ) আবার গুণগান করিতে শুরু করেন।

ইব্রাহিম (আঃ) পূর্বাপেক্ষা অধিক ব্যাকুল হইয়া কাদিতে লাগিলেন। জিব্রাইল (আঃ) চমৎকৃত হইয়া আবার চুপ করিলেন। তখন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কাদিতে কাদিতে বলিলেন, “আমার সমস্ত সম্পদ ও টাকা পয়সা যাহা কিছু আছে, সব্ আপনাকে দিলাম। আপনি অধিকভাবে খোদাতায়ালার মাহিমার গুণগান করুন।” জিব্রাইল (আঃ) আবার গাইতে আরম্ভ করিলেন এবং ক্ষনকাল পরে আবার থামিলেন, তখন হযরত খলিলুল্লাহ (আঃ) নিবেদন করিলেন,“আমার সমস্ত পরিবারবর্গকে আপনার অধীন করিয়া দিলাম। আপনি পূর্বাপেক্ষা আরও বেশী আল্লাহ পাকের গুণগান করুন।” তখন জিব্রাইল (আঃ) আবার গাইতে আরম্ভ করিলেন এবং অনেকখন পর্যন্ত গুণগান করিয়া চুপ করিলেন ।

তখন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, “এখণ কেবল আমার প্রাণ অবশিষ্ট আছে, ইহাও আমি আপনাকে দান করিলাম। আপনি পূর্বাপেক্ষা আরও বেশী আল্লাহ পাকের গুনগান করুন।” তখন গায়ক আবার গুনগান আরম্ভ করিলেন।” গুণগান সমাপনান্তে হযরত খলিলুল্লাহ (আঃ) নিজের পরিচয় ব্যক্ত করিলেন এবং বলিলেন, “এই জন্যেই আল্লাহ পাক আপনাকে দোস্ত বলিয়াছেন। আপনি তাহারই উপযুক্ত।” ইহা বলিয়া তিনি অদৃশ্য হইয়া গেলেন। সংসারে যাহারা প্রকৃত তালেব তাহাদের আবস্থাও ঐরুপ। তাহারাও পরম পবিত্র খোদাতায়ালার গুণগানকারী পীরে কামেলকে নিজ প্রানাপেক্ষা ভালবাসে। মূলতঃ পীরের প্রতি মহব্বতে জাতি পয়দা না হইলে পীরের হুকুম পালন করা মুরিদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তরিকতের পথে পীরের যে কোন হুকুম পালন করা মুরীদের শর্ত । এই জন্য পীরেরহুকুম পালনে প্রয়োজন হয় মহব্বতের; প্রয়োজন হয় সাহসের।

[তথ্যসূত্র – শাহসূফি খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত, ১ম খন্ডঃ আদাবুল মুরীদ, নসিহত নং-৩]

error: অনুমতিহীন কপিকরা দণ্ডনীয় অপরাধ!