খােদাপ্রাপ্তির পথে আদব সম্পর্কে মনীষীদের উক্তি ও বেয়াদবীর কুফল।

খােদাপ্রাপ্তির পথে আদব সম্পর্কে মনীষীদের উক্তি ও বেয়াদবীর কুফল।
ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी العربية العربية

খােদাপ্রাপ্তির পথে আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস-এই চারটি মানবিক বৃত্তির বিকাশ সাধনের প্রয়ােজনীয়তা, আদব সম্পর্কে মনীষীদের উক্তি, বেয়াদবীর কুফল, পাক কুরআন ও হাদীসের আলােকে আদবের গুরুত্ব সম্পকীয় আলােচনাঃ

আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস-এই চারটি স্তম্ভের উপর খােদাপ্রাপ্তির প্লাটফর্ম স্থাপিত। 

আদবঃ আদব হইল পীরের হাতে তেমন থাকা যেমন ধৌতকারীর হাতে মাইয়েত বা মুর্দা থাকে, ইহাই আদব। ধৌতকারীর নিকট মুর্দারের যেমন কোন ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে না, তেমনি পীরের নিকটে মুরীদের কোন ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকিতে নাই।

বুদ্ধিঃ পীরের কথা ইশারাপূর্ণ। মারেফাতের ভাষা ইংগিতময়। পীরের ইশারাকে বুঝিবার বা হৃদয়ঙ্গম করিবার জন্য বুদ্ধির প্রয়ােজন পীরের ইশারা বা ইংগিত বুঝিতে না পারিলে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না, মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌছানাে যায় না। আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব বলিতেন, “পীরের ইশারা যে বুঝে না; দীন ও দুনিয়া সে খােলা দিয়া খায় অর্থাৎ দীন-দুনিয়া বরবাদ করে।”

মহব্বতঃ খােদাপ্রাপ্তির পথে আর একটি প্রয়ােজনীয় গুণ মহব্বত। এই পথে পীরকে ভালবাসিতে হয় সব কিছুর চাইতে বেশী। আপন স্ত্রী-পুত্র, মা-বাবা, ভাই-বােন, আত্মীয়-স্বজন, সহায়-সম্পদের চেয়ে পীরকে বেশী ভালবাসিতে হয়; এমন কি নিজের জীবনের চেয়েও। যে মুরীদ নিজ জীবনাপেক্ষা পীরকে বেশী ভালবাসিতে না পারিবে, সে কস্মিনকালেও খােদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছাইতে পারিবে না। খােদাপ্রাপ্তির পথে ইহা এক অন্যতম প্রধান শর্ত। 

সাহসঃ আদব, বুদ্ধি ও মহব্বতের মত এই পথে অদম্য সাহসের ও প্রয়োজন। এই গুণের অভাব হইলেও খােদাতায়ালাকে পাওয়া সম্ভব নয়। 

ধর, তােমাকে তোমার পীর বলিলেন, বাবা, তােমাকে বিদায় দেওয়া হইল; তুমি অমুক রাস্তা দিয়া গৃহাভিমুখে যাওঁ। তুমি বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিবে। কিছুদূর গমন করিবার পরে যদি পথিমধ্যে এক ক্ষুধার্ত বাঘ দেখিতে পাও, তখন তুমি কি করিবে? হয় তােমাকে সম্মুখে অগ্রসর হইতে হইবে, নতুবা পীরের দরবারে ফেরত আসিতে হইবে।

যদি সম্মুখপানে অগ্রসর হও, বাঘের হাতে তোমার মরণ হইতে পারে। অন্য দিকে, তুমি ফেরতও আসিতে পারিবে না, কারণ তােমাকে গৃহে। যাওয়ার জন্য বিদায় দেওয়া হইয়াছে, ফেরত আসিলে তাহা হইলে আদবের খেলাফ।

তুমি যদি উপযুক্ত মুরীদ হও, তবে মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করিয়া পীরের নির্দেশ প্রতিপালনের জন্য সম্মুখপানেই অগ্রসর হইবে! আর পীরের প্রতি তােমার এই আদব ও আদব রক্ষার্থে তােমার সাহসী ভূমিকা দেখিয়া আল্লাহতায়ালাও পথিমধ্যের বাঘকে সরাইয়া দিবেন। শুধু তাই নয়, তােমার এই গুণাগুণের কারণে খােদাতায়ালা তোমাকে নিজ সান্নিধ্যও দান করিবেন।

কাজেই আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস-এই চার গুণের পূর্ণ বিকাশ ব্যতীত খোদাপ্রাপ্তিজ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। আবার গুণ চারটির যে কোন একটির কমতি বা ঘাটতি থাকিলেও খােদাতায়ালাকে পাওয়া যায় না।

বুঝিবার সুবিধার্থে এখানে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়ঃ একজন মুরিদ তাহার পীরের দরবারে ১২ বছর খেদমত করিলেন। বার বছর অন্তে পীর ছাহেব তাহাকে বিদায় দিলেন। বিদায় দেওয়ার সময় একটি সুতীক্ষ্ণ ধারালো ছোরা মুরীদের হস্তে প্রদান পূর্বক বলিলেন, “বাবা, তুমি এক যুগ খেদমত করিলে, তােমাকে কি দিব, তুমি এই ছােরাটা লইয়া যাও।” মুরীদ বিনীত ভাবে পীর ছাহেবের নিকট জানিতে চাহিলেন যে, ছােরা দিয়া তিনি কি করিবেন? পীর ছাহেব তাহাকে ফরমাইলেন, “কোথাও একটি উচু গাছের নীচে তুমি ছােরাটি উল্টাভাবে গাড়িবে; এমন ভাবে গাড়িবে যেন ধারালো অগ্রভাগ মাটি হইতে বেশ কিছু উপরে থাকে।

অতঃপর তুমি সেই উচু গাছের উপরে উঠিয়া একটি ডাল হইতে সেই ছােরার তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ লক্ষ্য করিয়া লাফ দিয়া পড়িয়া মরিয়া যাইবে।” এই আশ্চর্যজনক কথা শুনিয়া মুরীদ ছােরাসহ বিদায় হইলেন। তিনি পথ চলিতেছেন, আর অশ্রু বিসর্জন করিতেছেন। কারণ পীরের নির্দেশ প্রতিপালন মানেই টাটকা মরণ।

কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরে একটা উচু গাছ দেখিয়া তিনি বসিয়া পড়িলেন। পীরের নির্দেশ মত অগ্রভাগ উপারে রাখিয়া ছােরাটিকে মাটিতে গাড়িলেন।

তৎপর গাছের উচু ডালে উঠিয়া যেইমাত্র নীচের দিকে তাকাইলেন। তৎক্ষণাৎ ভয়ে তাহার হৃদয় কাপিয়া উঠিল। তিনি নীচে নামিয়া আনেকক্ষণ বসিয়া কাঁদিলেন। একদিকে পীরের আদেশ পালন; অন্য দিকে মৃত্যুর ভয়।

তিনি আবার গাছে উঠিয়া আবারও নীচের দিকে তাকাইয়া প্রাণ ভয়ে আবারও নামিয়া কিছুক্ষণ অঝরে কাঁদিলেন। ভাবিতে লাগিলেন পীরের নির্দেশ পালন না করিলে ১২ বছরের খেদমত বৃথা যায়; ইহকাল-পরকাল বরবাদ হয়।

এই চিন্তা করিয়া তিনি আবারও গাছে উঠিলেন; কিন্তু নিম্নে ছােরার অগ্রভাগের দিকে তাকাইয়া শিহরিয়া উঠিলেন। জানিয়া শুনিয়া কিভাবে মরিবেন? তিনি নীচে নামিয়া আসিলেন। এইভাবে একবার, দুইবার, তিনবার তিনি পীরের নির্দেশ প্রতিপালনের জন্য গাছে উঠিলেন কিন্তু জীবনের মায়ায় নামিয়া আসিলেন।

চতুর্থবারে মনে মনে ভাবিলেন, ‘মরিতেতাে একদিন হইবেই। মৃত্যুর ভয়ে পীরের নির্দেশ প্রতিপালন না করিলে দীন ও দুনিয়া-উভয়ই হারাইতে হইবে। কাজেই আমি গাছে উঠিয়া চক্ষু বন্ধ করিয়া ছােরার দিকে না তাকাইয়া লাফ দিয়া মারা যাইব।” তিনি প্রাণের মায়া ত্যাগ করিয়া দৃঢ় চিত্তে পীরের নির্দেশ পালনে গাছে উঠিয়া উচু ডাল হইতে ছােরার অগ্রভাগ সােজাসুজি চক্ষু বুজিয়া ঝাপ দিলেন।

কিছুক্ষণের জন্য তিনি অজ্ঞান হইয়া পড়িলেন। জ্ঞান ফিরিলে তিনি দেখিলেন, প্রকৃত প্রস্তাবে ছােৱা তাহার বুকে বা শরীরের কোথাও প্রবেশ করে নাই। যেখানে ছােরাটি ছিল, সেখানেও নাই। ভাবিলেন, হয়তাে ছােরাটি দেহের চাপে মাটিতে গাড়িয়া গিয়াছে। মাটি খুড়িলেন, কিন্তু ছােরাটি পাইলেন না। পীরের মহব্বতে হৃদয় তাহার ভরিয়া গেল। তিনি মােরাকাবায় বসিলেন।

পীরের দিকে দেলকে মােতাওয়াজ্জুহ করিলেন। সংগে সংগে তাহার দেলের পর্দা উন্মােচিত হইল; আল্লাহর নুরে ভরিয়া গেল। তিনি শুনিতে পাইলেন, আল্লাহপাক তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছেন, “হে আমার বান্দা! তােমার আর কোন চিন্তা নাই।”

উল্লেখিত এই কাহিনী হইতে বুঝা যায় যে, আল্লাহতায়ালাকে পাইতে হলে আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহস-এই চারটি গুণের পরিপূর্ণতা প্রয়োজন। উক্ত মুরীদের আদব পুরাপুরিই ছিল, মহব্বতও পূর্ণমাত্রায় ছিল কিন্তু বুদ্ধি ও সাহসিকতার ঘাটতি থাকায় পীরের নির্দেশ প্রতিপালনে মুরীদের বিলম্ব হইতেছিল। অবশ্য আল্লাহপাকের দয়ায় কিছুক্ষণেই

মুরীদের গুণাগুণের পূর্ণতা আসে; ফলে সে পীরের হুকুম পালনে ‘ তৎপর হয় এবং নির্দেশমত গাছের উঁচু ডাল হইতে ছােরার উপরে লাফ দিয়া পড়ে।

ফলে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, খােদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়

আদবের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,

الأدب خير من الذهب و الفضة

অথাৎ “আদব বা শিষ্টাচার স্বর্ণ রৌপা হইতেও অধিক মূল্যবান ও শ্রেয়।” তাছাউফের প্রখ্যাত আলেম হযরত জোনায়েদ বােগদাদী (রঃ) ছাহেব তদীয় তাছনিফাতে বলেন,

التصوف هو الأدب

অথাৎ – “আদব রক্ষা করাই তাছাউফ।” হযরত বু-আলী দাক্কাক (রঃ) ছাহেব আদবের সুফল সম্পর্কে বলেন, “বান্দা তাহার বন্দেগী দ্বারা জান্নাত বা বেহেশত লাভ করে; আর আদব দ্বারা আল্লাহর মিলন লাভ করে।” হযরত আবুবকর কাতানী (রঃ) ছাহেব বলেন, “যে পীরের প্রতি আদব প্রদর্শন করে না, সে নিষ্ফল দাম্ভিক।”

ফারসীতে একটি প্রবাদ আছে-

“বেআদব বেনসীব
বাআদব বানসীব।”

অর্থাৎ- যাহার আদৰ নাই সে ভাগহীন; যাহার আদব আছে সে ভাগ্য ওয়ালা। শুধু খােদাতায়ালাকে পাওয়ার জন্যই নয়, দুনিয়াবী যে কোন কল্যাণ

লাভের জন্যও আদবের প্রয়ােজন। আদবের খেলাফ করিয়া দাম্ভিকতাসহ যে ব্যক্তি সমাজে বসবাস করে, সকলেই তাহাকে বেয়াদব বা বেতমিজ বলে। সমাজে সে ঘূণিত বা ধিকৃত। কোন কাজেই সে সফলতা অর্জন করিতে পারে না। কোন বিপদে পড়িলেও কেহ তাহার দিকে ফিরিয়াও তাকায় না। আদব না থাকায় দুনিয়াবী কাজেই যখন সফলতা সম্ভব নয়; সেখানে আদব শূন্য স্বভাব লইয়া খােদাকে পাওয়া কি করিয়া সম্ভব? তাই পারস্যের সূফীসাধক ও মরমী কবি, সর্বযুগমান্য মাওলানা হযরত জালালুদ্দিন রুমী (রঃ) ছাহেব তদায় মছনবী শরীফে বলেন, “বেয়াদব মাহ্রুমে গাশত আয ফাজলে রব – বেয়াদব আল্লাহর রহমত হইতে বঞ্চিত হয়। বেয়াদব তাহার বেয়াদবীর কারণে যে একাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাহা নয়। একজনের বেয়াদবার কারণে এমন কি একটি গোত্রের সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এমন বহু নজীর কুরআন হাদীছে বর্তমান।

হযরত ঈসা (আঃ) তাহার কওমের জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট দু’আ করিয়াছিলেন, “হে আমার প্রভু.পরওয়ারদিগার! আমাদের জন্য আসমান হইতে অবতীর্ণ কর খাদ্য-সামগ্রী পূর্ণ খাঞ্চা, যাহা আমাদের পূর্বাপর সকলের জন্য আনন্দের কারণ হইবে এবং তোমার কুদরতের একটি বিশেষ নিদর্শন হইবে। এতদ্ভিন্ন আমাদেরকে সর্ব প্রকার রেজেক দান কর; তুমি সর্বোত্তম রেজেকদানকারী।”

হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রার্থনার ফলে আল্লাহতায়ালা আসমান হইতে খাদ্যসামগ্রীপূর্ণ ডালা অবতীর্ণ করিতে লাগিলেন। তবে একটি শর্তারোপ করিলেন। উম্মাতে ঈসায়ীর প্রতি নির্দেশ দিলেন ডালা হইতে পেট পুরিয়া খাইতে, তৃপ্ত হইয়া খাইতে; কিন্তু ডালা হইতে খাদ্য সামগ্রী উঠাইয়া জমা করিতে বা সঞ্চয় করতে নিষেধ করিলেন। কিছু উম্মত আল্লাহর সে নিষেধ অমান্য করিয়া খাঞ্চা হইতে খাদ্য উঠাইয়া জমা করিল যাহা ছিল ঘোর বেয়াদবী। ফলে আসমান হইতে খাদ্য সামগ্রী আসা বন্ধ হইল। কতিপয় বেয়াদব উম্মতের জন্য সমগ্র গােষ্ঠীই আসমানী নেয়ামত হইতে বঞ্চিত হইল ।

ঈসা (আঃ) এর উম্মতের মত হযরত মূসা (আঃ) এর উম্মতেরা ও বেয়াদবী করিয়াছিল। একদা হযরত মুসা (আঃ) কে তদীয় উম্মতকুলসহ সাইনা উপত্যকার মরুপ্রান্তরে দীর্ঘ দিন বাস করিতে হইয়াছিল। সেখানে খাদ্য দ্রব্যের প্রচণ্ড অভাব ছিল ! ফসলাদি উৎপন্নের কোন ব্যবস্থা ছিল না। 

আল্লাহপাক হযরত মুসা (আঃ) এর খাতিরে তাহাদের প্রতি আসমান হইতে মিষ্টি হালুয়া জাতীয় এক প্রকার সুখাদ্য এবং বটের পাখীর গোশত প্রেরণের ব্যবস্থা করিলেন। ফলে বিনা পরিশ্রমে তাহাৱা আসমানী খাদ্য পাইতে ছিল। কিন্তু কতিপয় উম্মত বেয়াদবী করিল। তাহারা আল্লাহর নেয়ামত তথা আসমানী খাদ্যের প্রতি অবজ্ঞা করিয়া বলিলঃ আমরা রসুন, পেয়াজ, ডাল ইত্যাদি চাই অথাৎ মাটি হইতে উৎপন্ন ফসলাদি চাই। এই বেয়াদবীর কারণে আসমান হইতে খাদ্য আসা বন্ধ হইল।

পুরা গোত্রই আসমানী খাদ্য হইতে বঞ্চিত হইল এবং তাহাদের উপর চাষাবাদ করিয়া ফসল উৎপাদনের কষ্টের বােঝা অর্পিত হইল।

উপরের কাহিনীদ্বয় হইতে বুঝা যায় যে, বেয়াদবীর কারণে মানুষ দুনিয়াবী জীবনেও আল্লাহর রহমত, বরকত ও নেয়ামত হইতে বঞ্চিত হয়। দুনিয়াবী কল্যাণ লাভের ক্ষেত্রে আদবের গুরুত্ব যখন এত অধিক সেখানে খােদাতায়ালাকে পাওয়ার ক্ষেত্রে কি রকম আদব রক্ষা কবিয়া চলা কর্তব্য-তাহা একবার চিন্তা করিয়া দেখার বিষয়। আল্লাহপাক আমাদিগকে যত নেয়ামত দান করিয়াছেন তাহার সংখ্যা নিরুপণ করা কাহারাে পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে বলেন,

وان تعدوا نعمة الله لا تحصوها

অর্থাৎ “তােমরা গণনা করিলে আল্লাহর নেয়ামতের সংখ্যা নির্ণয় করিতে পারিবে না।” (সুরা নাহল, আয়াত নং ১৮) সেই অগণিত নেয়ামতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত হইল খােদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান। কারণ এই জ্ঞানের মাধ্যমে খােদার সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। আর এই খােদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হইলেন নবী-রাসূল ও ওলীয়ে কামেলসকল। নবী ও রাসূল (আঃ) গণ দুনিয়াতে আল্লাহর পক্ষ হইতে হেদায়েতকারী হিসাবে আসিতেন।

তাহারা মানব সমাজের নিকট আল্লাহর একাত্বের বাণী প্রচার করিতেন। আপন আপন শক্তিশালী আত্মার তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়ােগে স্ব স্ব উম্মতকুলকে নাফসে আম্মারার শৃংখল থেকে মুক্ত করতেন, শয়তানের কুমন্ত্রণা হইতে হেফাজত করিতেন; তাহাদের দেল ও দেহের পবিত্রতা দান করিতেন। নবী ও রাসূল (আঃ) গণের খেদমত করিয়া উম্মতবর্গ আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে খােদাতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করিতেন; জাত ও সিফাতের জ্ঞান অর্জন করিতেন।

শেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল (সাঃ) এর মাধ্যমে নবুয়তের দরজা বন্ধ হইলেও নবুওতের কামালাত এখনও জারী রহিয়াছে। যে সকল সাধক রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে নবুওতের কামালাতের অধিকারী মর্যাদা প্রাপ্ত হন, তাহারা নবী নহেন সত্য; কিন্তু নবুওতের যােগ্যতার আধকারী। তাহাদের চরিত্র নবীগণের চরিত্রের অনুরূপ। দুনিয়াতে তাহারা নায়েবে নবী বা নবীর ওয়ারেছ’ হিসাবে পরিচিত। তাহারা আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ হইতে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাদী’।

তাঁহারা কামেল পীর বা মাের্শেদ নামে খ্যাত। কামেল পীরগণের কর্মকান্ডও-নবী-রাসূলের অনুরুপ। তাহারা ও মানব সমাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত খােদাপ্রাপ্তি তত্ত্বজ্ঞান বিতরণ করেন। তাহারা ও স্ব স্ব জামানায় খােদা অন্বেষীদের মধ্যে তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করিয়া তাহাদেরকে নাফসে আম্মারার শৃংখল থেকে মুক্ত করিয়া নাফসে মোৎমাইন্ন্যা বা নাফসে মােলহেমায় উপনীত করেন। খােদাতালাশী ব্যক্তিবর্গ পীরে কামেলের খেদমতের মাধ্যমেই খােদাতায়ালার জাত ও সিফাতের স্থান অর্জন করেন।

যে সকল সাধক বর্গের অছিলায় অথাৎ নবী-রাসূল (আঃ) গণ ও নায়েবে নবী বা ওলীয়ে কামেলের মাধ্যমে বা অছিলায় নাফসের শৃংখল মুক্ত হওয়া যায়, শয়তানী চক্রান্ত থেকে বাচা যায়, দেল ও দেহের পবিত্রতা লাভ করা যায়, জড় জগত, নুরের জগত ও সিফাতের জগত পার হইয়া খােদাতায়ালার জাতের সান্নিধ্য বা নৈকট্য লাভ করা যায়; তাহাদেরকে কি রকম আদব প্রদর্শন করা উচিৎ, সে প্রসংগে আল্লাহতায়ালা পবিত্র আল কুরআনে যথেষ্ট দিক নির্দেশনা দান করিয়াছেন। সত্যিকার আদব-সম্মান প্রাপক হইলেন আল্লাহ স্বয়ং, তদীয় রাসূল ও মর্দে মােমেনগণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ।

و الله العزة ولرسوله وللمؤمنين و لكن

المنفقين لا يعلمون.

অর্থাৎ- “আদব বা ইজ্জত আল্লাহ, তাহার রাসূল এবং মর্দে মােমিনদের জন্য। কিন্তু মােনাফেকরা তাহা বুঝিতে পারে না।” (সূরা মােনফেকুন, আয়াত নং ৮)। এখানে মর্দে মােমেনদের পরিচয় প্রয়ােজন। মােমেন আর মােসলমান এক কথ্য নয়। ঈমান আনার পর মােসলমান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করা যায়; মােমেন স্বীকৃতি পাইতে বহু কাঠ-খড়ি পােড়াইতে হয়, বহু ত্যাগ তিতিক্ষা ও সাধনার প্রয়ােজন হয়। মােমেনের পরিচয় দানের ক্ষেত্রে রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, মােমেন হইল সেই ব্যক্তি-যাহার নামাজে মেরাজ সিদ্ধ হয়।

الصلؤ معراج المؤمنين

অর্থাৎ- “নামাজ মোমেনের জন্য মেরাজ।”

একজন সাধকের কখন মেরাজ বা খোদাতায়ালার দীদার নছিব হয়? যে সকল সাধক কামালাতে বেলায়েত ও কামালাতে নবুয়তের মাকাম সমূহ তয় করিয়া হকিকতে এলাহিয়ায় (হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে সালাত) উপনীত হইতে পারিয়াছেন; তিনি যখন নামাজে দন্ডায়মান হন, তাহার উপর হকিকতে কুরআন হইতে একটি নূরের ধাৱা, হকিকতে কাবা হইতে আর একটি নূরের ধারা এবং হকিকতে সালাত হইতে ভিন্ন একটি নূরের ধারা অবিরাম পড়িতে থাকে।

সাধক বা নামাজী তখন নিজের সমগ্র অজুদ বা সত্তাকে হযরত মুসা (আঃ) এর নূরে প্রজ্জ্বলিত বৃক্ষের মত দেখিতে পান। হকিকতত্রয়ের নূর একত্রিত হইয়া বিশাল এক নূরের গম্বুজ তৈরী করে যেই গম্বুজের মধ্যে তখন সাধক বিনীতভাবে বিগলিত প্রাণে সেজদা কৱেন। ইহাই মেরাজ।

এই অবস্থাতে সাধক খােদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের পরিপূর্ণতা অর্জন করেন, যেমন মেরাজে দয়াল নবী (সাঃ) এর খােদাপ্রাপ্তিতজ্ঞান লাভ হইয়াছিল। এমন সাধকবর্গকে বলা হয় মােমেন। কাজেই মোমেনের মর্যাদা পাওয়া এত সহজ নয়। আর ঈমান আনিলেই মােমেন হওয়া যায় না। একমাত্র ওলীয়ে কামেলগণই যথার্থ মােমেন। আর আল্লাহপাক বলেন,

او لله العزة ولرسوله وللمؤمنين و لكن المنفقين لا يعلمون .

অর্থাৎ- “আদব আল্লাহর জন্য, আদব রাসুলের জন্য এবং আদব মােমেনের জন্য অর্থাৎ ওলীয়ে কামেলগণের জন্য। কিন্তু মােনাফেকেরা তাহা বুঝিতে পারে না।” (সুরা মােনফেকুন, আয়াত নং ৮) 

নবী-রাসূল বা ওলীয়ে কামেলগণের প্রতি কি রকম আদব প্রদর্শন করিতে হইবে -সেই প্রসংগে ইশারাপূর্ণ বহু আয়াত কুরআন শরীফে আছে।

একদা এক দিবসে দ্বিপ্রহরকালে হযরত নবী-করীম (সাঃ) স্বীয় গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন। এমন সময় একদল বেদুঈন আসিয়া হোজরার বাহির হইতে উচ্চস্বরে তাহাকে ডাকিতে থাকে যাহা ছিল তাহাদের জন্য আদবের খেলাফ। সংগে সংগে আল্লাহপাক আদৰ শিক্ষা দান উদ্দেশ্যে নিম্নলিখিত আয়াত নাযিল করিলেন। আল্লাহ পাক বলিলেন,

ان الذين

ينادونك من وراء الحجرات اأكرهم لا يعقلون. و لو أنهم صبروا حتى تخرج اليهم لكان خيرا لهم ط

অথাৎ -(হে রাসুল (সাঃ) !! নিশ্চয়ই ঐ সকল ব্যক্তি যাহারা আপনাকে পবিত্র হােজরার বাহির হইতে আহ্বান করিতেছে, তাহাদের অধিকাংশই অজ্ঞানশূন্য। অর্থাৎ আপনার উচ্চ মর্তবা ও সম্মান তাহারা অবগত নহে, তাহারা যদি ধৈর্য ধারণ করিত এবং যে পর্যন্ত আপনি স্বেচ্ছায় আগমন না করেন সে পর্যন্ত অপেক্ষা করিত, তাহাই তাহাদের জন্য মঙ্গলজনক হইত।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত নং ৪-৫)

নবম হিজরীর দিকে একবার বণী তমীম গােত্রের একদল প্রতিনিধি দয়াল নবী (সাঃ) এর মজলিসে উপস্থিত হইয়া তাহাদের দেশের জন্য। এক ব্যক্তিকে আমির হিসাবে প্রার্থনা করেন। সভায় বহু সাহাবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দুই সাহাবা হযরত আবুবকর (রাঃ) ও হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেবদ্বয় উপস্থিত ছিলেন।

হযরত আবুবকর (রাঃ) ছাহেব বণী তমীম গােত্রের প্রতিনিধি হিসাবে হযরত কা’কা বেন মা’বাদের (রাঃ) কে নির্বাচিত করেন। কিন্তু হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেব নিবাচন করেন অপর সাহাবী হযরত আকরা ইবনে হারেছকে। ইহাতে হযরত আবুবকর (রাঃ) হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেবের প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়া বলেন, আপনি আমার বিপরীত ব্যতীত কিছুই চাহেন না।” প্রতি উত্তরে হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেব বলেন, ‘আমি আপনার বিরুদ্ধাচরণ করিতে চাহি নাই” ইত্যাদি।

রাসূলে পাক (সাঃ) এর সম্মুখেই সাহাবাদ্বয়ের কণ্ঠস্বর উচ্চ হইতে উচ্চতর হয়-যাহা ছিল আদবের খেলাফ।

ইহাতে আল্লাহপাক অসন্তুষ্ট হন এবং নিম্নলিখিত আয়াত শরীফ নাযিল করেন। তিনি বলেন,

يأيها الذين آمنوا لا تقدموا بين يدي الله و ارسوله واتقوا الله له ان الله سميع عليم أيها الذين آمنوا لا ترفعوا أصواتكم

فوق صوت النبي ولا تجهروا له بالقول گجهر بعضكم البعض أن تحبط أعمالكم و أنتم لا تشعرون.

অর্থাৎ-“হে বিশ্বাসীগণ! তােমরা আল্লাহ ও রাসুলের অগ্রগামী হইও না এবং আল্লাহতায়ালাকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহপাক শ্রবণকারী ও সর্বজ্ঞ। হে ঈমানদারগণ! তােমরা তােমাদের কণ্ঠস্বর নবীর কণ্ঠস্বর হইতে উচ্চ করিও না এবং তােমরা পরস্পর যে রূপ উচ্চস্বরে কথােপকথন কর, তাহার সহিত তদ্রুপ সজোরে কথা বলিও না, যাহাতে তােমাদের অজ্ঞাতসারে তােমাদের নেক আমল সমূহ ধ্বংস হইয়া যায়।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত নং ১-২) অতঃপর নিম্নলিখিত আয়াত নাযিল হইল।

ان الذين يقضون أصواتهم عند رسول الله أولئك الذين امتحن الله قلوبهم للتقوى ط لهم مغفرة و أجر عظيم.

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই ঐ সকল ব্যক্তি, যাহারা স্বীয় কন্ঠস্বর আল্লাহর রাসূলের নিকট অবনত করিতেছে, উহাদের কালব আলাহ পরহেজগারী বা নির্লিপ্ততার জন্য পরীক্ষা করিয়া লইয়াছেন। উহাদের জন্য ক্ষমা ও অতি উচ্চ পারিতােষিক প্রস্তুত আছে।” (সূরা হুজুরাত-৩)

আল্লাহতায়ালা আদৰ শিক্ষাদান উদ্দেশ্যে আবার বলিতেছেন, 

يأيها الذين آمنوا لا تدخلوا بيوت الثبي الأ أن يؤذن لكم اللي طعام غير نظرين انه و لكن اذا دعيتم فادخلوا فاذا طعمتم فانتشروا

كان يؤنی ولا مستأنسين لحديث ط أن ذلك النبي فيستحي مثم

ز و الله لا يسحتى من الحق ط و اذا سألتموهن متاعا

سئلوهن من وراء حجاب ط ذلكم أطهر القلوبگم و قلوبهن ط و ماگان لكم أن

تؤذوا رسول الله وأن تنكحوا أزواجه من بعده أبدا ط أن ذلكم كان عند الله عظيما

هه وه

অর্থাৎ “হে বিশ্বাসীগণ! তােমরা ঐ বিশিষ্ট নবী (সাঃ) এর গৃহে তাহার অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করিও না এবং যখন আহারের জন্য তোমরা আহূত হও, তখন তাহার গৃহে প্রবেশ কর। তৎপর যখন আহার সমাপ্ত হয়, তখন চলিয়া যাও। গল্পগুজবের জন্য তথায় অপেক্ষা করিও না, যেহেতু ইহা নবী (সাঃ) এর প্রতি কষ্টদায়ক। অবশ্য লজ্জায় তিনি ইহা প্রকাশ করেন না। কিন্তু আল্লাহপাক সত্য বিষয়ের প্রতি লজ্জা করেন না

অতঃপর তােমরা যখন পয়গম্বর (সাঃ) এর সহধর্মিণীগণের নিকট হইতে কোন দ্রব্য চাও, তখন তাহা তােমরা পর্দার আড়াল হইতে চাহিও, ইহাই তােমাদের ও তাহাদের অন্তকরণের জন্য পবিত্রতর কার্য। তােমাদের জন্য উচিৎ নহে যে, তােমরা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে কষ্ট দান কর এবং ইহাও তােমাদের জন্য অনুচিৎ যে, তাহার ইন্তেকালের পর কস্মিনকালেও তাঁহার সহধর্মিণীগণকে তােমরা বিবাহ কর। ইহা আল্লাহতায়ালার নিকট অতি বড় জঘন্য কাজ ও পাপ। (সূরা আহযাব, ৫৩ নং আয়াত)।

আদব প্রসংগে আল্লাহতায়ালা যে নির্দেশাদি দান করিলেন, তাহার খেলাফ করা অর্থই আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) কে কষ্ট দেওয়া, যাহার পরিণাম অত্যন্ত খারাপ। আল্লাহপাক তাই ফরমান,

ان الذين يؤذون الله و رسوله لعنهم الله في اليا و الاخرة

অর্থাৎ-“নিশ্চয়ই যাহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে কষ্ট প্রদান করে, আল্লাহপাক তাহাদিগকে ইহ-পরকালে মালাউন বা অভিশপ্ত ও বিতাড়িত করিবেন।” (সূরা আহযাব, আয়াত নং ৫৭)। সাহাবা সকল রাসূলে পাক (সাঃ) এর সংগে কত অধিক আদব রক্ষা করিয়া চলিতেন তাহার নজির নিম্নের ঘটনার মধ্যে বিধৃত।

হিজরতের ছয় (৬) বছর পরের ঘটনা। দয়াল নবী (সাঃ) ১৫০০ জন অনুচর এবং ৭০ টি কোরবানীর উট লইয়া হজ্জ উপলক্ষে মক্কাভিমুখে রওয়ানা দিলেন। এই খবর মক্কায় পৌছানাে মাত্রই কোরাইশরা বাধাদানের উদ্দেশ্যে যুদ্ধের সাজে মদিনার দিকে রওয়ানা দিল। রাসূলে পাক (সাঃ) হােদায়বিয়া নামক স্থানে পৌছাইয়া থামিয়া গেলেন। সেখানে মক্কার কোরাইশদের সহিত তাঁহার এক চুক্তি হয়-যাহা “হােদায়বিয়া সন্ধি” নামে পরিচিত।

এই সন্ধি সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে হযরত ওরওয়া (মুসলমান হওয়ার পূর্বে) কোরাইশদের পক্ষ হইতে প্রতিনিধি হিসেবে হােদায়বিয়ায় আসে দয়াল নবী (সাঃ) এর সংগে আলাপ আলােচনার জন্য। আলােচনা হয়। আলােচনার সময়ে ওরওয়ার ব্যবহার ছিল ধৃষ্টতাপূর্ণ। সে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর শ্মশ্রু মুবারক হস্ত দ্বারা বারবার স্পর্শ করিতেছিল। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পার্শে দন্ডায়মান ছিলেন সাহাবী মুগীরা বিন স’বাহ (রাঃ)।

তিনি তৎক্ষণাৎ ওরওয়ার হস্তে স্বীয় তলওয়ারের বন্ধনী দ্বারা আঘাত করিয়া বলেন, “হে ওরওয়া! দয়াল নবী (সাঃ) এর দাড়ী মােবারক হইতে তােমার হস্ত সরাইয়া লও।” ওরওয়া হাত সরাইয়া লইল। অতঃপর অত্যন্ত তীক্ষ্ণ নজরে। কথােপকথনের ফাকে ফাকে সাহাবীগণের দিকে তাকাইল এবং রাসূলে করীম (সাঃ) এর প্রতি তাঁহাদের আদব-লেহাজ দেখিয়া অতিশয় আশ্চর্য হইল।

পরবর্তীতে নিজ গােত্রে যাইয়া ওরওয়া ঘােষণা করিল, “হে আমার দল! তোমরা আমার কথা শুন। আমি বহু রাজা বাদশাহের নিকট দূত হিসাবে গমন করিয়াছি। আমি রােমের বাদশাহ, পারস্যের সম্রাট ও আবিসিনিয়ার অধিপতিদের নিকট দূত হিসাবে গমন করিয়াছি। কিন্তু কোন সম্রাট বা বাদশাহের দরবারে আমি দেখি নাই যে, তাঁহাদের সহচরগণ বাদশাহকে ঐরূপ সম্মান ও শ্রদ্ধা করে, যেইরূপ হযরত মুহাম্মদ মােস্তফা (সাঃ) কে তাঁহার সহচরগণ সম্মান করিয়া থাকেন।

আমি দেখিলাম, তিনি যখন থু থু নিক্ষেপ করেন, তখন তাহা তাহাদের (সহচরদের) কাহারাে না কাহারাে হস্তে গৃহিত হয় এবং তাহারা তাহা স্বীয় বদন ও দেহে মর্দন করেন। তিনি যখন কোন কাজের আদেশ করেন, তাহা প্রতিপালনের জন্য তাহারা দ্রুত ধাবিত হন। তিনি যখন কোন কথাবার্তা বলেন, তখন সকলেই নিম্নস্বরে তাহার সহিত কথােপকথন করিয়া থাকেন এবং আদব সম্মানার্থে তাহার প্রতি কেহই তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকান না।

তিনি যখন অজু করেন, তাহার অজুর পানি গ্রহণের জন্য অত্যন্ত ভীড় হয়। অতঃপর ওরওয়া বলিল, এমন ব্যক্তি যখন তােমাদিগকে সরল পথ বা সন্ধির প্রস্তাব দিতেছেন, তখন তােমরা ইহা গ্রহণ কর।” (বুখারী শরীফ)। এখানে উল্লেখ্য, রাসূলে পাক (সাঃ) এর সহিত সাহাবাগণের সম্পর্ক ছিল সত্যিকারার্থে পীর-মুরীদি সম্পর্ক। কারণ নবী করীম (সাঃ) ছিলেন। সাহাবা গণের জন্য পীর বা মাের্শেদ বা পথ প্রদর্শক। নবী করীম (সাঃ) ও সাহাবাগণের মধ্যেকার সম্পর্কের প্রতিবিম্বই হইল পীর-মুরীদির যথার্থ সম্পর্ক। সাহাবাগণ রাসূলে পাক (সাঃ) এর প্রতি যেরূপ আদব প্রদর্শন করিতেন, তাহাই হইল মূলতঃ খােদা নিদর্শক, পথ প্রদর্শক পীরে কামেলের প্রতি মুরীদের আদবের নমুনা।

আদব সম্পর্কীয় আলােচনায় পবিত্র কুরআন (সূরা ১৮ কাহাফঃ ৬০-৮২) ও হাদীস থেকে আরও একটি কাহিনী প্রনিধানযােগ্য। তাহা হইল, হযরত মুসা (আঃ) ও হযরত খিজির (আঃ) এর কাহিনী। পাক কুরআন ও হাদীস শরীফে এর বিবরন আছে। বােখারী শরীফে মােট ১২ জায়গায় এই কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে।

হযরত মুসা (আঃ) অন্যতম উলুল আজম পয়গম্বর ছিলেন। এলমে জাহের ও বাতেন -উভয় জ্ঞানেই তিনি জ্ঞানী ছিলেন। তবে এলমে লাদুন্নীর পরিপূর্ণতা হয়তাে তাঁহার ছিল না।

তাই আল্লাহতায়ালা একদা তাহাকে সেই জ্ঞান অর্জনের জন্য হযরত খিজির (আঃ) এর নিকট পাঠাইলেন। হযরত খিজির (আঃ) এর নিকট পৌছাইয়া হযরত মুসা (আঃ) বলিলেন, “আমি কি আপনার সংগে থাকিতে পারি এই উদ্দেশ্যে যে, আপনি আপনার আলাহপ্রদত্ত বিশেষ জ্ঞান হইতে আমাকে কিছু শিক্ষা দিবেন?’ হযরত খিজির (আঃ) মুসা (আঃ) কে সংগে রাখিলেন একটি শর্তে।

তিনি বলিলেন, আপনি আমার সংগে থাকিবেন কিন্তু কোন বিষয়েই আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করিতে পারিবেন না অথবা আমার কোন কাজে সমালােচনা করিতে পারিবেন না, যতক্ষণ না আমি। নিজে উহা ব্যক্ত করি। এই শর্তের উপরে হযরত মুসা (আঃ) হযরত খিজির (আঃ) এর সংগে থাকিবার অনুমতি পাইলেন। একদা দুইজনে পথ চলিতেছেন। সম্মুখে নদী পড়িল। নদী পারাপারের জন্য তাহারা নৌকার সন্ধান করিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ বাদে একটা নতুন নৌকা লইয়া একজন মাঝিকে আসিতে দেখা গেল।

নৌকার মাঝি হযরত খিজির (আঃ) কে চিনিলেন। তিনি সাধকদ্বয়কে নৌকায় করিয়া নদী পার করিলেন কিন্তু হযরত খিজির (আঃ) নৌকা হইতে নামিবার পূর্বে নিখুঁত নৌকার একটি তখতা খুলিয়া ফেলিলেন। ইহা দৃষ্টে হযরত মুসা (আঃ) বলিয়া ফেলিলেন, “মাঝি বিনা পয়সায় আমাদিগকে পার করিল। আর আপনি তাহার নৌকার একটি তথতা খুলিয়া ফেলিলেন, কাজটি ভাল করেন নাই।” হযরত খিজির (আঃ) মুসা (আঃ) কে তাহার। শর্তের কথা স্মরণ করাইয়া দিলেন।

হযরত মুসা (আঃ) অনুতপ্ত হইলেন। তাহারা আবার পথ চলিতে লাগিলেন। পথিমধ্যে দেখিলেন, বেশ কয়েকটি ছেলে-পেলে খেলাধুলা করিতেছে। হযরত খিজির (আঃ)। তনধ্যের একটি ছেলেকে হত্যা করিলেন। ইহা দৃষ্টে হযরত মুসা (আঃ) এর আর সহ্য হইল না। প্রতিবাদের সূরে তিনি বলিলেন, “আপনি বড়ই অবাঞ্চিত কাজ করিলেন। একটি নির্দোষ ছেলেকে মারিয়া ফেলিলেন। 

হষরত খিজির (আঃ) এবার একটু রাগতস্বরেই মুসাকে (আঃ) তাহার শর্তের কথা পুনরায় স্মরণ করাইয়া দিলেন। মুসা (আঃ) স্বীয় ভুলের জন্য দুঃখিত হইয়া বলিলেন, আর একবার যদি উক্তরূপ ভুল আমি করি, তাহা হইলে আমাকে আর আপনি সংগে রাখিবেন না; আমারও আর কোন ওজর-আপত্তি থাকিবে না।

এই বলিয়া তাহারা আবার পথ চলিতে শুরু করিলেন। পথ চলিতে চলিতে একটি গ্রামে আসিয়া উপনীত হইলেন। খুবই ক্ষুধার্ত ছিলেন তাহারা। গ্রামবাসীদিগকে খাবারের ব্যবস্থা করিতে অনুরােধ করিলেন কিন্তু গ্রামবাসীরা রাজী হইল না।

সাধকদ্বয় ঐ গ্রাম অতিক্রম করিবার সময় দেখিতে পাইলেন, একটি দেওয়াল ধসিয়া পড়িবার উপক্রম হইয়াছে। হযরত খিজির (আঃ) ঐ দেওয়ালটি হাতে ধরিয়া সােজা করিবার ন্যায় ইশারা করিলেন-আল্লাহর কুদরতে সংগে সংগে দেওয়ালটি সোজা হইয়া গেল। ইহা দেখিয়া হযরত মুসা (আঃ) তাহার শর্তের কথা ভুলিয়া আবার বলিয়া ফেলিলেন, গ্রামবাসীরা আমাদের মেহমানদারী করিল; সুতরাং আপনি ইচ্ছা করিলে এই কার্যের জন্য তাহাদের নিকট হইতে পারিশ্রমিক আদায় করিতে পারিতেন।

তখন হযরত খিজির (আঃ) পরিস্কার বলিয়া বসিলেন-এইবার আপনার ও আমার সংগ ভংগ হইল। এই পর্যন্ত যাহা কিছু ঘটিয়াছে এবং যাহা দেখিয়া আপনি ধৈর্যহারা হইয়া শর্ত ভংগ করিয়াছেন-তাহার প্রত্যেকটি রহস্য বর্ণনা করিতেছি।

শুনুনঃ নৌকাটির একটি তখতা ভাংগিয়া ফেলার কারণ -ঐ দেশের বাদশাহ বড়ই স্বৈরাচারী। নতুন ও ভাল কোন জিনিস দেখিলেই সে ছিনাইয়া লয়। যে নৌকায় আমরা পার হইলাম তাহা ছিল যেমন নিখুঁত, তেমনি সুন্দর। অথচ মাঝি ছিল খুবই অভাবগ্রস্থ। তখতা ভাংগিয়া আমি নৌকাটিকে রক্ষা করিবার ব্যবস্থা করিয়াছি।

তারপর ছেলে হত্যার রহস্য হইল-ছেলেটি অনিবার্যভাবে কাফের হইতে চলিতেছিল, অথচ তাহার পিতামাতা ঈমানদার। আমার আশংকা হইল যে, এই ছেলের মমতার বন্ধন হয়তাে মাতা পিতাকেও কুফরীর মধ্যে জড়িত করিয়া ফেলিবে। তাই মারিয়া ফেলিলাম। অবশ্য আমি প্রার্থনা করিলাম, আল্লাহতায়ালা যেন এই ছেলের পরিবর্তে তাহাদিগকে স্নেহের যােগ্য কোন সুসন্তান দান করেন।

আর দেওয়ালের ঘটনার রহস্য এই যে, দেওয়ালটির মালিক দুইটি এতিম ছেলে। তাহাদের পিতা অতি নেককার ছিলেন। তিনি ঐ শিশু দুইটির জন্য কিছু ধন-দৌলত ঐ দেওয়ালের নীচে পুতিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা হইল-এই সম্পদের হেফাজত করা, যেন এই এতিমদ্বয় বড় হইয়া তাহাদের ঐ প্রােথিত ধন বাহির করিতে পারে। ইহা সবকিছুই আমি আল্লাহতায়ালার ইংগিতে করিয়াছি; নিজের ইচ্ছামত করি নাই। ইহাই হইল উক্ত ঘটনা সমূহের রহস্য। যাহার জন্য আপনি ধৈর্য ধারণ করিতে পারেন নাই।

খােদাতত্ত্বজ্ঞ পীরের প্রতি মুরীদের আদব কত অধিক থাকা কর্তব্য তাহা কুরআন ও হাদীস পাকের উল্লিখিত ঘটনা সমূহ হইতে সহজেই অনুমেয়।

হযরত মুসা (আঃ) যদি শর্তানুযায়ী হযরত খিজির (আঃ) এর কাজে সমালােচনা না করিয়া ধৈর্যসহ চুপ থাকিতে পারিতেন; তাহা  হইলে হযরত খিজির (আঃ) এর আল্লাহপদত্ত প্রদানেও তিনি আশা হইতে পারিতেন। এই জন্যই বলা হয়, পীরের হাতে তুমি তেমন থাক, যেমন ধেীতকারীর হাতে মুর্দা। হয়তো আত্মাহপাক পরবর্তীতে তাহাকে [মুসা (আঃ)] উক্ত জ্ঞান দান করিয়াছিলেন। আল্লাহ পাকই সব ভাল জানেন।

পীরের প্রতি মুরীদের আদব প্রসংগে তরিকতের ইমাম হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাঁহার মাবদা ওয়া মা’আদ পুস্তিকাতে বলেন, “পীরের হক অন্য সকলের হকের চাইতে অধিক। বরং বলা যায় যে, পীরের হকের সাথে অন্য কাহারো হকের তুলনাই হইতে পারে না। 

আল্লাহর অনুগ্রহরাজী ও তাহার রাসূল (সাঃ) এর এহসানের পরেই পীরের হকের দর্জা; বরং সকলেরই হাকীকী পীরতো স্বয়ং রাসূলে পাক (সাঃ); যদিও জাহেরী জন্ম মাতাপিতার মাধ্যমে হইয়া থাকে কিন্তু প্রকৃত জন্ম পীরের সাথে সংশ্লিষ্ট। বাহ্যিক জন্মের হায়াততাে মাত্র কিছুদিনের জন্য। কিন্তু প্রকৃত জন্মের হায়াত চিরস্থায়ী। পীরতো তিনিই, যিনি মুরীদের বাতেনী অপবিত্রতা পরিষ্কারকারী ।…

“যে অপবিত্রতা কালব ও রূহের মধ্যে অবস্থান করে, তাহা পীর কর্তৃকই অপসারিত হয়। তিনিই খােদাতালাশীর আত্মাকে পরিস্কার করেন। কোন মুরীদকে তাওয়াজ্জুহ দেওয়ার সময় অনুভূত হয় যে, মুরীদের বাতেনী অপবিত্রতা সমূহ পীরের উপরও মলিনতার প্রভাব ফেলে এবং পীরের মধ্যেও উহা বহুক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। পীরই একমাত্র ব্যক্তি, যাহার অছিলায় মানুষ মহিমান্বিত আল্লাহ পর্যন্ত পৌছায়, যাহা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট। পীরের অছিলাতেই নাফসে আম্মারা-যাহা সৃষ্টিগতভাবে কলুষিত, তাহা পবিত্রতা হাছিল করে; পরিশুদ্ধ হয় এবং আম্মারা বা কলুষতা হইতে প্রশান্তির মাকামে উপনীত হয় এবং সৃষ্টিগত কুফরী হইতে হাকীকী ৰা প্রকৃত ইসলামে সমুন্নত হয়।

যেমন কবির ভাষায়-

ইহাদের ব্যাখ্যা যদি করি আজীবন,
সমাপ্ত হবে না তার ব্যাখ্যা কদাচন।” 

তিনি আরও বলেন, “বস্তুতঃ যদি কোন পীর কোন মুরীদকে গ্রহণ করেন, তবে মুরীদের উচিত ইহাকে নিজে সৌভাগ্য মনে করা অপরপক্ষে, কোন পীর যদি কোন মুরিদকে প্রত্যাখ্যান করেন, মুরিদের উচিৎ ইহাকে নিজের দুর্ভাগ্য মনে করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি পীরের সন্তুষ্টির আড়ালে নিহিত আছে।

অতএব মুরিদ যে পর্যন্ত পীরের সন্তুষ্টির মধ্যে নিমজ্জিত না হইবে, সেই পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করিতে পারিবে না। পীরকে কষ্ট প্রদানের মধ্যেই মুরিদের বিপদ। ইহা ব্যতীত অন্য যে কোন ভুল-ত্রূটি হউক না কেন, তাহার প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব কিন্তু পীরকে ব্যথা দেওয়ার কোন প্রতিকার নাই। পীরের অসন্তুষ্টিই মুরীদের দুর্ভাগ্যের কারণ।’

পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফের আলােচনা এবং তরিকতের মাশায়েখ বর্গের বাণী থেকে খােদানির্দেশক পীর ও মাের্শেদের মর্যাদা এবং পীরের প্রতি মুরীদের আদব রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে নিশ্চয় তােমরা উপলব্ধি করিতে পারিয়াছ। কাজেই, হে জাকেরান সকল! তােমরা যদি খােদাতায়ালাকে পাইতে চাও, খােদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান বা সর্বোৎকৃষ্ট নেয়ামতের অধিকারী যদি হইতে চাও, তবে প্রতি পদক্ষেপে আদব রক্ষা করিয়া চল। পীরের ইচ্ছাতে নিজের ইচ্ছাকে বিলীন কর । পীরের যে কোন নির্দেশ যথাযথ পালন কর। পীরের হুকুমের মধ্যে নিজের বিবেক খাটাইবে না; ভাল মন্দ চিন্তা করিও না।

হযরত মুসা (আঃ) যদি হযরত খিজির (আঃ) এর কর্মের ভাল-মন্দ চিন্তা না করিতেন, তাহা হইলে যে উদ্দেশ্যে আল্লাহপাক তাহাকে খিজির (আঃ) এর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন তাহা হযরত মুসা (আঃ) এর সিদ্ধ হইত। কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত “মুসা-খিজির কাহিনী” পীরের প্রতি মুরীদের আদব রক্ষার বা আদব প্রদর্শনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মনে রাখিও, আদবের বিন্দু পরিমাণ খেলাফ হইলে খােদাপ্রাপ্তিজ্ঞান অর্জন করিতে পারিবে না। 

আদবের সাথে সাথে পীরকে ভালবাস, মহব্বত কর। পীরের ইশারা বুঝিবার চেষ্টা কর। পীরের যে কোন হুকুম পালনের জন্য অদম্য সাহস রাখ। আমি দু’আ করি, এই পথে চলিতে আল্লাহপাক তোমাদিগকে আদব দেন, বুদ্ধি দেন, মহব্বত দেন, সাহস দেন, ভক্তি দেন, শক্তি দেন। আমীন!


টীকা।

_______

১। তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী- “তাওয়াজ্জুহ” অর্থ আত্মিক শক্তি বা প্রভাব।
তাওয়াজ্জুহ চার প্রকার। যথাঃ (ক) তাওয়াজ্জুয়ে এনেকাছি, (খ) তাওয়াজ্জুয়ে এলকায়ী, (গ) তাওয়াজ্জুয়ে এছলাহী এবং (ঘ) তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী। ওলী-আল্লাহগণকে আল্লাহপাক উল্লিখিত চার প্রকারের শক্তি দান করেন। চতুর্বিধ তাওয়াজ্জুয়ের মধ্যে তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী সর্বাধিক কার্যকরী। ডিনামাইটের সাহায্যে যেমন পাহাড়-পর্বত ধ্বংস করা যায়, তেমনি ওলী-আল্লাহগণ তাহাদের দেলস্থিত তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী নামক ডিনামাইটের সাহায্যে গােনাহগার মুরীদ সন্তানের দেলের গােনাহের পাহাড় ধ্বংস করেন; দেলে আল্লাহর জেকের জারী করাইয়া দেন।

২। নাফসে আম্মারা-নাফ্স অর্থ প্রবৃত্তি। নাফসের পাঁচটি স্তর আছে। যথাঃ (ক) নাফসে আম্মারা, (খ) নাফসে লাওমা, (গ) নাফসে মােৎমাইন্ন্যা, (ঘ) নাফসে মােলহেমা এবং (ঙ) নাফসে মােহাদ্দেসা। পাঁচটি স্তরের মধ্যে নাফসের নিকৃষ্ট অবস্থাই হইল আম্মারার স্তর। যাবতীয় কুচিন্তা ও কুকর্মের উৎপত্তিস্থল এই নাফস। খােদায়ী দাবী করা ইহার জাত- স্বভাব। খােদাতায়ালাকে স্বীকার করিতে সে নারাজ। ওলী-আল্লাহ সকল নাফসে আম্মারাকে ফেরাউন বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।

৩। জাত – সত্তা।

৪। সিফাত – গুণাবলী।

৫। কামালাত – পূর্ণতা বা যােগ্যতা।

৬। ওয়ারেছ – উত্তরাধিকারী।

৭। হাদী – হেদায়েতকারী বা পথ প্রদর্শক।

৮। নাফসে মােৎমাইন্যা – প্রশান্ত নাফস বা খােদার উপর সন্তুষ্ট নাফসকে নাফসে মোৎমাইন্না বলা হয়। নাফসের এই স্তর পবিত্র এবং আম্মারার দুষ্ট স্বভাবমুক্ত। বেলায়েতের ছােগরা স্তরের ওলী-আল্লাহগণের নাফস মােৎমাইন্যা প্রাপ্ত নাফস। খােদাতায়ালা তাহাদের উপর সন্তুষ্ট; তাহারাও খােদার উপর সন্তুষ্ট।

৯। নাফসে মােলহেমা – মােৎমাইন্যার উর্ধ্বের স্তরের নাফসকে নাফসে মোলহেমা বলা হয়। এই নাফস এলহামপ্রাপ্ত তথা আল্লাহর সাথে কথােপকথনের যােগ্যতা প্রাপ্ত নাফস।

১০। ঈমান – বিশ্বাস।

১১। মেরাজ – দীদার। 

১২। কামালাতে বেলায়েত – যে মাকামে বেলায়েত বা খােদার সান্নিধ্য পূর্ণতা। পায়-তাহাই কামালাতে বেলায়েত।

১৩। হকিকতে এলাহিয়া – মূল মারেফাত কারখানায় এমন কতিপয় মাকাম আছে-যাহা কেবলমাত্র ইবাদতের মাধ্যমে অতিক্রম করিতে হয়। যথাঃ হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে সালাত ও মাবুদিয়াতে সেরফা। উল্লিখিত চারটি মাকামকে একত্রে “হকিকতে এলাহিয়া” বলা হয়।।

১৪। কালব – মানবদেহস্থিত আলমে আমরের একটি লতিফা। ইহা বুকের বামস্তনের দুই অংগুলী পরিমান নীচে অবস্থিত। কালবকে আল্লাহতায়ালার। ভেদের মহাসমুদ্র বা মহা জ্ঞানভান্ডার বলা হয় । 

১৫। এলমে লাদুন্নী – বাতেনী জ্ঞান।

১৬। খােদাতত্ত্বজ্ঞ – খােদাতত্ত্বজ্ঞানী।

১৭। অছিলা – মাধ্যম।

সূত্রঃ নসিহত প্রথম খন্ড (আদাবুল মুরীদ) – নসিহত নং -১

error: অনুমতিহীন কপিকরা দণ্ডনীয় অপরাধ!